লুকোচুরি / সুদেষ্ণা সিনহা

লুকোচুরি / সুদেষ্ণা সিনহা

এই শীতের দুপুরেও দর দর করে ঘামছে দীপ।উবেরে খুব হাল্কা করে এ সি চলছে।তবুও যেন শরীরটা ভাল লাগছে না তার। তার মনের মধ্যে তীব্র ঝড় চলছে। সেই ঝড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে সে ক্রমশ।তবুও বাইরে থেকে
সে যতটা সম্ভব নিরেপেক্ষ  নির্বিকার।
উবেরটা ব্যারাকপুর বৃদ্ধাশ্রম পর্যন্ত যাবে। ব্যারাকপুর মেন রোডে স্বামী প্রণবানন্দের আশ্রম।সেই আশ্রমে বহু বছর ধরে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ হয়। আশ্রমের প্রদীপ মহারাজজি ভীষণ কাজের মানুষ। তিনি আসার পর থেকে আশ্রমটার অনেক উন্নতি হয়েছে। দাতব্য চিকিৎসালয়,শিশুদের বিদ্যালয় ,বাচ্চাদের পার্ক — এগুলো তো ছিলই,এখন সংযোজন হয়েছে বৃদ্ধাশ্রম। আশ্রম সংলগ্ন জমিতে ছোট ছোট ঘর,বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের  জন্য। এখানে তাদের দু বেলা খাবার ব্যবস্থা আছে। অবশ্যই নিরামিষ।প্রণবানন্দজীর আশ্রমে মাছ-মাংস-পেঁয়াজ-রসুন ঢোকে না।  আশ্রমে বড় বড় দুধেলা গাই আছে। আশ্রমবাসীদের পুষ্টির অভাব হুয় না।প্রত্যেকজনের জন্য এক গ্লাস করে দুধ বরাদ্দ আছে। বৃদ্ধাশ্রমে যদি কেউ নিজে রান্না করে খেতে চায়,তা করতে পারে। বৃদ্ধাশ্রমের ঘরের একপাশটিতে উঁচু ঢালাই করা শ্ল্যাব,তার উপর ইচ্ছে করলে গ্যাস ওভেন রাখা যেতে পারে। এই আশ্রমে দাতব্য চিকিৎসালয়ও আছে।সেখানকার ডাক্তাররা বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতি সপ্তাহে রবিবারের দিন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। বিকেলে শিশু পার্কে কচিকাচাদের ভিড়।পার্কে সিমেন্টের বেঞ্চ পাতা আছে।সেখানে বসলেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সময় কেটে যাবে। সকাল,সন্ধ্যেতে মূল মন্দিরে প্রণবানন্দজীর  ভোগ-রাগ-আরতি হয়। সব দিক দিয়েই এখানে বেশ সুন্দর ব্যবস্থা।
বাপ্পা,তার ছেলেবেলার বন্ধু।সেইই এই আশ্রমের খোঁজ দিয়েছিল প্রথমে।তার পরিচিত কেউ একজন এখানে থাকেন। তখন মায়ের জন্য হন্যে হয়ে দীপ বৃদ্ধাশ্রম খুঁজছে। নতুন ফ্ল্যাটে ঝুমা কিছুতেই মাকে রাখবে না। এই নিয়ে নিত্যদিন অশান্তি হচ্ছে দীপের সঙ্গে।তখনই হঠাৎ করে বাপ্পা ফোন করেছিল,”কেমন আছিস দীপ?”
দীপ মিথ্যে বলতে পারেনি।বলেছিল,”একরকম চলছে।”
“একরকম মানে কি রে?হয় বল ভালো আছি।নাহলে বল  ভালো নেই।দুটোর মাঝে এরকম কথার মানে কি?”
“ভালো নেই রে।”
“কেন রে?”
“আর বলিস না।চিরদিন যা হয়ে আসছে।আমার বউ নতুন ফ্ল্যাটে মাকে নেবে না।”
“তাহলে মাসিমা কোথায় থাকবেন?”
:”এটাই তো ভাবছি।”
“কৌই বাত নেহি।ব্যারাকপুরে সুন্দর বৃদ্ধাশ্রম আছে।তুই একবার দেখে যা । তারপর পছন্দ হলে মাসীমাকে পৌঁছে দিস।”
ব্যারাকপুরে প্রণবানন্দজীর আশ্রমে দীপ এসেছিল একদিন।মহারাজজীর সাথে কথা বলে গেছে বৃদ্ধাশ্রমে মায়ের জন্য ঘরও ঠিক করে গেছে।
আজ সঙ্গে আছে তার মা মলিনাদেবী।মাকে বৃদ্ধাশ্রমেই রাখতেই যাচ্ছে দীপ।কিন্তু বলি বলি করেও কিছুতেই বৃদ্ধাশ্রমের কথাটা মাকে বলতে পারেনি সে।কথাটা মুখে আটকে যাচ্ছে।
বছর খানেক হল নাগেরবাজারে সপ্তর্ষি মলের
কাছেই একটা তিন কামরার ফ্ল্যাট কিনেছে সে।পুট্টি করে প্রমোটার ফ্ল্যাট হস্তান্তর করে দিয়েছে বেশ কুয়েক মাস আগে।দীপের বউ ঝুমার সুন্দর করে ফ্ল্যাট গোছানোর খুব শখ।ইন্টিরিয়র ডেকোরেটর দিয়ে ফ্ল্যাটটাকে নিজের মনের মত করে সাজিয়েছে সে ।মডিউলার কিচেনের কাজও প্রায় শেষের দিকে।এখন শুধু রঙ করে ফ্ল্যাটে ঢোকার অপেক্ষা। কোন ঘরে কি রঙ করবে তাও দুজনে মিলে ঠিক করে রেখেছে। এই মাসেই ভাড়াবাড়িটা ছাড়তে হবে।নতুন ঘরের মানানসই কিছু নতুন আসবাব কেনা হবে।কিছু জিনিস পালিশ করিয়ে নিলেই নতুনের মতো হয়ে যাবে।বাকি অব্যবহার্য জিনিসগুলো একে তাকে দিয়ে দেওয়া হবে।
ঘরের জিনিসপত্রের কথা উঠতেই দীপের মায়ের কথাও উঠেছিল।নতুনবাড়িতে শাশুড়িকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ঝুমার ভীষণ আপত্তি।দীপের খুব খারাপ লেগেছিল।সে তার মায়ের একমাত্র সন্তান।খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারায় দীপ।বাবার মুখটাই মনে পড়ে না তার।বাবার ব্যাঙ্কের চাকরি ছিল।তার মায়ের চাকরির ব্যাপারে বাবার কলিগরা খুব সাহায্য করেছিলেন।ব্যাঙ্কে মায়ের চাকরিটা হয়ে গিয়েছিল।তারপর উদয়াস্ত পরিশ্রম করে তার মা তাকে বড় করে তুলেছিলেন।দীপের জীবনে মা-ই একমাত্র সম্বল।তাই নতুন ফ্ল্যাটে মায়ের জন্য একটা আলাদা ঘর রেখেছিল দীপ।কিন্তু একথা জানতে পেরে খুব রাগারাগি করেছে ঝুমা।
” রাবিশ তোমার চিন্তাধারা।তাহলে ওই ফ্ল্যাটে তুমি তোমার মাকে নিয়েই থাকো।ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি বাপের বাড়ি চলে যাব।”
“তাই কি হয়!”
“আলবৎ হয়।হয় তোমার মা যাবে নাহলে আমি,যেকোন একজন থাকবে ওখানে।”
খুব খারাপ লাগলেও কোন প্রতিবাদ করেনি দীপ।
ঝুমা সাংসারিক সব ব্যাপারেই তার বাবার সাথে পরামর্শ করে। মায়ের বৃদ্ধাশ্রমে থাকার ব্যাপারে ঝুমার বাবাই প্রথম সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ-খবর দিয়েছিলেন তিনি। দীপের তেমন পছন্দ হয়নি।
ব্যারাকপুরের স্বামী প্রণবানন্দজীর আশ্রমে বেশ খোলামেলা পরিবেশ।।মন্দিরে সকাল-সন্ধ্যা ধূপ-দীপ-আরতি। মায়ের একাকীত্ব লাগবে না।
“মা আ আ আ”,দীপ মাকে ডাকে।
বাতাসে শীতের রেশ।উবেরের দুলুনিতে বোধহয় ঝিমুনি এসেছিল মলিনাদেবীর। দীপের ডাকে চোখ খুলে বললেন,”কিছু বলবি? বল।”
“তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল মা।জানই তো তোমাকে যে দুটো কথা বলব, বাড়িতে তো সে পরিবেশ নেই।”গলাটা বুঁজে এল দীপের।
” কেন? কিছু বলবি বাবা?”
“তুমি কোথায় যাচ্ছ জান?”
“হ্যাঁ,ব্যারাকপুর ভারত সেবাশ্রমে।”
“এখন থেকে তোমাকে ওখানে থাকতে হবে মা। আমি এমনই অপদার্থ ছেলে যে তোমাকে কাছে রাখতে পারব না,মা।”

দীপের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল,” আমার একটুও ভাল লাগছে না।তুমি ছাড়া নতুন ফ্ল্যাটে আমার একটুকুও মন বসবে না মা।আমি পারব না মা তোমাকে ছাড়তে।”
“দূর বোকা ছেলে। এই কথা! এই নিয়ে কি কেউ মন খারাপ করে ? আমাকে বল তো,বাবা,মা কারো চিরকাল থাকে? ”
মলিনাদেবী নির্বিকার। ” তাছাড়া মেয়েটার কত কষ্ট হয় বল তো! তোদের আমিষ, আমার নিরামিষ । আজ ব্যস্ততার দিনে কে এত সাতসতের ঝামেলা পোহাবে,বল তো বাবা? তার থেকে তো এই ভাল,তুই মন খারাপ করিস না বাবা। আমার তো দিন হাতে গোনা।ঠাকুর দেবতা,ভজন,কীর্তন নিয়ে কেটে যাবে।তাছাড়া তুই মনখারাপ করলে চলে আসবি।”
ভারত সেবাশ্রমের গেটের কাছে উবের থামল। ভাড়া মিটিয়ে মাকে নিয়ে নেমে এল দীপ।গাড়ির ডিকি খুলে একটা সাবেকি ট্র্যাঙ্ক আর একটা ব্যাগ নামিয়ে দিল উবের ড্রাইভার।
ভারত সেবাশ্রমের গেট পেরিয়ে মাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল দীপ। কতদিন মাকে ভালভাবে দেখেনি সে! মায়ের মুখে শত রেখার আঁকিবুকি!মায়ের বয়সটা এক ধাপে যেন অনেকটা বেড়ে গেছে।  মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দীপের বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠল। আজ ভীষণ পাপবোধ হচ্ছে তার । সত্যিই কি সে নির্দোষ!মাকে বৃদ্ধাশ্রমের নির্বাসনে পাঠাতে তার কি একটুকুও দায় নেই!নাকি নিজের সত্ত্বাটাকে লুকিয়ে রেখে সে মায়ের সাথে লুকোচুরি খেলছে আজ!
আশ্রমের দুটি ছোট ছোট ছেলের ডাকে সম্বিৎ ফিরল মা ছেলের।
” মহারাজজী ওঁনাকে ঘরে নিয়ে যেতে বললেন।”
দীপ সম্মতি দিলে একটি ছেলে মলিনাদেবীর ট্রাঙ্ক আর ব্যাগ দুহাতে তুলে নিল।আর একটি ছেলে  মলিনাদেবীর হাত ধরে খুব যত্ন করে নিয়ে যাচ্ছে ঘরে।যেতে যেতে পিছনে ফিরলেন মা ।
ডাকলেন,”দীপু।” তারপর ছেলের দিকে শতজীর্ণ হাত বাড়িয়ে মলিনাদেবী বললেন,” আমার জন্য চিন্তা করিস না একদম। ভাল থাকিস বাবা।”
দীপ দেখল মায়ের ঘোলাটে চোখের কোণে জলের ধারা।

