বড় বাস্তব *** তনুজা চক্রবর্তী

বড় বাস্তব

তনুজা চক্রবর্তী

যারা আপন হয়েও, অপরিচিত
তারা আত্মার আত্মীয় নয়।
ওরা জন্মকে বিদ্রুপ করে,
ধর্মকে এগিয়ে দেয়।
বলে, যা করছো সবটাই ভুল!
গলায় সুর, কলমে শব্দ তবু আসে।
সে এক পাখির ঠোঁট থেকে ঝরে পড়া বীজ,
পাখিরা উড়ে যায়, ভুলে যায় সব–
বীজ থেকে চারা হয়, তারপরে গাছ।
জীবনভর কেবল দিয়ে যায়—
লিখিয়ে নেয় জীবনের কথা ।

# দিবস কেন যে এলো না # – ৫ কলমে – অরণ্যানী

# দিবস কেন যে এলো না # – ৫

কলমে – অরণ্যানী

মেয়েটিকে পরীক্ষা করে নীলম দেখলো, প্রায় চার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে সে গর্ভবতী! রোগা, রক্তাল্পতার ছাপ চোখে মুখে। তবে গায়ের রঙটা আর মুখের মাধুর্য এসকল দুর্বলতাকে ঢেকে দেয়। সে মাধুর্যের মধ্যেও একটা মলিনতার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু রোগাটে ছোট খাটো চেহারায় প্রেগনেন্সি ধরা পড়ে না বলে না দিলে। বয়স কত আর হবে, হয়তো আঠারোর কাছাকাছিই কিছু।
নীলম — আগে টের পাসনি? এতো দেরি করলি?
-— বলেছেল বে করবে।
—- আর কবে করবে? বাচ্চা হয়ে গেলে? যদি বিয়ে করতে না চায় কী করবি ভেবেছিস?
—- নাগো দিদা, ও অমন নয়।
— সেই ও টা কে শুনি?
—- সে আমি বলতি পারবুনি।
—- তবে কী করবি? এখানে তো এই অবস্থায় বাচ্চা নষ্ট করার কোনও ব্যবস্থাই নেই।
—- নষ্ট ক্যানে করব?
—- বিয়ে করতে গেলে তোর ও টা কে, তা তো সবাই জানবে।
—- পাইলে যাব। ও আসুক না ক্যানে।
—- তবে আমার কাছে কেন এসেছিস?
নীলম এবার একটু ধমকের সুরেই বলল।
—– গ্রামে তো দু’দিন পর থেকেই হই হই পড়ে যাবে। নাকি তার আগেই পালাবি? কিন্তু আমি ঠিক কী করব?
—- বাচ্ছাটা ঠিক আচে কিনা তাই দেকাতে এলুম।
—- বাচ্চা কী করে ঠিক থাকবে? তোর শরীরে তো রক্ত কম, তোকে খাওয়া দাওয়া করতে হবে অনেক ভালো করে। মুসুর ডাল, শাক সবজি, ডিম, দুধ, ফল, এগুলো খেতে হবে। সেছাড়া ওষুধও খেতে হবে নিয়মিত।
চন্দনা নীলমের মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। নীলম বুঝল ও কিছু গোপন রাখতে চায়। কিন্তু ওর ও টা তো বোধহয় এখানে নেই এখন। যদি এরমধ্যে না ফেরে? ওরা যে অত সহজে বিশ্বাস করে ফেলে – – –
নীলম আবারও প্রশ্ন করল — ওর নাম আমাকেও বলা যাবে না? কোনো বিপদে পড়লে কী করবি?
চন্দনার চোখে আবারও জল। নীলমের পাশের ছোট্ট ঘরের বেডটার উপর চন্দনা বসে। মাঝে মাঝে অসময়ে রুগী এসে পড়লে ওখানেই দেখার ব্যবস্থা আছে। নীলম চন্দনার মাথায় হাত রেখে স্নেহের সঙ্গে বলল, “কেঁদে কিছু করা যায় না রে বোকা। বল আমাকে। আমি নয় প্রয়োজন না পড়লে কাউকে বলব না”।
চন্দনা হঠাৎ নীলমের হাতটা মাথায় চেপে ধরে বলল, আমি না বললে তুম্মো কিচু বলবেনি বলো।চন্দনার চোখে মুখে দৃঢ়তার ছাপ।
—- এই মাতায় হাত দেছো। যদি বলো আমার মরণ হবে।
অসহায় মুখে নীলম প্রতিজ্ঞা করতে চন্দনার মুখ থেকে ধীরে ধীরে সব বের হতে থাকল।

সে গাঁয়ের তপনকে ভালোবেসেছে। তপন বিয়ে করার আগে থেকেই চন্দনাকে ভালোবাসতো। কিন্তু তপন কোনও কাজ না পেলে চন্দনা বিয়ে করতে রাজি হয়নি। এরমধ্যে তপনের বাড়ি থেকে মিথ্যে বলে ওদের চেয়ে বেশি অবস্থাপন্ন ঘরের একটি মেয়ের সঙ্গে তপনের বিয়ে ঠিক করে ফেলা হয়। তপন শেষ বার চন্দনাকে বিয়ের কথা বলে। কিন্তু চন্দনা রাজি হয় না। ততদিনে তপনের সন্তান যে তার গর্ভে এসেছে তা সে টের পায়নি। একদিন চন্দনার সঙ্গে ঝগড়া করে তপন বাড়ির ঠিক করা পাত্রীকেই বিয়ে করে ফেলে। আর তার কিছু দিন পরই কেরালায় শ্রমিকের কাজ নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার আগে চন্দনাকে বলে যায়, সে তাকে এখনো ভালোবাসে। চন্দনাও টের পায় ততদিনে তপনের সন্তান তার গর্ভে। সে কথা চন্দনা তপনকে জানায়। তপন সব গোপন রাখতে বলে যায়। আর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যায়, ফিরে এসে চন্দনাকে নিয়ে সে পালাবে। একেবারে কেরালায় থাকার ব্যবস্থা করেই সে আসবে। কিন্তু মাস খানেক কেটে গেছে, তপনের কোনও খোঁজ নেই। তার বউ বা বাড়ির লোকজন, গাঁয়ের বন্ধুরা, কেউই জানে না তপন কোথায়! অথচ ওর সঙ্গে যারা গ্রাম থেকে কাজে গিয়েছিল, তারা বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। কিন্তু তারাও আজ আর জানে না তপন কোথায়! চন্দনা বিশ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, তপন ঠিকই আসবে।
(চলবে )

আক্কেল গুড়ুম! কলমে- দীপ্তি নন্দন

আক্কেল গুড়ুম!
কলমে- দীপ্তি নন্দন

কদিন থেকেই ময়ূখের মনটা খুব অস্থির হয়ে আছে। ওদের কলেজে , ফার্স্ট ইয়ারের বাংলা অনার্সে ভর্তি হওয়া, নতুন মেয়েটাকে( নামটিও বেশ, রোমিতা) দেখে অবধি, তাদের সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেদের নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ হয়ে যাবার যোগাড় হয়েছে! ময়ূখ ওদের সেকেন্ড ইয়ার ফিজিক্স অনার্সের ছাত্রদের দলের সর্দার। খুব স্মার্ট আর মেধাবী হওয়ার জন্য সকলেরই পছন্দের মানুষ সে। কলেজের গেটের কাছে দাঁড়ানোটা তাদের রোজকার কাজ! আর অনেকেই তাদের দিকে একটু চোরা চাউনি যে ফেলে না তা নয়। বিশেষ করে ময়ূখের দিকে না তাকিয়ে কেউ যায় না। ময়ূখ এতদিন ধরে এই চিত্র দেখে দেখে, এটাকেই নিয়ম বলে মনে করত।
কিন্তু এবার সে জোর ধাক্কা খেয়ে গেছে, এই রোমিতার কাছে।
মাত্র সপ্তাহ খানেক আগের ঘটনা। রোজের মতোই গেটের সামনে দলবল নিয়ে গুলতানি করছিল সে, আর সঙ্গে চলছিল, মেয়ে দেখা! এমন সময় হঠাৎ করেই একটা বেশ বড়ো গাড়ি এসে থামতে, তারা কৌতূহলী হয়ে দেখতেই ,দেখল তাকে! আর সব ঋতু হেনা, লুসি, রুশা এদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একজনকে। বেশ কালো , কিন্তু অসাধারণ সুন্দর ফিগার, লিপস্টিক হীন স্বাভাবিক রঙের ঠোঁটের ফাঁকে, তার মুক্তোর মতো দন্ত পংক্তির মিষ্টি হাসি মাখানো মুখ আর কোমর ছাপানো একরাশ কোঁকড়া চুল নিয়ে, শাড়ি পরে একজনকে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা চলে যেতে! তারপর এতগুলো দিন ময়ূখ খুব চেষ্টা করেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। এমনকি মেঘলা দিনেও চোখের ভাব লুকোতে কালো চশমা অবধি পরেছে সে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সেই মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে, তার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কোনো দিকে নজর না দিয়ে চলে গেছে রোজই!
তাই আজ ময়ূখের মন মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে। কেউ কোন কথা বললেই রেগে, দু-চার কথা শুনিয়ে দিচ্ছে। প্রথমে এল মা, “কি রে খোকন, আজ কি কলেজ ছুটি? এখনও তৈরি হলি না!” তারপর দাদা- বৌদি। “কি রে ছোটন, লেখাপড়া সব গোল্লায় দিয়ে, এখনও বসে আছিস? কলেজ নেই? ”
এর পরে রামু এসে বলে, “ও দাদাবাবু, এখনও বসে, কেন গো? আমি ঘর পরিস্কার করব তো! “ধুত্তেরি” বলে বাইক হাঁকিয়ে কলেজে পৌঁছতেই, পেছন থেকে,” ও দাদাভাই, একটু শোন! “শুনে ঘুরে তাকাতেই
ময়ূখ চমকে ওঠে! কিন্তু ও বলে কি! ‘দাদাভাই! ‘
তখনই আবার ,” দাদাভাই আমাকে একটু পৌঁছে দেবে? আমাদের গাড়িটা আজ গেছে সারাতে! তুমি সিনিয়র, তাই দাদাভাই বললাম। রাগ করলে নাতো? “খুব হতাশ হয়ে, সে বাড়তি হেলমেটটা বাইকের টুল বক্স থেকে বের করতে করতে মনে মনে ভাবে,’ শেষে একেবারে দাদা বানিয়ে দিল! যাক্, এত ছেলেদের মধ্যে থেকে তাকেই তো বেছেছে! ‘ সে , ঐদিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারছিল, বাকি ছেলেরা সব ঈর্ষান্বিত নজরে তাকেই দেখছে! একটা প্রচ্ছন্ন গর্ববোধে মনে মনে কলার তুলে সে, রোমিতার দিকে বাড়তি হেলমেটটা এগিয়ে দিয়ে, বাইকে স্টার্ট দেয়!

বাংলা কবিতার বাঁকবদলে একবিংশের “নতুন ধারা” ********রেশম লতা

বাংলা কবিতার বাঁকবদলে একবিংশের “নতুন ধারা”
রেশম লতা

বাংলা সাহিত্যে অষ্টাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মধ্যযুগীয় প্রভাবের সমাপ্তি ঘটে। তাঁর কাব্য ধারার বৈশিষ্ট্যে ছিল আরবি, ফারসি ও হিন্দুস্তানি ভাষার মিশ্রণে আশ্চর্য নতুন এক বাগভঙ্গি ও প্রাচীন সংস্কৃত ছন্দের অনুকরণে বাংলা কবিতায় ছন্দের প্রয়োগ।

হিমালয় মেনকা যদ্যাপি দিলা সায়
লগ্নপত্র করিয়া নারদ মুনি যায়”
(অন্নদামঙ্গলকাব্য, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)।

তাঁর সেই প্রাচীন বাগভঙ্গি ভেদ করে উনিশ শতকের মাঝামাঝি বাংলা সাহিত্যে যোগ দিল মাইকেল মধুসৃদন। নতুন ধারার প্রতিভায় প্রশস্ত রাজপথ। সনেট, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক সাহিত্যের মোড় ঘোরালেন একাই।

“অন্নদা! বহিছে শূন্যে সঙ্গীত-লহরী,
অদৃশ্যে অপ্সরাচয় নাচিছে অম্বরে। ”
(অন্নপূর্ণার ঝাঁপি, মাইকেল মধুসূদন)।

কিন্তু তিনি যে ফল ফলালেন তাতে বীজ ধরল না, লেখা হলো সন্তুষ্টিহীন, উপযুক্ত বংশাবলী সৃষ্টি করলো না। মিল্টন, ভার্জিল, হোমার প্রভৃতি পাশ্চাত্য কবিদের কাছ থেকে সাহিত্য-সাধনার উৎসাহ কুড়িয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যেও তা প্রতীয়মান ছিল ঢের।

“পর্বতশিখরে নাচি, বিষম তরসে
মাতিয়া মেঘের সনে,” (বায়ু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় )।

কিন্তু কালের বিবর্তনে সব হলো গত। নতুন বাঁকে রবীন্দ্রনাথ এলেন আকাশছোঁয়া প্রতিভার দীপ্তি নিয়ে। তাঁর মানসিকতা মার্কসীয়-ফ্রয়েডীয় ভাবনার অনুসৃতি যা শিনতা ও দেহগত কামনা সম্পৃক্ত প্রেমের এক গভীর সমুদ্র। রবীন্দ্রনাথের শব্দ গঠন, ভাষাশৈলী, বৈচিত্র চিত্রকল্পের অনুভূতি প্রকাশের বিষয় ছিল অতুলনীয়। তাঁর কবিতা বৈশিষ্ট্য পরিশীলন এবং পরিমিতিবোধ যা বাংলা সাহিত্য তেমন করে কারোর মাঝে দেখতে পায়নি। আধ্মাতিকতা, পার্থিব-অপার্থিব জীবনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন কলমের খোঁচায়।

“ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।”
(সোনার তরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

মাইকেল, বঙ্কিমদের মধ্যে আধুনিকতা ছিল না কেননা আধুনিকতা তখনো বাংলা কবিতা স্পর্শ করেনি। মূলত রবীন্দ্রযুগ হচ্ছে আধুনিকতার প্রস্তুতিযুগ।
এবার নব নজরুলযুগ। নজরুল তার স্বকীয়তায় এতটাই উচ্ছল ছিল যে মানসিক ব্যক্তি সংকট উষ্ণতাকে অতিক্রম করে নতুন কাব্য দর্শন সৃষ্টি করেছেন। দিগন্ত কাঁপানো অবসাদ ও জড়তা ঘুচিয়ে উল্কার মতো আবির্ভূত হন কাব্য, প্রবন্ধ. গল্প ও উপন্যাসে! বাঁধভাঙা জোয়ার বইয়ে দেন সাহিত্যের ডেরায়। নারী-পুরুষের বৈষম্য বিরোধী কবিতা রচনা করেন,,,

”বিশ্বে যা কিছু মহান চির সৃষ্টি কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”
(নারী, কাজী নজরুল ইসলাম)।

হিন্দু-মুসলিম মিথ ইতিহাসকে তুলে ধরলেন তার কবিতায়। পাশাপাশি আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দের ব্যবহার ঘটান। তাই তার কবিতা হয়ে ওঠে বলিষ্ঠ এবং সমৃদ্ধ যাকে বলে সাবলাইম। এ যেন গণতান্ত্রিক ও গণমুখী ভাবনার নির্যাস। আধুনিকতার পূর্ণ সোপান নজরুল যুগে ঘটে। নজরুলের প্রয়ানের পর. কল্লোল যুগের শুরু বা তিরিশের কবিরা স্বতন্ত্র ধ্যান-ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কবিতা লিখেছেন। আধুনিকতার জোয়ারে স্রষ্টার প্রতি অবিশ্বাস, অস্থিরতা হতাশা, নৈরাশ্য, নৈঃসঙ্গ প্রভৃতি বিষয় উঠে আসে। জীবনানন্দ দাশ হয়ে ওঠেন বাংলা কবিতার সম্রাট। ভিন্ন মাত্রা দেখা যায় চিত্রকল্প ও উপমায়। তিনি ঈশ্বর ভাবনায় নিরব থেকে সম্পূর্ণরূপে ইহলৌকিক কবিতা লিখেন।

“লক্ষীপেঁচা হিজলের ফাঁক দিয়ে
বাবলার আঁধার গলিতে নেমে আসে;”
(অঘ্রাণের প্রান্তরে, জীবনানন্দ দাশ)।

