বিভাগ-গল্প। #শিরোনাম-এখানে শিউলি ঝরেনা। # কলমে-ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

বিভাগ-গল্প।
#শিরোনাম-এখানে শিউলি ঝরেনা।
# কলমে-ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

-“এখানে আশ্বিনের সোনা রোদের গান শুরু হয় বিউগল আর প্যারেড দিয়ে।এবার দুর্গাপুজোয় বাড়ি যেতে পারবোনা। সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরার কাজে সদা সতর্ক থাকতে হয় আমাদের।ভারতমাতার পুজারি আমরা।আমাদের পরনের এই জলপাই রঙের জংলা ছাপের পোষাক‌ই মাতৃ আরাধনার পুরোহিতের পট্টবস্ত্র।পশু বলিদানে আমরা বিশ্বাসী ন‌ই।কিন্তু বিপন্ন দেশমাতৃকার রক্ষা কল্পে প্রতিটি সেনার আত্মোৎসর্গ তো করাই থাকে। আর হানাদারদের রক্তে সীমান্ত ধুয়ে দিতে আমরা পিছুপা হ‌ইনা গৌরি।তোমরা সবাই পুজোয় খুব আনন্দ করো।”- টপাটপ টাইপ করে শৌনক পোষ্ট করে দেয় গৌরিকে। তারপর অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে মোবাইল দিকে। স্ক্রিনে ফুটে উঠছে”গৌরি ইজ্ টাইপিং “।এখন কোন সৈন্যের স্ত্রীকে প্রতীক্ষায় বসেথাকতে হয় না স্বামীর চিঠির জন্য, মাকে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না ডাকপিওনের অপেক্ষায়। গৌরির মেসেজ ঢোকে-” আমরা ঠিক‌ই আছি। বর্ডারে তো প্রচন্ড ঠাণ্ডা।মা খুব চিন্তা করেন তোমার জন্য। বাবা তো কর্ণেল ছিলেন। বললেন-“বৌমা,আমরা নিয়মিত শরীরচর্চা, শৃঙ্খলা অনুশীলন করেছি।তোমার শাশুড়িমাকে বোঝাও ঐ সব সস্তা সেন্টিমেন্ট একটা মিলিটারি ফ্যামিলিকে মানায় না।”- -“শৌনক,মিলিটারি মানে কী অনুভূতিহীন?এবার পুজোয় তুমি আসবেনা;আমি কতো প্ল্যান করেছিলাম,পাড়ার ক্লাব থেকে শুরু করে সব ঠাকুর দেখতে যাব।বাবা বলেছেন আমার মা-বাবাকেও ডেকে নেবেন।সবাই মিলে আনন্দ করবো।সব ভেস্তে গেলো।”-

গৌরির ফোন বেজে ওঠে, -“গৌরি,এতো টাইপ করতে পারছিনা।শোনো আমার প্ল্যান।সারাদিন ব্যাস্ত থেকো। দুস্থ বাচ্চাদের জন্য পোষাক ও খাবার বিতরণ কোরো।”- গৌরি বলে -“সব প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। শুধু তুমি থাকবেনা, সে শূন্যতা কে ভরাবে?”- -“কিচ্ছু শূন্য হয়না গৌরি।বাবার মতো আমিও বলছি,নেভার বি সেন্টিমেন্টাল। বাস্তব চরম কঠিন। আমার একমাত্র সেন্টিমেন্ট আমার দেশ। সম্মান আমার মা-বাবা।আর ভালোবাসা? আমি মিলিটারি ম্যান।সততার সঙ্গে বলছি, ভালোবাসি একমাত্র আমার গৌরিকে। মিস করবো তোমাকে মেমসাহেব।”- গৌরির ভিজে গলা শোনে শৌনক -“কবে আবার কথা হবে?”- -“ফোনে কথা হবে।প্রতি রাত বারোটা থেকে সকাল ছটা।এটাই আমাদের প্ল্যানিং। যদিও এইভাবে কথা বলার জন্য স্পেশাল পারমিশন নিতে হয়। আমি চেষ্টা করছি, কেমন?”- ছোট্ট একটা মিষ্টি চুমুর শব্দ ভেসে আসে। গৌরিও একটা চুমু দিয়ে চোখের জল মুছে মোবাইলটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

পত্রসাহিত্য / কলমে – গীতশ্রী সিনহা

পত্রসাহিত্য / কলমে – গীতশ্রী সিনহা

অতিক্ষা
সময় ঘেঁটে দেখতে গিয়ে দেখি বেশ কিছু অতীত গরুর গাড়ির চাকার মতো গড়িয়ে গ্যাছে… ছিঁড়ে -চুষে তছনছ… মিহি কাচে জ্যোৎস্না ফুঁড়ে শুকনো পাতার শব্দে নি:সঙ্গতা রঙ্গতামাশায় ব্যস্ত ! বসন্ত মাখানো পলাশ ছুঁইনি কতোদিন, তুই – আমি ! বিশ্বের সকল ঋতু-ই ছিল আমাদের বসন্ত! ২৩ – এর বসন্তে তোকে আবার মনে করছি রে অতিক্ষা। হঠাৎ ওঠা ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে তোর নামে কিছু লিখে পাঠিয়েছিলাম সে-ই পাঁচ সালের… বসন্তে-ই হয়তোবা ! দূরবর্তী নৌকার পালে আটকে থাকা চিঠি আজও আঙুলে ছোঁয়ানো থুতনির মতো বিভ্রান্ত!
বয়সের তুলনায় আমি একটু বেশি পাকা ছিলাম, পাড়ার স্কুলে তুই -আমি হাত ধরে ভর্তি হতে যাই, ক্লাশ থ্রি -তে নিজেরাই। স্বভাব অনুযায়ী তোর নাম রাখলাম অতিক্ষা, আমি অক্ষরা ! ট্যাপট্যাপ করে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে ছিলি বড়দিদিমণির অফিস ঘরে। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই ! আমাদের নামের মানে জিজ্ঞেস করলেন বড়দি, আমি তো প্রস্তুতি নিয়েই গেছিলাম !
বললাম, ” বড়দি, ওর তো পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে তাই ওর নাম অতিক্ষা ! ” হাই পাওয়ারের চশমা কপালে তুলে গোল্লা গোল্লা চোখে তাকিয়ে থাকেন নির্বাক দৃষ্টিতে ! সে-ই অবসরে এবার আমাকে নিয়ে পড়লাম, বললাম — ” বড়দি পড়তে খুব ভালোবাসি… তা-ই তো দেবী সরস্বতীর নাম আমার নাম ! ”
ব্যাস, হয়ে গেলাম ভর্তি, শুধু অভিভাবক এর সই। তাও হয়ে গেল !
মনে আছে রে অতিক্ষা, বইয়ের ভাঁজে আমরা ক্লাশ চলাকালীন চিঠি চালাচালি করতাম —– মনের কথা বানান ভুলে লেখা ! কাটাকুটিতে বেশির ভাগ লেখাই উদ্ধার করতে পারতাম না ! সেটাও ছিল ভারী মজার ! টিফিন পিরিয়ডে খিলখিলিয়ে হাসি—- বেশিরভাগ টিফিনের রুটি-গুড় মাটিতে তখন গড়াগড়ি।
সারসের মতো গলা বাড়িয়ে দিন এগিয়ে চলছিল বেশ। মৌমাছির খুপরিতে ঠিল পড়ে তুই – আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম ! উড়ে যাওয়ার স্বাধীনতা পাইনি, মধু তো অনেক পরের কথা! লুট হয়ে গেল গোছানো সময়। বড় হওয়ার উদগ্র খিদে সময়কে আমূল-পরিবর্তন করে দিলো।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, কলমকে এখন বন্ধুকের হাতছানি মনে করি।
অতিক্ষা, আজ অনলাইন ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ — সব যেন মায়ার চাদর ! চিনি না, জানি না — অথচ বন্ধু ! দেখাও হয়তো হবে না কোনো দিন ! তাও তারা কেমন যেন মায়ায় লেপ্টে থাকা আপনজন ! ৫ সালেও যদি ওয়েবসাইট থাকতো, আমি তোকে হারাতাম না রে! ওয়েব পেজের কোথাওবা ধোঁয়ার মতো তুই ভেসে থাকতি ! তা-ই আগের লেখার চিঠিটা একটু এক্সটেনশন করে ছেড়ে দিলাম ” পত্রসাহিত্য ” হিসেবে। এটাই হয়তো আমাদের ডেসটিনেশন ! ফিরে পেতে চাই soul mate – কে। জমে থাকা ধ্বনি -তাল-লয় প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে অগোছালো বেখেয়ালি সময়ের ধাক্কায়… আর একটা নতুন জীবন চাই শুধু তোর জন্য।
আশায় অপেক্ষায় থাকলাম রে অতিক্ষা।

তোর ছোট্টবেলার সাথী
অক্ষরা।
—————————-

কবিতা : *মিলাবে মিলিবে* 🖊 নীহার কান্তি মন্ডল

কবিতা : *মিলাবে মিলিবে*
🖊 নীহার কান্তি মন্ডল

“দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে”
বিশ্বকবির এ চিরন্তন বাণী
কখন কিভাবে — না জানি
তারই উত্তরসূরির
এ যুগের হাজার কবির
অভীষ্ট লক্ষ্য হয়ে দেখা দেবে
হয়তো কবি নিজেও দেখেন নি ভেবে।

একটা সময়ে
কবিরা ছিলেন সাধারণের চেয়ে
একটু হলেও আলাদা।
তখন পাঠক ছিল অগন্য
তুলনায় কবির সংখ্যা ছিল নগন্য।

আর এখন –?
আজকের গণমাধ্যমের এই
অপরিমেয় উন্নতির যুগে
কবিও পাঠকের সংখ্যা
সমান সমান প্রায়
হয়তো বা পাঠকই সংখ্যালঘু
কবি-সংখ্যার তুলনায়।
কবি ও কবিতা আজ
ফেসবুকের অপার সহযোগিতায়
অনায়াসে মুঠোফোনের পাতায়।