মিরুজিন আলো (পর্ব ষোল) বিজয়া দেব

মিরুজিন আলো (পর্ব ষোল)

বিজয়া দেব

জুহির পড়ার টেবিলে দুটো চিঠি – একটি দেবাংশীর জন্যে একটি জুহির জন্যে। পত্রলেখক জগবন্ধু।দেবাংশীর চিঠিটা নিয়ে জুহি দেবাংশীর ঘরের সামনে গিয়ে মৃদু টোকা দিল। ভেতর থেকে ভেজানো। দেবাংশী বেরিয়ে এল। ঘুম ক্লান্তি জড়ানো চোখ মেলে তাকিয়ে বলে-কি ব্যাপার?
জুহি কথা না বলে চিঠিটা এগিয়ে দিল। একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ।
– এটা কি?
-খুলে দেখো।
বলে কথা না বাড়িয়ে জুহি চলে যাচ্ছে।
দেবাংশী কাগজ খুলে দেখে ক’টা লাইন লেখা – মা, তুমি আমায় মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছ। কিন্তু পাপী আমি তোমার ঋণ শোধ করতে পারলাম না। নিজের ঠেকে ফিরে যাচ্ছি। আমায় ক্ষমা করতে পারবে না জানি। কোনও মা-ই আমায় ক্ষমা করবে না। যাচ্ছি মাগো। – জগবন্ধু।
জুহি চিঠি দিয়ে নিঃশব্দে চলে গেছে। জগবন্ধু কখন গেল? দেবাংশী অফিস থেকে ফিরে আসার পথে তাদের উইমেন্স ক্লাবে গিয়েছিল। ফিরতে খানিকটা রাত হয়েছে। কালরাতের ডিনারটা বাইরে সারতে হয়েছে। সবাই জোর করছিল। গতকাল শুক্রবার ছিল। এরপর দুদিন বন্ধ, উইকএন্ড। এখন সকালবেলা।নিশ্চয়ই জগবন্ধু গতকাল রাতে ছিল না। কিন্তু জুহি তাকে ফোন করে জানায়নি। জানালে অফিস থেকে সোজা বাড়ি ফিরত দেবাংশী। কি হয়েছিল ঠিক? জগবন্ধুকে দিয়ে তার অন্ধকার জীবনের কথাগুলো বলিয়েছে জুহি। হয়ত শক্তকথা শুনিয়েছে জগবন্ধুকে। ও মেয়ের তো কিছু ঠিক নেই! দেবাংশী জুহির ঘরের দিকে এগোয়। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কোনদিন না কোনও কান্ড করে বসে। আজকাল কীসব হচ্ছে। কত কী শোনা যায়। দু’বার দরজায় নক করল দেবাংশী। কোনও সাড়া নেই। জগবন্ধুর সাথে জুহির একটা স্নেহের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। খুব শান্তি এনে দেওয়ার মত একটা ব্যাপার ছিল সেটা। সে তো নিশ্চিন্তে অফিস ক্লাব সমাজসেবা ইত্যাদি করে যাচ্ছিল। এভাবে চলতে থাকলে জগবন্ধু অতীতটা ভুলতে পারত। সেটাই জরুরি ছিল হয়ত। আরও দুবার নক করল দরজায় দেবাংশী। এবার দরজা খুলল জুহি। কথা না বলে সে তাকিয়ে। চোখে প্রশ্ন।
-জগবন্ধু কখন গেছে জানিস?
-বলে গেলে চিঠি দিত?
-কখন থেকে দেখতে পাচ্ছিস না তাকে?
-এখন গোয়েন্দাগিরিটা জাস্ট বন্ধ করো। গতকাল কত রাতে ফিরলে?
-অসভ্যতা করো না জুহি। আর ভেতর থেকে দরজা লাগিও না। বাড়িতে এখন শুধু তুমি আর আমি। আজ শনিবার। শনি রবি দুদিন যদি একটু শরীর মনে বিশ্রাম না পাই তাহলে তো খুব মুশকিল। দরজা খোলা রেখো।
দেবাংশী কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে। জুহি দেখছে। একটা অজানা আক্রোশ জুহির ভেতর থেকে পাক খেয়ে উঠছে। কীসের এ আক্রোশ সে জানে না। জুহি তো দরজা লাগিয়েছে এজন্যেই, দেবাংশীর গোয়েন্দাগিরি করার সুযোগ না দেওয়ার ইচ্ছেতে। অসহ্য! তবে জগবন্ধু চলে যাওয়ায় সবকিছু বড্ড ফাঁকা লাগছে। লোকটা তাকে স্নেহ করত, কিন্তু এমন লোককে জুহি বিশ্বাস করবে কি করে! পারুলের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে যে! মা সবটা জানতে পারে নি। তার কষ্ট হচ্ছে। বেশ কষ্ট হচ্ছে। বুকের ভেতর একটা পাক খাওয়া কষ্ট। থিতু হতে কিছুটা দিন যাবে। নাহ বেরিয়ে পড়বে আজ। যেখানে হোক। নীলাভকে একটা ফোন করবে? দেবাংশী আবার দরজায়।
– চলো, আমার সাথে আজ বাজার যাবে।
– তুমি যাও। আজ আমি বাইরে লাঞ্চ করব।
-বিকেলে ট্যুইশান আছে না?
-হ্যাঁ। একেবারে সেরে রাতে ফিরব।
– পড়াশুনো কখন হবে?
-রাতে।
-কোথায় লাঞ্চ করছ?
-সে আছে।
-মানে? কোথায় যাচ্ছ বলে যাবে না? একটা আপদবিপদ হলে কোথায় খোঁজ করব?
-থানায় যাবে!
-মানে? তুমি কোথায় যাচ্ছ বাড়িতে বলে যেতে হবে না? কী ভেবেছ তুমি? যাচ্ছেতাই করবে?
-আচ্ছা! তুমি বলে যাও বাড়িতে? আপদবিপদ হলে কোথায় খোঁজ করব?
-উইমেন্স ক্লাবে করবে। অফিসের বাইরে ওখানটাই আমার ঠিকানা। তোমার তো তেমন নয়। কোথায় যাচ্ছ কার সাথে যাচ্ছ তার কোনও হদিস কেউ কখনও বের করতে পারবে না।
-ঐ থানা পুলিশ করতে হবে আর কি!
-জুহি!
দেবাংশী গর্জন করে ওঠে।
-চোখ দেখিও না মা। সে অধিকার তুমি হারিয়েছ।

নিজের ঘরে এসে হতাশ দেবাংশী বসে পড়ে। কি করা উচিত তার? কি করা উচিত ছিল তার? নিজেকে জয়মাল্যর সম্পত্তি হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া? মেয়ের দিকে সে নজর দেয়নি? অসুখবিসুখে রাত জাগেনি? শিয়রে বসে ছোট্ট মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি? একটি নারীকে কি কি করলে বিশ্বসুদ্ধ সবাইকে খুশি করা সম্ভব? কি কি ভুল সে করেছে? তবে কেউ খুশি হল কিনা তা নিয়ে সে কেন ভাববে। কিন্তু সন্তান? বুকের ভেতর কেন এত কষ্টের বান ডাকে? আজ ভেবেছিল একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবে। মেয়ের পছন্দের খাবার বাজার থেকে কিনে আনবে।
ফোনটা বাজল। তুলতেই এক অজানা নারীকন্ঠ।  – দেবাংশী বলছেন? পারিজাতকে চেনেন? চেনেন তো? আমি তার রাঙাপিসি। চিনতে পেরেছেন? একসময় আপনাদের উইমেন্স ক্লাবে ছিলাম। বর্তমানে শরীর ঠিক থাকে না, তাই আর আসতে পারি না। একসময় জুহি আমার বাড়িতে আসত।আপনার সাথেও ফোনে কথা হয়েছে কত। বলছি যে আপনার বাড়িতে থাকত জগবন্ধু এখন আমার এখানে। আপনাকে জানানো দরকার, তাই জানালাম। আমার পাগল ভাইপো পারিজাত রাস্তা থেকে তুলে এনে এখানেই ঠাঁই দিয়েছে।জগবন্ধু চলে যেতে চাইছে। বলেকয়ে আটকে রেখেছি বলতে পারেন। আপনাকে বলে এসেছে কি?
(ক্রমশ)