সাহিত্যের মোড় ঘুড়ানো কবিরা হলেন মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ আর আল-মাহমুদ প্রভৃতি। বাঁক সৃষ্টির পেছনে কাজ করে কবির শক্তি ও কল্পনা প্রতিভার দূরদৃষ্টি। সৃজনক্ষমতা, মৌলিকত্ব ও বাস্তব নিয়োগ প্রক্রিয়া এভাবেই নতুন দিগন্তের কবিতা পাঠকদের গ্রহণযোগ্য করে তুলে।

সময় এগোয়, বদলে যায় সাহিত্য; পুরোনো চিন্তার জরাজীর্ণ কলেবর মুক্ত হয়ে গড়ে উঠে নতুন ধারার ইস্তেহার। বস্তুতঃ বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম সময়োপযোগী ও পূর্ণাঙ্গ কোনো সাহিত্য ধারার ইস্তেহার রচিত হয়। যার হাতে রচিত হয় এই ইশতেহার তিনি এমন এক কবি যিনি ইতিমধ্যেই বাংলা কাব্যসাহিত্যে স্মরণীয় অবদান রেখে চলেছেন। উনার তেজস্বীতায় বাংলা সাহিত্যে খুলেছে নব দ্বার বাতিল সাহিত্যের বিরুদ্ধে। তিনি হলেন কবি ফাহিম ফিরোজ। বাংলা কাব্য সাহিত্যে এখন নতুন ধারার জয় জয়ধ্বনি। এ ধারায় কোথাও কোথাও ধারাবাহিকতা নেই আছে একটি ছেদের পর আরেকটি ছেদ, যার মধ্যে নেই কোন পরম্পরায় তাৎপর্য, নেই কোন ক্রমিক প্রগতির ইঙ্গিত। কোন কিছুর সাধারণ সূত্র দিয়ে একে সূত্রবদ্ধ করা বোকামি। হেগেলের বিশ্ববীক্ষাও যেমন ভ্রান্ত, তেমনই মার্কসের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ। মিশেল ফুকো তো পরিষ্কার সিদ্ধান্ত টেনে দিয়েছেন_ মার্কসবাদ বিংশ শতকে অচল। একবিংশ শতকে তো কথাই নেই। পৃথিবীর সত্যকে জানা যাবে না এই ভ্রান্তিতে নিবিষ্ট হয়ে থাকলে। তাই একবিংশে নতুন ধারাই একমাত্র শ্রেয়। জীবন ও শিল্পের যে দাম্ভিকতা তার মাত্রায় ভর করে পরাবাস্তবতার মিশেল বা বহুমুখী সমাপ্তির খোঁজে দৃঢ় অগ্রসর এই নতুন ধারার কাব্য। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায় তাই পাঠকের উপরই। এই জন্যই নতুন ধারায় পাঠ পান্তাভাত নয়। মনস্তাত্বিক জাগরণের অন্যতম উপায়ও বটে। প্রমিতের সাথে লোকজ ভাষার অভেদ বন্ধনে কঠিন অনুষঙ্গগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই কবিগণ।

“ভেতরে গরম।
বলাও যায়না, কারো কাছে।
পাছে মিথিলা ননদ ঘুরঘুর পদান্তর, ছায়ান্তর।
টের পেলে হয়ে যাবে দাপুটে মাইক!”
(মরিচ গীতিকা, ফাহিম ফিরোজ )।

একথা অনস্বীকার্য যে, সাহিত্য সমাজ বিকাশের কোন শাশ্বত পদ্ধতি পন্থা থাকে না । সাহিত্য সমাজে একই সাথে বিভিন্ন অস্তিত্বের মোহনা চলে এর মধ্যে থেকে প্রধান অপ্রধান চিহ্নিত করে মীমাংসায় পৌঁছানো যায় না। কেননা আজ যেটা প্রধান কাল সেটা অপ্রধান হয়ে যেতে পারে, পরশুতে সেই অপ্রধানের মধ্যে আবার একটি প্রধান আবির্ভূত হতে পারে। নতুনধারার কাছে তাই কাব্য সাহিত্য হলো বহুবিধ নির্মাণ এবং বিনির্মাণের অবিরাম যুদ্ধ ধারা।

“উত্তম–সবুজ আমরা – কার লিগা করি অপেক্ষা? আরেকদফা মুষলধারায় বৃষ্টি পড়ছে;
পলিখিন ঠোঙ্গা চা কফির কাপ জুস ও পানি’র বোতল ড্রেন অভিমুখী করতিছে যাত্রা—-
পাবলিকের চুল হালায়
নাকে তেল দিয়া ঘুমায় ঢাকা ওয়াশা।”
(বহুরুপী আগুন, কবির আহাম্মদ রুমী)।

“লাতি চোর, পাতি চোর, সোনার মোহর চোর,
পাগাড় পুকুর হয়, পুকুর হয় দিঘী!
অমাবস্যার কঠিন কালা রাইতে কৃষ্ণবিহ্বরও কৃত্রিম আলোয় করে ঝিকিমিকি।”
(কলিকালের কপাইল্যা, আমিন সাদিক)।

নিগূঢ় সত্যের অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নতুন ধারার কাব্যগৃহে। গ্রামীণ চিরাচরিত যে সম্বন্ধবাচক শব্দ যা এতকাল বাংলা সাহিত্যে ছিল অনুপস্থিত তা আজ সেই শূণ্যস্থান পূরণ করেছে নতুন ধারার কবিরা। কবিতার শরীর গড়ে উঠেছে নিপুণ বাচনভঙ্গিমা আর শৈল্পিক দক্ষতার অমোঘ বন্ধনে।

“ছাই ছাই মেঘের আদল
বাদল ভরা রাইত!
এই বলে, এই কয়ে আইজ
আন্ধার পালায়ে বেড়ায়_
নাই জীবন, যৌবন ভাগাড়ে দেয় ডুব
ফুলে উঠে আঙুল
কান্নার দাগ জমা খসখসে গালে।”
(দৌড়কন্যা রেশম লতা)

“না, যায়দিন নয়, দাদাজান! আসেদিনই ভালা।
কোরানে কয়। সরকারও তো কয়, কয় না?…
হাছা, হাছা_ মাথা আলগাইয়া কইতাছে যে রাষ্ট্র,
পঞ্চাশ বছইরা বাংলাদেশ। ”
(দিন, ফারুক আফিনদী)।

মনোজগতের গহীনে লুকানো সত্তা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এসে কানে কানে বলে যায় শেকড়ের কথা, মাটির কথা, বিশুদ্ধ গাঁয়ের কথা। এসব ভুলেনি নতুন ধারার কাব্যিকরা। সেই সাথে ভুলেনি বর্তমান উত্তরাধুনিক জীবনধারণেরও কথা। নতুন ধারার কবিগণ বাস্তব ও অলৌকিকতায় বিশ্বাসী। কবিতার কাঠামো শৈথিল্য প্রবাহমান।
“ঘটকার মাথা এইবার কাটা যাবে৷ থাইবে ঝাড়ুর প্রেম। এসব হুনছি বাতাসে, হাসছে পথ, পন্থের আংগুল।
বড় কিছু গিলে দিছেরে গুইজা সরল নজুর! ফতুর। ভাগ্যের ফল ঘূমটাহীন। কাক।”
(বাজাইরা খন্ড, ফাহিম ফিরোজ )।

কবিতার দেহে এবার নতুন পোশাকের সমৃদ্ধ আবরণ। হওয়া নির্মল। গ্রামীণ চিরাচরিত কোল ঘেঁষে শহুরে তান্ডবে গড়া কবিতার নতুনা চিত্রপট। যা ছিল অনুপস্থিত আজ তা দৃশ্যমান। ঘনিষ্ঠজনদের ঘনিষ্ঠতা, রূপ, রস, উপমা, অলংকারের কাব্যিকতা প্রতীয়মান। নতুন ধারায় আছে বহুভাষীকতা, আছে শব্দ নিয়ে খেলার নিঁখুততা। যা কি না আধুনিক কবিদের মধ্যে কমই চোখে পড়ে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রগতি আর দর্শনের নির্ভরতম মাধ্যম এই নতুন ধারার কাব্য। নতুন ধারায় প্রভাবিত হয়ে নিয়মিত লিখছেন এমন আরো কয়েকজন কবির কবিতার চুন্বক অংশ তুলে ধরছি যাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক কবিগণও রয়েছেন_

ইলিশের ঝাঁকের লাহান উজান ঠেইল্যা
মনের গাঙ্গে ঢুইক্যা পড়ে স্মৃতির ঝাঁক
বৃষ্টিস্নাত দিনমানে আবেগের বারিধারায়
খুইজ্যা পাই এক নতুন জীবনের ঠিহানা”।
(বাইষ্যার দিনে, উৎপলেন্দু পাল)।

“বাগে, য্যান এক অটোমেটিক গ্রিনহাউস।
হের লগে মাঠের পর মাঠ ভাঙে,
রাতের পর রাত জাগে, দোয়া মাগে মান্নত করে ফকির।”
(বশির শেখ ম্যাঘ ধরততে চায়, কিংকর দাস)

“ফোড়ন ওঠার ঝাঁজ দেইখ্যা লতা মুচকি হাসে….. পরানের পোলার জিভের স্বাদ গ্যাছে… তাই লতা আজ সাধ বদল করব….. স্বাদ থেকে সাধ… জিভ থাইক্কা একদম মনে।” (লতা কাহিনী, উত্তম কুমার দাস)

দর্শন, ইতিহাস আর বিয়ং এর আরেক নাম নতুন ধারা। পুঁথিগত কবিতা নিয়ে একবিংশে টেকা মুশকিল । নতুন যুগের হাওয়া কেপটাউন থেকে টংটাউন পর্যন্ত লেগে গেছে। বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটছে। মান্দাত্তার আমলের চিন্তাধারার পরিবর্তন করতে পারলে সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ এমনিতেই পরিবর্তন হবে। নতুন ধারা। নতুন কিছুর আহ্বান। এ এক মহাযজ্ঞ। মহাকলা। মানে’টা স্পষ্টতই । কই > বলি, কই > কোথায়, কই > কইমাছ। বোঝা দিতে নয় বুঝিয়ে দিতে এর সৃষ্টি । এ ধারার বৈশিষ্ট্য, উপবৈশিষ্ট্য কঠিন কোন উল্লম্ফন নয়, এ একালের সার্বজনীন, সর্বজনস্বীকৃত, উৎকৃষ্ট এক ধারা, যা ফাহিমীয় ঢঙ বলে বেশি সমাদৃত। লেখকের ছোঁয়া কলমের ডগায় যখন এর জীবন তখন পাঠক আওড়ায়_

“আমাগো আসমান বেইচা দিছি আধুনিকতার দামে বিষকণার কাছে,
নিঃশ্বাস পথে লাগাইছি হোফা, খুঁজে নিছি ডিব্বা ভর্তি অক্সিজেন।
কাটছি গাছ, বন -জঙ্গল ধুয়েমুছে বানাইছি রংমহল। “। (বৈপরীত্য, রাবেয়া হ্যাপী)

“নয়া বল্লম হাতে, নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে কোপায়, কাঁপায় পয়োধর ফুল।
আখের খোঁজে কীটের দূর্যোধন।”
(চিল উপাখ্যান, সাইদ খান)।

জীবনের হিসেব সাজায় উকিল বয়াতি
কখনও বনিবনা সময়ের গল্প লইয়া
জ্যামিতিক মনছবি আঁকে আঙ্গুরি বিবি।
দুঃসময়ের সরলিকরণ কইরা কতোটাই বা এগুনো যায় —!”
(নীল ছোঁয়া মন, শাহানারা ঝরনা)।

আধুনিকতায় পিকাসোর ছবি আজ ফ্যাকাসে। কারণ নতুন ধারার জোয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এ ধারার কাব্যসাহিত্য হলো অনিঃশেষভাবে অনির্ণেয়তার সন্ধানী। নতুন ধারা দুর্বার গতিতে পালাতে চায় অতীতমুখীনতা থেকে। কেননা ভবিষ্যৎ অভিমুখেই তার ছুটে চলা। আর এই পথের মহানায়ক কবি ফাহিম ফিরোজ যাঁর নাম বাংলা কাব্যসাহিত্যে স্বর্ণাক্ষরিত হয়ে থাকবে যুগের পর যুগ।

লিভ – ইন ও কিছু কথা ***** ভারতী বন্দ্যোপাধ্যায়

লিভ – ইন ও কিছু কথা
ভারতী বন্দ্যোপাধ্যায়

সাম্প্রতিক একটি শব্দ আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বেশ জায়গা করে নিয়েছে।
লিভ- ইন !
বিদেশে এই লিভ – ইন ব্যবস্থা বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয়।
এখন আমাদের ভারতবর্ষেও তা বেশ একটি পরিচিত নাম ও জনপ্রিয় তো বটেই।
বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রথম পছন্দ লিভ – ইন !
বিষয়টি যে খারাপ সে কথা হয়তো অধিকাংশ মানুষ ই বলবেন না বরং এই সহবাস শুরু করতে বা শেষ করতে কোনো আইনি ঝকমারি থাকে না , যতক্ষণ ভালো লাগলো থাকলাম আর না পোষালে বেরিয়ে এলাম , যাকে বলে “বন্ধুত্ব পূর্ণ সহাবস্থান ” !
কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখা।
ক্রমশ এই লিভ – ইন সংক্রান্ত ব্যাপারে বেশ জটিলতা দেখা যাচ্ছে ।এমন কি এই সম্পর্কের জেরে মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে । সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে।
কিন্তু, আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় হয়তো অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন আবার অনেকেই হবেন না।
প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য যেন আমরা গুলিয়ে না ফেলি। আমি কোন সংস্কৃতির বিরোধিতা করছি না দুটোরই আলাদা আলাদা মাধুর্য্য আছে।
আমি কোন রীতি কে গ্রহণ করতেই পারি কিন্তু তার আগে আমাকে মানসিক ভাবে তৈরি হতে হবে ।
আমি কেন এই রীতি কে গ্রহণ করবো সেটা আগে নিজেকে জানতে হবে নয়তো যে কোন গ্রহণের গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।
অর্থাৎ, আমি বিদেশী এই প্রথাকে গ্রহণ করলাম কিন্তু মননে সেই ট্রিপিক্যাল ইন্ডিয়ান ওম্যান থেকে গেলাম। শত অত্যাচার সহ্য করেও সম্পর্ক থেকে বেরোতে পারলাম না । অবশেষে শারিরীক মানসিক নির্যাতন মেনে নিতে না পেরে আত্মগ্লানি অভিমান অবসাদে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম অথবা সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাতে নিজের জীবন বিসর্জন দিলাম।
তাহলে এই লিভ- ইন এর সার্থকতা কোথায় ????
প্রশ্ন থেকেই গেলো !
আসলে সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা এই সব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আমাদের সমাজকে ।
এখন শিক্ষিত সমাজ লিভ -ইনকে আদর্শ মনে করেন এই কারণে যে রাষ্ট্র ও আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো করে ব্যক্তিগত সম্পর্কে থেকে যাওয়া বা না যাওয়ার গল্পটা নিজেদের ব্যক্তিগত থাকে।
কিন্তু, আমার কাছে এই ধারণাটাই খুব যেন ঘোলাটে লাগে যেন , ” ধরি মাছ না ছুঁই পানি ” — কারণ যে ভাবে গৃহহিংসা উত্তোরোত্তর বেড়েই চলেছে।
যে কোন সম্পর্কেই তা বিয়ে হোক , প্রেম হোক বা লিভ- ইন যদি সুখ , শান্তি , ভালবাসার , নির্ভরতা বা বিশ্বাসের না হয় সেটা কি আর ব্যক্তিগত থাকে ??
এটা একটা প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে সামনে আসে।
আর যখনই সম্পর্কে ভায়োলেন্স শুরু হয় তখন ই প্রশাসনের দ্বারস্থ হই অর্থাৎ সেই রাষ্ট্রের শরণাপন্ন হই।রাষ্ট্রকে তোয়াক্কা না করে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যে সম্পর্কে র সূচনা হলো সেটা আর ব্যক্তিগত থাকলো না!!
আসলে আমি দ্বিচারিতা করতে পারি না তাই এই প্রশ্নের পোকা আমাকে কুঁরে খায়।
এইজন্যই আমি ” প্রশাসনের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও” – না বলে ” প্রশাসনের সঠিক কাজ করাতে বাধ্য করা হোক ” – এটা বলতেই বেশি ভালবাসি।
আইনি ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়াটা কি আমাদের কাম্য ???
১৯৭৮সালে সুপ্রীম কোর্ট রায়ে দিয়েছিল ভারতে লিভ – ইন বৈধ তা যদি–
১) পরস্পরের সম্মতিতে
২) পাত্র-পাত্রী সাবালক সাবালিকা হলে
৩) উভয়েই মানসিক ভাবে সুস্থ হলে।
যদিও ভারতে লিভ- ইন সম্পর্কিত কোন আইন আছে কিনা আমার জানা নেই যদি না থেকে থাকে তাহলে বিবাহ সম্পর্কিত আইন গুলো ই মাথায় রাখতে হবে। তবে তা বিচারকের ইন্টারপ্রিটেশনের উপর নির্ভরশীল।
নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে অনুরোধ লিভ- ইন সম্পর্কে যাওয়ার আগে কিছু ভাবনা মাথায় রেখো।
কারণ , নতুন প্রজন্মের ভাবনা কে স্বাগত জানিয়েই বলছি–
লিভ- ইন আদালতে প্রমাণ করার জন্য যা যা প্রয়োজন–