কবিরাই অন্য কবির কবিতা বেশি পড়েন
কেউ বা না পড়েই বুড়ো আঙ্গুলে
টিপ-ছাপ ইমোজির দস্তখতে
আপন উপস্থিতির চিহ্ন আঁকেন।

কবিতার আঁতুরঘর ছিল এক কালে
স্কুল কলেজের কোনো নির্দিষ্ট দেয়ালে
অলঙ্কৃত দেওয়াল-পত্রিকা
ছিল কবিতার বাঁধানো খাতা
অথবা বার্ষিক ম্যাগাজিন,
আজ পাল্টে গেছে দিন
ফেসবুকে সাহিত্য-চর্চার ফলে
সকলেরই নিজস্ব “ওয়ালে”।
বোর্ডের ‘পরে তুলি কলমের
বালাই নেই অলঙ্করণের
আছে মোবাইলের কী-বোর্ড
যেখানে যথেষ্ট আঙুলের ছোঁয়াই।

হাজার কয়েক সাহিত্য-গ্রুপের
কয়েক শত কবি-সম্মেলন
ঘুরে ফিরে সহস্রাধিক কবির মেলা।
(আমিও তাদেরই একজন)
শুধু পারমুটেশন-কম্বিনেশনের খেলা।
স্বঘোষিত সাহিত্যিকও নয় তো বিরল।
সবই সাহিত্যে উদারীকরণের সুফল।

কবিতা লেখাটাও আজ সোজা
নেই সেই হরেক নিয়মের বোঝা
সহজ হয়েছে দু’চারটে কবিতা লিখে
কবি হিসেবে স্বীকৃতিও পাওয়া
‘কাব্যতীর্থ’ ‘কাব্য-ভারতী’
কিংবা ‘কাব্যশ্রী’ শিরোপা
না লিখেও বিশেষ কোনো কাব্য
সাহিত্য গ্রুপের বদান্যতায়
আজ হয়েছে সহজলভ্য।

“সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে”
আজকের সাহিত্য-বাসরে
— কবির এই অমোঘ বাণী
সাফল্যেরই অন্যতম চাবিকাঠি
সকলে নিয়েছি আমরা মানি’।

#এসে_মেশা_সাগরে:—- #সুজাতা_দাস:—-

#এসে_মেশা_সাগরে:—-
#সুজাতা_দাস:—-

ছুটে চলা পথে নির্নিমেষ অবকাশ,
পাহাড়ের বুক চিরে খরস্রোতা নদী,
যার দিক সে নিজেই ঠিক করে-
আপন খেয়ালে রাস্তা বাছে নিজের মতো সাগরে মেশার তাগিদে।

দিগন্ত বিস্তৃত নীল নীলিমায়,
অসংখ্য তারার ভিড়ে এক উজ্বল তারকা জ্বলতে থাকে সাঁঝ আকাশে-
বহু দূরের নক্ষত্র, ছোঁয়ার অবকাশ নেই শুধুই চেয়ে দেখা!
ইচ্ছেরা উড়তে চায় উপরে আরও উপরে,
যেখানে শুধুই ভালোলাগার ভিড়ে সহস্র নীহারিকার সংসার–
আছে সময়ের নিয়ম মেনে উদিত হওয়া আর অস্ত যাওয়া!
আছে অনন্ত শূন্যতায় নিজেদের মেলে ধরা।

নদীর মতো মনেরও হদিস পাওয়া মুশকিল, ভাসে স্রোতের দিকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে!
মিলতে চায় দুরন্ত সাগরের বুকে—
এই কারণেই ছুটে চলা অনন্তকাল, দিক পাল্টানোর আগে পর্যন্ত—
মনও ছুটে চলে অসীমের দিকে, মেলার অপেক্ষায় দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে—-
কখনও ছুটে চলা বিফলে যায়, কখনও মেশে অনন্ত সাগরের মাঝে যা চেয়েছিল নিজে।

কিছু স্রোত হারিয়ে শীর্ণকায়া হয়ে বাঁচে,
শুধু মাত্র নামটুকু নিয়ে—-
তবুও ভাবে হয়তো আবার আসবে জোয়ার,
তন্বী তরুণীর মতো ছুটে চলবে সে!
মিশবে দুরন্ত সাগরের অনন্ত বুকে, হারাতে অবহেলে!

#নতুন কিছু করি #কলমে : সাহানা

#নতুন কিছু করি
#কলমে : সাহানা

কাচের ঘোরানো দরজাটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে পলি। হাতে টুকিটাকি সামগ্রীর কয়েকটা কাপড়ের ব্যাগ। পুজোর মাত্র কটা দিন বাকি। এর মধ্যেই সবকিছু সেরে ফেলতে হবে। কাজ কি কম!
পরিবারের সব সদস্যদের মনের মত জিনিসপত্র কেনা, ফর্দ মিলিয়ে উপহার দিয়ে আসা, এক মহা ঝক্কি!!
তারপর তো শুরু হবে…
-বুঝলি পলি, এই শাড়িটা ভালো, কিন্তু জমিটা তেমন পোক্ত নয়…কত নিল রে?
-পলিমাসি, আমার জামাটা কিন্তু একেবারে ওল্ড ফ্যাশনড্। চলবে না, বলেই দিচ্ছি। না পড়লে, দোষ দিও না!
-আরে পলি, শুধু সেলের মার্কেট থেকে বাজার করলেই চলবে? একটু স্ট্যান্ডার্ড জায়গায় কেনাকাটা করো বাপু!!

বড়ো জা আবার নির্বিরোধী।
-আহা! ওকে কেন সবাই মিলে…

হাজারটা মতামত! কথা বলে বা প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই।
সংসারের একটিই নিয়ম। ভালো থাকতে চাইলে মুখটি বন্ধ রাখো। নাহলে, পরিস্থিতি যাবে আয়ত্ত্বের বাইরে!!

একমাত্র বাবা এবং মা যতদিন জীবিত ছিলেন আগলেছেন প্রাণ দিয়ে। তারপর…
পলি চুপ করেই থাকে আজকাল।
প্রথম প্রথম মৃদু প্রতিবাদ করত। কখনও গ্রাহ্য হতো কখনও নয়। ধীরে ধীরে জীবনের চলার বাঁকগুলো আরও ভাঙাচোরা আরও তীব্র হতে থাকে…একসময় মনে হয়, পলি পড়েছে জীবন নদীখাতে…
কি দরকার! অহেতুক প্রতিবাদে? সেই তো জীবন বইবে নিজস্ব গতিতেই।
অতএব চুপ থাকাই ভালো!!
একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে আঁচলে টান পড়ে!

-কে রে?
ফিরে তাকিয়েই অবাক!
দুটো ছোট্ট ছোট্ট মুখ, শীর্ণ দেহ, গায়ে প্রায় কিচ্ছু নেই, পরণে শুধু ঢিলে রঙচটা একটা বস্তু, প্যান্ট ছিল কোনো কালে হয়তো!
-এই, তোরা কে রে? কি চাই?
অকারণেই গলাটা গম্ভীর করে তোলে।
ফিকফিক করে হাসছে! দাঁতে ময়লা ছোপ।
-খেতে দাও। দুদিন খাইনি।

এ আবার কি!
বিরক্তি বোধ করে। কিন্তু জোর করে কিছু বলতে পারে না। কেমন যেন মায়ায় মাখানো চোখগুলো। খুদে অথচ জ্বলজ্বলে।
অস্বীকার করা যায় না!
-এই তোরা কে? কোথায় থাকিস?
নিজের প্রশ্নে নিজেই অবাক হয়। কি দরকার ছিল জানবার?
-খেতে দাও।
সেই একই সুর!
পার্স খুলে দুটো দশ টাকার নোট এগিয়ে ধরে।
-এই নে। কিনে নিবি কিছু।

রাস্তার ওপারে ক্লাব। প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে। পুজো আসতে আর মাত্র এক সপ্তাহ। সব কাজ শেষ করার জন্য প্রচুর ব্যস্ততা। বেশ ক’টা দোকানপাট ও খুলেছে ওদিকে।
পলি সেইদিকে আঙুল দিয়ে দেখায়।
-না গো মা, ওদের হাতে টাকা দিওনি। দোকানে গেলেই বলবে, চুরি করেছে।
একটা কর্কশ স্বর ভেসে আসে।
স্বরের অধিকারিণী মানুষটি একদম শীর্ণদেহী। ছেঁড়া খোঁড়া কাপড়চোপড়!
-তুমি কিনে দিও।
-না গো মা, আমাকে তো দেবেই না।
তুমি কিছু দিয়ে যাও গো।
প্যান্ডেলের পাশে এরকম বেশ ক’জন লাইন দিয়ে বসে। আসন্ন পুজো উপলক্ষে দুঃস্থ মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করেছে ক্লাব থেকে। ঘোষণা চলছে।
পলি এক মুহূর্ত ভাবে। দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।
তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে রাস্তা পেরিয়ে ক্লাবে হানা দেয়।
দুজন কর্তা স্থানীয় ব্যক্তি এগিয়ে আসে।
-কি ব্যাপার, ম্যাডাম?
-আপনারা কি দুঃস্থ মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা করেছেন?
-হ্যাঁ। পুজোর দিন পনেরো আগে পরে এবং পুজোর ক’দিন পেটভরে খিচুড়ির আয়োজন করা হয়েছে ক্লাব থেকে।
গদগদ স্বরে এক সদস্যের জবাব। পাঞ্জাবীতে লাগানো দলীয় ব্যাজটির দিকে তাকিয়ে ভ্রু  কোঁচকায় পলি। তকমা!!
-আর জামাকাপড়?
এবার মাথা চুলকোনর পালা।
-না, মানে… ওটা ঠিক…

সময় নষ্ট না করে হাতের ব্যাগ থেকে বেছে দুটো ব্যাগ ধরিয়ে দেয় ওদের।
-এর মধ্যে কিছু শাড়ি আছে। পাড়ায় বিলি করুন। অনেক মহিলাই আব্রুহীন দিনযাপন করে।