# দিবস কেন যে এলো না # – ৬ কলমে – অরণ্যানী

# দিবস কেন যে এলো না # – ৬

কলমে – অরণ্যানী

নীলম জানে চন্দনাদের বুঝিয়ে কিছু লাভ হয় না। ওরা নিজের প্রেমিককে সেরা পুরুষ কল্পনা করেই সুখী থাকতে চায়। কিন্তু মনের ভেতরেও কি এদের সন্দেহ জাগে না? নাকি সব ইচ্ছা করেই এরা ঢেকে রেখে ভাবে, যে ক’দিন সুখের অনুভূতি লাভ করা যায়!
সব শুনে নীলম বলল -— আর কিছু দিনের মধ্যে যদি তপন ফিরে না আসে, তবে গ্রামে টেকাই যে তোর দায় হবে। শহরের বড় হাসপাতালে গিয়ে আগে বাচ্চাটা নষ্ট করে আয়। আমি সব লিখে দিচ্ছি। আমার চেনা ডাক্তার। বাড়িতে কেউ জানে এ কথা?
—- না, কাউরে কইনিকো। আমি ক্যামনে যাবু শহুরে একলা? আর বাচ্চা আমি নষ্ট করব নিকো। উ আমার কতু আদুরের হবে। ও যকন আসবে তারে কি কবো? বাচ্ছা নষ্ট করে দেছি?
-— তপনকে কিছু জানানোর দরকার নেই। সেছাড়া তপনের বউ আছে। তার কী হবে একটা মেয়ে হয়ে তুই ভাবলি না?
-— উ বড়লুকের মাইয়া। ঠক্কে বে দিছে ওর বাড়ির নোক। উ কি ভালোবাসে?
–— তুই কী করে জানলি বাসে কি না বাসে?
—- আমারে বুলেচে।
–— তবে কী করবি?
-— ভালো করি খেলি আর ওষুদ খেলি বাচ্চা ঠিক থাকবে? তবে তাই দাও না কেনে।
—- আর বাড়ির ,গাঁয়ের সবাই কী করবে ভাব।
—- বাচ্চার জম্ম দেয়া কি পাপ নাকি? আমি কি আর আস্তাকুঁড়ে ফেলি দে আসচি?
—- কোনদিন তাই দিবি।
-— না, এ আমার ভালোবাসার জিনিস। আমি নিজের রোজগারে খাই। কার কী বোলার আচে? ঘরের সব কাজ করি। বৌদিরা তু কুটোটি নাড়ে না। বাপ দাদাই বা কী দেছে? মদ খেয়ি পড়ি থাকে। মা তু নিজের মুকেই বলিছেল, পারিস তো এটটা ছেলি ধরি বে করি নে। নইলে তোর পয়সায় সবাই খাবে।
এরপর আর নীলমের বলার কিছু রইল না। আয়রন, ভিটামিন, ক্যালশিয়াম, সব ওষুধ পত্র বুঝিয়ে দিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করল, বাচ্চাটা হলে ওর বাবা কে, কী বলবি?
চন্দনা — সত্যিকারে যে তার কতাই।
—- ফল, শাকসব্জি, মুসুর ডাল, আর পারলে একটু দুধ আর ডিম জোগাড় করে খাস। বমি হলে, বা হজমের অসুবিধা হলে আসিস, ওষুধ দিয়ে দেবো। আর তিন সপ্তাহ পর এসে দেখিয়ে যাস। মানে একুশ দিন।
চন্দনা হাসি মুখে আচ্চা বলে চলে গেল।

নীলম বুঝল গ্রামে আবার একটা গন্ডগোল বাধবে কিছু দিন পরেই। আবার থানা পুলিশ সব তাকেই করতে হবে। অবশ্য ওদের এনজিও আছে। মেয়েটা ওখানেই কাজ করে। দেখা যাক কী হয়। অন্তত আমার মতো হেনস্থা হতে দেবো না কিছুতেই। এটা আসলে ভুলেরই বয়স। আর চেতনা? সে শুধু বক্তৃতা দিয়ে কি আনা যায়? কিছু মানুষের ত্যাগ ও মানুষের ঠেকে শেখা, দু’য়ের মধ্যে দিয়েই হয়তো আসে।

ছোট্ট ফুলি — অনিন্দিতা নাথ।

ছোট্ট ফুলি
— অনিন্দিতা নাথ।

অন্নের জ্বালা মেটাতে
মা নিল বাসা বাড়ির কাজ।
ছোট্ট দশ বছরের মেয়ে,
বাপ হারা।
মিষ্টি ভুবন ভোলান হাসি!
নেমে পড়ল বাজারে ফুল
বিক্রির কাজে।
দিন আনে দিন খায়
তবুও আনন্দের সংসার।
ফুলি হাঁক পাড়ে-ফুল নেবে গো,
তাজা ফু**ল।
এগিয়ে এলো একটি লোক ,
কাছে ডাকে তাকে, কাছে আয়।
দু’টি হাত দিল টাকা!
তারপর?
নির্জন, নিস্তব্ধ, অন্ধকার গলিতে
যৌনতার স্বীকার হ’ল সে
আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ল দিকে
দিকে। মেদিনীকম্পিত ,
চারপাশ নিঝুম, জন শূন্য গলি।
তৃপ্তির হাসি ঐনৃশংশ
লোকটির মুখে ।
হায়! বিধাতা কি দোষে আজ
ফুলির জীবন বিপন্ন ?
কে দেবে, তার কৈফিয়ত?

বায়োস্কোপ ওলা ****** কলমে দীপ্তি নন্দন।

বায়োস্কোপ ওলা

কলমে দীপ্তি নন্দন।

বসেছে আজ রথের মেলা,
নিয়ে হরেক রকম খেলা,
আছে ম্যাজিক, নাগরদোলা,
আর আছে বায়োস্কোপ ওলা।
আজব সুরের গান শুনে ভাই,
ছেলেরা সব ছুটে আসে তাই।
গোল ফুটোতে চোখটি রেখে,
কত কিছুই যে দৃশ্য দেখে!
দেখে, সুনীল আকাশে মেঘের ভেলা,
সেথা বকের দলের চলছে খেলা!
নাচ গান আর হরেক ছবি তে,
কল ঘুরিয়ে সবার মন মাতাতে,
রঙীন পাগড়ি এক জড়িয়ে মাথায়, তার আজব সুরের গান যে শোনায়!
ছায়াছবির সীন গুলো সব মন ভোলা!
মেলার মাঠে ঐ এসেছে বায়োস্কোপ ওলা!

কবিতা: বৃক্ষ মায়া ———— প্রভাত

কবিতা: বৃক্ষ মায়া
———— প্রভাত

বৃক্ষ রাজি সারি সারি স্বতঃসিদ্ধ স্বভাব তারি,
পথ প’রে ফেলে তারি ছাঁয়া।
মৃদু মন্দ সমীরণে ভুলায় পথিক জনে,
যেন তারি তরে কত মায়া! c
অপরাহ্ন সবে শেষ পথিক প্রবরও বেশ,
মুছে ফেলতে ক্লান্তির ছাপ,
চেয়ে দেখে বৃক্ষ রাজি আনুকুল্যে তার নীতি,
ঝির ঝিরে ছাড়িছে বাতাস।
পথিক প্রবর জন যেন তারি ভুলো মন,
অনুসন্ধান করে বৃক্ষ দান!
ভুলে যায় কালে কালে ও বৃক্ষ বন্ধু ছলে,
বাঁচিয়েছে আরো কত প্রাণ।
গ্রহন– দানের নীতি কৃতজ্ঞতায় জীবপ্রীতি,
নিদর্শন কেবা দেখায় এ বসুধায়?
সানন্দে গরল তারি শুষে নিয়ে ও জীবেরই,
নির্মল বাযু সে বিলায়।
এত বড় মহা দানে বাঁচায় সে কত প্রাণে,
নাহি চায় কভূ কিছু তবুও প্রতিদানে,
তবুও জীবকুল বারে বারে করে ভুল,
পরম বন্ধু সম ও বৃক্ষ নিধনে।

ঢাকা, ১৫, ফেব্রুয়ারী, ২৩ ইং।

মনে রেখো — উদয় ভানু চক্রবর্তী

মনে রেখো —

উদয় ভানু চক্রবর্তী

বাড়ির পেছনে সবার অপছন্দের লাজুক কলাগাছের সারি ছাড়া আর কিছু জোটে নি পোড়া কপালে, এর বেশী পাওয়ার সামর্থও ছিল না তোমার!

একবার ফল আসার পর সবাই ত্যাগ করেছে ওদের। শুধু মাটি, বাতাস আর রোদ্দুরটুকু ছেড়ে যায় নি, এখনও ছুঁয়ে থাকে শিশির কি এক অনাবিল মায়ায়।
সেই পরিত্যক্ত নিষ্ফলা সারিবদ্ধ সবুজ দীর্ঘশ্বাসটুকুই শেষ অবধি থেকে গেছিল তোমার জন্য!

বর্ষায় প্রথম কদম ফুলের গন্ধে যখন জগৎ মেতে ওঠে, ময়ূরী পেখম মেলে সঙ্গীর খোঁজে, একলা দুপুরের নিঝুম মুহূর্তরা প্রাণে দোলা জাগায়-
তাকিও ওই জনমদুখী কলাগাছদের দিকে, ওদের পাতার দিকে!
তুমি কবি বলেই লক্ষ্য করো ওদের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে সুসজ্জিত কত কবিতার খাতা- গুছানো অগুনতি অক্ষরের মেলা, নতুন ভোরের ঠিকানায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো ম্রিয়মান ভাল পালা- নরম কান্ডগুলো!

অথচ কেউ জানে না যে ওরা কলাগাছই নয়,
ওরা আসলে তোমার কবিতার খাতা!
যে খাতায় তুমি লিখেছো হাজার কবিতা-
আমার কথা ভেবে ভেবে !!

No one knows what wanders through your imagination…
Gazing the foggy horrizon, into the stratosphere, the unfathomable cosmos..
The heavenly fragrance touches your mind and you write ..scratch and write and scratch again..
My poet!

 

(মুক্ত গদ্য) নন্দিনী

(মুক্ত গদ্য)