১) যৌথ ফটো
২) পাড়া- পড়শির একসাথে থাকতে দেখা
৩) জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট, বাড়ি ভাড়া বা কোন সম্পত্তি ক্রয় – বিক্রয়ে দুজনের হস্তাক্ষর অর্থাৎ কিছু কাগজপত্র।
তাহলে দেখো যে রাষ্ট্র ও আইনকে কাঁচকলা দেখালে লিভ- ইন জনিত কারণে তোমার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর কাছ থেকে কোন রকম
অন্যায় অত্যাচার হলে সেই আইনের কাছে ই তোমার কাগজপত্র দেখাতে হবে। তাহলে ব্যক্তিগত থাকলো কি ?
এরপর ও একটা প্রশ্ন
তুমি কি কোন বিবাহিত পুরুষ বা স্ত্রীর সাথে লিভ – ইন করছো ?
তাহলে প্রথমেই তোমার লিভ- ইন সম্পর্ক নাকচ হলো তার কারণ একজন বিবাহিত পুরুষ কিংবা স্ত্রী যেই জন্য আর একটি বিয়ে করলে তা অবৈধ হয় ঠিক সেই অর্থে ই তোমার লিভ- ইন সম্পর্কে বৈধতা থাকলো না ।
এমন অবৈধ লিভ- ইনের জন্য কেউ হয়তো শাস্তি পাবে না যতদূর জানি আড্যাল্টারি আইন উঠে গেছে । অবশ্য আমি ভুলও হতে পারি। কিন্তু সেক্ষেত্রে তোমার সম্পর্কটা অবৈধ ই থেকে গেলো।
যেহেতু সম্পর্কে র কোন বৈধতা থাকলো না তাই তোমাদের একে অন্যের উপর ভায়োলেন্স হলে সেটা এমনিই ভায়োলেন্স।ডমেষ্টিক ভায়োলেন্স নয়।৪৯৮ আওতায়ও আসবে না এমনকি ডমেষ্টিক ভায়োলেন্সের আওতায়ও নয়।
সন্তান উত্তরাধিকার এসবের স্বীকৃতি তো দিনের চাঁদ দেখার মতো । হ্যাঁ তোমাদের দুজনের একজনের যদি এই ভায়োলেন্সের জেরে প্রাণহানি হয় সেক্ষেত্রে একজনের জেল হতেই পারে তবে কতটা কি হবে সেটা বলা খুব শক্ত।
আধুনিক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি যে কারণ ও আদর্শ কে সামনে রেখে বিয়ের বদলে লিভ- ইন বেছে নেওয়া সেটা আসলে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বরং কিছু নিম্ন মানসিকতার মানুষ এই সম্পর্ক কে হাতিয়ার করে সঙ্গী বা সঙ্গিনীর উপর যথেচ্ছ অত্যাচার করে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আসলে বিবাহ শুধু দুটি মানুষের নয় দুটি পরিবারেরও তাই পরিবার বেষ্টিত সম্পর্ক অনেক বেশি নিরাপত্তায় থাকে কিন্তু লিভ- ইন দুটো মানুষের ব্যক্তিগত মতামত এবং সেখানে পরিবারের কোনো ভূমিকা থাকে না কিন্তু মজার ব্যাপার এটাই যখন তোমাদের কেউ একজন অত্যাচারিত হও ততক্ষণ তোমরা ব্যক্তিগতই রাখো তাই হয়তো অবসাদ অবসান হয় জীবন ।কিন্তু সেই পরেই পরিবার এসেই পড়ে তখন আর ব্যক্তিগত থাকে না ।
রথ
তাই প্রেম করো লিভ- ইন করো কিন্তু কিছু কথা মাথায় রেখো…
উপরোক্ত কথা গুলো জেনে রাখা
ভালো।

তথ্যসূত্র সংগ্রহীত

আজ আমার কলমে,কিছু ব্যক্তিগত অনুভবের কথা ✍️ নিতু চৌধুরী,,

আজ আমার কলমে,কিছু ব্যক্তিগত অনুভবের কথা,

✍️ নিতু চৌধুরী,,

সৃষ্টি কর্তা চাইলে তার তৈরী এই দুনিয়ায় মাথা উঁচু করে নিজের মতো করে অবশ্যই বাঁচা যায়,সৎ পথে থেকে, পাশে কেউ থাকুক বা না থাকুক। শুধু ইচ্ছার জোর থাকা চাই আর লড়াই করার মতো মানসিকতা থাকলেই সব সম্ভব হয়। তার জন্য মিথ্যাচার,ভণিতা,বা অসৎ পথে রোজগারের দরকার পরে না।অবশ্যই তার জন্য নিজের মনকে কন্ট্রোল করতে হবে। চাহিদার থেকে রোজগার কম থাকলে অবশ্যই চাহিদা কমাতে হবে। ছোট ছোট জিনিসের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাওয়ার মজাটা উপভোগ করতে শিখতে হবে।

যেমন ধরা যাক, আমার রোজগার কম তাহলে বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান না করে, দেশের মাটিতেই যে ঘোরার জায়গা আছে সেখানেই যাওয়া যেতে পারে। নিদেন পক্ষে নিজের সঙ্গীকে সাথী করে কিছুটা রাস্তা হেঁটে আসা ,পুরোনো স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এর কাছে কিন্ত ঘুরে বেড়ানোর মজাও কম পরে যাবে।

সঙ্গীর অসৎ পথে রোজগারের হীরের গহনার থেকে তার কম পয়সায় কেনা একটা ছোট্ট মুক্তোর দুল ও কিন্ত দুর্লভ উপহার হয়ে ওঠে ভালোবেসে গ্রহণ করলে কারণ তার মধ্যে সেই মানুষটির কষ্ট, ঘাম আর অনেক টা ভালোবাসা জড়ানো থাকে, কিন্ত মনটাকে সেভাবে তৈরি করাটা জরুরী।

অনেক বড়ো ফ্ল্যাট বা বাড়ি না থাকলেও চলে, ভালোবাসা থাকলে এক কামরার ঘরটাও কিন্ত স্বর্গ হতে পারে। কিন্ত বড়ো ঘরে একই বিছানা অথচ মন যদি থাকে এদিক ওদিক তাহলে সে জায়গা নরক হতে বাধ্য। ওই যে কথায় আছে না, “যদি হও সুজন, তেঁতুল পাতায় নয় জন “।

সন্তান মানুষ করছি মানেই বুড়ো বয়সের ভার বহন করবে এটা না ভেবে, এভাবেও তো ভাবা যায় আমরা তাকে পৃথিবীতে এনেছি তাই এটা আমাদের দায়িত্ব, কর্তব্য।যদি সত্যিই বাবা-মা হিসেবে তাকে সু শিক্ষা দিয়ে থাকতে পারি তাহলে সে তার বুদ্ধি বিবেচনার হাত ধরে যা করার করবে কিন্ত আমরা আশা করবো না কোন কিছুর। তাহলে আমার মনে হয় পরবর্তীতে যেটাই ঘটুক কষ্ট পেতে হবেনা বা আনন্দ বেড়ে যাবে। কিন্ত হতাশা আসবে না।

“বন্ধুত্ব” একটা সুন্দর শব্দ ।যেটার সঙ্গে হৃদয়ের যোগাযোগ আছে। যেকোন অবস্থায় যেকোন বয়সের দুটো মানুষ বা একাধিক মানুষ বন্ধুত্ব করতেই পারে কিন্ত রক্ষা করার দায়িত্ব টা প্রত্যেক কেই পালন করতে হবে কারণ কোন সম্পর্কই এক তরফা টেঁকেনা।
বন্ধু তাকেই করা উচিত যে আমাদের স্ট্যাটাস নয় আমাদের মধ্যের মানুষ টাকে ভালোবাসবে।বিষাক্ত আগাছার সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে একা থাকা অনেক ভালো তাতে অন্ততঃ নিজের মতো বেঁচে থাকা যায়। আমাদের জীবনেও কখনো কখনো আশেপাশে হঠাৎই গজিয়ে ওঠা আগাছার মতো বন্ধুদের ও সময় থাকতে ছেঁটে ফেলা উচিত তা নইলে জীবনে চলার পথটা যেকোন সময় আবর্জনাময় হয়ে যায়,তখন না সুস্থ ভাবে চলা যায় না বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় শ্বাস নেওয়া যায়।

অতিরিক্ত আবেগ নামক শব্দ টিকে জীবন থেকে বাদ দেওয়া অবশ্যই দরকার না হলে জীবন বড়ই কালিমা লিপ্ত পাঁকে পরিণত হয়,আর ক্রমশই তাতে তলিয়ে যেতে হয়।অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না। তা ভালোবাসা হোক, খাওয়া দাওয়া হোক বা বন্ধুত্ব হোক। কোন কিছু অতি হলেই ঝামেলার শুরু। কারণ অতিরিক্ত কোন কিছুই মানুষ নিতে পারেনা।আর উল্টোদিকের মানুষ টাকে সস্তা মনে করতে শুরু করে।তাই পরিমিতি বোধ থাকা খুব দরকার জীবনে সুস্থ ভাবে বাঁচতে গেলে।

যদি কেউ বারবার বোঝাতে থাকে যে, তোমার থাকাটা অ প্রয়োজনীয়,তবে বারবার অপমানিত হওয়া,উপেক্ষিত হওয়ার থেকে সেই কারণ বা সেই মানুষের বা মানুষগুলোর থেকে অচিরেই সরে আসা উচিত নাহলে আরো বেশি কষ্ট পাওয়ার রাস্তা নিজেই তৈরি করছো এটা নিয়ে সংশয় নেই। তাই কষ্ট অবধারিত । আনন্দে বাঁচতে গেলে এগুলো থেকে সরে একা থাকাই ভালো।

অযাচিত উপকার বা অন্যকে বেশি গুরুত্ব দিলে সেটাকে দুর্বলতা ভাবা কিছু মানুষের স্বভাব কিন্তু কিছু মানুষের কাছে সেটা মনুষ্যত্ব,তবে বোঝার বা দেখার চোখ ভিন্ন হতেই পারে।

কারোর কাছে তুমি ভালো, কারোর কাছে খারাপ কারণ একসাথে সবার মন রাখা যায় না, ভালো হওয়া যায় না। তাই দিনশেষে নিজের মতো একা থাকাই ভালো। নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার জন্য এটা খুব জরুরি।

আর একটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথা, যেকোন রকম দুঃখ-কষ্ট, দারিদ্র্যতা, হতাশা সব কিছুকেই হাসি মুখে জয় করার মোক্ষম অস্ত্র হলো প্রাণ খুলে হাসা।প্রাণ খুলে হাসলে দুঃখ-কষ্ট দূরে যেতে বাধ্য, ভয় পেতে বাধ্য কারণ সেই মানুষটির যে কোন কিছুতেই ভয় নেই সেটা বুঝলে তারাও পালাতে বাধ্য হবে। তাই যতো কষ্ট ই আসুক, হাসির অস্ত্র দিয়ে তাকে পরাজিত করাই যায় কারণ জীবনের চলার পথে কোন মানুষের হাসিমুখ টাই আমরা মনে রাখতে চাই, কারণ দুখী মানুষদের সকলেই এড়িয়ে চলে। কেন ?সে আর এক প্রসঙ্গ। পরে কোন দিন নাহয় আলোচনা করা যাবে বন্ধুরা।
আপনারা কি আমার সাথে একমত বন্ধুরা?আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম,,,,

মিরুজিন আলো (পর্ব পনেরো) বিজয়া দেব

মিরুজিন আলো (পর্ব পনেরো)
বিজয়া দেব

-এভাবে রিঅ্যাক্ট করছেন কেন? এটা কেন হতে পারে না?
ক্লান্ত স্বরে পারিজাত বলে – জানি না। কেন এইভাবে রিঅ্যাক্ট করলাম তা-ও জানি না। একটা বিষাদ সিন্ধু আমাকে ঘিরে নিয়েছে, আর ধীরে একটু একটু করে সে আমাকে একটা নির্জন দ্বীপে নিয়ে যাচ্ছে, বেশ ভালোই বুঝতে পারছি।
-আমার এই পরিচয় আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে, কিন্তু কেন? আমি তো আপনার কেউ নই।
-কেউ – ই আমার কেউ নয়। এই যে পারুলের কথা বললাম সে – ই বা আমার কে? কখনও দেখেছি? পারুলের জীবনটা আমার শোনা এক গল্প। আপনি আমার কেউ নন। তবে আজ থেকে কেউ তো হলেন।
-মানে?
-তোমাকে আমি জানতে চাই অপরিচিতা।
-আমি খুশি হলাম ওগো পথভোলা পথিক। আমার নাম দীপশিখা।

পারিজাত হাসল। দীপশিখা মুগ্ধ হল।
সন্ধ্যা উৎরে রাত, পারিজাত উঠে দাঁড়াল। রাঙাপিসির ফোন, ফেরার পথে আমার ওষুধ নিয়ে আসিস।
-চলে যাচ্ছেন?
– হ্যাঁ। রাত নামল বলে, আপনি বাড়ি যান।
-এখন বাড়ি গেলে খাব কি? আপনি আমার কাস্টমার হবেন?
-বেশ সাহস তো আপনার?
-সাহস না থাকলে খাব কি পড়ব কি?
-আবার পড়েনও?
-আমি গবেষণা করছি। বিষয় – যৌনতা ও ভারতীয় সমাজ।
-ও। আপনার গবেষণা পত্রটি ভালই হবে মনে হচ্ছে। আপনি কি বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গবেষণাপত্রটি তৈরি করবেন বলে এই পথে নেমেছেন?
দীপশিখা হেসে উঠল। সহজসুরে বলল – না না। কারণটা একেবারেই অর্থনৈতিক। বাড়িতে ঝগড়া করে এখানে এসেছি। জিজ্ঞেস করবেন কেন ঝগড়া করেছি? আগেভাগেই উত্তরটি দিয়ে দিই, গবেষণার বিষয় বাড়ির কারো পছন্দ নয়। তাঁদের যুক্তি – যৌনতা বিষয়ে লেখালেখি,  গবেষণা এসব বাড়াবাড়ি।  ও তো সহজ সরল একটা শরীরী চাহিদা। এসব নিয়ে কীই বা করার আছে? তাছাড়া বিয়েটা ওদের কাছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট। আমার বিয়ে দেবার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। তাই চলে এসেছি কলকাতা। এখন আমাকে রোজগার করে থাকতে হবে, পড়তে হবে।বাবা বলে দিয়েছে নিজে রোজগার করে গবেষণা করি যেন। বাড়ি থেকে সাহায্য পাব না। আমার মা নেই। ছোটবেলায় মারা গেছে। বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। বাবার এই পত্নী খুব তাড়াতাড়ি আমাকে বিয়ে দিয়ে তাড়িয়ে দিতে চায়। ঐ রূপকথার সৎমাদের মত। তবে ভদ্র মিষ্টি তার কথাবার্তা। সুতরাং চলে এলাম। এখন কি রোজগার করব? কীভাবে রোজগার করব? কাগজে একটা অ্যাড দেখে এই পথে এলাম। অ্যাডটা এইরকম ছিল – নিঃসঙ্গের সঙ্গী চাই। দৈনিক দু’ঘন্টা। নারীপুরুষ নির্বিশেষে।
-মানে?
-মানে নারীপুরুষ নির্বিশেষে। কাজটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হল। অ্যাডটা দিয়েছে একটা এজেন্সি। কাজটা এইরকম, অসুস্থ নিঃসঙ্গের নার্সিং এর দরকার হতে পারে। নিঃসঙ্গ মহিলা কিংবা নিঃসঙ্গ পুরুষের যৌনসুখের সঙ্গী হওয়ার দরকার হতে পারে। শুধু বেড়ানোর সঙ্গী হওয়ার দরকার হতে পারে। শুধু কথা বলার সঙ্গী হওয়ার দরকার হতে পারে। এক একটা কাজে এক একরকম চার্জ। সবচাইতে বেশি হচ্ছে শয্যায়। তবে ওটা আমি নিইনি। আমার একরকমের করে হয়ে যাচ্ছে, দরকার নেই তাই।
-দরকার হলে করতেন?
-দেখুন আমার পুরো পরিবার যদি আমার ওপর নির্ভর থাকত, ঠিকঠাক খাওয়া পরা জোটাতে অসমর্থ হতাম তাহলে করতাম। করতেই হত।
-আপনি কি কাজ নিয়েছেন জানতে পারি?
– শয্যাসাথীটা ছেড়ে দিয়ে। এক পঁচাশি বছরের বৃদ্ধার সাথে কথা বলার সঙ্গীও হয়েছি। এক গে-র সাথে দু ঘন্টা কাটিয়েছি। অ্যান্ড শি ইজ ভেরি বিউটিফুল। ইউ আর অলসো ভেরি ইন্টারেস্টিং।
ঘনায়মান অন্ধকারের ভেতর দীপশিখার চোখ দুটো তারার মত ঝিকমিক করে। পারিজাত চোখ সরাতে পারে না।
দীপশিখা হেসে বলে – বেশ তো, কাস্টমার নাই বা হলেন, বন্ধু হতে পারেন তো? আমাকে একটু একটু করে ভালবেসেও দেখতে পারেন।
-ভালবাসাবাসির কাস্টমার?
-ছি ছি এসব কি বলছেন? সত্যি বলছি আপনাকে আমার ভাল লাগে।  ভালবাসার গল্প শুনিয়েছেন সেই পঁচাশি বছরের বৃদ্ধা। একেবারে উদগ্রীব হয়ে শোনার মত সে গল্প। আমাকে উনি আবার কবে ডাকবেন সেই অপেক্ষায় আছি।
-কত পেলেন সেদিন?
-প্রশ্নটা খুব একটা ভদ্রোচিত হল না কিন্তু। কত পেলাম সেটা বলা যাবে না।