সদ্য পিকো করানো তাঁতের শাড়ি আর উপহার দেওয়ার জন্য কেনা ক’টা প্যাকেট নামিয়ে রাখে।

তারপর ওদের হাঁ করা মুখগুলো পেছনে ফেলে গটগট করে বেরিয়ে আসে বাইরের রোদে।
আশ্বিনের শুকনো গুমোট হাওয়া। ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছে রাস্তার জঞ্জাল।
পলি সানগ্লাস নামিয়ে এদিক ওদিক দেখে।
নাহ্! সেই কচি শুকনো মুখগুলো নেই তো!
একটু এগিয়ে সেই মহিলাকে পেয়ে যায়। চট্ করে পাশের দোকান থেকে কয়েকটা রুটি আর মিষ্টি  কিনে তার সামনে দাঁড়ায়।
– এই নাও।
– বেঁচে থাকো দিদিমণি। ভগবান ভালো করবেন গো।
এই পল্টু – মিনি এদিকে আয়, দ্যাখ্ দিদিমণি কত্ত খাবার দিয়েছে।
পলি আর দাঁড়ায় না।
ফিরতে হবে।
রাস্তা পেরিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠার সময় একপলক তাকায় চারপাশে। বেশ হালকা লাগে। উৎসব তো দোরগোড়ায়। প্রাচুর্যের মধ্যে বসবাস করা মানুষজন চারপাশে ভিড় করে! অথচ, আলোর জেল্লাটা সরালেই একদঙ্গল উলঙ্গের মিছিল!
যাক্! একবিন্দু হলেও কিছু তো করতে পেরেছে! অন্তত একবেলার জন্যও! সেই চিরাচরিত সমালোচনা ….আর নয়, এবার নতুন কিছু ভাববে সে।

শিরোনাম — অন্য পুজো। (গল্প) কলমে — দীপ্তি নন্দন।

শিরোনাম — অন্য পুজো। (গল্প)
কলমে — দীপ্তি নন্দন।

হৈমন্তী আজ সকাল থেকেই বারান্দায় বসে আছেন আনমনে। কয়েকদিন অঝোরে বৃষ্টিপাতের পরে আজ একটু রোদ দেখা গেছে। আকাশটাও কিছুটা পরিস্কার আজ। তাই রোদে এসে বসেছেন তিনি। সামনেই পুজো! এখন আর তাঁর কাছে ঐ দিন গুলোকে বিশেষ দিন বলে মনে হয়না । অথচ একটা দিন ছিল যখন ঠাকুর দেখা আর হৈ চৈ খাওয়া দাওয়া নিয়ে সারাক্ষণ আনন্দের জোয়ার বইত সারা বাড়িতে। আজ এই অশীতিপর বয়সে একেবারে নড়বড়ে আর একা হয়ে গেছেন তিনি । “ও বড়মা আর কতক্ষণ রোদে বসে থাকবে গো! এখন তো কড়া রোদ উঠেছে। এবার তো ঘরে চলো। দাঁড়াও আমি হাতটা ধরি আগে, তারপর তুমি উঠবে । ” রতনের জোরদার গলা শোনা যায়। সে পাশের বাড়িতেই থাকে।
হৈমন্তীর নাতির বন্ধু ছিল একসময়ে। তার একমাত্র নাতিটি মোটরবাইক এক্সিডেন্ট করে ,তার এই অসহায় ঠাকুমাকে একেবারে একা আর আরও অসহায় করে দিয়ে চলে গেল যখন, তখন থেকেই তার দেখাশোনার ভার নিয়েছে এই রতন।
একেবারে দুটো পাশাপাশি বাড়ি। মাঝে শুধু একটা পাঁচিলের তফাৎ। তাই খুব ছোট থেকেই রতনের এ বাড়িতে অবাধ গতিবিধি। শুধু সেই নয়, তার বাবা, মাও এ বাড়ির ছেলে আর বৌমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আর সেকারণে একসঙ্গে তারা বাইরে বেড়াতে যেতো প্রায়ই। আর সেভাবেই তারা একই সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শেষ হয়ে যায় কিছু বছর আগে। শুধু রতন আর হৈমন্তীর নাতি রজত দুজন সেবার সঙ্গে যায়নি ওদের পরীক্ষা থাকায়। তাই সেবার ওরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। আর তারপর তো রজত ও চলে গেলে, তিনি একেবারে একা হয়ে গেছেন। এখন এই অশক্ত শরীরে তাঁর একটাই আকাঙ্ক্ষা, তাড়াতাড়ি ওপরে যাবার। এখন আর তাই পুজোর উৎসবের দিনগুলো কোনো নতুন আনন্দ এনে দেয় না তাঁর মনে।
রতনের হাত ধরে ঘরে এসে বসে হাঁফাতে থাকেন তিনি। এতটুকু পরিশ্রমের ক্ষমতা নেই আর তাঁর। ” বলি বড়মা, আজ তুমি কি খাবে বলত! তৈরি করে ফেলি চটপট।” বলেই রতন হাসতে থাকে। আসলে সে জানে, একা থাকলেই এই ঠাকুমাটি শুধু পুরোনো কথা ভেবে কষ্ট পায়। তাই সে হাসি মজা দিয়ে আবহাওয়াটা একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। রতন তার এই ঠাকুমাটিকে সমস্ত শক্তি দিয়ে আগলে রাখতে চায়, ছোট থেকে সে এঁর কাছ থেকে অনেক স্নেহ পেয়ে আসছে । তার নিজের ঠাকুমাকে তো তার মনেই পড়ে না।” কি রে দাদাভাই চুপ করে কি ভাবছিস বলতো? এই যে কিসব ভালো মন্দ আমাকে রেঁধে খাওয়াবি বলছিলিস, তার কি হলো? ” বলেই জোর করে দুলে দুলে হাসতে থাকেন তিনি। আসলে এই দুটি অসমবয়সী দুখী মানুষ পরস্পরের কষ্টের কথা জানে ভালো করে। তাই তারা চেষ্টা করে একে অপরকে এই সব অবাস্তব কথা বলে একটু আনন্দ দিতে! তা নাহলে কেউই কোনো ভালো খাওয়ার কথা কিংবা কোনো আনন্দ করার কথা স্বপ্নেও ভাবে না ! পুজোর দিনগুলোও এই মানুষ দুটির মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। ৪১৬.

দুর্গা বাজুক ***** মধুমিতা ধর

দুর্গা বাজুক

✍️মধুমিতা ধর

ঘুরতে ঘুরতে মেঘ আকাশের পথ
কখন যেন বৃষ্টি হয়ে নামে
ঐ বনপথ ,পাহাড়,সমুদ্দুর
সব পেরিয়ে পায়ের কাছে থামে।

শরৎ বেলার,শিউলি ঝরা মনে
হঠাৎ উঁকি দিয়েছে কাশবন
জড়িয়ে ‘ধরে সম্পর্কের মত
রক্ত রঙে ভেসেছে রঙ্গন।

সব একা আজ মিলনে মশগুল
হুল্লোড় খুঁজে,দিগ দিগন্তে ছোটে
এমন দিনে যেন সবার কানে
ঢ্যাম কুড়াকুড় দুর্গা বেজে ওঠে।

 

এ কেমন তর স্বপ্ন! ***** উত্তম কুমার দাস

এ কেমন তর স্বপ্ন!

উত্তম কুমার দাস

জ্বর জ্বর …শরীর পুড়ে যাচ্ছে
মন… মন থেকে মস্তিষ্ক একটা গভীর ঘোর
পাক খাচ্ছে… চারিদিকে জ্বর শুধু জ্বর

হোসেনের পোলা ডা চাইয়্যা ছিল… তিন দিন উপবাসের পর,

রহিমাবেটির বিয়া হল গরিব বলে হোসেনেরে দাওয়াত দেয় নাই… দুর্গাপূজা আহে

আমি হারিয়ে যাচ্ছি
গভীর থেকে গভীরতায়
ঈশ্বর নিরাকার… হে আল্লাহ

তবু দেবী ঘুরে বেড়ায় রাস্তায় রাস্তায়, ফুটপাতে ,স্টেশন চত্বরে শোভাবাজার ,সুতানটিতে

আমি ঘোরের মধ্যেও সব দেখতে পাই
হে আল্লাহ … দুর্গা কোথায়
হে আল্লাহ… দুর্গা কে?

উত্তম কুমার দাস

# দিবস কেন যে এলো না # – ৭

# দিবস কেন যে এলো না # – ৭

আজকের দিনটা একটু নিজের মতো করে কাটাবে ভেবেছিল নীলম। সব সময় সব হয় না, যেমনটা চাওয়া যায়। চন্দনার চিন্তাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। তারসঙ্গে ভিড় করে আসছে আরও কত পুরনো স্মৃতিরা। তাকেও জীবনে লাঞ্ছনা গঞ্জনা কম শুনতে হয়নি বাড়িতে বা সমাজের কাছ থেকে। কত অগ্রাহ্য করেছে অহংকারের সঙ্গে। কিন্তু মনের গভীরে কি বিষন্নতা কাজ করত না? তবুও কাউকে বুঝতে দেওয়া মানে হেরে যাওয়া, এই ছিল ওদের দর্শন। দুঃখের মধ্যেও যে ভালো থাকতে হয়, তা শিখিয়ে ছিল ওদের বন্ধু শ্রেয়া, আর চঞ্চলদা। হ্যাঁ, চঞ্চলদাকে কখনই দুঃখ করতে দেখেনি। অথচ দুঃখের সংসারেই যার জন্ম! এতো আনন্দ, এতো উচ্ছ্বাস, কোথা থেকে আসত? এতো অপমান, এতো সামাজিক লাঞ্ছনার পরও?

এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে কখন একটু চুলে চিরুনি বুলিয়ে, শাড়িটা ঠিক করে নিয়ে নীলম বাইরে একটু হাঁটতে বেরোল। কিন্তু চেনা পরিচিত মানুষের সামনে পড়লেই আবার সেই সমস্যার কথা শুনতে হবে। কার স্বামী মদ খেয়ে এসে রাতে বউকে পিটিয়েছে, কার ছেলেকে জাল পেতে ধরার জন্য কার মেয়ে সেজে গুজে ঘুরতে বেড়িয়েছে, কার বউ স্বামী না থাকা কালীন অন্য পুরুষ ঘরে ঢুকিয়েছে – – – উহ্ – – – এসবের সমাধান করতে আর যেন মন চায় না। তবুও করতে হয়। কিছু তো করতেই হয়। সব কি আর ভালো লাগা লাগির উপর নির্ভর করে? কিন্তু আজ নয়। তাই নদীর পাড়ের অপেক্ষাকৃত নির্জন পথ ধরেই নীলম হাঁটতে লাগল। শীত চলে যাচ্ছে।ঝোপঝাড় শুকিয়ে এখানে এখন পায়ে চলার পথ। নাহলে অন্য রাস্তা আছে। কিন্তু চিরকালীন অভ্যাস!

আগাছার মধ্যেও দু’একটা গাছ তো আছেই। শিমুলের ফুলগুলো ফুটে আছে। দু’দিন পর ফলগুলো ফেটে তুলো উড়বে বাতাসে। বিকেলের রোদ ঝলমল করছে। কোকিলের ডাক তো বেশ কয়েক দিন থেকেই শোনা যাচ্ছে। একটা কোকিল এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে জামরুল গাছটার উপর। বেশিক্ষণ একটানা হাঁটতে একটু ক্লান্তি বোধ হয় আজকাল। নীলম বসে পড়ল জামরুল গাছটার নীচে।
(৪)
একদিন সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি এলো। না, সেদিন যেমনটা মজা হওয়ার কথা নীলমরা ভাবত, কারুরই সেই মজা হলো না। কেউ বাড়ি থেকেই বেরিয়ে এলো না। চঞ্চলদা সিঁদুর পরিয়ে নিয়ে এসেছে ঝিলিকদিকে! সঙ্গে সাক্ষী কুসুমদি। চোখে সেদিন জল নয়, যেন আগুন ঝলকে উঠেছিল নীলমের! অবশ্যই নীলমেরই বেশি। তবে তার বান্ধবীদেরও কিছু কম নয়। যদিও ঘটনাটা ঘটবে সবাই জানত, তবুও মেনে নিতে পারল না অনেকেই।

আর ঝিলিকের দাদা বিদ্যুৎ ভট্টাচার্য্য তো রীতিমত আঘাত পেলেন। মাত্র আঠারো বছর বয়স। লেখাপড়ায় চঞ্চল এতো ভালো। নিজেই মায়ের অসম্মতিতে চঞ্চলকে গৃহে আশ্রয় দিয়েছিলেন একটু উঁচু শ্রেণীতে তুলে আনার জন্য। তার বোন ঝিলিকের প্রতি চঞ্চলের ভালোবাসাটা যে মোহ, তিনি জানতেন। তাই সে মোহ কেটে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন। আর যদি টিকে যায় তিনি কথা দিয়েছিলেন চঞ্চলকে, যে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সমাজে পাঁচ জনের সামনে তাদের বিয়ে দেবেন। কিন্তু চঞ্চল এ কী করল! এখনো চাকরি করে না। আর তার স্ত্রী কুসুমই বা কোন বুদ্ধিতে ওকে বিয়ে দিয়ে আনল? স্থির থাকতে না পেরে বিদ্যুৎ ভটচায সেদিন ভীষণ মূর্তি ধারণ করে চঞ্চলকে মারধর শুরু করলেন। জানলার ফাঁক দিয়ে দেখে নীলমের একটু খারাপ লাগছিল। তবে নানান অকাজের জন্য ওরকম মার খেয়ে চঞ্চলদা অভ্যস্ত।

কিন্তু আজ আর চঞ্চল বিদ্যুৎ ভটচাযের শাসন মেনে নিতে পারল না। গায়ের জোরে হাত ছাড়িয়ে দূরে সরে গেল। অন্যদিকে কুসুম তার স্বামীকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল। পাড়ার মহিলারা সকলেই উপভোগ করে সে দৃশ্য দেখতে লাগলো। এরপর সংঘাত বিদ্যুৎ ভট্টাচার্য্যের নিজের বাড়িতে। একদিকে কুসুম আর বিদ্যুতে, অন্যদিকে বিদ্যুতের মা কুসুম ও বিদ্যুৎ দু’জনকেই এরজন্য দায়ি করল। একটা কায়স্থ ঘরের ছেলেকে গৃহে আশ্রয় দিলে এমনই বিশ্বাস ঘাতকতা করে তারা। এখন তার মেয়ে ঝিলিকের কী হবে? সে যে কায়স্থ হয়ে গেল। বাড়িতে মহা শোরগোল, ঝগড়া, মারামারি, কান্নাকাটি চলতে থাকল বিদ্যুৎ ভটচাযের। চঞ্চল আর ঝিলিক বিয়ে করে ঝিলিকের বাড়িতেই উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ তাদের একটু বুঝতে দেওয়ার জন্য বাড়িতে ঢুকতে নিষেধ করলেন। ঝিলিকের হাত ধরে চঞ্চল নিজের বাড়িতেই উঠল। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই। গয়নাগাটি ছাড়া এক কাপড়ে তার সোনার টুকরো ছেলেকে এভাবে মেয়ে গছানোর জন্য প্রচুর চেঁচামেচি, খিস্তি পর্যন্ত চলতে থাকল। এর মধ্যে দিয়েই ঝিলিক চঞ্চলের বিবাহিত জীবনের শুরু।

সে কিন্তু আজ থেকে দীর্ঘ বছর আগের ঘটনা। যে নীলম আজ সত্তর পেরোচ্ছে, তখন সে তেরো বছরের কিশোরী।

এইভাবে সিঁদুর মাথায় চঞ্চলের ঘরে উঠে ঝিলিকের সংসার জীবনের শুরু। চঞ্চলের দিদি ততদিনে লেখাপড়া ছেড়ে অর্থ ও সৌন্দর্যের অভাবে ঘরে বসে। সেযুগে যাকে থুবরি হয়ে বসে থাকা বলত সমাজ। বড়দা উজ্জ্বল আর বাবা শেখর অধিকাংশ সময় মদ খেয়ে বাড়িতে বসে অথবা বাইরের আড্ডায়। সংসার চালাতে ততদিনে চঞ্চলের দিদি প্রিয়া শরীর ব্যবসায়। স্বভাবটা তার অল্প বয়স থেকেই একটু খারাপ ছিল। কারণ অর্থনৈতিক দিক থেকে আর একটু উচ্চ সমাজের ছেলেরাই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। কিন্তু রূপ গুণ কোনো দিক থেকেই সে যোগ্যতা না থাকায় শেষ পর্যন্ত এই বৃত্তিই গ্রহণ করে স্বেচ্ছায়। বিয়ে একটা নিয়ম মাফিক কিছুদিনের জন্য হয়েছিল। কিন্তু সে স্বামীও যদি মদ্যপ হয়ে অন্য নারীদের দোরে দোরে ঘুরে বেড়ায়, তবে লাভ কী সে স্বামীর ঘর করে?

এরকম সম্পূর্ণ এক বিপরীত মেরুর সংসারে এসে যথারীতি ঝিলিকের সংসার জীবন সুখের হলো না। কলেজে ভর্তি না হয়ে চঞ্চল ট্রাক চালকের কাজ নিল। সৌন্দর্যের জন্য শ্বাশুরী ও ননদ ঝিলিককে দেহ ব্যবসায় নামানোর চেষ্টা করল। প্রচুর অশান্তির মধ্যে দিয়ে একটি ছোট্ট খুপরি ঘরে ঝিলিক চঞ্চলের নিজস্ব সংসার হলো। কিন্তু এই দারিদ্র বেশি দিন ঝিলিক সহ্য করতে পারবে কেন? অন্যদিকে সমস্ত পাড়া ততদিনে চঞ্চলকে বয়কট করেছে। তার সঙ্গে পাড়ার ভদ্রস্থ ঘরের ছেলে মেয়েরা আর মেশে না। চঞ্চলেরও আর ভদ্র সমাজে নিজের স্থান করার ইচ্ছা গেল চলে। তার সমাজ গেল দ্রুত বদলে। জন্মই যার এরকম পরিবেশে, স্বভাবতই তাই ছোটবেলা থেকেই তার উগ্রতা একটু বেশি। ফলে চঞ্চলও মদ্যপানে অভ্যস্থ হয়ে গেল খুব দ্রুত। মাঝে মধ্যেই মদ্যপ অবস্থায় পাড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ ভটচাযকে গালিগালাজ করতে থাকে। পাড়ার মানুষ মজা দেখে। তারই মধ্যে সমস্ত সমাজকে চ্যালেঞ্জ দেখিয়ে ঝিলিকের সঙ্গে মাঝে মাঝে হাত ধরাধরি করে পাড়ার মধ্যে ঘুরেও বেড়ায় চঞ্চল।