নন্দিনী

ভার্গবী
একটা গ্রাম ছিল।
সে গ্রামে সবুজ ধানক্ষেত, বিশাল বটগাছ, কুল কুল করে বয়ে যাওয়া নদী, বাঁশি হাতে রাখাল বালক। কত পাখির কতরকম ডাক। সাথে কিছু মানুষ ছিল। যারা হাসতো, খেলতো, গল্প করতো, চিৎকার করে ঝগড়া করতো, আনন্দে উৎফুল্ল হতো। গ্রামের প্রান্তে রাজবাড়ী। গ্রামের গুঞ্জন পৌঁছত সে রাজবাড়ীর কানেও। রাজবাড়ী বড়ো নিয়মে বাঁধা। মাপা হাসি। কান্নাও মাপ মতো। রাজা তার মন্ত্রীকে বললো, “শোনো মন্ত্রী, বৈদ্যকে বলো ওষুধ দিয়ে গ্রামকে চুপ করাতে। ওরা বেনিয়মে চলে। এত কথা এত হাসি– আমার বাড়ি বড়ো করুন মনে হয়। সে হতে পারে না, ওদের চুপ করাও।” বৈদ্য বললো “আজ্ঞে মহারাজ।”
দুদিন ধরে নানা জরিবুটি জোগাড় করে বৈদ্য ওষুধ বানালো।
মন্ত্রী ছল করে রাজার বাড়ির থেকে রাজার পাঠানো মিষ্টি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিল।
গ্রামের লোক মহা খুশি, তারা সে মিষ্টি খেল। শুধু সুবল মাঝির মেয়ে নন্দিনী খেল না। সে গিয়েছিল নদীতে কলসী ভরতে।
এদিকে গ্রামে সবার গলা বুজে এলো। হাজার কথার ভিড়। তারা শব্দ পাচ্ছে না।
একা নন্দিনী।
রাজা বেজায় খুশি, গ্রাম শান্ত।
শুধু শোনা যায় নদীর জলের কল কল আওয়াজ, পাখির কুজন আর রাখালের বাঁশি।
একসময় রাখালও বাঁশি বাজানো বন্ধ করলো। আর যে কেউ তাকে দূর পথে যেতে যেতে বলে যায় না চিৎকার করে “বড়ো মিঠা সুর বাজাইছিস বটে।”
যে গল্পে নন্দিনী থাকবে সে গল্পে বিশু পাগলকে থাকতেই হবে। এ গল্পেও ছিল। পাগল বিশু গান গাইতো। সে গানও এখন বন্ধ।
গ্রামটা যেন এক আস্ত প্রেতপুরী।
নন্দিনী বললো– বেশ, হবে যুদ্ধ রাজার সাথে। এ অবস্থা কি করে চলতে পারে। নন্দিনী থাকলে সে গল্পে কিশোরকেও থাকতেই হয়। স্বর হারালে কি করে বলবে তবে সদ্য কিশোর বালক উচ্চকিত কণ্ঠে “ভা.. লো.. বা.. সি..”
কেমন করে হবে রাগ- দুঃখ- ভালোবাসার প্রকাশ, অনুভবের প্রকাশ।
সুর, আর স্বর ফেরাতেই হবে। এ দাবী, ন্যায্য দাবী। ছুটলো নন্দিনী রাজার দরজায়। মুহুর্মুহু আঘাত। গোটা গ্রাম তার পেছনে। সাথে তাদের কাছে যা ছিল যাতে শব্দ হয় বাসন, যন্ত্র , ফাঁকা কলসি সে সব কিছু নিল তারা।
নন্দিনীর প্রশ্ন ছুটলো রাজার দিকে। সাথে গ্রামবাসীর জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি বেতালা আওয়াজ। রাজা তখন বললো বৈদ্যকে ওদের শব্দ ফিরিয়ে দাও। এ আওয়াজ ভার বইতে পারিনা আমি।
নন্দিনী বললো, “রাজা দুঃখে কেউ যদি না বলে- আমি আছি.. কেউ যদি তাকালে- না বলে ভালোবাসি, কেউ যদি সুখে হা হা করে নাই হাসি, কেউ যদি কষ্টে নাই কাঁদি ডুকরে, কেউ যদি না বলে– অমন করে কাঁদে না…..তাহলে জীবন আর মৃত্যু আলাদা করবে কি উপায়ে? অভিমান শুধু নীরব হয়। বাকি অনুভূতির শব্দেই জয়।”

“শব্দ-বিলাসী” কলমে: সাহানা

“শব্দ-বিলাসী”

কলমে: সাহানা

পদ্যমাখা ছন্দের বিলাসী শব্দেরা-
ছড়িয়ে পড়ছে এদিক ওদিক;
ধুলোমাখা একটানা সরু পথে-
কখনও আলের ওপর,
আবার কখনও মাঠের সবুজে-
খেতে চাষ হচ্ছে আলু, ধান, গম-
আর…..আর শব্দ!
হ্যাঁ, বিলাসী শব্দ, উন্নাসিক শব্দ
বিনীত শব্দ, আবার কোথাও-
শুধুই শব্দের জমা পচা
বিকৃত লাশ!
এতো শব্দের শব, কোথায় থাকবে?
পুঞ্জীভূত মেঘের মত আকাশে?
তারপর, আকাশ থেকে টুপটাপ
বাদল ঝরবে? নাকি, শব্দগুলো
আনাচে কানাচে অস্তিত্ব রক্ষার
খাতিরে হয়ে যাবে স্তব্ধ-
বাকরুদ্ধ, কিংবা বারুদ বা
বিস্ফোরকের তাড়নায়-
ঝলসে পুড়ে খাক্ হবে!

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ ~ শান্তনু ঘোষ

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ
~ শান্তনু ঘোষ
পর্ব-৯

আগে যা ঘটেছে:
চলেছি রাজশাহী। পথে নাটোরের রাজবাড়ি দেখার জন্য সামান্য বিরতি নিয়েছি। অনেকটা জায়গা জুড়ে নাটোরেরে রাজবাড়ি । অল্প সময়ের মধ্যে দেখা যায় না। আমাদের তাড়া আছে বলে পরীক্ষার আগে ফাঁকিবাজ-ছাত্রের-তাড়াতাড়ি-বইয়ের-পাতা-উল্টানোর মত করে যতটুকু পারলাম দেখে নিয়ে গাড়িতে চাপলাম। এবার গাড়ি চলেছে রাজশাহী।

তারপর…
প্রায় এগারোটা বাজে। গাড়ি চলছে ‘নাটোর – রাজশাহী হাইওয়ে’ ধরে। রাস্তা বেশ ভালোই। পথের মাঝে কোথাও জনপদ, কোথাও বা গ্রাম। এমনই দেখতে দেখতে আসছি। পারিপার্শ্বিক দৃশ্য দেখলে মনে হবে কলকাতা থেকে বনগাঁ যাবার রাস্তায় আছি।

এই সব যত দেখি ততই আমার ওই একটা প্রশ্নই খোঁচা দেয় মনে। কিছুই তো ভিন্ন নয়। তাও দুটো ভিন্ন দেশ। ভিন্ন ভাবনা। অন্তরে অন্তরে কতটা কঠিন প্রাচীর। একদিন তো অনেকের মত আমার পূর্বপুরুষকেও এই দেশ ছাড়তে হয়েছিল। সব কিছু ফেলে রাতারাতি প্রাণ হাতে নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালাতে হয়েছিল। অজানা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে পুরো পরিবারটা সঁপে দিয়েছিল নিজেদের।

আজও বাংলাদেশে থাকা বেশ কিছু মানুষের লুকিয়ে রাখা যন্ত্রণার ভীত-গোপন প্রকাশ দেখে মনটা দমে যায়। তাঁরা প্রকাশ্যে আনার সাহস পায় না। জানে তাতে ক্ষতি বই লাভ নেই। কেউ সাহায্য করবে না। তাই চুপ করে অপমান সহ্য করে দিন যাপন করতে বাধ্য। যাবার কোন জায়গা নেই। উপায় নেই।

বাংলাদেশের সুস্থ-সুন্দর মনের বন্ধুরা বার বার বলে, বাংলাদেশ সুন্দর দেশ। মানুষ খুব সহৃদয়। এখানে ভয়ের কিছুই নাই। কথাগুলো মিথ্যে নয়। তাঁদের জন্যই আজও বাংলাদেশ সুন্দর। কিন্তু বিষ এক ফোঁটা থাকলেই ক্ষতি করার জন্য তা যথেষ্ট।

সেই বিষ বাংলাদেশে আছে। কিছু লোক আছে যারা বিভেদের পূজারী। তারা তো চুপ করে বসে নেই। আর ওই কিছু লোকের প্রভাব অনেক বেশী হয়। সে কথা বাংলাদেশের সুস্থ মনের মানুষ জানে ও মানে।

দুষ্ট লোক তো সব দেশেই থাকে। তা থাকে। কিন্তু দেশের সরকারকেও কোথাও যদি দুষ্টের সাথে কিছুটা আপোষ করে চলতে হয়, বিপদের শুরুটা সেখানেই। সেখানে জনগণের ভরসার স্থল কোথায় হবে তাহলে!

মনে পড়ল UNESCO-র কন্সটিটিউশানে লেখা সেই বিখ্যাত কথাটি –
‘Since wars begin in the minds of men, it is in the minds of men that the defences of peace must be constructed’
মূল কথাটি অবশ্য ঝাড়া হয়েছে অথর্ব বেদ থেকে। পশ্চিম দুনিয়া তো এমন কত কিছু যে আমাদের থেকে ঝেড়েছে তার হিসেব নেই। ভারতের প্রাচীন পুঁথি চুরি করে, জ্ঞান চুরি করে এখন নিজের নামে পেটেন্ট করে আমাদের কাছেই বিক্রি করছে।

সে যাই হোক গে, মোদ্দা কথা হল, মানুষের মনের জগতে পরিবর্তন না আসলে – প্রকৃত পরিবর্তন কখনই আসবে না।

গাড়ি চলছে ভালোই। কৌস্তভকে বলি, রাস্তায় পুঠীয়ার রাজবাড়ি পড়বে। চাইলে একবার দেখে নিতে পারি।

ড্রাইভার ভাইকে বলাতে, তিনি বলেন যে, হ্যাঁ, একটু বাঁক নিয়ে যেতে হবে। তাই আমরা মেইন রোড ছেড়ে বাঁদিকে একটা সরু রাস্তায় ঢুকে পড়েছি।

মাঝপথে একটা বাজার মত জায়গায় আবার একটু চা-বিরতির জন্য থামলাম।
খুবই সাদামাটা চায়ের দোকান। একটা মুদী দোকানের অ্যাপেন্ডিক্স এর মত ছোট লেজুর হয়ে রাস্তার দিকে এগিয়ে আছে। নেমে আড়মোড়া ভেঙ্গে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম দোকানের দিকে। কৌস্তভ নেমেই দোকানে বলে দিল, ওয়ান-টাইম।

আমি বললাম, আমায় লাল চা দেবেন। দোকানী আমাকে শুধরে দিয়ে বললেন, ওহ, লিকার চা খাবেন।
বাংলাদেশে সব জায়গায় লিকার চা পাওয়া যায়। ইন্ডিয়াতে আমি এমন পাই না। এখানে অনেকটা পরিমানে চা দেয়। আর দাম বেশ কম, সব জায়গায় ৬ টাকা। যেন সরকারী বাধা রেট। মজা পাচ্ছি।

শীতের মিষ্টি রোদে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছি। সামনের মুদী দোকানটা বেশ সাজানো। দোকানে ভিড় নেই। একজন ক্রেতা কিছু কিনতে এসে দোকানীর সাথে গল্প জুড়েছে। তাদের গ্রামে জমি জমা নিয়ে গোলমালের গল্প। খুবই সাধারণ। তার মধ্যেই এসে গেল তাদের পার্টি-পলটিক্সের কথা।

পশ্চিমবঙ্গে লাল-লাল জামানায় বেড়ে ওঠা। পলিটিক্সের গন্ধ পেয়েই এক-পা দু-পা করে এগিয়ে গেলাম । কান খাড়া করে শুনছি ।

ক্রেতা বলছেন, বেশী ঝামেলা পাকাইলে, আওয়ামীলীগের নেতারে ধইরা লইয়া আসুম। ও তো আমাগো কথা শুনবই। আরে আমার বাড়ির ৩৬ টা ভোট।
আমি চোখ বড় বড় করে শুনছি, এক বাড়িতে ৩৬ টা ভোট! কত বড় পরিবার রে বাবা!
দোকানী এবার বি এন পি নিয়ে কিছু বলছে। পাশে দাঁড়িয়ে আমি উৎসাহী শ্রোতা।

