গীতশ্রী সিনহা, সম্পাদকীয় কলম, বিনোদন বিভাগ

সম্পাদকীয়

সদর দরজা খুলতেই লাশ ঘরে লাট খাওয়া প্রিয়জনের শরীরের গন্ধ সময়ের খেলায় ! অগণিত মানুষের রুজিরোজগার বন্ধ, বহু বন্ধ স্কুলের ভিতর থেকে ভুতুড়ে ঘন্টার হাহাকার। প্রযুক্তির দৌলতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর মুঠোর মধ্যে আজ।
শব্দ স্তব্ধ, ভোঁতা কলমের আঁচড়, ধিক্কার আর ছিঃ ছাড়া ভাষা নেই! নির্বাক-ধূসর দুনিয়া। জ্যান্ত সভ্যতায় চুঁইয়ে পড়ছে অসভ্য নেশা। ভয়ংকর এক পরিস্থিতির শিকার সময়ের গায় বেয়ে! দখলদারি চলছে নারী শরীরের উপর। ভুলতে বসেছে, একজন নারী তোমাদের মা, বোন, স্ত্রী এবং কোলের শিশুকন্যাটি। বর্বরোচিত নির্যাতনে নারী সমাজ আজ লাঞ্চিত অসুস্থ। প্রশাসনের হাস্যকৌতুক চলছে যেন ! সম্পর্ক ঢিলে…আলগোছে ফাঁক রেখে দেয়.! প্রতিদিন আসে… মুছে যায় গতকাল… কোটি কোটি মামলার কাছে ফিকে হয় বর্তমান।
ধর্ষিতা হচ্ছে সমাজ, সংসার, মানবিক বোধ, সামাজিক উন্নয়ন। ধর্ষিতা হচ্ছে হাজার স্বপ্ন। লজ্জিত হচ্ছি আমরা এরকম দেশের নাগরিক হিসেবে। নষ্ট সময়কে ধরে চলছে লোফালুফি খেলা, কতিপয় মানুষ আজ বিপন্ন-বিস্ময়ের সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে। নিষ্ঠুরতায় নষ্ট মানুষের তান্ডব মিছিল – ভোগ – বিলাস – কাম লালসায় ডুবতে চলেছে সময়। চরম ক্ষুধার শিকারের দখল দুনিয়াদারি। বিচারের দরজা বন্ধ মুখোশের প্রহসনে… খবরের কাগজে গালভরা গল্প, যেন অনাহারে মহাভোজ। সভ্যতার বলিষ্ঠ শরীর আর্তচিৎকারে হাহাকার।
আজ যেন কাজের কথায় ফিরতেই পাচ্ছি না, কিছু তো বলতেই হবে। দেখতে দেখতে বছরের পর বছর অতিবাহিত করলাম আমারা প্রিয় কবি শিল্পী বন্ধুদের হাত ধরে। মন্তব্যের অপেক্ষায় থাকলাম।
ফেব্রুয়ারি মাস বেশ কিছু দিবস নিয়ে ঠাসাঠাসি, হোক না ব্যবসায়িক দিক ! দিবসকে পুঁজি করে সম্পর্কের বন্ধন মজবুত করি, তবেই তো সার্থকতা !
শুভেচ্ছা শুভকামনা সতত সকল পাঠক সমাজের জন্য। প্রতিটি সংখ্যা একটি নিজস্বতায় নিমগ্ন থাকুক আশাকরি। প্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ থাকুক। আগামীতে নতুনভাবে নতুন নতুন লেখার মাধ্যমে কবিদের নাম সংযোজন হোক।
আগামীর অপেক্ষায় থাকলাম আমরা সবাই।
গীতশ্রী সিনহা, সম্পাদকীয় কলম, বিনোদন বিভাগ।