নাহ্, আর সহ্য হয় না নীলমের। ক্রমশ মনের মধ্যে একটা আক্রোশ জন্ম নিতে থাকে। কিন্তু কার উপর এই আক্রোশ! ছোটবেলার সেই মিষ্টি ঝিলিকদিই এখন যেন দুটো চোখে জ্বালা ধরায় নীলমের। যদিও নীলমের বান্ধবীদের ততদিনে চঞ্চলের প্রতি আকর্ষণ উবে গেছে। সচেতনে, অথবা নিজের অজান্তেই ঝিলিক আর চঞ্চলের সম্পর্কের ফাঁক খোঁজে নীলমের মন। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীলম ভাবে – – – কে বেশি সুন্দরী? না ঝিলিকদির গায়ের ফর্সা দুধে আলতা রঙ, আর নিজের চাপা গায়ের রঙের তফাত যেন অনেক। সবে শরীর গড়ে উঠছে কিশোরীর। সহ্য হয় না এই তফাত। মনে বার বার প্রশ্ন জাগে, ওই সৌন্দর্য ছাড়া আর কী যোগ্যতা আছে ঝিলিকদির? পারছে কি ঠিক মতো সংসার করতে? এক জটিল বয়ঃসন্ধি কালীন সমস্যার মধ্যে তখন নীলম। কিন্তু কেই বা তার খোঁজ রাখে, সে যে কখন বড় হয়ে উঠেছে? ছোট খাটো রোগা পাতলা চেহারার মধ্যে একটু শারীরিক পরিবর্তনে একটা জৌলুস দেখা দিয়েছে সবে।
(৫)
এদিকে চন্দনার ফ্যাকাসে মুখের দিকে চোখ পড়ছে ক্রমশ সকলের। মুখের হাসি কোথায় হারিয়ে গেছে! বয়সের জৌলুস হারাচ্ছে শরীর। নীলমের বাড়িতে এসে নিয়মিত দেখিয়ে যায়। এখনো প্রতিবেশীরা কিছু টের পায়নি। তবে আর কিছু টের না পাক, তপনের সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়নি বলেই যে মেয়েটা ক্রমশ ভেঙে পড়ছে মনে মনে, তা সবাই বোঝে। ফলে চন্দনার মাকে সকলে পরামর্শ দেয় মেয়েকে পাত্রস্থ করার।
(ক্রমশ)

মিরুজিন আলো (পর্ব সতেরো) ***** বিজয়া দেব

মিরুজিন আলো
(পর্ব সতেরো)

বিজয়া দেব

দেবাংশী ফোনটা রেখে জুহির ঘরের দিকে গেল। জুহিকে জানাতে হবে জগবন্ধু পারিজাতের বাড়ি গিয়ে উঠেছে। জুহির ঘরের দরজাটা ভেজানো। তবু নক করল দেবাংশী।মেয়ের ঘরে তার অবাধ প্রবেশাধিকার নেই। ঠিক কবে থেকে এভাবে চলছে মনে পরে না। বেশ কয়েকবার আলতো হাতে ঠক ঠক করার পর যখন দরজা খুলল না তখন দরজায় কান পাতল দেবাংশী। নাহ কোনও সাড়াশব্দ নেই। এবার দরজাটা খুলল দেবাংশী। ঘরে কেউ নেই। বেশ কয়েকবার ডেকেও সাড়া পাওয়া গেল না। জুহি না বলে চলে গেল! এখন শনি রবি দুদিন ছুটি। বিদেশিদের উইকেন্ড কনসেপ্ট এখানেও এসেছে। বাড়িতে নয় বাইরে গিয়ে খাওয়াদাওয়া, ঘোরাফেরা, ছুটির আমেজ কেড়ে নেওয়ার জন্যে হই হই করার অভ্যেসটা চালু হয়েছে খুব। তাদের সময়ে ছুটির দিনে বাড়িতে মাংস রান্না হত। টিভিতে সিনেমা দেখা বাড়ির সবাই বসে একসাথে খাওয়াদাওয়া গল্পগুজব এসবই হত। এখন পরিবার কি আর পরিবার আছে? কেমন যেন ছিন্নভিন্ন টুকরোটাকরা, পরিবারের সম্পর্কগুলো ছিন্ন সুতোর সাথে সংযোগে রয়ে গেছে কোনোক্রমে , যে কোনও মুহূর্তে পুরো ছিন্ন হয়ে যাবার মতোই ব্যাপার। ঘরটা আবার খুব গুছিয়ে রেখেছে জুহি। এইটা খুব ভাল যাই হোক। ওর ঘরে দেবাংশীর ঢোকাটা একদম পছন্দ করে না জুহি। ওর দেহের ভাষায় তা বুঝিয়ে দেয়। পড়ার টেবিল চমৎকার করে গুছিয়ে রেখেছে। টেবিলের ওপর দেয়ালে একটাই ছবি , একটি গাছ ও একলা এক কাক.. ধূসর নীলাভ ক্যানভাসে আঁকা। কার আঁকা? তার চোখে পড়েনি তো আগে!ছবিটা কি পারিজাতের আঁকা? কে জানে! পারিজাত আগে এ বাড়িতে আসতো এখন আর আসে না। জুহির সাথে সম্পর্কটা আর বেঁচে নেই। ওদের ভাষায় ব্রেক আপ।
ঘর থেকে বেরিয়ে আগের মতোই দরজাটা ভেজিয়ে দিল দেবাংশী। তারপর ভাবল ঘরে থেকে কীই বা করবে! আজ একা একাই উইকেন্ড উদযাপন করা যাক। ঘরদোর একটু গোছগাছ করে বেরিয়ে পরল সে।
আজ খুব ঘরোয়া রান্না খেতে ইচ্ছে করছে। তাদের বাড়িতে রবিবার দিন কত কি রান্না করতো মা। বাবা বাজার করে আনত। খেতে খেতে একটু দেরি। বিকেলে মা-র সঙ্গে একটু ঘুরে আসা। বাবার সেই চৌমাথার মোড়ে বড় ওষুধের দোকানের একপাশে বসে জমানো আড্ডা। ওষুধের দোকানটাতে আড্ডার জন্যে একটা পরিসর ছিল। বাবার ফিরতে ফিরতে দেরি হত। মা রাগারাগি করত। তাছাড়া অনেক রবিবার বিকেলে সাদাকালো টিভিতে সিনেমা। পাশের বাড়ির কাবেরীরা সিনেমা দেখতে আসত। ওদের তখনও টিভি কেনা হয়নি। এসব মনে হলে মনটা এমন ধূ ধূ করে।
-ম্যাম কি নেবেন?
চকিত হয়ে ওঠে দেবাংশী। সে তো রেস্তোরায় বসে। একটা টেবিল নিয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবছে। অতীতটা কখন যেন দেহ থেকে খসে পড়ল।
মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে বসে দেবাংশী। কি খাবে এবার?
-মা?
চকিতে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে জগবন্ধু।
-তুমি এখানে?
জগবন্ধু হাত তুলে ইঙ্গিতে দেখায়। পাশের টেবিলে পারিজাত ও আরেকটি তরুণী।
-তুমি না বলে চলে এলে জগবন্ধু?
-বললে কি আর আসতে দিতেন মা? এখানেও থাকব না। এই মেয়েটি আমাকে এখানে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কী সব পড়াশোনা করবে। ঐ আমার মহল্লার খবর নিচ্ছে।
দেবাংশী দেখল বেশ ঝকঝকে তরুণীটি। পারিজাত উঠে আসছে এদিকেই।
-কেমন আছ মা?
কান জুড়িয়ে গেল দেবাংশীর। কতদিন কেউ মা বলে ডাকেনি। জুহি তো কোন সম্বোধন করে না।
-এই চালিয়ে যাচ্ছি বাবা। তুমি তো আজকাল আর আসো না।
-জুহি পছন্দ করে না তাই আসি না।
দেবাংশী দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। বলল- তাহলে মা বলে ডেকেছিলে কেন? মাকে দেখার ইচ্ছে করে না?
পারিজাত ভাবে আত্মসম্মান বড় বালাই মা। ও গায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
জগবন্ধুও তাকে মা ডেকেছিল। দেবাংশী ভাবে।
অচেনা মেয়েটি এদিকে আসছে। অপরিচিতা কিন্তু যেন বড্ড চেনা। কাছে এসে একটু হাসল। বলল- আমরা সবাই এক টেবিলে বসতে পারি?
সবাই এখন দেবাংশীর টেবিলে। অপরিচিতা বলল-আমি দীপশিখা। আমিও যদি আপনাকে মা বলি?
দেবাংশী মৃদু হেসে বলল- ডেকো। খুশি হবো।
দেবাংশী ভাবছে, এখানে এই টেবিলে যদি জুহি থাকত তাহলে সে-ই শুধু তাকে মা ডাকত না।
পারিজাত বলে – তুমি আজ একা? জুহি কোথায়?
দেবাংশী হেসে বলে – কখনও আমার সাথে তাকে দেখেছ পারিজাত? দুজনের পথ আলাদা যে! তোমার সাথেও তার পথচলা হল না।
দীপশিখা তাকে দেখছে। দেবাংশী বলল- খুব চেনা লাগছে। কোথাও দেখেছি কি তোমায় ?
(ক্রমশ)

জর্জ বিশ্বাস ও নিঃসঙ্গ চিমনি ********* শান্তময় গোস্বামী

জর্জ বিশ্বাস ও নিঃসঙ্গ চিমনি

শান্তময় গোস্বামী

বন্ধ কারখানা শহরে এখনো একটা চিমনি নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে।
অঝোর বৃষ্টিতেও এ শহরের পৃথিবী আজ শুকনো।
ঘরগুলোর দরজা, জানালা এখনো খোলা।
মানুষ থাকে না এখানে। শরীর থেকে ইট, কাঠ, লোহা
উপড়ে খুলে নেওয়ার আর্তনাদ প্রতিধ্বনিতে থাকে।
দুর্ভেদ্য আগাছা সবুজে সেজেছে রক্ষাকবচ।

এখানে কেউ যেন কখনো ভেজে নি, কেউ কখনো ভেজে না।
এ শহরে তবু এখনো কিছু ছাদখোলা-ফাঁক দিয়ে চেয়ে থাকে আকাশ।
সেই আকাশ থেকে ঝরে পড়ে শেকড় চোয়ানো বৃষ্টি!
হু হু জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় কিছু হাসি। কথা-গরম প্রতিশ্রুতি …
কিছু ব্যথা। কিছু ইস্তাহার। পাশের শহরেই রোজ বৃষ্টিপাত।
মানুষ- ভেজানো বৃষ্টি।
আহা, সবাই যদি আজ এমন বৃষ্টিতে ভিজতাম।