আওয়ামীলীগ আর বি এন পি হল বাংলাদেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল। সর্বদা প্রতিপক্ষ। তাই এদের বিষয়ে সাধারণ মানুষের মনে কি ভাবনা চলছে জানতে আমার খুবই ইচ্ছে। অজান্তেই মাথা নাড়ছি।

ওদের কথার মাঝে দু-একটা প্রশ্নও করছি। চায়ের দোকানের আড্ডায় প্রায় ঢুকে পড়েছি। অতি উৎসাহিত হয়ে আমি কিছু বলতে যাচ্ছি…
এমন সময় কৌস্তভ, কানে কানে বলল, এখানে পলিটিক্স নিয়ে একদম কথা বলবি না। যতই টেম্পটেশন হোক না কেন।
আমি তাই ঢোক গিলে মন দিয়ে চা খেতে শুরু করি।

চা পান পর্ব শেষে। গাড়ি আবার চলছে। এবার পুঠীয়ার রাজবাড়ি।
সরু রাস্তা দিয়ে গাড়ি হঠাৎ একটা বিশাল বড় মাঠের সামনে এসে উপস্থিত। মাঠের অপর প্রান্তে দেখছি এক ছোটখাটো প্রাসাদ ভবন। দেখেই বোঝা যায় যে আগেরকার দিনের জমিদার বাড়ি।

ইন্দো-সারাসেনিক আর্কিটেকচার এর ধাঁচে তৈরি। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে এমন একখানা প্যালেস যিনি এই সুদূর প্রান্তে দাঁড় করিয়েছিলেন তাঁকে সেলাম। ইন্দো-গথিক ডিজাইনের বড় বড় থাম ওয়ালা প্রাসাদটি দেখলেই প্রথমে কলকাতার আলিপুরে সরকারী টাঁকশাল বিল্ডিং এর কথা মনে হবে, কিংবা ন্যাশনাল লাইব্রেরী। আর থাম গুলি দেখলে তো জিপিও, টাউন হল, বা প্রিন্সেপ ঘাট মনে আসবেই।

ইতিহাস বলে যে, রানী হেমন্ত কুমারী দেবীর জন্য এই ভবনটি বানানো হয়েছিল। মূলত চারটি অংশ আছে – কাছারি, মন্দির, অন্দর মহল, আর মহারানীর থাকার মহল। এখানেও চারদিকে বড় বড় দীঘি কাটা আছে। তখনকার দিনে সুরক্ষা ব্যবস্থার একটা দিক। বাড়িটির ভিতরে ঢুকতে টিকিট লাগে। সময় কম থাকায় আমরা ঢুকছি না। বাইরে থেকেই দেখছি। মূল ভবনটির অবস্থা তেমন ভাল নয়। ভালো করে সংস্কার-সংরক্ষণ প্রয়োজন।

রাজবাড়ির সামনে সুবিশাল উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। পশ্চিমবঙ্গে এমন খালি জায়গা পড়ে থাকলে এতদিনে প্রমোটিংএ চলে যেত।

প্রাঙ্গণের সামনে আর বাঁ-পাশে রাস্তা । ডান দিকে দীঘি। দীঘির পাশ দিয়ে রাজবাড়ি পেছনে যাওয়া যায়। সেদিকে এসে দেখি অযত্নে অপালিত আমবাগান। সেখানে কিছু যুবক-যুবতী নিভৃত সময় অতিবাহিত করতে ব্যস্ত।

আমরা চলে এসে প্রাসাদের পাশে পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দিরে গেলাম। টেরাকোটার কাজের সুন্দর নিদর্শন রয়েছে মন্দিরের গায়ে। মন্দির প্রাঙ্গণের বাকি মন্দিরগুলো ভেঙ্গে গেছে।

আদিতে পুঠীয়া ছিল লস্করপুর পরগণার একটি গ্রাম। লস্কর খাঁ নীলাম্বর এর নাম থেকেই এই লস্করপুর নাম । তিনি ছিলেন পুঠীয়ার প্রথম জমিদারের ভাই। পরবর্তী কালে এই জমিদারী ভাগাভাগি হয়ে যায়। এখন যা সামনে দেখছি তা হল পাঁচ আনি ভাগের অংশ।

এই সম্পত্তি ভাগাভাগির রোগটা মনে হয় বহুকাল আগে থেকেই বাঙ্গালীর রক্তে আছে। নাটোরের জমিদারীতেও একই অবস্থা দেখেছি। বাঙ্গালী নিজের পরিবারেই মিলেমিশে থাকতে পারে না, তো দেশে কি করে মিলেমিশে থাকবে ! পরিবারের সম্পত্তি ভাগের মত দেশটাও ভাগ করে নিয়েছে।

কিন্তু লক্ষণীয় যে এই খাঁ বাবুরা কত সুন্দর মন্দির করেছিলেন। তাই খাঁ দেখেই অত হা হা করার কিছু নেই। বিষয়টির গভীরে জানা প্রয়োজন। খাঁ বা খান উপাধি দেওয়া হত সেই সময়। অনেক হিন্দু রাজা বা জমিদারও সেই উপাধি পেতেন এবং ব্যবহার করতেন।

ক্রমশঃ

ছোটগল্প || গহনা এবং…. || ©মোনালিসা সাহা দে

ছোটগল্প

|| গহনা এবং…. ||
©মোনালিসা সাহা দে

সন্দীপ এক প্রতিষ্ঠিত যুবক। তার জীবনে কোনো কিছুরই অভাব নেই। তবু কয়েকদিন হলো সে চিন্তিত। এর কারণ তার সদ্যবিবাহিতা বউ। যে মেয়ে তাকে সবসময় আনন্দে ভরিয়ে রাখত সেই পল্লবী এখন মাঝেমাঝে গভীর রাতের দিকে কেন যে এরকম বিমর্ষ হয়ে যায় সন্দীপ নিজেও বুঝতে পারে না।

ঘটনাটা প্রথম সে মাস খানেক আগে লক্ষ্য করেছে। অত রাতে তার ঘুম সচরাচর ভাঙে না। তবু একই ঘটনা সে দু তিন বার লক্ষ্য করলো বৈকি! এমনিতে আগে পল্লবী সবসময় খুশীতে ডগোমগো থাকতো। নতুন বিয়ে হলে যেমনটা হয় এই আর কি! কিন্তু এখন গভীর রাতে কেন যে সে মনমরা হয়ে থাকে কে জানে! কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে সে নিজের দুই হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। আয়নাতে নিজেকে দেখে! যদিও জিজ্ঞাসা করলে কিছু না বলে চুপ করে শুয়ে পড়ে। মজুমদার পরিবারে খুশীর রেশে কি কারও নজর লাগলো বুঝি?

এই তো কিছুদিন আগেই বাড়ির একমাত্র ছেলের বিয়ে হওয়ায় সকলে আনন্দে মেতে উঠেছিলো। যদিও বিয়ে হয়েছিল আচমকাই। হুট করে পল্লবীকে বিয়ে করে নিয়ে এসে হাজির হয়েছিল সন্দীপ। লোকাল বাসে আলাপ, যাকে বলে প্রথম দর্শনেই প্রেম! স্বজনহীন, গৃহহীন, মেসে থাকা মেয়েটির দুঃখের কথা শুনে সন্দীপের মনে মায়া চলে এসেছিলো। গ্রামের ভিটে বাড়ি বেচে আসা মেয়েটির অল্প সম্বলে কতদিনই বা চলবে? ফোনে কথা শুরু হলো নিয়মিত।

একদিন দুপুরে…

– এই তুমি এভাবে একা কতদিন থাকবে পল্লবী?

– একা থাকা ছাড়া আমাদের মতো অনাথ মেয়েদের আর কোনো উপায় আছে কি?
পল্লবীর গলাটা সেদিন বড্ড ধরা ধরা শোনাচ্ছিল।আহা রে! মেয়েটার চোখে জল এসেছিলো নিশ্চয়!

– আমাকে বিয়ে করবে তুমি?

ওদিকে অদ্ভুত রকমের নীরবতা নেমে এসেছিল। সন্দীপের মন ছটফট করছে। কি উত্তর দেবে পল্লবী? কিন্তু সন্দীপ যে পল্লবীকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করার কথা আর ভাবতেও পারছে না।

বেশ কিছুক্ষণ পরে নীরবতা ভাঙলো।

– তুমি কি ভেবেচিন্তে বলছ?

– হ্যাঁ, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি পল্লবী।

– কিন্তু আমি কি তোমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য?

– ভালোবাসা কি অত ভেবেচিন্তে হয় পল্লবী? আর তুমি অযোগ্য, এটাই বা ভাবছো কেমন করে? কোনো কিছু বিচার করেই ভালোবাসা হয় না, তাতে ভালোবাসা আটকে রাখা যায়ও না। ভালোবাসা তো শুধু ভালোবাসার জন্যই হয়।

পল্লবী ফোনে কিছুক্ষণের জন্য আবার নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল।

– কি হলো? কি ভাবছ?

– তুমি আমাকে কতটুকু চেনো সন্দীপ? কদিনের আলাপেই…

– যেটুকু চিনেছি তাই যথেষ্ট। আমি জীবনসঙ্গী হিসেবে তোমাকেই চাই।

এর পরেও পল্লবী চুপ ছিলো।

– এখনও কি ভাবছো তুমি? আমি তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করব। আমাদের উচ্চবিত্ত পরিবার, আমি নিজে বড় সংস্থায় চাকরী করি। তুমি এ বাড়িতে রাণী হয়ে থাকবে।

– আচ্ছা তবে তাই হবে!

সন্দীপ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিলো।
– একটা কথা বলব পল্লবী?

– বলো…

– আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসি, কোনোদিন মায়ের অবাধ্য হইনি। তুমি শুধু এমন কিছু বোলো না আমায় যাতে আমাকে মায়ের অবাধ্য হতে হয়! আমি পারব না গো। কারণটা জানো তুমি? শুনলে অবাক হবে। আমার মা আমার নিজের মা নয়, সৎ মা।

– সে কী!