(ক্রমশ)

হিয়ার মাঝে ******* সুদেষ্ণা সিনহা

হিয়ার মাঝে
সুদেষ্ণা সিনহা

আজ সন্ধ্যে থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানাইকে।অতসী কেমন যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সম্ভবত ওর মনের অন্দর মহলে অদ্ভুত ও ভিত্তিহীন কল্পনার সংখ্যা বাড়ছে।
আমাকে কেউই কিছু বলেনি। তবুও আমি লোহিতরঞ্জন রায়, শহরতলির এক আধাখ্যাত কলেজের সাইকোলজির প্রফেসর সন্ধ্যেবেলায় বিছানায় গা এলিয়ে বিশ্রাম নিতে নিতে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের  সাহায্যে বুঝতে পারছি ,আমাদের ছেলে মানাই এখনো ঘরে ফেরেনি।
অতসী দরজার ভারী পর্দা সরিয়ে একবার করে ঝুলবারান্দায় যাচ্ছে। তারপর তার পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির শরীরটাকে গ্রীলবারান্দার ফাঁক দিয়ে গলিয়ে রাস্তার মিটমিটে আলোয় মানাই এর মুখটা দেখার প্রত্যাশা করছে।
আবার একদল ছেলের হুল্লোর শুনে অতসী ছুটে গেল ঝুলবারান্দায়। কাকে যেন জিঞ্জেস করল, ” এই মানাইকে দেখেছিস রে ওদিকটায় ? ” সে কি উত্তর দিল শোনা গেল না, তবে দরজার পর্দাটাকে ফের দোলার সুযোগ দিয়ে অতসী ঘরে এসে ঢুকল। এই নিয়ে বোধহয় পাঁচবার হল।এবার ঠিক আমার সামনেটায় এসে দাঁড়াল ও,কিছু বলার অপেক্ষায়। চোরা চোখে দেখলাম অন্যদিনের মতো সাজের পারিপাট্য নেই , বাসি ফুলের মতো নেতিয়ে গেছে মুখটা । কপালে একরাশ কুচো চুলের ঢেউ ।পরনের শাড়িটাও কেমন আলগা হয়ে ঝুলে পড়েছে।থমথমে মুখে চিন্তার ছাপ।
সামনে একজন কিছু বলার অপেক্ষায় ,আর আমি ছিঃ টিকটিকির মতো ঘুলঘুলি খুঁজছি। তীব্র বিবেকের দংশনে অস্থির হয়ে উঠলাম।
– ” কিছু বলবে? ”
শাড়ির খুঁটটা তর্জনীতে জড়াতে জড়াতে অতসী বলল, “মানাই এখনও ফেরেনি গো।”
বাইরে শান্তভাব বজায় রেখে আমি বললাম, ” এত চিন্তা করছ কেন? ফিরবে । ছেলে বড় হচ্ছে না? হয়তো কোন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে । ”
– “আড্ডা দেবে আমার মানাই? ”
অজান্তে মাতৃহৃদয়ের কোন্ দুর্বলতম জায়গায় আঘাত করে ফেলেছি বলে নিজের উপর রাগ হল।
– ” মিনুকে জিঞ্জেস করেছ? ও কোথায় ? ”
তর্জনী তুলে পাশের ঘরটা দেখাল অতসী। পড়াশোনার সুবিধার জন্য ওখানেই দুই ভাইবোনের থাকার ব্যবস্থা।পিঠেপিঠি দুই ভাইবোনে যতটা ভাব,ততটাই খুনসুটি।মাঝে মাঝে অতসী রেগে যায় , ” কি তোমার আক্কেল বলত ,বাঘে গরুকে আর কতদিন এক জায়গায় রাখবে? ”
মানাই নতজানু হয়ে প্রেয়ারের ভঙ্গীতে বলে, ” মম্ টু মান্থস্ অনলি। নীটের রেজাল্ট বেড়ালেই তো আমি চলে যাব।আর ততদিন এই জ্বলুনিটুকু সহ্য কর প্লীজ । ”

মিনুকে ডাকা হল।বেচারা কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। মানাই এর কথা জিঞ্জেস করতেই তির তির করে কেঁপে উঠল ওর পাতলা ঠোঁটদুটো। ওর কথা থেকে যেটুকু বুঝলাম স্কুল থেকে ফিরে মিনুর প্রচন্ড গরম লাগছিল,ফ্যান চালিয়েছিল সেই নিয়েই ভাইবোনে একচোট মতানৈক্য। রাগ করে ঘর থেকে বের হয়ে যায় মানাই। তারপর আর দাদাকে দেখতে পায়নি মিনু।
কি করা যায় ভাবছি ঠিক তখনই দেওয়াল ঘড়িতে আটটার ঘন্টা বাজতেই সচকিত হয়ে উঠি আমি আর অতসী দুজনেই।
ছোটবেলায় একবার  রথের মেলাতে হারিয়ে গিয়েছিল মিনু।তখন স্থানীয় থানার দায়িত্বে ছিল রমেন,আমারই স্কুলের বন্ধু।ফিরে এসে কি কান্না অতসীর!রমেনকে খবর দিতেই তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ প্রশাসন।সন্ধ্যেবেলায় বাসস্ট্যান্ড থেকে খুঁজে পাওয়া যায় মিনুকে। এক মহিলা ওকে কোলে নিয়ে বাসে  উঠছিল। মহিলার জামাকাপড়ের সাথে মিনুর জামাকাপড়ের মিল না থাকায় পুলিশের জালে ধরা পড়ে মহিলা। সে যাত্রায় মিনুকে ফিরে পেয়েছিলাম আমরা। অতসীর সে কি আনন্দ !
পূর্ব স্মৃতি পুনর্রোমন্থনের আশায় থানায় যাব ভাবছি,অতসী একটা বাসন্তী রঙা খাম আর একটা চিরকুট ধরিয়ে দিল আমার হাতে । আমার জিঞ্জাসু চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “খামে মানাই এর ফটো আছে আর ওই চিরকুটটায় ওর বন্ধুদের নাম আর ফোন নাম্বার ।”
একে একে মানাই এর বন্ধুদের বাড়ি থেকে ফিরে এলাম। কেউ জানে না ওর খবর। আজ নীটের রেজাল্ট বেরোনোর পর ওকে ফোন করেছিল ওরা। মানাই ফোন তোলে নি।
কোথায় যেতে পারে ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গেলাম ইন্দ্রাণী টকিজের দিকে। যদি সিনেমা দেখতে আসে । সিনেমার শো ভেঙেছে তখন ।আস্তে আস্তে নারী পুরুষের ভিড় পাতলা হয়ে এল একসময়। ফাঁকা সিনেমা হলের সামনে আমি একা।মানাই এখানেও নেই।

এবার কোথায় যাব? ইন্দ্রাণী টকিজের সামনে চৌরাস্তা পেরিয়ে থানার মোড় । সে রাস্তাই ধরলাম।
থানায় গিয়ে যা শুনলাম তাতে আমার পিতৃহৃদয় বার বার বলতে লাগল এমনটি যেন না হয়। আজ বিকেলে একটা উনিশ-কুড়ি বছরের ছেলে নাকি গঙ্গার ব্রীজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে ।আর ঝাঁপ দেওয়ার আগে একটা অদ্ভুত কাজ করেছে সে ,তার চটিজোড়া আর রুমালটা একটা বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে থানায় পাঠিয়ে দিয়েছে। জমা পড়া চটি আর রুমাল দেখতে চাইলাম । থানা থেকে বলল  – ” সকালে আসুন। ”
বড়বাবু নেই।  যিনি দায়িত্বে আছেন তিনি সব শুনে বললেন – ” নিখোঁজ ডায়েরি করবেন যে , দরখাস্ত নিয়ে এসেছেন?” মাথা নাড়লাম আমি।
নিখোঁজ ডায়েরি করে থানা থেকে বেরিয়ে এলাম যখন তখন অনেক রাত । বুকের মাঝে হাজার উথাল-পাথাল। সন্তানের অনাগমনে ক্ষতবিক্ষত জায়গাটা কাকে দেখাব আমি !কাকে দেখাব !  মানাই তুই এরকমটা করলি কেন? কি দুঃখ ছিল তোর বাবা? জীবণে ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করাই কি বড় কথা ! আমি কেমন বাবা রে,তোকে বুঝতে পারলাম না ! তুই ই কি এমনটা করেছিস?একা একা এতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারলি বাবা?তোর ভয় করল না একটুকুও?
পায়ে পায়ে কখন বাড়ির সামনে এসে পৌঁছে গেছি জানিনা। নিস্তব্ধ রাত। সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে ।এখানে আমিই একমাত্র পিতা যে জানে না তার সন্তান মৃত না জীবিত । মনে হল বিশ্বদেবতা আমার জীবণ পথে কালির পুরো দোয়াতটাই উল্টে দিয়েছেন ।
হাত বাড়িয়ে কড়া নাড়তে গিয়েও হাত সরিয়ে নিলাম  ।থাক। অতসীর হাই ব্লাড প্রেসার। কিছুটা সময় বেচারা নিশ্চিন্তে থাকুক। বুক পকেট থেকে মানাই এর ছবিটা বের করে মোবাইলের টর্চে দেখতে দেখতে বড় অচেনা লাগল । বন্ধ দরজার সামনে উদ্ভ্রান্তের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম আমি আরেকটা ভোরের অপেক্ষায়।

সেদিনের_কবিগান :   কলমে :     গীতালি ঘোষ

সেদিনের_কবিগান :  
কলমে :     গীতালি ঘোষ

পর্ব : ৪

শোভাবাজার রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে নিয়মিত বসত কবিগানের আসর। জানা যায়  যে রাজা গোপীমোহন দেবও এই কবিগান শুনে খুবই  আনন্দ পেতেন।

কবিয়াল বা ছড়াকারদের মধ্যে  দুটি পক্ষের মধ্যে বিতর্ক  চলে। তারা গান গেয়ে বা ছড়া বলেই নিজেদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। বলা যেতে পারে এ এক কাব‍্যগীতির মাধ্যমে লড়াই। কবিয়াল আফাজুদ্দিন লিখেছিলেন :
” এ লড়াই-এ নেই লাঠালাঠি
শুধু কথার ফাটাফাটি
হয় না তাতে চটাচটি
থাকে যুক্তির পরিপাটি।”
এই ছড়ায় কবিগানের মূল সুরটি সুন্দর ভাবে ব‍্যক্ত হয়েছে।

সেসময়ে কোনো কোনো ধনী ব‍্যক্তির প্রাঙ্গণে রাতে বসত কবিগানের আসর। অনেক বেশি মানুষের সমাগমে উদ‍্যোক্তারা ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতেন। মাঝে মাঝেই  লাঠি বা চাবুক চালাতে হত। এর মধ্যেই ঢুলিদের ঢোলে পড়ত ঘা। জমে যেত সভা। তারপর কবিয়ালদের প্রথম দল কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত লাল কাপড় পরে, দুপায়ে নুপূর বেঁধে সভার মাঝে এসে পৌঁছাত। মাথায় তাদের  থাকত তিনকোনা টুপি, যার মাথায় থাকত পাখির পালক। তাদের নুপূরের ঝুমঝুম শব্দের মাঝেই অবতীর্ণ হত দ্বিতীয় দল। এর কিছু কিছু  বর্ণনা ও বিষয়বস্তুর তথ‍্য পাওয়া যায় জয়নারায়ণ ঘোষালের ‘করুণানিধানবিলাস’এ যা ঈশ্বর গুপ্তের সংগ্রহেরও তিরিশ বছর আগেকার কথা। কিন্তু ১৮৩৭ সনের ১৩ই জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ইংলিশম‍্যান’ পত্রিকায় “হিন্দু” নামক প্রবন্ধে কবিগানের দল ও আঙ্গিকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় মুদ্রিত হয়েছিল।

যে কোনো  কবির লড়াইএ সাধারণত ৫টি স্তরে এই লড়াই হত। সেগুলি হল :
১। ভবানী বিষয়ক ( মা দুর্গা বা মা কালীকে ভজনা করা)
২। সখী সংলাপ ( রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা বিষয়ক )
৩। বিরহ ( সাধারণ মানুষের দুঃখের কাহিনী )
৪। খেউড় ( পুরাণের থেকে কিছু এবং দেবতাকে উদ্দেশ্য করে গান )
৫। লহর ( প্রতিপক্ষকে  আক্রমণ করে নেতিবাচক সমালোচনামূলক গান )

তাছাড়াও নানারকমের বিভাগ রয়েছে কবিগানের। যেমন,
ক।। আসরের আগে রচিত গানের রকমফের যা দুইপক্ষকেই গাইতে হবে–

১. ডাক
২. আগমনী / ভবানী/ মালসী
৩. গোষ্ঠ/ ভোর
৪. সখীসংবাদ
৫. কবি (লহর কবি )

খ।। আসরে উপস্থিত হয়ে  রচিত গানের রকমফের, যেগুলি দুইপক্ষের গেয়–
১. সখী সংবাদ বা কবির জবাব
২. ধুয়া
৩. ত্রিপদী পাঁচালী
৪. ধুয়া ও সুর সহযোগে গান
৫. পয়ার পাঁচালী
৬. যোটক

এছাড়া যে বিভাগগুলি দেখা যায়, তা হল,
ক. ডাক গানের অঙ্গ  বিভাগ–
১. প্রস্তাবনা বা ডাক যাকে আহ্বান বলা যায়।
২. অন্তরা বা চালনা
খ. ভবানী বা মালসীর অঙ্গ বিভাগ
১. চিতান
২.পাড়ন
৩. প্রথম ফুকার
৪. মিল অথবা ছাড়
৫. মুখড়া বা ধুয়া
৬. ডাইনা
৭. খাদ
৮. দ্বিতীয় ফুকার
৯. মিল
১০. অন্তরা বা লটক
১১. পরচিতান
১২. পাড়ন
১৩. তৃতীয় ফুকার
১৪. মিল বা ছাড়

কবিয়ালরা এই প্রতিটি নিয়ম মেনে সবসময় গান গাইতেন না। নিয়মের ব‍্যতিক্রম প্রায় ক্ষেত্রেই হত। যত সময় বয়েছে, কবিগানের আঙ্গিকেরও কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কবিয়ালরা তাদের গানের ধারাকে নিজস্ব ঘরানা দিয়েছেন, কিন্তু সেই লড়াইএর ভঙ্গিটি ছিল ঠিক তেমনই।     (চলবে)