সজীব খরিশের ফেলে যাওয়া খোলস, শ্যাওলা সাজানো
নিরাভরণ ক’টি কুকুর করোটি, প্রচুর অভিশম্পাত শুধু
জেগে থাকে নিয়ত প্রহরায়।
আশা নিরাশার দ্যোতনায় আকাশের দিকে ঠায় চেয়ে থাকে
অজস্র সুগভীর অ্যাসফাল্ট-ক্ষত পথ।
নবীন খুড়োর ভাঙ্গা চায়ের দোকানে
আপনমনেই জর্জ বিশ্বাস গেয়ে চলেন …

“মহারাজ, একি সাজে এলে হৃদয়পুরমাঝে!
চরণতলে কোটি শশী সূর্য মরে লাজে ॥
গর্ব সব টুটিয়া মূর্ছি পড়ে লুটিয়া,
সকল মম দেহ মন বীণাসম বাজে ॥”

শ্রীরাধিকা জাগো —– গীতালি—–

শ্রীরাধিকা জাগো

—– গীতালি—–

ঐ যে দূরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি… রুক্ষ চুলগুলো উড়ছে, কবরী থেকে খসে গেছে ফুলের মালাটি, আনমনা…. বারবার দীর্ঘনিশ্বাসে শরীর তার কেঁপে  উঠছে। কোনদিকে তার দৃষ্টি? পথের ধারে তমাল গাছটির গায়ে মৃণাল হাত দুখানি রেখে কী খুঁজে বেড়াচ্ছে সে? পৃথিবীর অন‍‍্য কোনো দিকে তার দৃষ্টি নেই… একনিষ্ঠ নজরে কাকে সে বন্দী করে রাখতে চায়? প্রাণের গোপনে যে তারে তার সুললিত ছন্দ ছিল, সেই তারে যে এক ভঙ্গুর কাঁপন দেখা যায়।

রাজার দুলালী হয়ে যে গোপবালকের সঙ্গে তার প্রাণের লেনাদেনা, সেই কস্তুরীগন্ধ সমন্বিত পুরুষটির অপসৃয়মান শরীরটির দিকেই আজ তার বিভ্রান্ত দৃষ্টি। কিছুক্ষণ আগেই সেই প্রাণপ্রিয় প্রেমিকটি যে চিরদিনের মত নিজের নারীটিকে ছেড়ে চলে গেছে কর্তব্যের হাত ধরে। ওই ধূলি ধূসরিত পথের প্রান্তে অশ্রুমতী নারীটি তার জীবনের সব সম্বল হারিয়ে রিক্ত নিঃস্ব হয়ে প্রস্তর মূর্তির মত নিথর হয়ে রয়েছে। শ‍্যামপ্রিয়া শ্রীরাধিকার এই দীর্ণ রূপটি কী সেই শ‍্যামকান্তি বংশিবাদকের চোখে পড়ল না? রাজকর্তব‍্য তাকে এতোই নিষ্ঠুর করে দিতে পারল? যে প্রিয়া সমাজ সংসার ভুলে বারবার শত অপমান সহ‍্য করেও মোহনবাঁশির সুরের আকর্ষণে ছুটে ছুটে প্রেমের কাছে ধরা দিয়েছে  তাকে কেমন করে ভুলে গেল সেই  প্রেমিকপুরুষটি। নারীর অনুরাগ  উপেক্ষা করে, যৌবনের সংরাগ অবহেলা করে নূতন পথের আকর্ষণে এমন করে চলে যেতে হয়?  এ কী সঠিক বিচার?

রাধা, তোমার চোখের অশ্রু তুমি এবার মুছে ফেলো। আগুনপাখি বাসা বাঁধুক তোমার মনে। যে প্রিয় তোমার জীবনকে উপেক্ষিত অবহেলায় ভরে দিল, তার জন‍্য তোমার দুচোখে শ্রাবণ নামিও না। তুমি  তো জানো, এর পর থেকে কৃষ্ণের জীবনে  তুমি ব্রাত‍্য। কারণ তাকে তো মহাভারতের মহানায়ক হতেই হবে! ধর্মের জয়পতাকা তাকে তুলতেই হবে! শুধু কৃষ্ণের জীবনে তো না, বিশ্ব সংসারে তুমি ব্রাত‍্য হয়েই থাকবে। আর কোনো বৈষ্ণব কবি তাদের সুললিত লেখনীতে তোমার জীবন-বেদন আঁকবেন না। অথচ তোমার জীবনের অনেকটা সময়  এখনো বাকি। কেমন করে কাটাবে তুমি তোমার নিঃসঙ্গ জীবন? যে রাধিকার কথা আর কেউ বলবে না, তাকে তো নিজের মুখেই উচ্চারণ করে নিজের কথা জানাতে হবে। তাই আগুনে হৃদয়কে অভিষিক্ত করো রাধিকা। তোমার প্রতি ঘটে যাওয়া এই অবিচারের জন‍্যই তোমাকে জেগে উঠতে হবে, মুখে যথাযথ ভাষা আনো, বিশ্বে ছড়িয়ে দাও তোমার একান্ত অভিমানের জ্বলন্ত আগুন।।

(সম্পূর্ণ কাল্পনিক রম‍্যরচনা)

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় যাত্রা শুরু করল আমারন ব্যাটারি

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় যাত্রা শুরু করল আমারন ব্যাটারি

বালুরঘাটঃ রাজা ব্যাটারি লিমিটেড (এআরবিএল) দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বাজারে ‘আমারন’ ব্যাটারির যাত্রা শুরু করল।শুক্রবার বালুরঘাটের একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে আমারন ব্যাটারির যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিন উপস্থিত ছিলেন আর এম- সাজিত কুমার এন,ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মনোজ কুমার শর্মা,অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার রাম চক্রবর্তী, সার্ভিস হেড অর্নব গাঙ্গুলি সহ আরো অনেকে। এদিন কোম্পানীর তরফে দাবি করা হয়,আমারন রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ছাড়া গ্রাহকদের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারির নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এছাড়া এটি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনবিহীন, সম্পূর্ণ চার্জযুক্ত এবং ফ্যাক্টরিতেই সক্রিয় করা হয় এমন ব্যাটারি। এটি বেস্ট ইন ক্লাস (বিআইসি) ভেন্টস সম্পন্ন যা নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী।আমারন ব্যাটারির গুণগতমান শুধুমাত্র প্রতিশ্রুত নয় বরং নিশ্চিত। নতুন ধরনের প্রযুক্তির সাথে গ্রাহকরা এখন দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। গুন মানসম্পন্ন পণ্যে ক্রেতা, ডিলার ও ব্যবহারকারী সকলেই উপকৃত হবেন।

নববর্ষে তোমার জন্য আমার পত্র, কলমে রাখি চ্যাটার্জি।

প্রিয়তম।
তোমার চিঠি পেলাম। তুমি চিঠি লেখো, না ছবি আঁকার জন্য কলম ধরো তা আমি বুঝতে পারিনা।
আগামী কাল নতুন বছর, ছোট খোকা আমায় একখানা হলুদ রঙের ফুল তোলা কাপড় কিনে দিয়েছে, আমি বললুম ” তোমার বাবার জন্য একখানা চওড়া পাড়ের ধুতি নিয়ে এলে পারতে ? ”
উত্তরে ছোটো খোকা বললে ” মা,,,, আর তো কটামাস,,,, তুমি দেশের বাড়িতে ফিরে গেলে তোমার সাথে পাঠিয়ে দেবো ” । আমার মন তাতেই ভরে গেলো।
আজ ভোরের আলো ফোটার আগে,,, আমি গিয়েছিলাম খোকা দের আবাসনের সামনে ঐ সরু পিচ ফেলা রাস্তাটি ধরে কিছু টা হে৺টে এলুম। জানো,,,,, বহুদিন পর পুরোনো স্মৃতি বহন করে আমি একেবারে হারিয়ে গিয়েছিলুম।।
সেই সবে তখন তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে,,,, ভোর বেলায় তোমার পাওয়া রেল কোয়ার্টার এ একটু দুরে ,,, সেই বকুল ফুলের গাছ থেকে ভোরের আলোয় ফু তুলতাম,,, তুমি বেশি তুলতে না,,, তোমার ছিলো শুধু দুষ্টুমি, কখনো আমার খোপা খুলে দেওয়া কখনও পেছন থেকে জড়িয়ে একটা আলতো চুম্বন। আমার কিন্তু ভালোই লাগতো জানো। ফিরে এসে দৈনন্দিন জীবনে আবার ফিরে আসা। অবাক লাগে আমাদের মধ্যে কোনো বিশেষ ধরনের কোনো চাহিদা পূরণের আকাঙ্খা ছিলোনা। তবে আজ এই মধ্য বয়সে এসে আমি আজও ভুলিনি,,,,,, প্রথম রাতে তোমার আবদার ছিলো একটি,,,,, আমাদের তিনটি সন্তান হবে,, আমি খুব রেগে তোমাকে চিমটি কেটে বলেছিলাম,,,, না,,, একটি।
আমার কথাই শেষ পর্যন্ত তুমি মত প্রকাশ করলে।
এই দেখো লিখতে লিখতে কতো রাত হয়ে গেলো, সারাদিন একটুও চিঠি লিখবার সুযোগ পাই না। দিন যায় রাত যায় কিন্তু জানো তোমার সাথে স্মৃতি আমার সঙ্গ ছাড়ে না। তুমি তো অনেক বই প্রকাশ, পৃথিবীর বিভিন্ন ধরনের ঘটনা লিখে আমার কাছে তো অনেক বড়ো পন্ডিত। বলতো আমার মতো স্মৃতি বহন করে তোমার ও কি আমাকে মনে পড়ে???
যাক এবার আর রোমান্টিকতা নয়। আগামী কাল নববর্ষ। পাশের বাড়ির পুটু যে তোমাকে রোজ ওদের বাগানের,,,, লালদোপাটি, যূ৺ই, সাদা টগর দিয়ে যায়, তুমি কিছু মিষ্টি এবং তার মধ্যে অবশ্যই দেবে গোলাপি রঙের সন্দেশ,,,, পুটুর প্রিয়। ওওওও হ্যাঁ কালকে একটি নতুন জামা গায়ে দেবে। তোমার আসবার অপেক্ষায় রইলাম। তোমার,,,,,
ইতি
আমি।