– হ্যাঁ। আমি যখন খুব ছোট্টটি, আমার মা কলেরায় ভুগে মারা যায়। তারপরে বাবা এই মাকে বিয়ে করে নিয়ে আসে। কিন্তু এই এতদিন যাবৎ আমি মায়ের কাছ থেকে যা ভালোবাসা পেয়েছি, তাতে কোনোদিন অনুভুত হয়নি যে এ মা আমার নিজের মা নয়। জানো, মা কোনোদিন আমার জন্য নিজের বাপের বাড়িও যায়নি। আমি জানিও না আমার মামাবাড়ি কেমন। শুধু এটুকু জানি যে আমার মা কোনো এক গ্রামের মেয়ে, যেখানে মা আর কখনো ফিরে যেতে চায়নি। মা নিজের কোনো সন্তানও নেয়নি আমার জন্য। বুঝতে পেরেছ তাহলে, আমি মায়ের প্রতি কতটা অনুগত?

– বুঝেছি।

– চলো তাহলে বিয়ে করি। বাড়িতে বলি তোমার কথা।

– বাড়িতে বলবে, তারপরে বিয়ে হবে?

– সেটাই তো স্বাভাবিক!

– একটা কথা রাখবে আমার? শুধু একটা কথা!

– কি?

– আমাকে এখনই বিয়ে করবে তুমি?

– ও মা, সে কী!

– হ্যাঁ, চলে এসো স্টেশনের উল্টোদিকের বড় মাঠে। সকাল থেকেই একটুও ভালো লাগছিল না, তাই মাঠে হাওয়া খেতে এসেছিলাম। আমি ওখানেই বসে আছি। সঙ্গে শাঁখা, সিঁদুর আনতে ভুলো না যেন। আমাকে এই এক কাপড়েই বিয়ে করে নিয়ে গিয়ে আজ ঘরে তোলো। এই মাঠেই আমাকে বিয়ে করো। হয়তো একটু অবাক লাগছে শুনতে তোমার, তোমার মাকে না জানিয়ে তুমি বিয়ে করবে, কিন্তু বললাম যে জীবনে আর কোনো দিন কোনো কিছু তোমার কাছে চাইবো না।

সন্দীপ পড়ে গেলো দোটানায়। কি করা উচিত তার? এভাবে হুট করে বউ নিয়ে ঢুকলে বাড়িতে সমস্যা হবে না তো! কিন্তু পল্লবী তো বললো আর জীবনে কোনো কিছু চাইবে না সে। কিন্তু মা? মা রাগ করবে না তো! অবশ্য সন্দীপের উপর আজ অব্দি কোনো কারণেই তার মা কোনোদিন রাগ করেনি। আর এও তো তো ঠিক পল্লবীকে সে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে।

– কি হলো, কিছু বললে না যে!

– একটু ভাবি আগে।

– তাহলে তুমি ভাবো, আমি মেসে ফিরে যাই।

– না! ওখানেই থাকো তুমি। আমি আসছি। আমি আজই তোমায় আমার ঘরে বউ করে নিয়ে আসব পল্লবী।

ব্যাস! আর কি! বিয়ে হয়ে গেলো হুট করে। আচমকা বিয়ে হলেও মজুমদার বাড়ি আধুনিক মনষ্ক এবং সংস্কারমুক্ত মনের। তারা রীতি নীতি নিয়ে কোনদিনই মাথা ঘামায়নি। তাই এ বিয়ে তারা খুশী মনেই মেনে নিল। সন্দীপের মা এমন চমক পেয়ে সাময়িকভাবে একটু থমকে গেলেও বউকে ভালোবেসেই মেনে নিলেন। এ বাড়িতে তিনিই গৃহিণী। সন্দীপের বাবাও তার উপর কোনো কথা বলেন না। এমনিতে এ বাড়ি হিন্দু বাড়ি, অথচ পুজোপাঠের চল নেই। এক্ষেত্রে অবশ্য মজুমদার গিন্নী অর্থাৎ সন্দীপের মায়ের ভূমিকাই বেশি। পুজোপাঠে তার কোনদিনই মন নেই। তিনি শুধু সংসার করতে আর সাজগোজ করতে ভালোবেসে এসেছেন চিরকাল।

বেশ কিছু দিন কাটলো। পল্লবী অত্যন্ত সুন্দরী এবং গৃহকর্মী নিপুনা, এমন বৌমাই তো তারা চেয়েছেন বরাবর। ছেলে যে কবে মনে মনে পছন্দ করে বসেছিল একজনকে, তা তারা জানতে পারেননি মোটেই। তাই অনাথ মেয়েকে বিয়ে করলেও তার বংশ পরিচয় নিয়েও মাথা ঘামায় নি মজুমদার পরিবার। সন্দীপ নিজেও আশা করেনি পল্লবী এতটা চটপটে ও কাজের হবে, ঠিক যেন তার মায়েরই প্রতিরূপ। শাশুড়ি মাও আশা করেননি তার বৌমার এত গুণ থাকবে। রাঙা হাতে শাঁখা পলা নোয়া, পায়ে নূপুর ও আলতা যা সুন্দর মানায়, সকলের চোখ জুড়িয়ে যায়। মজুমদার গিন্নী নিজেও শাঁখা – পলা – নোয়া – আলতা, ভারী ভারী গয়না পরতে খুব ভালোবাসেন। আর পল্লবীর বেশী গয়না না থাকলেও রাঙা হাতে শাঁখা পলা নোয়া দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। আসলে পল্লবী নিজেও সাজতে খুব ভালোবাসে। তবে অনাথ হওয়ার জন্য তার বেশি গয়না লাভ হয়নি এখনও। তার স্বপ্ন একদিন তারও অনেক গয়না হবে। এমনিতেও শাশুড়ি মা তাকে খুব ভালোবাসে, তার প্রচুর গয়না। বাড়িতেও অনেক গয়না পরে থাকেন তিনি। অল্পকিছু গয়না তিনি তার বৌমাকে ভবিষ্যতে অবশ্যই দেবেন।

তারপরে এলো সেই দিন। যেদিন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটলো এ বাড়িতে। শাশুড়ি আর বৌমার মনোমালিন্য ঠিক কি নিয়ে ঘটে গেল তা এখনও সন্দীপ বুঝে উঠতে পারেনি। সেই সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে সে বাড়িতে পা দিয়েই অনুভব করেছিল যে তার মা ও বৌ এর মধ্যে কিছু একটা বিষয় নিয়ে মন কষাকষি হয়েছে। যদিও আসল ঘটনা সে জানতে পারেনি এখনও। কারণ সেই সময়টাতে তারা বাবা – ছেলে দুজনেই বাড়ির বাইরে ছিল। তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত মানুষ হলেও ঘরে তার মন টেকে না। মাঝে মাঝেই তিনি বাইরে বেরিয়ে যান বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। এদিকে সে নিজে তো এখন অফিসের কাজে এত ব্যস্ত থাকে যে বলার নয়। এদিকে কেউই মুখ খোলেনি। যদিও সন্দীপ জানার অনেক চেষ্টা করেছিল।

– কি হয়েছে মা?

– কি আবার হবে? কিছু না।

– পল্লবী, তুমি বলো কি হয়েছে!

– কিছু তো হয়নি, কি বলব আমি!

– তোমাদের মুখাবয়ব, বাড়ির পরিবেশ বলছে কিছু একটা হয়েছে, এদিকে তোমরা দুজনেই চুপ থাকবে?

এত কিছুর পরেও সন্দীপের জিজ্ঞাসার কোনো উত্তর না দিয়ে দুজনেই যে যার ঘরে চলে গিয়েছিলো। বাবাকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো কিছুই আন্দাজ করতে পারেনি সে। তার পর থেকেই সে আরও বেশী ভাবে খেয়াল করে পল্লবী যেন কেমন পরিবর্তিত হচ্ছে!

**

রাত তখন বেশ গভীর। সন্দীপ অঘোরে ঘুমাচ্ছে। পল্লবী আচমকাই উঠে বসলো। নাইট ল্যম্পের আলোয় নিজের হাত জোড়া মন দিয়ে দেখছিল সে। অনেক অনেক দিন আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে আজ তার। ছোটবেলার কথা।

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলো সে। ছোট থেকেই তাঁর একমাত্র শখ বিয়ে করে সংসার করার, সুখে ঘরকন্না করার।

– মা, আমার যখন বিয়ে হবে আমি খুব সুন্দর সুন্দর শাঁখা পলা পরব। আর অনেক সোনার গয়নাও থাকবে আমার।

– আচ্ছা রে মা, তাই হবে। বাবা! এইটুকু মেয়ে, কত পাকা পাকা কথা!

– এতে পাকামির কি আছে মা? তোমার হাত দুটো কত সুন্দর লাগে! আমি চাই বড় হয়ে আমার হাত দুটোও ঠিক এমনই সুন্দর লাগুক। কিন্তু তুমি গয়না পরো না কেন মা?

– মামণি, আমার কি আর টাকা আছে গয়না কেনার?

– আমি কিন্তু পরব মা।

– ভাগ্যে থাকলে তুই সুখের সংসার পাবি, সঙ্গে অনেক গয়নাও।

~ মা যে কেন অকালে চলে গেল? তারপরে হুট করে কিনা এমন ঘটে গেলো সেদিন আমার সঙ্গে!-
বিড়বিড় করে বলছিল পল্লবী।

– কি হলো তোমার আবার?
সন্দীপের ঘুম ততক্ষণে ভেঙে গিয়েছে।
পল্লবী কিছু না বলে আবার শুয়ে পড়লো।

সন্দীপ ততক্ষণে মনে মনে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে, এ বাড়িতে কারও কুদৃষ্টি পড়েছে নিশ্চয়। কিন্তু তার মা যে পুজো পাঠে বিশ্বাসী নয়। তাহলে সে কি করবে? অবশ্য পল্লবীর মধ্যে যে সব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাতে তার কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে, এমনটা হওয়াও অসম্ভব নয়। তবে কি সে তার বউকে একবার কোন মনোবিদের কাছে নিয়ে যাবে? তিনি যদি কোনো আশার আলো দেখাতে পারেন!

না! আর দেরী নয়। কাল সকালেই একজন ভালো মনোবিদের কাছে গিয়ে নাম লিখিয়ে আসতে হবে।
সন্দীপ আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো।

**

তখন ভোর আগতপ্রায়। ঘন কালো অন্ধকার ধীরে ধীরে অল্প অল্প আলোর স্পর্শে কমলা রঙে রঙিন হতে চাইছে। এদিকে পল্লবী তখনও জেগে। সম্পূর্ণ রাত দু চোখের পাতা এক করেনি সে। কোনো এক ভাবনা তার মনকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কি সেই ভাবনা?

না! এ বাড়িতে আর থাকা যাবে না! থেকে কোনো লাভ নেই। যে স্বপ্ন নিয়ে সে এ বাড়িতে এসেছিল, যে স্বপ্ন নিয়ে সে সন্দীপের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিল, তা তো পূরণ হওয়ার নয়। তার সত্ত্বা এবং তার শাশুড়ি মায়ের সত্ত্বা যে সত্যিটা বুঝতে পারার পরে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে! এক্ষেত্রে স্বপ্নপূরণের আশা করাটা বোকামী। তিনি নিজের মোহের দ্রব্য বৌমাকে কি কোনোদিন দিতে পারবেন?