// ভাত — Series ****** পূর্বা মাইতি

// ভাত — Series

পূর্বা মাইতি

#পাঁচ

আজ সকাল থেকে কাজলের আনন্দের সীমা নেই। আজ যে রথযাত্রা। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা — দাদাবোন তিনজনে মিলে একসঙ্গে ভক্তদের দর্শণ দেওয়ার দিন।
কাজলও আজ বড়দার সাইকেলে সওয়ার হয়ে রথের মেলা দেখতে যাওয়া মনস্হ করেছে।
তবে বড়দার সাইকেলে বন্দোবস্ত না হলে ছোড়দার সাইকেল আছে। এই অপসনটা থাকার ফলে কাজলের একটু বাড়তি সুবিধে আছে। তাই মা ছাড়া কোথাও যাওয়ার হলে কোন না কোনো শর্তের বিনিময়ে কাজল দুজনের একজনকে তো পেয়েই যায়।
এদিকে আকাশে হালকা চালে রোদ বৃষ্টির খেলা চলেছে।
বিকেল হতে না হতেই সোনা রোদ ঝিকিমিক করে উঠলো। তড়িঘড়ি করে কিশোর বড়দার সাইকেলে ছোট্ট কাজল চেপে বসলো। গলি ছাড়িয়ে ঘন্টি বাজিয়ে সাইকেল বাস রাস্তায় এসে পড়লো।
কাজল সাইকেলের পেছনে বসে মহানন্দে দোকান পাট, লোকজন দেখতে দেখতে চললো।
মেলা যাওয়ার পথে পড়ে মোল্লা জীর মাংসের দোকান। পাঁঠা কাটা তো হয়েই চলে। আজ এই প্রথমবার কাজলের নজরে পড়লো। কাজল মাগো বলে বড়দাকে জাপটে ধরলো।
বড়দা কাজলকে যতোই বোঝায়…
আরে মাংস কাটছে তো কী হয়েছে । বাড়িতে যে মাংস রান্না হয়, ওটাই তো! কিন্তু কাজল হঠাৎ যেন চুপসে গেলো।
দিঘীর পাড়ে মেলা বসেছে। নানান জিনিসে, নানান জায়গার মানুষে — রথ দেখা কলা বেচা হয়েই চলেছে। একটা মনোহারি দোকানের পাশে বড়দা সাইকেল এনে দাঁড় করালো। এখান থেকে দিঘির জল টলমল দেখা যায়।
বড়দা কাজলকে বললো —
তুই এখানে একটু বোস। আমি জিনিসগুলো কিনে নিয়ে চট করে চলে আসবো। ঐ যে দূরে রথে চড়ে জগন্নাথ দেব। তুই এখান থেকে দেখতে থাক। এখনি রথ টানা শুরু হবে। আমি আসছি।
ছোট্ট কাজল গুটিসুটি মেরে পাড়ে বসে দিঘীর জলে তাকিয়ে রইলো। ওর আর কিছুই দেখতে ভালো লাগছেনা।
তখনকার দিনে অজানা আশঙ্কা বোধহয় শিশুমনে গাস করেনি। নাহলে কিশোর ছেলেটা নিশ্চিন্তে জিনিস কিনতে চলে যায় আর ছোট্ট মেয়েটি দাদার কথামতো দিঘীর পাড়ে বসে থাকে জলের দিকে চেয়ে ….

চলবে ….

#ছয়

কিছুক্ষণ পর বড়দা সাইকেল নিয়ে ফিরে এলো।
কাজল কে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে, নামেই ‘বড়দা’, তবুও ওই কিশোরদাদাটার মনটা দুখী দুখী হয়ে উঠলো। তখন ছোট্ট বোনটার মন ভালো করার জন‍্য বড়দা কাজলকে বললো —
কি রে কি খাবি? আমি বাড়ির জন‍্য জিলিপি, পাঁপড়, তেলেভাজা এনেছি।
দুটো খেতে খেতে সাইকেলে ওঠ। যা ভীড়। ওই দূর থেকেই ঠাকুর দেখ। কাছে পৌঁছতে পারবিনা।
আমি বেলুন, বন্দুক পটকাও এনেছিরে। এই নে বেলুন ধর।
চুপ করে আছিস কেন তখন থেকে। তাহলে বাড়ি চল। বাড়ি চল। দেরি হলে আবার মা ভাববে।
সেদিন রাতে কাজল যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, তারপরে কখন যে তার ধুম জ্বর এসেছে, কিছুই মনে নেই তার।
এলোপ‍্যাথি, হোমিওপ্যাথি সব কিছু সেবা নিয়ে বেশ কয়েকদিন পার করে কাজল সেরে উঠলো।
তবে জ্বরের ঘোরে এ কদিন সে কেবল দেখেছে — মোল্লাজীর সেই পাঁঠা কাটার দৃশ‍্য ! কী রক্ত কী রক্ত!!
এর পরের সার কথা হোল — ষাট ছুঁই ছুঁই কাজল তারপর থেকে কোনদিন কোনো মাংস মুখে তোলেনি।
কোন মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খায়নি।
এমন কি কোন জিওল মাছও না।
জয় জগন্নাথ! তোমার ছাপ্পান্ন প্রকার ভোগ থাকতে, তোমার ভক্তের আর অন‍্য রসনায় মন মজিয়ে লাভ কী প্রভূ!!

// ভাত — Series //

পূর্বা মাইতি

#ছয়

কিছুক্ষণ পর বড়দা সাইকেল নিয়ে ফিরে এলো।
কাজল কে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে, নামেই ‘বড়দা’, তবুও ওই কিশোরদাদাটার মনটা দুখী দুখী হয়ে উঠলো। তখন ছোট্ট বোনটার মন ভালো করার জন‍্য বড়দা কাজলকে বললো —
কি রে কি খাবি? আমি বাড়ির জন‍্য জিলিপি, পাঁপড়, তেলেভাজা এনেছি।
দুটো খেতে খেতে সাইকেলে ওঠ। যা ভীড়। ওই দূর থেকেই ঠাকুর দেখ। কাছে পৌঁছতে পারবিনা।
আমি বেলুন, বন্দুক পটকাও এনেছিরে। এই নে বেলুন ধর।
চুপ করে আছিস কেন তখন থেকে। তাহলে বাড়ি চল। বাড়ি চল। দেরি হলে আবার মা ভাববে।
সেদিন রাতে কাজল যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, তারপরে কখন যে তার ধুম জ্বর এসেছে, কিছুই মনে নেই তার।
এলোপ‍্যাথি, হোমিওপ্যাথি সব কিছু সেবা নিয়ে বেশ কয়েকদিন পার করে কাজল সেরে উঠলো।
তবে জ্বরের ঘোরে এ কদিন সে কেবল দেখেছে — মোল্লাজীর সেই পাঁঠা কাটার দৃশ‍্য ! কী রক্ত কী রক্ত!!
এর পরের সার কথা হোল — ষাট ছুঁই ছুঁই কাজল তারপর থেকে কোনদিন কোনো মাংস মুখে তোলেনি।
কোন মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মেখে খায়নি।
এমন কি কোন জিওল মাছও না।
জয় জগন্নাথ! তোমার ছাপ্পান্ন প্রকার ভোগ থাকতে, তোমার ভক্তের আর অন‍্য রসনায় মন মজিয়ে লাভ কী প্রভূ!!

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ ~ শান্তনু ঘোষ

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ
~ শান্তনু ঘোষ
পর্ব-৮

আগে যা ঘটেছে:
ঈশ্বরদী ষ্টেশনে নেমে একটি রিক্সা নিয়ে চলে এসেছি কৌস্তভদের অফিসের গেস্টহাউজে। আসার সময় জিলিপি কিনে এনেছি। কৌস্তভ অফিসে আছে। আর কিছু সময় পরে আসবে। ইতিমধ্যে গেস্ট হাউজের ছেলেটি আমাকে একটা ঘর দেখিয়ে দিয়েছে। আমি জিনিসপত্র রেখে একটু ফ্রেস হয়ে নিচ্ছি। এমন সময় দেখি কৌস্তভ এসে গেছে। এসেই অনেক প্রশ্নবাণ ছুড়ে দিল আমাকে। তারপর আমরা বসেছি আগামীকালের ঘোরার বিষয়ে আলোচনা করতে। প্রাথমিক ভাবে ঠিক হল যে, আগামীকাল নাটোরের রাজবাড়ী দেখে রাজশাহী যাওয়া হবে।

তারপর…

আগামীকাল কৌস্তভ ছুটি পাবে। মাত্র একদিনই। খুবই ব্যস্ত মানুষ। তাও একটি ছুটির দিন বন্ধুর জন্য উৎসর্গ করবে।

ঈশ্বরদী থেকে আমি দুটো জায়গায় যাবো ভেবেছি। একদিকে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি দেখতে, আর অন্যদিকে রাজশাহী ও নাটোরের রাজবাড়ী দেখতে।

বন্ধু আমাকে বলল, যে ও মাত্র একদিন যেকোনো একদিকেই আমার সঙ্গে যেতে পারবে। আমি কোনটা চাই ভেবে নিতে বলল।

কৌস্তভ হল ফুলহাতা কর্পোরেট ম্যান। তাই একটা ছোট “কস্ট-বেনেফিট” এনালিসিস আলোচনা করে নেওয়া হল। তারপর আমারা ঠিক করলাম যে আগামীকাল রাজশাহী আর নাটোরেরে রাজবাড়ী যাওয়া হবে। এখানে অবশ্য আমার ‘কষ্ট’ আর ‘বেনেফিটের’ কথা ভেবেই ও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ ও থাকলে একটা গাড়ির ব্যবস্থা হবে। আর তাতে আমি সুখে ঘুরতে পারব। কারণ রাজশাহী অনেকটা দূর।

ও বলল, শিলাইদহে তুই বাসে করেও চলে যেতে পারবি বেশী দূর নয়। ওটা বরং তুই একাই দেখে আসিস। আমার দেখা হয়ে গেছে।
আমিও খুশি খুশি রাজি হয়ে গেলাম।

রাতের খাবার খেয়ে অনেকদিন পরে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি। স্কুলের দুই বয়স্ক-বন্ধু এক জায়গায় হলে যা হয় আর কি। পুরানো সেই দিনের কথা…স্কুল জীবনের কথা… কলেজ লাইফ…। তখন ঘটে যাওয়া অনেক কিছুর পেছনের জানা-অজানা কারণগুলো উন্মোচিত হচ্ছে। সেইসব কথা চলছে। ইতিমধ্যে ওর সহধর্মিণী ফোন করলেন কলকাতা থেকে। ভিডিও কল। সেও তো জানে যে আমি এখানে উপস্থিত। তেনাকেও তো অনেকদিন চিনি। তাই ভিডিও কলেই ইয়ারকি-মজা আর হাই হাই-বাই বাই করা হল।

কৌস্তভের কাছ থেকে শুনছি বাংলাদেশে ওর কাজ করার অভিজ্ঞতা। ভালোমন্দ মিশিয়ে বেশ উপভোগ্য কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে ওর। ওকে বলে দেওয়া হয়েছিল, বেশ সাবধানে চলাফেরা করতে। প্রথমদিকে একদম গুড বয় হয়ে চলত। পরে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এখন অনেকটা সাহসী।

প্রাত্যহিকিতে কিছু শব্দ যেমন, আসসালামু আলাইকুম, পানি, ফোন দেওয়া, এমন আরও কিছুর ব্যবহার অভ্যেস করে নিয়েছে। বাংলাদেশে কেউ ফোন করে না, ফোন দেয়। কি মিষ্টি শব্দ ! ইশ, আমায় যদি কেউ বলত ফোন দিব, আমি তো সানন্দে বলতাম, দিলে একটা আপেল ফোন দিও।
গল্পে গল্পে রাত অনেক হয়ে গেল। এবার না ঘুমালে আগামীকাল তাড়াতাড়ি উঠতে পারব না।

সকালে আমার ঘুম তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে যায়। আর ঘুরতে গেলে তো আরও তাড়াতাড়ি। পাহাড়ে গেলে তো খুব ভোরে উঠতে হয়। কিছুদিন আগেই গাড়োয়ালে গিয়ছিলাম। হিমালয়ের কোলে কার্ত্তিকস্বামী মন্দির থেকে সূর্যোদয় দেখব বলে, কনকচৌরি গ্রাম থেকে এত অন্ধকার থাকতে হাঁটা শুরু করেছিলাম যে এক জায়গায় পাহাড়ি পায়েচলা পথে পথ ভুল হয়ে গেছিল। পরে কিছু স্থানীয় লোক ঠিক রাস্তা বলে দেয়।

আবার পরের দিন, তুঙ্গনাথ থেকে আরও উঁচুতে চন্দ্রশীলা (১৩০০০ ফুট) যাবার জন্য কত অন্ধকার থাকতে উঠে হাঁটা শুরু করেছিলাম। সেখানেও স্কুলের অন্য দুই বন্ধু ছিল। খুবই ঠাণ্ডা । তাও সবাই হাঁপিয়ে লাফিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম। নইলে তো হিমালয়ের বরফ আবৃত শৈল শিখরের উপরে সূর্যোদয় দেখা যাবে না। সে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাই একটা ফিল্ম তৈরি করে তাতে সেই সৌন্দর্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। ইউটিউবে আছে আমার সেই তুঙ্গনাথ ভিডিও।

কৌস্তভের জন্য এই বেড়াতে যাওয়া একটু কষ্টকর হবে। ওর অত সকালে ওঠার অভ্যেস নেই। বেচারার একটি দিনই ছুটি । কিন্তু আমার জন্য বলিদান দিচ্ছে। ব্রেকফাস্ট পেতে একটু দেরী হল। বেরোতে বেরোতে প্রায় ৮ টা হয়ে গেল। দুয়ারে দেখি একটি বিদেশী গাড়ি দাঁড়িয়ে।

গাড়ি দেখে আমি বেশ চমকালাম। এমন গাড়ি তো আমি জীবনেও দেখিনি। জানতে পারলাম বাংলাদেশে প্রচুর “পূর্ব-ব্যবহৃত” বিদেশী গাড়ি আমদানি করা হয়। কারণ বাংলাদেশে এখনো নিজস্ব গাড়ি তৈরির কারখানা নেই। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই হবে। তখন হয়ত এই বিদশী গাড়ি আর আমদানি করতে হবে না।

চালককে প্রশ্ন করে জানলাম, কেনার সময় গাড়িটি প্রায় ৬০ হাজার কিলোমিটার চলেছিল। অন্তত মিটারে তাই ছিল। কিন্তু এখনও এই গাড়ি নতুনের মতই চলে। ‘কোন সমস্যা নাই’। রাস্তায় দেখছি ছোট গাড়ি সবই বিদেশী। কিন্তু ভারতের বাজারে উপস্থিত ব্র্যান্ডগুলো চোখে পড়ছে না, দু একটা হুন্ডাই আর টয়োটা ছাড়া।

তবে প্রচুর বাজাজ, হিরো, আর ইয়ামাহা বাইক দেখতে পাচ্ছি। শুনলাম যে, বাংলাদেশে এই বাইকের দাম ভারতের বাজারের তুলনায় প্রায় দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশী।

আমরা প্রথমে যাবো নাটোরের রাজবাড়ী। গুগুল দেখাচ্ছে ৫০ কিমি। আর সময় লাগবে ১ ঘন্টা। আর রাজশাহী প্রায় ৯৫ কিমি সময় লাগবে ২.৩০ ঘন্টা। গুগুল যা দেখাচ্ছে দেখাক। আমরা আমাদের মত চলেছি।

রাস্তায় এক জায়গায় একটা চা-বিরতি নেওয়ার জন্য থামলাম। একেবারে নির্ভেজাল রোড-সাইড ঝুপড়ি চা দোকান। পশ্চিমবঙ্গে আমরা দেখেছি এমন দোকান দেখলেই কোন কোন মন্ত্রী চা বানাতে চলে যান সেই দোকানে।

পরিচ্ছন্নতার কথা মাথায় রেখে কৌস্তভ বলে দিল, ‘ওয়ান টাইম’ দেবেন।
আমি ভাবি, এই ‘ওয়ান টাইম’ কি ব্যাপার? চা তো একবারই খাব? সেটা আবার আলাদা করে বলার কি আছে ! আর ‘ওয়ান টাইম’ না বলে দিলে কি চা দিতেই থাকবে? টু টাইম, থ্রি টাইম…?