।। চাঁদের বুড়ি ।। অণুগল্প ।। কলমে – মনোজ দাশ

।। চাঁদের বুড়ি ।। অণুগল্প ।।
কলমে – মনোজ দাশ

ভারতের চন্দ্রযান চাঁদে যাচ্ছে। চাঁদের চারপাশে তার ঘুরপাক খাওয়া শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। আজ তার নামার পালা। এই নিয়ে দেশ জুড়ে খুব হৈচৈ। টিভি খবরের কাগজ সব জায়গায় সেই ছবি। সবাই যাতে দেখতে পায় সেই দৃশ্য, তার জন্য স্কুলে আজ ছুটি। স্কুলের ক্লাস টিচার ক্লডিয়া মিস বাচ্চাদের বলে দিয়েছেন ছবি এঁকে নিয়ে যেতে। চাঁদ আর চন্দ্রযানের ছবি। বিকেলে পার্কে খেলতে না গিয়ে কুহু তাই বসেছে সেই ছবি আঁকতে।
পাতার পর পাতা ছবি আঁকছে। কিন্তু কোনোটাই ভাল লাগছে না। চাঁদ যেন ঠিক চাঁদ হচ্ছে না। সবসময় কেমন গোল্লা মতন হয়ে যাচ্ছে। চাঁদ কেন গোল্লা হবে?
ভেবে ভেবে যখন অস্থির কুহু, তখন দাদু বলল — চাঁদের বুড়ি না থাকলে চাঁদকে তো গোল্লা মনে হবেই। তুমি বুড়িকেও আঁকো দেখি।
অম্নি চাঁদের মধ্যে বুড়িকে আঁকতে বসল কুহু। চাঁদের বুড়ি চরকায় সুতো কাটছিল, চন্দ্রযানকে দেখে হাত তুলে ডাকছে — এরকম আঁকল। এবার চাঁদকে খুব পছন্দ হল কুহুর।
মায়েরও খুব ভাল লাগল ছবিটা। তবু বলল, বিজ্ঞানের মধ্যে রূপকথার গল্প দেওয়াটা কি ঠিক হল? সবাই হাসবে না তো? চাঁদের বুড়ি তো কল্পনা। মিথ্যে।
কুহুর দাদু হেসে বলল, কল্পনা কেন মিথ্যে হবে! কুহুর পৃথিবীতে যে চাঁদ আছে সেখানে চাঁদের বুড়িটাই তো সত্যি। সুকান্তর কাছে চাঁদ ঝলসানো রুটি হতে পারলে কুহুর কাছে কেন চরকায় সুতো কাটা বুড়ি হতে পারবে না?

❞ আবর্ত ═══════ ࿐ Bhaskar Sarkar ©️

❞ আবর্ত

═══════ ࿐

Bhaskar Sarkar ©️

নদীঘাট পার করেও এক আজনবী ব্যাগে প্রেম কিনে বাড়ি ফিরবে।

এই পণ ━━━━━

কিন্তু কিনতে গেলে তাকে পড়তে হবে মহা বিপদে!সামনেই নিষ্ঠার লাইন।

নিষ্ঠা চায় ভক্তি
কে// ভক্তি চায় ভাব কে// ভাব চায় মহাভাব কে// মহাভাব দেখি চাইতে যাবে প্রেমকে…

এই সুযোগেই খপ করেও ধরে ফেললো প্রেমের লাইন ━━━━━
অনেক ভিড় তো;- পদদলিত হয়ে মারাও যেতে পারে!

আবার ঘরে আনতে আনতে প্রেম ট্রেম মুছেও যেতে পারে!

কিংবা –
কোনোখানে ওই মোছা প্রেমই পুনরায় ফিরে পেতে চাইবে কেউ // হয়তো অন্য কোনো আজনবী লাইনে দাঁড়িয়ে একটি নিষ্ঠা কিনে বাড়িতেও ফিরতে থাকবে ━━━━━

এই ফাঁকে
নদীঘাট পার করিয়ে আর এক আজনবী ওই আজনবীর কাছ থেকে নিষ্ঠাখানি চুরি করে নেবে !