সেদিন সন্দীপের প্রশ্নের উত্তর তারা দুজনের কেউই দেয়নি। কারণ সেই দুপুরে যে তারা দুজনেই দুজনকে চিনতে ও বুঝতে পেরে গিয়েছিল। তারপরেই ঘটে সমস্যার সূত্রপাত। আসলে পল্লবী সংসার করতে পারলেও শাশুড়ির গা ভর্তি গয়নার ভাগ কোনদিনই পাবে না। সন্দীপও মায়ের অমতে কোনো কিছুই করে না, আগেই বলে দিয়েছিল সে। তাই এমন আশা করাটাও আর উচিত না।

পল্লবী উসখুস করছে। একটু হলেও মায়া পড়ে গিয়েছিল তার বরের উপরে। কিন্তু এ মায়াতে জড়ানো তো তার সাজে না।

পাশেই শুয়ে আছে মানুষটা। অঘোরে ঘুমাচ্ছে। পল্লবী এক মুহূর্তের জন্য সন্দীপের কপালে হাত বুলিয়ে দিলো। সেই মুহূর্তে সন্দীপ এক স্বপ্ন দেখছে। তার স্বপ্নে আসছে ছোটবেলায় ঠাকুমার কাছে শোনা পেত্নী ও শাখচুন্নীদের গল্পকথা। ঠাকুমা বলতো, যেসব গহনাপ্রিয় মেয়েরা অবিবাহিতা অবস্থাতে সংসার করার বাসনা নিয়ে অপঘাতে মারা যায় তারা মৃত্যুর পরে শাখচুন্নি হয়ে ওঠে। এরা এমনিতে যে কারো বিশাল কিছু ক্ষতি করে, তা কিন্তু না। তবে এদের মূল উদ্দেশ্য হলো সংসার জীবনে সুখ পাওয়া, এবং গয়না লাভ করা।

সন্দীপ শাখচুন্নির গল্প শুনেছিল বটে, কিন্তু বাস্তবে ঠিক কেমন তারা, তার সম্পূর্ণ নিখুঁত ধারনা সকলের নেই। গল্পের সাথে বাস্তবের কিছুটা ফারাক থাকে বৈকি। তাই তো সন্দীপ এতোদিনেও তার মাকে চিনতে পারেনি! অবশ্য এতে ওকে দোষ দিয়ে লাভ কি? পল্লবীকেও তো সে চিনতে পারেনি। পল্লবীর মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পরেই বাবাও চলে গিয়েছিল। তার পরেই তো রেললাইন পার হতে গিয়ে সে নিজেও একদিন…

বিবাহিত জীবনে গা ভর্তি সোনার গয়না পরার মোহ-মায়া পল্লবীকে আবার নতুন করে অন্য সংসার শুরু করাতে চাপ দিচ্ছে আজ। যদিও তেমন সংসার পাওয়া খুব কঠিন, তবু চেষ্টা করে যেতেই হবে! এ মায়ার কাছে যে অন্য সকল মায়া তুচ্ছ। সন্দীপ বরং স্বপ্ন দেখুক, ভোরের স্বপ্ন।

দিনের আলো ফোটার আগেই জানলা দিয়ে উড়ে বেরিয়ে গেলো পল্লবী।

(সমাপ্ত)
© মোনালিসা সাহা দে

*#জীবনচক্রবেঁচেথাকার_ইতিকথা………. @ #মৌমিতা_মৌ

*#জীবনচক্রবেঁচেথাকার_ইতিকথা……….

@✍️ #মৌমিতা_মৌ©®

পরিপুষ্ট ভ্রুণের অন্তর্বর্তীকালীন গর্ভপাত,
জীবন বয়ে চলে একহাত ছেড়ে অন্যহাত।
পাহাড় চূড়া ছিল যেন মাতৃগর্ভের স্বর্গসুখ,
ধ্বস তবুও গিরিখাত বেয়ে বাঁচতে উন্মুখ।

শৈশব ঠিক যেন উচ্ছল এক আদুরে ঝর্ণা,
এ’কোল থেকে অন্য কোলের স্নেহের বর্ণা।
পাথরনুড়ির খেলা মেয়েবেলার ঘুম ভাঙাতে,
দিনকাটে স্বপ্নগুলো রামধনুর রঙে রাঙাতে।

আবেগের তীব্রতার উত্থানপতনে কৈশোর,
হঠাৎ কড়ানাড়ে চৌকাঠে বাস্তবতার ভোর।
ভালোবাসার আসার খবর শুনিয়ে তিতির,
পাইনের কুয়াশায় গেছে হারিয়ে; শূন্যনীড়।

পাথরে হোঁচট খেতে খেতে যৌবনের যাওয়া,
খরস্রোতা মনের হয়নি প্রেমেরসায়রে নাওয়া।
মহীরুহের শিকড়ের গর্তে আটকে পড়া জল,
বাঁচার লোভ দেখিয়েই জীবন করে চলে ছল।

ভাগ্যের কোপে এভাবে নদী হয় অন্তঃসলিলা,
বন্দি মৃতমনে রয়ে যায় কত স্বপ্ন কথা নাবলা।
শুকনো নদীখাত ভুলেছে গতিপথ গুমরে মরে,
রয়ে গেছে জলের ছাপ পাথরের গায়ে পাঁজরে।

এমনই কত জীবনচক্র শেষ হয় শূন্যতার মাঝে,
সবপেয়েও মানুষ করে হাহাকার সকাল সাঁঝে।
উৎস থেকে মোহনা নাপাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা,
পুড়তে পুড়তে ফুরিয়ে যাওয়ার বেজে চলে ডঙ্কা।
@✍️ #মৌমিতা_মৌ©®

এমজি একটা দুঃস্বপ্ন ****** রেশম লতা

এমজি একটা দুঃস্বপ্ন
রেশম লতা

আকাশ-মাটির মাঝে ঝুলে থাকা কলা আমার চাপামুখ খুইলে দিছে; যখন আমরা চারজন!
দু’হাজার আট, বারো, সতেরো আর বিশ
সর্বোপরি নিজ্জলা পবিত্র কলঙ্ক
কনটেন্ট ক্রিয়েটর স্টিফেন মুলার দেশের হয়ে আমাকে গায়েবী নিমন্ত্রণপত্র পাঠায়__
সেন্টপল এর উল কাহিনী এবং জর্জিয়ার তাপ নিয়ন্ত্রক আগুন_ গ্রীষ্মের উত্তপ্ত সভায় প্রেসক্রাইবড তৈরি করে।

তখন শহরের ঝুলন্ত সেতু দিয়া আমগো লরি ছুটতেই__ পরিচিত ওসি কিম, আলী, দেবুদারা পকেটে ঝাপটে ধরে আঙুল!
লতাবুর নতুন ধারার সামার সেমিনার উপভোগ্য ছিল কিন্তু ফিরতি টিকিট এমজি থামতেই সব স্বপ্ন শুকনা বাঁশের লাহান ফাইটা গেছে, ফ্যাসফাস ডেড্ডের!
বুধীতে বিড়িপোড়া দিন আর শালুক বেচা সময়
খোয়ানো আইলে সুড়কি ভাজে,
ও বাহে, আমি তো ভাজি ৮, ১২, ১৭, ২০
এক মাঘে বৃটেনের আলেস্তাজিয়ায় বিশকে বিষ ভাইবে মাইরা দেই এক প্যাক ; জাগনা অইয়া দেহি__
এমজির কব্বরখোলায় আমি লাশ, ওরা তিন দুঃস্বপ্ন!!!

সম্পাদকীয় কলমে গীতশ্রী সিনহা

সম্পাদকীয়

অন্ধকারে এ-র ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে
কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না
সকলের মাঝখানে স্থির শুধু প্রগাঢ় অন্ধকার
সকলের মাঝখানে স্থির হয়ে আছে সময়
শোনো ;
তোমাদের মধ্যে কেউ একজন শব্দ করে ওঠো…
তোমাদের মধ্যে একজন অপরজনকে গোপনে স্পর্শ করো, নাহলে অন্ধকার ঘুচবে কিভাবে !

প্রাসঙ্গিকভাবে, কবি মহাদেব সাহাকে স্মরণ করে বলি… ” বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই,
মন ভালো নেই ; ফাঁকা রাস্তা,শূন্য বারান্দা
সারাদিন ডাকি সাড়া নেই, একবার ফিরেও
চায় না কেউ পথ ভুল করে চলে যায়,
এদিকে আসে না, আমি কি সহস্র সহস্র বর্ষ
এভাবে তাকিয়ে থাকবো শূন্যতার দিকে ? ”
আজকের দোদুল্যমান অবস্থার মধ্যেও সুখে থাকতে হবে। মানবিক অনুভূতি সুখ সৃষ্টি করে। সুখ মনের একটি অবস্থা বা অনুভূতি যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তারমানে, সবই আমাদের সকলের নিজেদের হাতে। সঠিকভাবে সুখ পরিমাপ করা খুব কঠিন। সুখ একটি ঝাপসা ধারণা।
বিনোদনের খোলা আকাশ দিলাম তোমাদের মধ্যে ছড়িয়ে, আর একটু অপেক্ষা শুধু, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা জানাই প্রতি সংখ্যার লেখক কবিদের প্রতি। যাদের ছাড়া বিনোদনের খোলা জানালা এইভাবে উন্মোচন হতো না।
আজ এই পর্যন্ত, ভালোবাসা রইল অপার।
সম্পাদকীয় কলমে গীতশ্রী সিনহা

ঘুণপোকা অনুগল্প / গীতশ্রী সিনহা

অনুগল্প / ঘুণপোকা

গীতশ্রী সিনহা

————–

সাহিত্যপ্রেমী ভাবনা উদার গলায় আবৃত্তি করতে ভালবাসতো | স্কুল জীবন থেকে
নীতি , আদর্শের সাম্যবাদী রাজনীতিতে যোগ | প্রচ্ছন্ন তৃপ্তি আর গর্বে উজ্জ্বল ভাবনা , রক্ত
গরম করা স্লোগানে গলা মেলাতো |মুঠো ভরা অফুরন্ত জীবন , হাতভরা অঢেল সময় |
সাথে পায়ের তলে দাপিয়ে চলার মতো শক্ত মাটি |
——–“মেয়েদের এতো লাগাম ছাড়া চলতে নেই | পরের ঘরে যেতে হবে” —
আতঙ্কিত মা বলতেন প্রায়ই | রাজনীতির তার্কিক ঢং-এ অক্লেশে হেসে উড়িয়ে দিত ভাবনা ।

হতাশ মা বলতেন — ‘শেষে বুঝবি |’
আরম্ভ হয়ে গেল শেষের শুরু |

ভাবনার চাঞ্চল্য উদ্যমে মুগ্ধ অনুভব ব্যানার্জী গোধুলি লগ্নে হাত ধরে তার |
অনুভবের সমকালীন বর্তমান এবং আগামী ভবিষ্যত পূরণ করতে গিয়ে ভাবনা তার
নিজের ইচ্ছা গুলিকে কবে যেন হারিয়ে ফেলেছিল |সংসারের মানুষগুলো কেমন যেন অন্য
গ্রহের মানুষ হয়ে গেল | সেটা বুঝতে বুঝতে সময় চলে গেল অনেকটা |

সেদিনটা ছিল ওদের প্রান্তিক বিবাহবার্ষিকী | চলে গেল অনুভব | ভাবনাকে করে
দিয়ে গেল মূল্যহীন আর কেমন যেন অচ্ছুত অপরাধী | কখন যেন সমস্ত
রক্তক্ষরণ , হাহাকার, আর যন্ত্রণা পরিণত হয় অসহায় অনুভূতিতে |বন্ধনহীন -সঙ্গীহীন
মনে হতে লাগে নিজেকে | নিঃশব্দ চিৎকারে বলতে থাকে — চুপ ! চুপ !
চুপ হয় না সে | ভেতরের কে একজন বলতে থাকে ভাঙা রেকর্ডের মতন — তোমার ” তুমি ” টা কোথায় গেল ভাবনা !!!!!