চা এল। দেখলাম সে এক মজার ব্যবস্থা। ষ্টীলের কাপের ভিতরে একটা প্লাস্টিকের কাপ বসিয়ে তাতে চা দেওয়া হল। ‘ওয়ান টাইম’ মানে বুঝলাম ডিস্পজেবল ।

চা খেতে খেতে চালককে জিজ্ঞেস করি, নাটোর আর কত দূর ?
সে বলে, আর ২০ কিলো।
আমি ভাবলাম, আরে ভাই আমি কি নাটোরের ওজন জিজ্ঞেস করেছি নাকি !
একটু পরে বুঝলাম যে, কিলো বলতে আসলে কিলোমিটার বলতে চাইছে। চলতি কথায় বাংলাদেশে দূরত্ব সবাই “কিলো” তেই বলে। আলু অবশ্য কেজিতেই বিক্রি হয়।

বাংলাদেশের এই ছোট ছোট বিষয়গুলি আমাকে বেশ আকর্ষণ করছে। একটা দেশ, তার মানুষ, তার সমাজ চিনতে এই আপাত তুচ্ছ ঘটনা গুলি খুব সাহায্য করে। বড় বড় স্ট্যাটিস্টিকস, গ্রাফ, চার্ট তো বড় বড় লোকদের জন্য। আমার মত হেটো-মেঠো ভ্রমণপিপাষুর জন্য এই এক-একটি বিন্দু জুড়ে জুড়ে একটা ছবি তৈরি হয়। মানুষকে অনেক কাছ থেকে জানা যায়।

জানালা দিয়ে বাইরে দেখছি। রাস্তার ধারে জায়গায় জায়গায় অনেক বড় করে হয় ব্রাজিল, নয় আর্জেন্টিনার পতাকা টানানো। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বিশ্বকাপের প্রভাব। অনেক বাড়ির ছাদেও লম্বা বাঁশের ডগায় ওই পতাকা উড়ছে। যদিও বিশ্বকাপ গত মাসেই শেষ হয়ে গেছে।

এসব ভাবতে ভাবতে দেখি আমাদের গাড়ি বাঁদিকে সরু রাস্তায় ঢুকে পড়েছে। এদিক দিয়েই নাটোরের রাজবাড়ী যেতে হবে। রাস্তা বেশ সরু। তার মধ্যেই দেখলাম নানা জায়গায় ‘বনলতা সেন’ নাম টা লেখা আছে। এই নামটা এখানে অকাতরে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই নামে একটা স্কুলও আছে মনে হল।

নাটোরের রাজবাড়ীর সামনে বড় গেট। লাল রং। গেট বন্ধ। টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। এখানে বাংলাদেশী ও বিদেশীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দামের টিকিট।

গেটের বাদিকে এক বড় বোর্ডে রাজবাড়ীর ইতিহাস লেখা আছে। এতটা লেখা পড়ার ধৈর্য বা সময় নাই। তাই পিড়িং পিড়িং করে একটু পড়ে বাকিটা ছবি তুলে নিলাম। আপনাদের পড়াবো বলে।

গেট পার হতেই মন ভরে গেল। আহা কি সুবিশাল প্রাঙ্গণ। সত্যি রাজবাড়ী বলেই অনুভূত হয়। সামনে অনেকটা লম্বা খালি প্রান্তর। তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। দুধারে গাছ গাছালি। কিছু দূরে রাজকিয় ঢঙ্গে তৈরি দু-একটি দালান দেখা যাছে। কোনটার কি মাহাত্য তা পড়ে জানতে হবে। আমি তেমন জানিনা। আসলে সময় কম। তাই আমি জায়গাটা ভালো করে ঘুরে দেখতে চাইছি। আর ইন্টারনেটের যুগে, নাটোরের রাজবাড়ীর ইতিহাস তো আমি ঘরে বসেও পড়তে পারব।

ছবি তোলার সরঞ্জাম নিয়ে কাজ শুরু করি। ও মা! একটু পরেই দেখি ভিডিও ক্যামেরার মেমরি কার্ড টা এরর দেখাচ্ছে। তার মানে দেহ রাখল। মাথায় হাত। এখন আমি নতুন মেমরি কার্ড কোথায় পাই? যাই হোক। ভিডিও ক্যামেরা রেখে ষ্টীল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে থাকি। ফিল্ম শুটিং-এর জন্য দারুণ লোকেশান।

একটু ছোট করে বলে দেই। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রাজবাড়ী। ১২০ একর। ভিতরে অনেকগুলো বিভিন্ন সাইজের বাড়ি বা ভবন। সেকালের জমিদার বাড়ির স্টাইলে তৈরি। পুরো এলাকাটি ওরা দুটো ভাগে ভাগ করেছে। ছোট তরফ আর বড় তরফ। তরফ অর্থ জমিদারীর অংশ বা মালিক।

অনেক ভবন ভেঙ্গে গেছে, আধ ভাঙ্গা পড়ে আছে। তবে কয়েকটির সংস্কার করা হয়েছে। ভিতরে পাঁচটি বড় বড় পুকুর বা দিঘি আছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে খনন করা হয়েছিল। দিঘির পারে সুন্দর বনবীথি।
একটা প্রাচীন মন্দির এখনও আছে। শ্যামসুন্দর মন্দির। সংস্কার হয়েছে। নিত্য পূজা হয়।

কৌস্তভ হাফ ব্রাহ্মণ। ঢুকে গেল মন্দিরে। বেশ বড় জায়গা। ভিতরে নানা দেব দেবীর মূর্তি। এক মাঝবয়সী মহিলা এগিয়ে এলেন। তিনি আর তার স্বামী এই মন্দিরে পূজা ও দেখভাল করেন। পাশেই থাকেন। দালান ঘরটা দেখালেন। সেখানে দাওয়ায় বসে একটি মেয়ে লেখাপড়া করছে। জিজ্ঞেস করাতে বললেন যে, ওনার ছোট মেয়ে। ক্লাস এইটে পড়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে বারো ক্লাসে পড়তে পড়তে। এখন ছোট মেয়েও চাইছে বিয়ে করতে। শুনে আমি হাঁ হয়ে গেলাম।

রাজবাড়ীর এত বড় এলাকার সংরক্ষণের জন্য অনেক অর্থের প্রয়োজন। সরকার হয়ত ততটা দিয়ে উঠতে পারে না। এইখানে পিকনিক করার ব্যবস্থা আছে। টাকা দিয়ে বুক করা যায়।

অনেকেই বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিক-প্রেমিকা, পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছে। আমরাও এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভবন-পুকুরগুলো ঘুরে দেখছিলাম। কিন্তু মনে খোঁচা দিচ্ছে সময়। কারণ রাজশাহী যেতে হবে। বেলা বাড়ছে।

ওদিকে রাজশাহী থেকে এক বন্ধু দু-বার ফোন করে জিজ্ঞেস করেছে আর কত দেরী হবে সেখানে পৌঁছাতে। সে অপেক্ষা করছে। তাই আর দেরী না করে, এবার গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম রাজশাহীর দিকে।

ক্রমশঃ

গল্প সংসার ও স্বপ্ন ***** প্রথম পর্ব

ধারাবাহিক গল্প
সংসার ও স্বপ্ন
প্রথম পর্ব

সকালে মৈনাকের হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে অমৃতা বলল–আজ তোমাকে একটা সুখবর দেব।মৈনাক বলল–শুধু খবর নয় একেবারে সু-খবর?তো বলো শুনি তোমার সুখবরটা কি?–আসলে খবরটা আগেই জানাতাম।কিন্তু কনফার্ম না হয়ে জানাতে চাইছিলাম না। একেবারে ডাক্তারের সংগে কনসাল্টও করে এসেছি। –এত ভূমিকা না করে আসল খবরটা বলো। অমৃতা বলল–আমি কনসিভ করেছি।

মৈনাক বলল– মানেটা কি? তুমি কি সাত সকালে আমার সংগে রসিকতা করতে এসেছো?–তোমার কি এটাকে রসিকতা বলে মনে হয়?মউ তো এখন একটু বড় হয়ে গেছে।আর একটা বাচ্চা হলে ক্ষতি কি?আমি তো ভাবলাম তুমি খুশি হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানাবে।মৈনাক বলল–তুমি কোন আক্কেলে এমন হঠকারী কাজটা করলে?তোমার সাবধান হওয়া উচিত ছিল না?আমার বাবা মা না থাকলে মউ তো কুকুর বেড়ালের মতো মানুষ হত।

অমৃতা বলল–তুমি এমন রি অ্যাক্ট করছ কেন? মউ তো বাবা মারও নাতনি।ওনারা শুধু মউকে আদর ভালোবাসা দিয়েছেন।একবছর আগে পর্যন্ত ওর জন্য আয়া ছিল।একটা হোল টাইমার সহায়িকা আছে।বাচ্চার পিছনে যা যা কাজ আয়া করেছে।হ্যাঁ মউ দাদু ঠাম্মির সান্নিধ্যে থেকেছে।এটাও অনেকে পায় না।এটার বেলায়ও আয়া থাকবে।দ্যাখো আর একটা ছেলে বা মেয়ে হলে মউ আনন্দে থাকবে।আমাদের যখন দুটো বাচ্চাকে ঠিক মতো মানুষ করার মতো আর্থিক ক্ষমতা আছে তখন এত আপত্তি করছ কেন?

মৈনাক বলল–ঠিক আছে আমি তোমার কথা মানব।কিন্তু কলেজের চাকরিটা তোমাকে ছাড়তে হবে।আমার একার রোজগারে দুটো বাচ্চা মানুষ করার ক্ষমতা আছে।অমৃতা বলল–তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?এই চাকরিটার পিছনে আমার কতো লেখাপড়া ,পরিশ্রম আর ধৈর্য ছিল সে ধারণা তোমার আছে?বাবা মা রান্নার মাসীর হাতে খেতে পারেন না বলে আমাকে সেই ভোর থেকে উঠে রান্না জলখাবার সেরে কলেজ করতে হয়।আমি তো এই নিয়ে কখনও অভিযোগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করিনি।–এত কষ্ট করার তো দরকার ছিল না।আমার বাবা মা আমি কেউ চাইনি তুমি চাকরি করো। আমি একটা এডুকেটেড মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম।চাকরিটা তো তুমি সবার অমতে বিয়ের পর পেয়েছিলে।—চাকরিটা আমার নিজের পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে অর্জন করেছিলাম।বিয়ের আগে তুমি তো একবারও বলোনি তুমি মেয়েদের চাকরি করা পছন্দ করো না।–করলে কি করতে?–বিয়েটা করতাম না।আমার জীবনের ফার্স্ট চয়েস ছিল স্বাবলম্বী হওয়া। কেন তোমার অফিসে মহিলা কলিগ নেই?

মৈনাক বলল–আমি শুধু আমার সংসার আর সুবিধা অসুবিধার কথা ভাবব।যারা চাকরি করে তাদের চাকরির প্রয়োজন আছে তাই করে।আমাদের তো প্রয়োজন নেই।আমার বয়স্ক বাবা মাকে দেখাশোনা করা তোমার কর্তব্য নয়?–আমি তো সেটা অস্বীকার করছি না। আর সেটা আমার একার কর্তব্য?
চাকরির পর আমার সাধ্যমতো তাদের দেখাশোনা করি।–ঠিক আছে,চাকরিটা যখন ছাড়বেই না তাহলে বাচ্চাটা এবরেশন করে নাও।– কেন এমন নিষ্ঠুরের মতো কথা বলছ?দ্যাখো দ্বিতীয়বার কনসিভ করতে আমিও চাইনি।কিন্তু অসাবধানতাবশত যখন যখন বাচ্চাটা চলেই এসেছে তখন পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তাকে মেরে ফেলব? এই বাচ্চা তো তোমার আমার ভালোবাসারই ফসল। আমি সবদিক বজায় রেখেই চাকরিটা করব।

ছেলে বৌমার কথা কাটাকাটির মধ্যে মৈনাকের মা অনুপমা দেবী বেরিয়ে এসে বললেন–সাত সকালে তোরা কি শুরু করেছিস বল তো?মৈনাক বলল–মা তোমার বৌমা আবার সন্তান সম্ভবা।তাই আমি ওকে চাকরিটা ছাড়তে বলছিলাম।অনুপমা দেবী বললেন–তুই ঠিকই তো বলেছিস।ঘরে বাচ্চা আসবে সেটা তো আনন্দের খবর। একটা নাতি হোক এটা আমিও চাইছিলাম।কিন্তু এই বয়সে দু দুটো বাচ্চার ধকল কি আমাকে নিতে হবে?বৌ তো সারাদিনের নামে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সেজেগুজে বেরিয়ে যাবে।আমি তো বরাবর বলেছিলাম ওর চাকরি করার দরকার নেই।আমাদের টাকা পয়সার অভাব তো কিছু নেই। তোর বাবা মোটা টাকা পেনশন পায়।কিন্তু ও মেয়ে যা জেদি।ও কারোর কথা শোনার পাত্রীই নয়।কি দেখে যে বিয়ে করলি কে জানে।মেয়েমানুষের এত জেদ কি ভালো?

অমৃতা বলল–মা আপনার নাতি হবে না নাতনি হবে সেটা তো আপনি বা আমি কেউ জানি না।তার সংগে আমার চাকরির কি সম্পর্ক?অনুপমা বললেন–তোমার লেকচারটা তোমার কলেজেই দিও বাছা। আর তোকেও বলি মনু ,ও মেয়ে যে কারোর কথা শোনার মেয়ে নয় সেটা জানতিস না?বিয়ের পর তো ভেজা বিড়ালটি ছিল। চাকরিটা পাওয়ার পর থেকে তার আসল রূপ বেরিয়ে পড়েছে।তুমি এখনও হাঁ করে বসে না থেকে আর একবার চা করে রান্না জলখাবার কি হবে দ্যাখো।সপ্তাহে দুটো দিন তো একটু ভালোমন্দ খাওয়া জোটে।আর সব দিন তো ঝড়ের বেগে দায়সারা রান্না করে কলেজ ছোটো।

অমৃতা বলল–মা আপনার ছেলেকে বলুন এবার একটা রান্নার মাসী দেখুক।ডাক্তারবাবু আমাকে ভারি কাজ করতে নিষেধ করেছেন।অনুপমা দেবী বললেন–তোমার চাকরিটা বুঝি ভারি কাজ নয়?একঘন্টা ভীড় বাস ঠেঙিয়ে কলেজ যাওয়া বুঝি হালকা কাজ?–মা তিনমাস আমি ক্যাব বুক করে কলেজে যাব।ডাক্তার বাবু আমাকে বেড রেস্ট নিতে বলেন নি।টুকটাক হাল্কা কাজ করতে বলেছেন।আর কলেজ যেতেও নিষেধ করেন নি।

অনুপমা দেবী বললেন–তাহলে তো সোনায় সোহাগা।আগে তোমার আধঘন্টা সাজতে সময় লাগত এরপর দু ঘন্টা সাজগোজের সময় পাবে।তারপর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ট্যাক্সি করে কলেজ যাবে।এখন থেকে কতদিন যে রান্নার মাসীর অখাদ্য রান্না খেতে হবে কে জানে।অমৃতা বলল–মা রবিবার দিনটা না হয় আমিই রান্নাটা করব।আর রান্নার বাইরেও আমাকে অনেক কাজ সামলে তবে যেতে হয়।মউকে স্কুলের জন্যে তৈরি করে খাওয়াতেই আমার অনেকটা সময় চলে যায়।–তবু তুমি চাকরিটা ছাড়বে না?অমৃতা বলল–মা একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন,সংসারে স্বামী স্ত্রী রোজগার করলে ভবিষ্যত অনেক নিরাপদ থাকে।দুটো বাচ্চার উচ্চ শিক্ষার জন্য টাকার দরকার।অনুপমা দেবী বললেন –তোমার রোজগারের টাকার একটা পয়সা এখনও পর্যন্ত এ সংসারে নেওয়া হয়না।তোমার শ্বশুরের পেনশন আর ছেলের রোজগারে সংসার স্বচ্ছন্দে চলে গিয়েও অনেক উদ্বৃত্ত থাকে।আমার দুটো নাতি নাতনির উচ্চ শিক্ষার জন্য যা থাকবে তাতে কোনো ঘাটতি পড়বে না। আমাদের কথা না হয় বাদ দাও।যেখানে তোমার স্বামী চাকরি করা পছন্দ করছে না সেখানে তার পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব তোমার কাছে কিছু নয়?