এই পণ ━━━━━

☘️

তোমাকে একটি ফুল ***** রেশম লতা

তোমাকে একটি ফুল
রেশম লতা

বলেছিলে ভালোবাসা করতে__
করেছি, তোমাকে নয়, তাকে; যাকে তুমি চেনো না
দেখোনি কখনো
হয়ত জানো না এখনো সে আমাকে ভালোবাসে
আমি বাসি না, তাই তোমাকে একটি ফুল__
জানি নেবে
বিনিময় ছাড়া যা দিয়েছো তারচে অতি নগন্য এটা
হয়ত চেয়েছিলে ওটা যেটা আমি দিয়েছি তাকে
যাকে তুমি চেনো না, দেখোনি কখনো
হয়ত জানো না এখনো সে আমাকে ভালোবাসে
আমি বাসি না তাই তোমাকে একটি ফুল__
জানি নেবে
তুমি স্বভাবতই ভদ্র
ইতালিয়ান পুরুষের ন্যায় দেহের গড়ন
সিঁথি করা সিল্কি চুল, উপন্যাসের নায়কের মত গোফ, স্বচ্ছ প্রকৃতির মত চোখ আর গণিতের সেকেন্ড ব্রাকেটময় এ্যাস বর্ণের ঠোঁট; ওহ্ কি মায়াময়!
মধ্যবয়সী দুপুর নিয়ে অনাবৃত পাঁজর খুলে সেবার যখন ডেকেছিলে
হেসেছিল আবদ্ধ সময়
এই তো সদ্য তাকে ভুলতে শিখেছি, তুমি যাকে চেনো না
দেখোনি কখনো।

বসুন্ধরা / অণুগল্প ***** গীতশ্রী সিনহা

বসুন্ধরা / অণুগল্প
গীতশ্রী সিনহা

চোখে ছিল অচেনা ভাষা, নিবিড় অনুভূতি , সঞ্চিত তৃণ যত্নে লালিত আবেগ – তুফান সরিয়ে দিতে পারে নি বসুন্ধরা। কথোপকথনে আদুরে প্রলেপ, কাছাকাছি চলে এসেছিল। কথা হতো ফোনে… দেখা হয়নি।
সামাজিক দুর্যোগ কে আড়াল করতে বেদ, উপনিষদ, চন্ডী, গীতার শক্তিকে সাথে নিয়ে চলতো বসুন্ধরা। কিন্তু, কোনো শক্তির কবজ বাধা দিতে পারেনি শেষ পর্যন্ত । যে ঐশ্বর্যের বিশ্বময় খেলা চলছে … তার স্পর্শ কতজনের ভাগ্যে জোটে !
অনুভূতি -আবেগ তাড়িত চোখের গভীর ভাষা নিয়ে সুভান আজ সামনাসামনি দাঁডিয়ে …

শুধু হাতটা ধরে বসুন্ধরা আলতোভাবে …
যে বাতাস ছুঁতে পারে না, যে বাতাসে গাছের পাতা দোল খায় না, শুধু মাত্র ওদের দু’জনের মধ্যে বয়ে চলে বীজমন্ত্র , অলীক প্রকৃতি পূর্ণতা পায়… ক্ষয়িত কষ্ট শুরু হতে থাকে।
হিমালয় আজ দুয়ারে দাঁড়িয়ে… তাও কি সম্ভব !!!
দুটি অসম মন – অদৃশ্য শক্তির সামনে স্বীকারোক্তি করে চলে … আমরা অঙ্ক বুঝি না –কবি, শিল্পীর সময়-সাগর থেকে অদৃশ্য শক্তির ভাষা উচ্চারিত হতে থাকে জন্ম তারিখ আমরা মানি না ! সদ্য স্নান করে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে দেখেছো কি ! খুঁজে পাবে না জন্ম তারিখ ! চিহ্ন নেই শরীরে কোথাও !!!!
চোখের কিছু দেবনাগরী ভাষা রুমালের ভাঁজে সংরক্ষিত হয়ে চলে… বসুন্ধরা আজ সোহাগিনী রাধা যেন। আহা ! জন্মে দেখি বাঁশবন, শালুক জলে ভাসে, ভাসে শ্রীরাধার কাঁখের কলসি… সূর্যাস্তের আবহমান দৃশ্য থেকে ফিরে আসে চোখ… কে যেন, যৌবনে তাকে নিবেদনকরে পদাবলী, তখন তার চোখে আঁতিপাঁতি জল… মরণ ঘনায় যেন তিলে তিলে ! যে বিষাদ সে লুকিয়েছে তাকে যদি অন্ধকার বলি, সে কথা কি আড়ম্বর কিংবা গোপনে অশ্রুপাত? বসুন্ধরার শরীর চুঁইয়ে মেঘ গোধূলিলগ্নের বৈরাগী।
সুভান, যে কৌতূহলে উদ্ভাসিত আত্মমগ্ন নিঃশব্দ বিলাপ, প্রেমের দুয়ার ঘিরে ভ্রমি আমি অস্থির উন্মাদ পাথাল উথালি ঢেউ।
অন্ধকার ঘনিয়েছে আঁচলের ভাঁজে, বাতাসে ওড়াউড়ি অলৌকিক সময় ছুঁলেই বিস্ফোরণ, এতোদিনের আদুরে লালিত স্মৃতি আজ ম্লান।
বসুন্ধরার মন জুড়ে জলতরঙ্গ বাজে নতুন গল্পের শুরু হবে আজ… ” একলা মেয়ে আর চাঁদ “…
বাকি টুকু তোলা থাক কুলুঙ্গিতে, ব্যক্তিগত যত ছিল অধ্যায় ধারাপাতে লেখা থাক অবশেষে।