মা-এর মুখ ভেসে ওঠে বেঠিক সময়ের চালচিত্র |
নিজেরই অলক্ষ্যে ঘূণপোকায় আক্রান্ত হয়েছিল ভাবনা |

“শরীর খেকো” *** -সান্ত্বনা

“শরীর খেকো”
-সান্ত্বনা

অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারেও
আমি বুঝতে পেরেছিলাম,
সে আমার শরীর চাইছে
আমাকে নয়…….
ও আমার কানের কাছে ভালোবাসার
স্বরলিপিতে গলা সেধে যাচ্ছিলো
আমি বুঝতে পেরেছিলাম,
ও না কোনো প্রেমিক পুরুষ
না কোনো ভালোবাসার সুর সাধক।
শকুনের দৃষ্টি ভাগাড় অব্দি
জীবন্ত লাশের উপর হামাগুড়ি দিয়ে
মাংস পিণ্ড চটকে চটকে রক্ত চুষে খায় ওরা
রাতের অন্ধকারে নিশাচর হয়ে
শরীর খোঁজে হন্যে হয়ে।
আমি ওর গায়ের গন্ধে বুঝেছিলাম,
ও কোন মানুষ নয়,কৃত্রিমতায় ঢাকা
একটা জানোয়ার,
হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম
কুচি কুচি করে কেটে পায়ের তলায়
পিষে দেব বলে।
কিন্তু ফুলি,কুসুম,জরিনা এরা….?
যারা অস্ত্র বিহীন নেতিয়ে পড়া ঘাসফুল!
যারা আত্ম রক্ষার জন্য প্রতিরাতে
গুটিয়ে থাকে রেল লাইন,ফুটপাত কিংবা
পরিত্যাক্ত কোন গৃহ বারান্দায়!
রাত বাড়তেই হায়নার চোখ চকচক করে ওঠে,মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসে পা টিপে টিপে। শকুনের উড়ে যাবার পতপত শব্দে
ঘুম ভেঙে যায় ফুলিদের
ভয়ার্ত দৃষ্টি মেলে তাকায় এদিক ওদিক,
তারপর………..??
তারপর এক সময় শরীর খেকোর
শিকার হয়ে যায়।

ভালোবাসা – মন্দবাসা —- সাকিরা সুলতানা

ভালোবাসা – মন্দবাসা
——————————
সাকিরা সুলতানা

যে ভালোবাসায় উন্মত্ততা নেই, মন্ত্রমুগ্ধতা নেই, রোমাঞ্চকর কোন ব্যাপার নেই
তাকে আমি মন্দবাসা অথবা দৈন্যদশা বলি!
ছক কেটে আবেগের রুপান্তর ঘটে না; ছকবন্দী মন প্রাণহীন হয়ে পরে ।
একজন প্রকৃত প্রেমিক মন সবসময়ই চিরসবুজ!
একটি সত্যিকারের ভালোবাসায় সর্বাঙ্গীণ সৌন্দর্য উঠে এসে একে-অপরকে অকৃত্রিম বাঁধনে বেঁধে দেয়। ভালোবাসা প্রাণ পায়! মন্দবাসায় বসবাস রীতিমতো বিভীষিকা!
সারাক্ষণ মরিচীকার মতো যবনিকা!

Title :Bittersweet Love

In love, no frenzy, no crazy schemes,
No enchantment, no thrill-filled dreams.
I call it sadness or a state of low,
When passion’s fire starts to slow.

Emotions don’t twist, they stay the same,
The heart grows numb, like an idle flame.
A true love blossoms, pure and divine,
Binding souls together in a magical line.

Love finds beauty in every part,
Creating a bond, a work of art.
Love breathes life into our very core,
While sadness resides in a monotonous bore.

A stagnant pond, where sorrow resides,
No vibrant colors, just dull tides.

আরও একটি কবিতার জন্ম হোক **** শান্তময় গোস্বামী

আরও একটি কবিতার জন্ম হোক

শান্তময় গোস্বামী

আরও একটি কবিতার জন্ম হতে যাচ্ছে…
মহেঞ্জোদারোর যক্ষিণীর মতো নগ্ন-সুন্দর আর স্বাধীন।
জন্ম-স্বাধীন কবিতার মগডাল থেকে ভোরের একমুঠো আলো-বাতাস নিয়ে
আসনপিঁড়ি পেতে বসে এসে আমাদের দিনশেষের পান্তার পাতায়।
কবিকে বললাম, তোমার মন তো পড়ে আছে ধানজমি আর
লোকমুখর হাটবাজারের খেলায়…
তুমি নাগরিকতার শিকল কেনো পরো?
কবি হাসেন স্বাধীনতা হাসে যেভাবে।

উনিশ-শ’এগারোতে একবার আমি সেই হাসির বিদ্যুতে মগ্ন হয়ে
প্রবীণ কবিদের হাঁটতে দেখেছিলাম মহানগরের পথে জ্যোৎস্নাদের সাথে
জ্যোৎস্না তো আমাদের আকাঙ্খার সহোদরা,
আমাদের মনোবাসনার দীপাবলি।
আমি একটি কবিতার শরীর সৃষ্টি হতে দেখছিলাম,
আমি ভাষার দাঁতের ফাঁকে দেখতে পাচ্ছিলাম
সেই কবিতার উপাদানের রক্তাক্ত পঙক্তিমালা…
সেখানে বেদানার শাঁসে-বীজে লুকোচুরি খেলা চলছে,
ভাঙাচোরা সময়ের নাভিমূলে মাইকেল জিংসেনের
বেশ্যাদের নিয়ে গানের কলি নাচছে ত্রিভঙ্গ মুরারির মতো।

আমি দেখেছি শোষক আর শোষিতের যৌথসম্মেলন
নক্ষত্রপল্লীর মতো নিজস্ব অরবিটে ঘুরপাক খাচ্ছে,
খুঁজে পায়নি বাংলার কক্ষপথে প্রবেশের গোপন পাসওয়ার্ড।
আমরা এখনও বলতে পারি না পৃথিবী মানুষের…
সাদা বা কালোদের নয়, হতদরিদ্র শ্রমিকের নয়…
পীত ও হলুদাভদেরও নয় এ-পৃথিবী,
বাঙালি নামক মিশ্রদের কবজিতে যে স্বাধীনতা
গোত্তা খেয়ে পড়েছিলো জুলাইয়ের বৃষ্টিভেজা ঘাসে,
সেখানেও কবিতা ছিলো অজানা চেতনার ভাঁজে ভাঁজে।

আমি আরও কিছু কবিতার জন্ম দেখবো বলে
আশ্বিণ-কার্তিক-অগ্রহায়ণ-পৌষ-মাঘ-ফাল্গুন-চৈত্র-বৈশাখের মতো
চক্রাকারে ঘুরছি, খুঁড়ছি মাটি আর বুনছি বীজ…
পৃথিবীর উর্বরতম মাটিতে স্বাধীনতাই হবে সেই শ্রেষ্ঠ কবিতা।

তোকে প্রণাম করাই উচিত …. অপর্ণা সিনহা

তোকে প্রণাম করাই উচিত
…………………………………….
অপর্ণা সিনহা

তুই বুঝিয়ে দিলি বন্ধু,
এই জীবন যে কতটা মিথ্যা।
পৃথিবী ও তার জীব যে কত তুচ্ছ,
কতটা অহেতুক, অপ্রাসঙ্গিক!

তুই বুঝিয়ে দিলি রে
এই যে আমি আমি করছি
এটা যে কত লজ্জাকর,কত ঘৃণার,
শুধু একটু ভালো সময় দিতে পারা।
আশেপাশে ছড়িয়ে দেয়া সুখ,
কিংবা সুখের অনুভুতি গুলো ছাড়া
কিছুই ফেলে যাবার নেই তোর!

তুই শিখিয়ে গেলি রে, আমিত্বকে
কি করে ছুঁড়ে ফেলতে হয়!
অল্প সময়ে যেটুকু তোর সম্বল
নিশ্চয়তা আর বিশ্বাস জমা রাখলি।
আমাদের চামড়া ভেদ করে পাঁজরে-
সেগুলো আমাদের সম্বল থাক বন্ধু!
কতটা ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেলি
এই পাঁজর,এই বুকের ভেতরটা
সে সব না হয় চাপাই থাক বন্ধু!

তুই শিখিয়ে দিলি কি করে নীরবে
নিঃশেষ করতে হয় পানপাত্রের বিষ,
একা একাই সয়তে হয় সেই জ্বালা!

তুই বুঝিয়ে দিলি তুই পথপ্রদর্শক
আমাদের সকলের আদর্শ, ভালোবাসা
হে শক্তি, তোর কাছে নতজানু হলাম

তুই জানিয়ে গেলি, ভালোবাসা কি!
কী করে সকল কষ্ট হৃদয়ে ধারণ করে
হাসি মুখে বিদায় নিতে হয় গোপনে!
লজ্জা লজ্জা লজ্জা! ধিক্ নিজেদের!
আমরা তোর উপযুক্ত ছিলাম না,

তুইই বুঝিয়ে দিলি,তুই কত অসাধারণ,
আমরা কত তুচ্ছ বন্ধু, তাই আজ
আমার ও আমাদের প্রণাম নিস !
-অপর্ণা সিনহা (ত্রিপুরা)