গীতশ্রী সিনহা । সম্পাদকীয় কলমে।

সম্পাদকীয়

আবার একটা সংখ্যা। চিরাচরিত এক ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহ্যকে সাথে নিয়ে সমবেত ভাবে মেতে উঠছি নিজেদের তাড়নায়। নিজ স্বত্তায়, নিজ গুণে, নিজ বৈশিষ্ট্যে এক শ্রেষ্ঠতম উপহারের ভাবনা চিন্তা শব্দের নিপুণ বন্ধনে নতুন দিগন্তের প্রেক্ষাপটে নজিরবিহীন উপস্থিতি।
রূপময়তা প্রেক্ষাপটে ছায়া ফেলে পরিবর্তন ঘটায়। অভিজ্ঞতার নানা রঙে সংস্কৃতি একটি স্থানে স্থির হয়ে থাকতে পারে না। তা প্রত্যহ পরিবর্তনের দিকে আঙুল তোলে। সেই কারণে একটি ম্যাগাজিন তার কার্যকর উপস্থিতিতে অনিবার্যভাবে সঞ্চারণশীল।
ম্যাগাজিনের জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধ হলে পাঠক সমাজ চিত্র কল্যাণকর হলেও ম্যাগাজিনের মান ক্ষুণ্ণ করে। হয়তো-বা এইভাবে সমৃদ্ধিকে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত করতে পারা যায় না। এই অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করার মাঝে কোনো গৌরব নেই, থাকেও না।
জাতির কথায় আসি, জাতির পূর্বসূরীদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং মূল্যায়নযোগ্য অনুসরণরীতির সব কিছুই যে কল্যাণকর তা কিন্তু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তা হতে পারে অযৌক্তিক, হাস্যকর এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার পরিচয়ও। তাই যে-কোনো নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি তে দিনাজপুর ডেইলি বিনোদন বিভাগীয় লেখা আটকে থাকছে না। জাতির চলমান সংস্কৃতি নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা আমাদের কর্তব্য এবং প্রয়োজন নিত্য নতুন উদ্ভাবনক্রিয়া, জ্ঞান – বিজ্ঞানের চর্চা, শিল্প – সাহিত্যের মধ্যে ঋদ্ধতার পথ অবলম্বন। আর এই অবস্থার মধ্যে দিয়েই জাতির বর্তমান জীবন সমৃদ্ধি ফিরে পেতে পারে। এইভাবেই আগামীতে জাতির অবস্থানও সমৃদ্ধি ও বলিষ্ঠতায় উন্নতি লাভ করতে পারে।
আজ আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির সংকটকাল উপস্থিত। নানাভাবে, নানা ঘটনা – দূর্ঘটনায় পাক খাচ্ছে, হচ্ছে ঘূর্ণিত আবর্তিত।
জীবনের নানা সংগ্রামে লিপ্ত মানবসভ্যতা সংস্কৃতি সাহিত্যের প্রাঙ্গণে যোদ্ধা হয়ে ওঠে যখন সে কোনো ম্যাগাজিনের সম্পাদনার কাজ করার সুযোগ পায়। বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সাহিত্য বেঁচে ছিল, আছে এবং থাকবে।
আজ হয়তো একটু অন্যরকম ভাবে উপস্থিত থাকলাম ! আসলে সব সময় একটা তাড়না কাজ করে চলেছে… গর্বের পথে চলমান একদল সাহিত্য কর্মী হয়ে ওঠার তাড়না।
আবার বলছি, দিনাজপুর ডেইলি বিনোদন বিভাগ আমাদের সকলের সহযোগিতায় এগিয়ে চলেছে, আগামীতেও চলবে ক্রমশ উন্নতির দিকে।
অনেক শুভকামনা শুভেচ্ছা ভালোবাসা অভিনন্দন সকলের জন্য, ফিরে আসছি আগামী সংখ্যায়। নিজেদের মতো করে লেখা জমা দিতে থাকো ।

গীতশ্রী সিনহা । সম্পাদকীয় কলমে।

যা বলা হয়নি ***** গীতশ্রী সিনহা

যা বলা হয়নি

গীতশ্রী সিনহা

অনন্যোপায় কৃষকের মতো মাটি আঁকড়ে আছি
একবার চিত্রকল্পে যদি ভেসে ওঠো তুমি !
তোমায় দিলাম ভালোবাসার নির্জনতা
সম্পূর্ণ আকাশ, মেঘলা দুপুর এবং এলোমেলো লেখা
আমার কোন ছলনা নেই , কূট -কোলাহল, বৈপরীত্য
শহরের দিনরাত পোকাদের উৎসবে তোমার কফিন
বিশ্বাস আর সংশয় নিয়ে টিকে আছে বাঁচার দৃশ্য !
ভালোবাসা দিলে আকাশ ছুঁয়ে পার হয়ে যাবো স্বর্গের সিঁড়ি ,
একটু ভরসা করো , কাছে এসে বলো ” বিশ্বাস করি “।
মুছে যাবে আকাশচুম্বী কথার পাহাড়, হাতের ছোঁয়া ,
তোমার অরণ্যদিনে রয়ে যাবে শুধু বিশ্বাস বোধ, উর্বর জমি।
ফিরে যায়, ফিরে যাবে এই সব দিন আর মৌসুমী হাওয়া,
ঘুম থেকে জেগে উঠি, জেগে ওঠে জ্যোৎস্নায় প্রতিশ্রুত চেতনা।

“ভালোবাসা তোলা থাকুক” ***** পূর্বা ঘোষ

“ভালোবাসা তোলা থাকুক”

পূর্বা ঘোষ

ভালোবাসা তোলা থাকুক
শেষ হিসেবে কম পড়বে যার,
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
একটু ছোঁয়া পেলেই
যার মধ্যে প্রান সঞ্চার হবে
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
ভালোবাসাহীনতা সখ নয়
প্রয়োজন যার
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
মানুষ হয়ে মানুষের জন্য যে থাকে সবসময়
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
জীবনের কালো রঙ ছাড়া আর কোন রঙ দেখেনি যে শিশু
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
যে মেয়েটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে
লুন্ঠিত হয়ে ঘুরে বেড়ায় রাস্তায় রাস্তায়
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
সেই মা যে তার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেবার জন্য
পণ্য করে নিজেকে
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
যে বাবা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিনরাত্রি
সংসারের বোঝা বহন করার তাগিদে
তার জন্য

ভালোবাসা তোলা থাকুক
আমার সব সন্তানরা
ভালোবাসার ছোঁয়ায় নতুন করে বাঁচার তাগিদ অনুভব করবে
তার জন্য

সবশেষে অবশিষ্ট কিছু থাকলে ভালো
না থাকলেও ক্ষতি নেই
আমার লাগবেনা
ভালোবাসা তোলা থাকুক।।

ধর্মের নামে ***** নূপুর রায় (রিনঝিন) ।

ধর্মের নামে
নূপুর রায় (রিনঝিন)

মানব ধর্মের অন্তর হয়েছে আজ শূন্য
ব্যস্ত সবাই আপনাকে করতে পরিপূর্ণ।
দশ ও দেশের জন্য ভাবছে ক’জন আর
ব্যস্ত নিজ নিজ পকেট ভরতে আপনার।
ধর্মের নামেই বিভেদ চলছে মানুষে মানুষে
মনুষ্যত্ব লোপ পেয়েছে মহাসংকট দেশে।
দশ ও দেশের নামেই চলছে অবিচার
অনিশ্চিত ভবিষ্যত শুধু ব্যভিচার ।
এখনো মানব ধর্ম জেগে উঠলে সব অন্তরে
অমরত্ব লাভের আশা মিটতে পারে বন্ধু রে !
অমরত্ব নয়তো অমর! থাকবে সকল মনে
নশ্বর দেহ পুড়ে ছাই! তবু রবে স্মরণে প্রাণে।

ধারাবাহিক গল্প সংসার ও স্বপ্ন

ধারাবাহিক গল্প
সংসার ও স্বপ্ন
দ্বিতীয় পর্ব

সন্ধ্যের পর মৈনাক ফিরতেই অনুপমা দেবী বললেন–মনু একবার ছেলেটাকে ভালো করে দ্যাখ। আমাদের কেমন রাজপুত্রের মতো নাতি হয়েছে।অমৃতা বলল–মা আপনি তো নাতনির নাম মহুয়া রেখেছেন।আমি আপনার নাতির নাম মন্দার রাখলাম।শাশুড়ি মা বললেন–আমি বাপু ওকে গোপাল বলে ডাকব।গোপালের নিত্য পুজো করে আমাদের ঘরে ঠাকুর জ্যান্ত গোপালকে পাঠিয়েছেন।অমৃতা হেসে বলল–তাই হবে মা।আমি ও আপনার নাতিকে গোপু বলে ডাকব।

অনুপমা দেবী বললেন– একটা কথা বলি বৌমা।এই সোনার চাঁদ ছেলেকে ফেলে তোমার চাকরি করতে ইচ্ছে করবে?ছেলেকে বুকে রেখে মানুষ করলে তবেই তো মায়ের ওপর টান হবে।–মা আমার মউ ও তো আমার সোনার চাঁদ মেয়ে।ওরাও বড় হয়ে একদিন চাকরি করে প্রতিষ্ঠিত হবে।ওদেরও সন্তান হবে।তখন চাকরির জন্য আপনার নাতনি নাত বৌ কেও বাইরে বেরোতে হবে।আমার ছেলে মেয়ের জন্য তবু তো দাদু ঠাম্মি আছে।ওদের হয়তো সেটাও থাকবে না।তাই বলে কি মায়ের ওপর টান ভালোবাসা থাকবে না?মৈনাক বলল–মা বৃথা কথা খরচ করছ। লেকচার দেওয়াটাই ওর কাজ।অমৃতা বলল–মোটেই লেকচার দিচ্ছি না।আমি শুধু মাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছি।