অমৃতা বলল–মা আমি শুধু মৈনাক কেন ,আপনাদের সবার পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব দিই।তাহলে আমিও তো আশা করব আপনারাও আমার পছন্দ অপছন্দের গুরুত্ব দেবেন।এই চাকরিটা আমার আত্মসম্মান, পায়ের তলার শক্ত মাটি,আমার মাথা উঁচু করে চলার রাস্তা।

নির্দিষ্ট সময়ে অমৃতা একটা পুত্র সন্তান প্রসব করল।নাতির মুখ দেখে শ্বশুর শাশুড়ি উচ্ছ্বসিত।অমৃতা জানে তার মেয়ে হলে তাঁদের এই উচ্ছ্বাসটা থাকত না।সৌজন্যবশত হয়তো মেনে নিত। মৈনাক একবার দায়সারা করে নার্সিংহোমে এসেছিল।

বাড়ি ফেরার পর অনুপমা দেবী উলুধ্বনি আর শঙ্খ বাজিয়ে একমুখ হাসি নিয়ে নাতিকে বরণ করলেন।শ্বশুর মশাই বললেন–একবারে বাপকা ব্যাটা হয়েছে।শাশুড়ি মা বললেন–আমার বংশের উত্তরাধিকার। চেয়ে দ্যাখো একেবারে মনুর মুখটা কেটে বসানো।অমৃতা মনে মনে হাসল।সদ্যোজাত সব বাচ্চার মুখ তার কাছে তো একই মনে হয়।এনারা কি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাদের ছেলের সংগে এত মিল খুঁজে পেলেন?মউও নাকি তার বাবার মতো চেহারা পেয়েছে।তাহলে তার ভূমিকাটা কি?শুধু জন্ম দেওয়া? তার চেহারার ছিটেফোঁটাও কি দুই ছেলে মেয়ে কেউ পায় নি?যাকগে যে যাতে সন্তুষ্ট থাকে।নার্সিং হোম থাকার সময় মৈনাক আয়ার ব্যবস্থা করেছিল।অমৃতা মনে মনে মৈনাকের দূরদর্শিতার প্রশংসা করল। নিশ্চয়ই ছেলের মুখ দেখে তার সব বিরক্তি উধাও হয়ে গেছে।

ক্রমশ—

সম্পাদকীয় __ রথযাত্রা :- গীতশ্রী সিনহা।

সম্পাদকীয়

রথযাত্রা :-

আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তে হিন্দু ধর্মের এক মহান ধর্মীয় তথা মানবিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয় শ্রীজগন্নাথ দেবের রথযাত্রা কে উপলক্ষ্য করে। ব্রহ্মপুরাণ, স্কন্দ পুরাণ ও কপিল সংহিতায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়।

এ যেন এক অনন্ত যাত্রা, যেন মানুষকে মনে করাতে চায় যে, জীবনের যাত্রা কখনো থামে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা চলতেই থাকে। জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা যেন সেই সময়ের যাত্রাকেই সূচিত করে, জীবনের চলমানতাকে বোঝায়।

জগতের নাথ তাঁর অগ্রজ বলরাম ও অনুজা সুভদ্রা কে সঙ্গে নিয়ে এবং অবশ্যই আপন সুদর্শনের সাথে রথে অধিষ্ঠিত হয়ে মূল মন্দির থেকে বেরিয়ে গুন্ডিচা মন্দির এর দিকে যাত্রা করেন। পথে তাঁর রথ নন্দীঘোষ কিছুক্ষণের জন্য তাঁর মুসলমান ভক্ত সালবেগের সমাধির পাশে দাঁড়ায়। এখানেই জগন্নাথ দেব সর্বধর্ম-সমন্বয়ের সংকেত প্রদান করেন তাঁর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এর মাধ্যমে। গুন্ডিচা মন্দির থেকে তাঁরা প্রত্যাবর্তন করেন আষাঢ়ের শুক্লা দশমীর দিন।

যাত্রার কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যায়– মন্দিরে আবদ্ধ না থেকে প্রভু বা ঈশ্বর জগত জনের কাছে আপনি প্রকট হওয়ার জন্য মন্দিরে বাইরে আসেন। লক্ষ লক্ষ ভক্তকে দর্শনাভিলাষী ভক্তকে দর্শন দিয়ে তিনি আপন করে নিতে চান মানবকুলকে। কথিত আছে, একদা রাজা কংস বৃন্দাবনে রথ পাঠিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম কে মথুরায় আনার জন্য। অক্রূর ছিলেন সারথি, এবং কংসের উদ্দেশ্য ছিল এই ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রাণনাশ। পরবর্তীকালে সেই দিনটিকেই রথযাত্রার দিন হিসাবে গণ্য করা হয়— জগন্নাথ দেব সেইদিনই রথযাত্রার দিন নির্ধারণ করেন।

রথ যাত্রার গুরুত্ব অপরিসীম! স্বল্প পরিসরে তা জানানো অসম্ভব। তাই সংক্ষেপে বলি, জগন্নাথ দেবের রথ যেন আমাদের মানব দেহ — যার রথী ঈশ্বর স্বয়ং। রথটি তৈরি হয় ২০৬ টি কাঠ দিয়ে, ঠিক যেমন এই মানব দেহ ২০৬ টি হাড়ে তৈরি হয়। রথের ১৬ টি চাকাকে আমরা ধরে নিতে পারি– ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ৫টি কর্মেন্দ্রিয় ও ৬টি রিপুর প্রতীকরূপে। রথের যে সুবিশাল রশিটি থাকে, তা হল আমাদের মন ; এবং বুদ্ধি রূপী সারথি অধিষ্ঠিত থাকেন রথে। জগন্নাথ দেব রথে অধিষ্ঠিত হয়ে ভক্তদের মাঝে উপস্থিত হয়ে তাঁর অপার করুণা বিতরণ করেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে, জগন্নাথ দেব মূল মন্দিরে প্রত‍্যাবর্তনের পরে ওই রথ গুলিকে ভেঙে ফেলা হয়। এরপরে টুকরো গুলিকে রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঠিক তেমনই, মানুষের মৃত্যুর পরে তার শরীর থেকে আত্মা বা ঈশ্বর বেরিয়ে গেলে তার নশ্বর দেহটিকে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

জগন্নাথ দেব নিজেই এক পরম বিস্ময়! একদা নীলমাধব নামে পূজিত হতেন যিনি, তিনিই রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের স্বপ্নের কারণে এই বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করে শ্রীক্ষেত্র পুরীতে অধিষ্ঠান করেন বহুকাল ধরে। তার বিষয়ে এত কিছু জানার আছে, যে বলার নয়! এই ছোট্ট পরিসরে তাঁর এবং তাঁর রথ যাত্রার মাহাত্ম্য এই টুকুই রইল।
প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে আজকের সম্পাদকীয় কলমে আছেন অতি পরিচিত নাম, যিনি প্রতি সংখ্যায় বিভিন্ন চেতনার লেখা নিয়ে আছেন, গীতালি ঘোষ। আমার স্নেহের এবং প্রিয় কলম।

আজ তবে এইপর্যন্ত থাকলো। আগামীতে ফিরছি নতুন ভাবে।
শুভকামনা শুভেচ্ছা ভালোবাসা নিয়ে গীতশ্রী সিনহা।

পাহাড়ের কোলে ____ মালতী মন্ডল

পাহাড়ের কোলে
মালতী মন্ডল

পাহাড়ের কোলে
রাত ধুয়ে গেছে জ্যোৎস্নায় —
ইউক্যালিপটাসের ছায়ায়
আলোময় উদ্ভাস —
শিলায় শিলায় জমে স্বেদ বিন্দু
বুনো আনন্দ উল্লাস !
উৎসবের সন্ধায় মর্মর
ঘন মেঘের আলিঙ্গনে
বীজের অঙ্কুরোদগম —-

ক্রমশঃ কাল হয়েছে দীর্ঘতর,
পাহাড়ের কোলে
রামধনু দ্যুতি ;
পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠে

বলতে পারি _________ তনুজা চক্রবর্তী

বলতে পারি

তনুজা চক্রবর্তী

অনেক কিছু’ই বলতে পারি,বলিনা কেন জানো?
এক জীবনে সবটা বলা যাবে না কক্ষনো।
কেটেছেঁটে বেছেবুছে সাজিয়ে দিলে পাতে,
না বুঝে গিলে বদ হজমে পেট ছেড়ে দেয় তাতে।
ইতিউতি দুর্গন্ধ হাত চলে যায় নাকে,
রেখে ঢেকে সামলে খাও, বলব আর কাকে!
তারচেয়ে বাপু চুপ থাকাটাই এখন দেখি শ্রেয়,
বোবার কোনো শত্রু নেই,করে’ওনা কেউ হেও।
তারপরেও বলতে হয় বিশেষ কিছু কথা
ছুঁড়তে হয় শব্দবাণ আদায়ে স্বাধীনতা।
আঁধার শেষে আলোর হাসি ফুটবে মুখে মুখে,
ভাবিনা ওই ওরা’ তো আছে বিপদ দেবে রুখে।

ঋণ—গীতশ্রী সিনহা

ঋণ

গীতশ্রী সিনহা

কত ঋণ,মাস্টারমশাই কেড়ে নিলেন বাড়ির বাইরে,
চেনালেন মানিক্য,বাক্য,শেকড়,
কোশে করে জল ঢেলে বললেন ;
মৌনব্রত নাও, নিরীক্ষণ করো…

হয়তো ম্লান বসেছিলাম অর্ধেক বিকেল
নদীতীর ধার দিল সন্ধ্যার আরাম …
উল্টো দিকে ছবি মুছে গেলে
উজান যাত্রায় ফিরে যেতে হলো…

একজন মুষ্টি অন্ন নিয়ে এলেন
তনু বাঁচাতে নিতে হলো শেষে
মণিবন্ধে কান পেতে শুনি অতপ:র
সার সার তন্ডুলের গান…

আকাশে মৌমাছির ঝাঁক
সাময়িক চন্দ্রাতপ বিরচনা ক’রে
চলে গেল গড়ে, নদীর ওপারে
ওদের গুঞ্জনে মধু
ঝরেছিল এই ভুঁয়ে, হাঁসের হৃদয়ে…
হাঁসিনীর কাছেও কিছু ঋণ হয়েছিল…

ফুলির রথ দেখা, #মৌসুমি

ফুলির রথ দেখা,

#মৌসুমি

জানো দিদা,চাঁপারা কইছিল গেরামের উত্তর দিকের মাঠে রথের মেলা বসবে কালকে,চলো না দিদা আমরাও যাই, রাতে দিদার পাশে শুয়ে বায়না করে ছোট ফুটফুটে বছর ছয়ের ফুলি।।দিদা ফুলির চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলে,ওরে পাগল মেয়ে,চাঁপা, শিউলির বাবাদের টেকা আছে।।তাই ওরা মেলায় যাবে।। এখন তুই ঘুমিয়ে পর ফুলি।।কাল আমাকে ভোরে উঠতে হবে, কথাটা বলে ফুলির দিদা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো।।।

ছোট্ট ফুলির চোখে কিন্তু ঘুম নেই।।সে ভাবতে থাকে রথের মেলায় কত আলো আছে।।নাগরদোলনা,জিলিপি,পাঁপাড় ভাজা,ভেঁপু,বাদাম ভাজা আরো অনেক কিছু।। কিন্তু সেখানে চাঁপা শিউলিদের মতো ও যেতে পারবে না কেন?
বেড়ার ঘরের ছোট জানলা টা দিয়ে জোনাকি পোকাদের দেখতে পাচ্ছিল ফুলি।। পাশে তার দিদা অঘোরে ঘুমাচ্ছে।। বিছানা ছেড়ে ভীষন আস্তে ওঠে সে। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে কালো আকাশ টার দিকে।। মনে অনেক প্রশ্ন তার,চাঁপা শিউলিরা তো ওরই মতো তাহলে আনন্দ গুলো আলাদা কেন?ফুলির দুটো ডাগর ডাগর দৃষ্টি অপলক খুঁজে যাচ্ছে দুটো তারা কে,।।দিদা বলেছিল ওর বাবা আর মা ওই তারাদের মধ্যে আছে।।

ফুলি তখন খুব ছোট,যখন ওর মা কি যেন একটা অজানা জ্বরে মরে যায়।।তার বছর দুই পরে ওর বাবা ও একদিন ভোরে হাটে ফুল বিক্রি করতে বেরিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে।। সেই তখন থেকে ফুলি দিদার কাছেই থাকে।।।ফুলি সব একা একা করে।।চাঁপাদের মায়েরা চুল বেঁধে দেয়, খাইয়ে দেয় কিন্তু ফুলি এই সব কিছু একাই করে যদিও তাতে ওর একটুও দুঃখ হয়না।।কারণ ফুলির বুড়ি দিদা ফুলি কে খুব ভালবাসে।।দিদা ছাড়া ফুলির তো আর কেউ নেই।। এগুলো ভাবতে ভাবতে খুব ঘুম পায় ওর, দুচোখ যখন প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন তখন কে যেন ওর নাম ধরে ডাকে,ফুলি,এই ফুলি।।
ফুলি ধরমরিয়ে ওঠে।।কে ডাকে এত রাতে ওর নাম ধরে।। আবার শোনে কে ডাকছে ওকে।।’ফুলি ও ফুলি মা আমার কাছে আয় একটা কথা কইব তোরে’।।ফুলি আবার বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে বাইরে গেল।। অন্ধকারে কে দাঁড়িয়ে ওখানে?ভয় পাস না ফুলি আমি তোর মা।। মা শুনেই ফুলি আনন্দে লাফিয়ে উঠলো।।মা তুমি? হ্যা রে মা তোর কষ্ট আমার আর সহ্য হলো না তাই তো চলে এলুম।। তুই রথের মেলায় যাবি? কথাটা শুনে ফুলি কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, খুব ইচ্ছে করছে মা, কিন্তু দিদা বললে আমাদের টেকা নাই,তাই যাওয়া হবে নি।।ছায়া মূর্তি একটু হেসে বলল,ও এই ব্যপার,শোন মা চৌকির নীচে একটা বাক্স আছে।।ওটা খুলে দেখবি কয়েকটা সুন্দর আসন বানানো আছে।।আসন বানানো আমার শখ ছিল।।বাক্সে এখন ও রাখা আছে।। তুই ওগুলো রথের মেলায় নিয়ে যাস।। লোকে তোর থেকে ওগুলো কিনে নেবে আর সেই টাকায় তুই মেলায় ঘুরতে ও পারবি।। আচ্ছা মা ভোর হয়ে আসছে, এবার আমি যাই।। তুই সাবধানে থাকিস।। কথাটা বলেই ছায়া মূর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল।।

ফুলি মা মা বলে চেঁচিয়ে উঠলো।।দিদা এসে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলল,ও ফুলি মায়ের স্বপ্ন দেখলি বুঝি?।।ফুলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,দিদা কাল রেতে মা এয়েছিল।।বাক্সে আসন বানানো আছে, মায়ের হাতে বানানো ওগুলো আজকে রথের মেলায় নিয়ে যাবো।। লোকে কিনবে।।দিদা কে কথাটা বলেই, খাটের নিচের থেকে বাক্স বের করে ফুলি দেখে কত সুন্দর সুন্দর আসন বানানো রঙ বেরঙের সুতো দিয়ে।।

সন্ধ্যার সময় দুচারটে আসন রেখে বাকি সবগুলো নিয়ে রথের মেলায় গেল ফুলি আর ওর দিদা।। কিছুক্ষনের মধ্যেই সব আসন বিক্রি হয়ে গেল।।ফুলির খুব আনন্দ।।সে দিদা কে নিয়ে পাঁপড় ভাজা খেলো।। একটা সুন্দর পুতুল কিনলো এবং বাড়ি ফেরার সময় কিছু জিলিপি আর বাদাম ভাজা কিনে নিয়ে এলো।
রাতে বাড়ি ফিরে ফুলি আর ওর দিদা জিলিপি বাদাম ভাজা খেয়ে শুতে চলে খেলো।। সেই রাতে ফুলির চুলে বিলি কাটতে কাটতে ওর দিদা বলল,বুঝলি ফুলি একেই বলে রথ দেখা আর কলা বেচা দুটোই।। কিন্তু ফুলির কানে গেল না দিদার কথা।।ওর তখন চোখ অন্ধকারচ্ছন্ন আকাশে দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা তারাদের দিকে।।
ওই দুটো তারা যে ওর বাবা আর মা।।।

#মৌসুমি

আজ আমার কলমে- মানব জীবনের চিরাচরিত সম্পর্ক আর মানসিকতা নিয়ে একান্তই কিছু মনের কথা___ কলমে-নিতু চৌধুরী।

আজ আমার কলমে- মানব জীবনের চিরাচরিত সম্পর্ক আর মানসিকতা নিয়ে একান্তই কিছু মনের কথা,,,,