অমৃতা কলেজে যোগ দেওয়ার দিন আরো একবার ছোটোখাটো অশান্তি হয়ে গেল।শাশুড়ি মা বললেন–শোনো বৌমা সবার কথা অগ্রাহ্য করে তুমি যখন চাকরিটা করবেই ঠিক করেছো তখন আমিও একটা স্পষ্ট কথা বলে দিচ্ছি।তোমার মেয়েকে আমি আর বকবক করে খাওয়াতে পারব না।

শর্মিলা বলল–মউয়ের ছ বছর বয়স হতে চলল।আপনি তো অনেকদিন করলেন।ওকে এবার স্বাবলম্বী হতে হবে।ও এবার থেকে নিজে খাবে,নিজে স্নান করবে। শুধু কমলা দি একটু সহায়তা করবে।–তোমার মতো এমন নির্দয় মা ই এমন কথা বলতে পারে।ছেলে মেয়েকে জন্ম দিয়েই তুমি খালাস।এখন তো ঘর সংসারের কোনো কাজও করতে হচ্ছে না।পটের বিবি সেজে চাকরি করাটাই তোমার প্রধান কাজ।

অমৃতা বলল–মা,আপনার আর বাবার ওষুধের প্রেশক্রিপশনটা দিন।আমি আসার পথে নিয়ে আসব।অনুপমা বললে–থাক মা ওটুকু দয়া তোমার না দেখালেও চলবে।মেডিসিনের দোকানে মনু বলে রেখেছে।ওখানে ফোন করলেই ওরা ওষুধ বাড়িতে দিয়ে যায়।

রাতে শোবার সময় মৈনাক বলল–একি! ওকে এখানে আনলে কেন?আয়া মাসী কি করছে?শর্মিলা বলল–আজ আয়া মাসী ছুটি নিয়েছে।কিন্তু মা বলেছেন রাতের আয়া মাসীকে রাখার আর দরকার নেই।আসলে আমি এখন বড্ড গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়ায় বলে মা এই ব্যবস্থা করেছেন।মানে রাতে গোপুর পুরো দায়িত্ব এখন থেকে আমাকেই নিতে হবে।আমার অসুবিধা হবে না। তাছাড়া আয়া মাসী থাকলেও গোপু কি সারারাত মা ছাড়া থাকবে? — আমার একটুও অসুবিধা হবে।–না। না,অন্তত পুরো একটা বছর আয়া মাসী থাকবে।বলেই অমৃতাকে কাছে টানল।ওদের আদর ভালোবাসার মধ্যেই গোপু তারস্বরে কেঁদে উঠল।

মৈনাক বিরক্ত হয়ে বলল–ডিসগাস্টিং।ওর কান্না থামাও। অমৃতা হেসে বলল–গোপুটা মনে হয় তোমার চেহারার সংগে তোমার স্বভাবটাও পেয়েছে।তুমিও মনে হয় মাকে এভাবেই জ্বালাতে। মউ তো জন্মের পর থেকে ভীষণই শান্ত। তার কান্নাকাটির আওয়াজ শোনাই যেত না।–রাত দুপুরে তোমার ন্যাকা কথাগুলো থামাও।কাল থেকে আয়া মাসীকে আসতে বলবে।এই বয়সেই তোমার আবেগ রোম্যান্স সব হাওয়া।আমার ওপর টানটা এখন শূণ্যতে।যতো মনোযোগ এখন তোমার দুটো বাচ্চার ওপর। না ভুল বললাম। মায়ের দায়িত্ব তো সেই কবে থেকেই আমার বাবা মা নিয়েছে।-

অমৃতা –বলল ওমা! তুমি তো ভারি হিংসুটে।আর মেয়েকে তো তুমিই জোর করেই মা বাবার ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলে।আচ্ছা বিয়ের আগে বা পরের সেই রোমান্সটা কি বাচ্চা হয়ে যাওয়ার পর থাকে?একটু তো ভাটা পড়েই গো।এখন থেকে তুমিও দু দুটো বাচ্চার বাবা।এখন আমাদের জীবনটা সন্তানদের ঘিরে আবর্তিত হবে। তার মধ্যেই আমাদের ভালোবাসা থাকবে শারীরিক সম্পর্ক থাকবে। এই ঘুমিয়ে গেলে? আচ্ছা ঠিক আছে রাতের আয়া মাসী না হয় আরো কিছুদিন থাকবে। কিন্তু আমি মাকে রাতের আয়া রাখার কথা বলতে পারব না।উনি এমনিতেই আমার ওপর সব সময় রেগে থাকেন।

পরদিন সকালে উঠতেই অনুপমা দেবী বললেন–কাল রাতে গোপু এত কাঁদছিল কেন? মনুর তো ঘুমের বারোটা বাজছে।ওকে অফিসে অনেক হার্ড পরিশ্রম করতে হয়। ওর ঘুম দরকার।তোমার মতো তো আরামের চাকরি ওর নয়।আজ থেকে তুমি গোপুকে নিয়ে আলাদা ঘরে ঘুমাবে।অমৃতা বলল–গোপু মনে হয় সারাদিন ঘুমায় বলে রাতে ঘুমাতে চায় না।কিন্তু এই ব্যবস্থায় কি আপনার ছেলে রাজি হবে?–তাকে তো তুমি ভারি মেনে বসে আছো।অমৃতা বলল–মা গোপু তো আমাদের দুজনের সন্তান।তার দায়িত্ব আমাদের দুজনের ভাগ করে নেওয়া উচিত নয় কি?ওই বয়সের বাচ্চার সব বাবা মাদেরই এরকম কষ্ট সহ্য করতে হয়।অনুপমা বললেন–দ্যাখো বৌমা তোমার কাছে এই বয়সে তুমি আমাকে উচিত অনুচিতের শিক্ষা দিতে এসো না।ওসব লেকচার তুমি বরং তোমার ছাত্র ছাত্রীদের দিও।চিরকাল মা রাই বাচ্চাদের মানুষ করে।বাবা তাদের শিক্ষা ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়।

অমৃতা বলল–মা আপনার ছেলে বলছিল রাতের আয়া মাসী আরও কিছুদিন থাকুক।—শুধু শুধু আমার ছেলের নাম দিচ্ছ কেন?তুমি কি বাচ্চার ধকল নিতে বিরক্ত হচ্ছ ?বাচ্চার মা হবে আর বাচ্চার ধকল নেওয়ার বেলায় আয়া মাসী?–না মা আমার অসুবিধা হবে না।অসুবিধাটা আপনার ছেলের হচ্ছে।

রাতে গোপুকে ঘুম পাড়িয়ে চারিদিকে বালিশের ব্যারিকেটে রেখে অমৃতা মৈনাকের ঘরে এসে বলল–খাটে গোপুকে একলা রেখে আসা নিরাপদ নয়।এমনিতে বড্ড ছটফটে ছেলে।মৈনাক বলল–তুমি কি ডিউটি পালন করতে এলে? না কি দয়া দেখাতে এলে?সংসারে আর পাঁচটা কাজের মতো এটাও কি তোমার একটা কাজ?অমৃতা বলল–আহা তুমি এত রাগ করছ কেন?সকালে মায়ের কথাগুলো তো তুমিও শুনলে।তখন তো প্রতিবাদ করতে পারতে।–এই নিয়ে প্রতিবাদ করলে ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু হত।–কেন হত? স্বামী স্ত্রী একঘরে থাকাটা কি করে দৃষ্টিকটু হয়?তোমার যতো হম্বিতম্বি আমার ওপর।মাকে কিছু বলার সাহস নেই।–বললাম তো এটা নিয়ে কিছু বলা যায় না।–মানলাম,কিন্তু রাতে আয়া রাখার কথা তো বলতে পারতে।মৈনাক বলল–আমি অশান্তি এড়িয়ে চলি।–আমি কি গোপুকে নিয়ে এখানে আসব?ও তো গোটা রাত কাঁদবে না।

মৈনাক বলল– থাক,আমিই ও ঘরে যাচ্ছি। মধ্যে রাতে গোপুর কান্নাকাটিতে মৈনাকের ঘুম ভেঙ্গে গেল।অমৃতা পাশ ফিরে ছেলেকে ব্রেস্ট ফিড করিয়ে ছেলেকে ঠান্ডা করল।প্রচন্ড বিরক্ত নিয়ে মৈনাক পাশ ফিরে ঘুমালো।এভাবেই অমৃতার সংসার টক ঝাল মিষ্টিতে চলতে লাগলো।তার মধ্যেই কলেজ যাওয়ার সময় শাশুড়ি মার তীর্যক মন্তব্য,শ্বশুর মশাইয়ের ব্যাজার মুখ সবটা নিয়েই ছেলে মেয়ে বড় হচ্ছিল।

অমৃতা শ্বশুর শাশুড়ির বিরক্তি,বরের অবুঝ বায়না সবটাই ম্যানেজ করছিল।কিন্তু তাকে ভাবিয়ে তুলল মউয়ের আচরণটা।এখন তাকে কাছে টেনে আদর করতে গেলে সে ছিটকে সরে গিয়ে বলে–তুমি পচা মা,বাজে মা।তোমার আদর আমার চাইনা।অমৃতা মেয়েকে জোর করে কাছে টেনে বলল –কেন রে সোনা?আমি ভাইকে বেশি আদর করি বলে বলছিস?ভাইটা তো তোরই।সে যে এখন অনেক ছোটো সোনা।মউ ঘাড় বেঁকিয়ে বলল–তুমি আমাদের ফেলে চাকরি করতে কেন যাও?ঠাম্মি বলেছে তুমি আমাদের ভালোবাসো না।–মাম্মাম চাকরি করা কি খারাপ? তুমি ও তো লেখাপড়া শিখে চাকরি করবে।তুমিও একদিন মা হবে।তখন কি তুমি পরিশ্রম করে পাওয়া চাকরিটা কি ছেড়ে দেবে?আর কক্ষনো এসব কথা বলবে না।

ক্রমশ–