কলমে-নিতু চৌধুরী।

আজ সকাল সকাল কিছু অদ্ভুত কথা মনে হচ্ছে।আমাদের জীবন চক্র চলে নানা মানুষ, নানা সম্পর্ক এককথায় সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে।সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক কি হয় জানা নেই আমার।আমার মনে হয় সামাজিক বা ব্যক্তিগত যে সম্পর্কই হোক না কেন দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস গুলিকে যেমন করে যত্ন করতে হয় নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে, সম্পর্ক গুলোকেও সেভাবেই যত্ন করতে হয়।সেটা না করলে ,লোহায় মরচে ধরার মতো তাতেও মরচে ধরে যায় তাই জীবনে ভালো থাকতে গেলে সম্পর্ক গুলোকেও যত্ন করতে হয়।আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটনা ক্রমে কতো মানুষ আসে- যায়, বলা ভালো কতো মানুষের সঙ্গেই সম্পর্ক তৈরী হয় কখনও ইচ্ছেয় বা কখনও অনিচ্ছেয়।হয়তো সম্পর্ক টেঁকে বা টেঁকে না কিন্ত সেই যে পরিচিতির দাগ লেগে যায় প্রয়োজনে বা অ -প্রয়োজনে তা কি মুছে ফেলা যায়?
বোধগম্য হলো না তো?আচ্ছা, একটু বুঝিয়ে বলি, ধরুন আপনি যখন খুব ছোট ছিলেন বাবা মা ভাই বোন বা আপনার চেনা বাড়ির পরিবেশ ছেড়ে যখন স্কুলের গন্ডিতে পা রাখলেন নতুন নতুন কিছু আপনার মতোই ক্ষুদে মানুষ দের সাহচর্যে এলেন ,পরিচিত হলেন বন্ধু নামক সম্পর্ক টার সঙ্গে। টিচার দের সাহচর্যে এলেন ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের আওতায় পরলেন।তৈরি হলো পারিবারিক সম্পর্ক ছাড়াও বন্ধুত্বের সম্পর্ক, শিক্ষক -শিক্ষিকা-ছাত্র ছাত্রীর সম্পর্ক। কালক্রমে যতো দিন যাবে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজ, কর্মক্ষেত্রে ও এরকম অনেক সম্পর্ক তৈরি হবে কিন্ত সেই যে স্কুলের সম্পর্কগুলো ভোলা যাবে কি?হয়তো ঝালিয়ে নিতে গেলে দেখা যাবে তাতে মরচে পরেছে ঠিকই কিন্ত মনে দাগ থেকেই গেছে। এরকম কতো সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক মেলানোই যায় না।যেমন ধরুন শাশুড়ি-বৌমা বা জামাই-শাশুড়ী মা মায়ের মতোন বা মেয়ের মতোন, ছেলের মতোন কিন্ত মেয়ে বা ছেলে কিন্ত নয়, মায়ের মতোন কিন্ত মা নয়। শবশুর মশাই বাবার মতোন কিন্ত বাবা নন।এই সম্পর্ক গুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট দেখভাল প্রয়োজন তাই না? হঠাৎই হয়তো কাউকে ভালো লাগলো, অনেক সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলো, এমন একটা অবস্থা হলো কোন কথা শেয়ার না করে থাকাই যাচ্ছে না।তার পর একদিন তাকে টেকেন ফর গ্রান্টেড করে দেওয়া হলো কারণ সে তো আছে সবসময়ই, ঠিক আছে, কোন ব্যাপার না কিন্ত আমরা বুঝতেই পারিনা কখন যেন অবহেলিত হতে হতে সেই সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে।আমরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে এতো দৌড়োতে থাকি যে বাবা-মা, ভাই-বোন, শবশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেওর, বন্ধু-বান্ধব,ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক-শিক্ষিকা মোট কথা যতো রকম সম্পর্কের সমীকরণ আছে তাদের টেকেন ফর গ্রান্টেড করে নিই।
তারপর আর কি, যা হওয়ার তাই হয়। কালক্রমে সেই মানসিকতা ঘুন পোকার মতো কাটতে শুরু করে সম্পর্কের অদৃশ্য সুতো গুলোকে।
তাই সম্পর্কের সুতোতে যত্নের মাঞ্জা দিতেই হবে সময় থাকতে নাহলে জীবনের চলার পথে একা হয়ে যেতে হবে।কে কি করলো ,কে কি বললো না ভেবে নিজের জীবনের সম্পর্কের ঘুড়িগুলো উড়তে থাকুক নিজের যত্নের মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় আর লাটাই টা থাকুক উপরওয়ালার হাতে। শেষ বিচারের ভার তিনিই নিক সম্পর্ক থাকবে না থাকবে না।তাতে মরচে ধরবে না সোনার মতো উজ্জ্বল থাকবে আজীবন।
আজকাল অদ্ভুত হয়ে গেছে আমাদের দিনলিপি।আমরা ব্যক্তিগত অনুভূতির পরিসরে, নিজের চাওয়া-পাওয়ার খেয়াল রাখতে গিয়ে, কেমন যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো ভেসে বেড়াচ্ছি। সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠা থেকে রাতে শুতে যাওয়া অবধি কেমন যেন যন্ত্রচালিত মেশিনের মতো ব্যবহৃত হই।নিজে থেকে উপযাচক হয়ে কারোর খোঁজ খবর রাখতেই চাই না আবার কেউ যদি সেটা করে তাহলে ভাবি তার কোন কাজ নেই বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে একটু বেশিই দূর্বল বা একটু হয়তো গায়ে পরা তাই তখন তাকে এড়িয়ে চলতেই চেষ্টা করি।ফোনের কনট্যাক্টগুলো মাঝেমধ্যে চেক করি, এমন প্রচুর নাম্বার সেভ করা আছে যাদের সাথে কথা হয়নি বহুদিন, অথচ তারাই আমাদের অভ্যাস ছিল কোনো এককালে। কেউ শুভ সকাল জানালে হোয়াটস এপ এ তবেই তাকে আমিও জানাবো নাহলে নয় এমনই মেন্টালিটি হয়েছে আমাদের।মানে ফর্ম্যালিটি ছাড়া সম্পর্কের প্রতি ভালোবাসা বা দায়িত্ব-কর্তব্য এসবের ধার ধারিনা আমরা। এমন অনেকে আছে যাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়নি ,আবার তার ভালোমন্দের খোঁজ খবর নেওয়ার কথাটাও মনে হয়নি।সেকি ভাববে, কি মনে করবে একথা ভাবতে ভাবতেই হয়তো মানুষ টা কখন পরপারে চলে গেছে। যখন জানতে পেরেছি তখন আফসোস করে কি লাভ।কত বন্ধুর সঙ্গে পুজোর প্ল্যান করতে করতেই ঝগড়া শুরু হয়েছে “তুই না গেলে, আমিও যাব না” বলা মেয়েটা একা একাই বেছে নিয়েছিল দূরত্ব। আমাদের ফোনে এমন কিছু নাম্বারও রয়ে গেছে যারা আজ বেঁচে নেই, জং ধরা গ্রিলের মতো শুধু পড়ে আছে স্মৃতিটা, কখন-সখনও ডায়াল করলে কি চেনা গলাটা পাওয়া যাবে ! কি জানি!
যেমন বছর তিনেক আগেই ফেসবুকের মাধ্যমেই খুঁজে পেয়েছিলাম আমার এক বন্ধু অয়ন কে। দু একদিন কথা ও হলো,হোয়াটস এপ নং দিলো কারণ আমার মেসেনজার ইউজ করাতে ঘোর আপত্তি। তার পর ওই গুড মর্নিং বা গুড নাইট কখনও-সখনও । বেশ কিছুদিন আমার ফোন বিকল থাকাতে গুড মর্নিং টুকুও হলোনা তার পর যথারীতি নতুন ফোন পেয়ে ওকে একটা মেসেজ করলাম ফোন খারাপের ব্যাপারে। দেখলাম সিন করেও উত্তর দিলোনা।আমিও আর কিছুই বললাম না।হঠাৎই ফেসবুকে দেখলাম অয়নের প্রোফাইল থেকে একটা পোস্ট, যে সময় আমার ফোন খারাপ ছিল, সম্ভবত সেই সময়ে কারোর করা। সেখানেই জানতে পারলাম ওর মৃত্যুর খবর। তার মানে আমার মেসেজ ও নয় হয়তো অন্য কেউ দেখেছে।আর আমি অভিমান করে বসে আছি বন্ধুর উপর যে কিনা তখন পরপারে।
ছোটোবেলায় আমরা যতো সহজে পেনসিল-রবার হারিয়ে ফেলতাম, বড়ো হয়ে ঠিক সেভাবেই “মানুষ” হারিয়ে ফেলছি,সম্পর্ক হারিয়ে ফেলছি,ভালোবাসা হারিয়ে ফেলছি, দায়িত্ব বোধ, কর্তব্য বোধ সব হারিয়ে ফেলছি কেবল মাত্র নিজের আত্ম অহংকার আর ব্যক্তিগত ইগোর জন্য। ইগনোর করতে শিখছি কেউ সেই দায়িত্ব বোধ, কর্তব্য বোধ, ভালোবাসা দেখালে। ভাবছি বড্ড বেশিই গায়ে পরা সেই মানুষটি।আসলে আমরা বড্ড বেশি বোঝদার হয়ে যাচ্ছি তাই না বন্ধুরা। রোজকার যোগাযোগ নাই বা হলো সংযোগ যেন থাকে, এটা তো জরুরি তাই না কারণ আমরা তো মানুষ, সামাজিক প্রানী তা না হলে তো জঙ্গলেই থাকতাম। আসলে আমাদের মানে মানুষ দের বুদ্ধিজীবী বলা হলেও সবথেকে বোকা কিন্ত আমরাই তাই না?
আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় থাকলাম পাঠকগণ।
ধন্যবাদান্তে-লেখিকা।

মিরুজিন আলো (পর্ব চৌদ্দ) ____ বিজয়া দেব

মিরুজিন আলো (পর্ব চৌদ্দ)

বিজয়া দেব

কোনও কিছুতেই মনটা লগ্ন হয় না পারিজাতের। একটা নেই আঁকড়া ভাব। সত্তর আশির দশকের রোমান্টিক সিনেমা দেখে আশ্চর্য হয়ে যায় পারিজাত। ওরকম ছিল তাহলে? প্রেম ভালবাসা নিয়ে তৈরি হত ছবি। এখন বিয়ের পর নাকি একই চেহারা দেখতে দেখতে ক্লান্ত অনুভব করে মানুষ। পরিবার প্রথা কি ভেঙে পড়বে ধীরে ধীরে? যাকগে ভেবে ভেবে কী হবে! “নদীর কূল নাই কিনার নাই রে…” একটা ভাটিয়ালি গান আছে না? সময়টা নদীর মতই পথ বদল করে দিক বদল করে  ভাঙনের মুখে কত আশ্রয় ভেঙে যায়। স্থিরতা বলে কিছু নেই, নদী তাই বলে। কিন্তু কষ্টে থাকা মানুষের দিকবদল হয় না। ঐ যে পারুল নামে মেয়েটির কথা বলল জগবন্ধু! কতশত পারুল এভাবে ঠিকানা হারিয়ে যৌনদাসীর জীবন যাপন করছে। এই জীবন তো তারা চায় নি। জোর করে ধরে এনে পিঞ্জরের ভেতর পুরে দেওয়া হয়েছে। কথাগুলো ভাবছিল পারিজাত পার্কে বসে। সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসছে। পার্কের বড় বড় গাছগুলোর মাথায় মাথায় জড়ো হচ্ছে আবছা আঁধার। এই সময়টা ভারি প্রিয় তাঁর।
জগবন্ধু বেশ আশ্চর্য মানুষ। পারুলকে সে ঐ চক্রের হাতে তুলে দিতে পারল কি করে? আবার ওখানেই ফিরে যেতে চাইছে। গিয়ে ঐসব কাজই তো করবে। একটা গোলমেলে লোক জগবন্ধু। তবু সে ওকে কিছুতেই ওখানে যেতে দেবে না, কিছুতেই না। যদিও জগবন্ধুর জায়গায় অন্য লোক বহাল হবে ওদের মহল্লায় এবং তরতর করে অসহায় মেয়েদের নিয়ে বাণিজ্য করার ব্যবসাটা চলতেই থাকবে।
এই ঘোর সন্ধ্যায় গাছের ঘন শাখাপত্রের ভেতর একটা বাদুড় ডানা ঝাপটে উড়ে গেল প্রতীকায়িত অলৌকিকের মত। যদি সে ভাবে এইটি পারুলের প্রেতাত্মা! তার মনের কথা বুঝতে পেরে এই গাছে এসে বসেছে তাহলে? তাকে বলে গেল কি, তুমি ভাবো আমাকে নিয়ে ভাবো। কেমন গা ছমছম করে উঠল না?
-কেমন আছেন? আকাশ পাতাল ভাবছেন?
পারিজাত আমূল চমকে ওঠে। পারুল কি? সন্ধ্যার আবছা আলোর ভেতর মেয়েটি অস্পষ্ট হাসে। বলে – এমনভাবে দেখছেন কেন? আমি কোনও অশরীরী নই। জলজ্যান্ত মানুষ। চিনতে পারেন নি, তাই না? সেই যে রেস্তরাঁতে.. মনে পড়ে?
মেয়েটি তার পাশে বসল।
-মনে পড়েছে। খুব কাঠ কাঠ কথা বলছিলেন সেদিন। আর কোনদিন আপনার সাথে দেখা হবে আর আপনি যেচে এসে বলবেন কেমন আছেন তা ভাবি নি। তাই আপনাকে ভুলে গেছি।  মনে করিয়ে দিলেন তাই মনে পড়ল। তা আপনি তো দেখছি আমাকে ভুলেন নি।
– দেখলাম গাছের দিকে তাকিয়ে আবোল তাবোল ভাবছেন সেজন্যে মনে পড়ে গেল এই আর কি। তা গাছ থেকে কি উড়ে গেল?
-আপনিও দেখলেন? অলৌকিক। প্রতীকায়িত।
-বাদুড়?
-দেখেছেন?
-ঠিকঠাক বুঝলাম না। তবে বাদুড়ই হয় সাধারণত।
কোনও মৃত মানুষের কথা ভাবছিলেন?
-হ্যাঁ ।পারুল।
-পারুল কে?
-যৌনদাসীত্বের জন্যে গ্রাম থেকে তুলে এনে বিক্রি করে দেওয়া একটি মেয়ে – নাম পারুল। একজনকে বিশ্বাস করেছিল। পরবর্তীতে এই মিথ্যাচার সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে।
-তো সে এই বাদুড়ে রূপান্তর পেয়েছে?
-হতেও তো পারে।
-আপনি কি আমাকে প্রথমে পারুল ভেবেছিলেন?
-এই যে আবছা আলো তার ভেতর থেকে আপনি কেমন যেন ফুটে উঠলেন.. এর ঠিক আগে ডানা ঝটপট করে বাদুড়টি উড়ে গেল। আমি জগবন্ধু ও পারুলের কথা ভাবছি তারপর এই গাছের শাখাপত্র ভেদ করে বাদুড়টি উড়ে গেল। তারপরই আপনি… কেমন আছেন ইত্যাদি। আপনাকে এই পরিস্থিতিতে পারুল মনে হতেই পারে।
-জগবন্ধু কে?
-যাকে বিশ্বাস করে ভালবেসে গাঁয়ের মেয়ে পারুল বিক্রি হয়ে গেল।
-আপনি এতসব কি করে জানেন?
-জগবন্ধু বলেছে।
-জগবন্ধুকে কোথায় পেলেন?
-সে এখন আমার বাড়িতে আছে।
-সে কে?
-আগে জুহির বাড়িতে ছিল।
-জুহি কে?
-আমার প্রাক্তন।
-ওরে বাবা আপনারও প্রাক্তন আছে।
-কেন থাকতে পারে না?
-তা পারে।
-আরও জেরা করবেন?
-নাহ্! আমার প্রাক্তনও নেই বর্তমানও নেই।
-আপনাকে আমি তো কিছু জিজ্ঞেস করি নি।
-না করেননি। কেন করেননি?
-ধুর আপনার ওসব জেনে আমার কি হবে?
-আগ্রহ নেই?
-থাকলেই বা কি?
-থাকলে জিজ্ঞেস করুন।
-আপনি আমার সাথে মহল্লায় যাবেন?
-কিসের মহল্লা?
-ঐ জায়গাটাকে জগবন্ধু মহল্লা বলে থাকে। মানে যেখানে থেকে মেয়েরা পতিতাবৃত্তি করে।
-ওটা ওদের পেশা। বাঁচবার একটা উপায়। ওখানে কেন যাবেন? লেখালেখি করেন?
-নাহ্। লেখালেখির সঙ্গে ওখানে যাওয়ার কি সম্পর্ক?
-না মানে মেটিরিয়ালস চাই তো? মনে করুন আপনি একটি উপন্যাস বা গল্প লিখবেন বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলে সেটি অনেক জীবনমুখী হবে। এধরণের ভাবনা থেকে লেখকরা ছদ্মবেশে কিংবা নিজবেশে ওখানে যায়। আপনি কেন যেতে চাইছেন?
-ঐ জীবনটাকে জানতে চাইছি।
-তাহলে আমাকেই জানুন না।
-মানে?
-আপনাদের ভাষায় আমিও একজন পতিতা। তবে ভদ্রতার ছদ্মবেশে করি। বাইরে থেকে কেউ বুঝতে পারবে না।
বলতে পারেন কলগার্ল।
লাফিয়ে দাঁড়িয়ে যায় পারিজাত। প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে – না। একদম নয়। এটা হতে পারে না।

(ক্রমশ)