ঘটা করে কাল পালিত হল ভালোবাসা দিবস

ঘটা করে কাল পালিত হল ভালোবাসা দিবস।
********
সত্যিই কি ভালোবাসা আছে?
নাকি মিথ্যে ভালোবাসা নিয়ে আদিখ্যেতা মিছে……!!

“ভালোবাসার প্রেতাত্মা”
-সান্ত্বনা

ভালোবাসলেই গোটা শরীর ফ্রি
চোখের নেশায় যতটা পরিকল্পিত
কৃত্রিম শৈলীতে সুসজ্জিত ভালোবাসার
বহিঃপ্রকাশ, অন্তরের অতলান্তে
লালিত বিষাক্ত লালসার অদম্য
কামনা অভিলাষ।
ভালোবাসার বীজেই বিনষ্ট অঙ্কুরিত চারা
অলীক প্রেমের নাট্যাভিনয়ে মেতেছে ওরা।
স্বার্থে অন্ধ হরিদাসেরা চণ্ডীদাসের কঞ্চি
বড়শী দ্বিখন্ডিত করে যৌবনের সোম রস
আস্বাদনে ভালোবাসার কাম টোপ ফেলে
অত্যাধুনিক হুইল বড়শী হস্তে অপেক্ষমাণ।
ওয়াশিং মেশিনের যুগে ধোপানীরা
অর্ধনগ্ন শরীর মাজে….
শূন্যতার শোকধ্বনি শতখালির ঘাটে।
ভালোবাসার অপমৃত্যু হয়েছিলো নক্সীকাঁথার মাঠে,সোজন বাদিয়ার ঘাটে
প্রকৃত ভালোবাসা সমাধিস্থ অপবিত্রতার
নির্মম যৌনাচারে
মৃত ভালোবাসার প্রেতাত্মা
আজ কেঁদে মরে অন্তর্দারে

বিঃদ্রঃ শতখালির ঘাটে চণ্ডীদাস বসে থাকতো রজকিনীর অপেক্ষায়।

আমার কবিতারা ***** মধুমিতা ধর

আমার কবিতারা
মধুমিতা ধর

ভালবাসার ওপর থেকে বিশ্বাস হারালে কলমও সন্তর্পনে সরে দাঁড়ায়
যেন কত কালের অচ্ছুৎ আমি…..
বিদিত শব্দভান্ডার পথ অবরোধ করে।আমার হৃদয় অন্বেষা হতবিহ্বল হয়ে দেখে আমারই প্রজ্ঞার বিপথগামীতা….
তুমি হয়ত জান না
আমার কাছে ভালবাসা ও কবিতা সমার্থক।
ভালবাসা হীন কবিতায় আমি বিশ্বাসী নই
অথচ সেই ভালবাসার নির্যাসটুকু কেড়ে নিয়ে সেই তুমিই আমায় নিঃস্ব করলে
ভালবাসার লাশের উপরে বসে
আর যাই হোক্ কবিতা লেখা অন্যায়।
এক বুকবিস্তৃত মরুভূমিতে দাঁড়ায়ে সৃষ্টির বীজ পুঁতলে আর কি মহীরুহ জন্মায়!

তাই সৃষ্টির বিপরীত বধ্যভূমিতে
অপেক্ষায় শাণ দিতে দিতে হয়ত
পেরিয়ে যাব কোন দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর
কোনদিন হয়ত পাথুরে শব্দের গায়ে ফুটে উঠবে দু’এক কলি কবিতার চারা।
আর প্রতিটি পাতায় ফুটে ওঠে তোমার মুখাবয়ব
আসলে তুমি, ভালবাসা ও কবিতা
কাউকে ছেড়ে আমি বাঁচতে শিখিনি।

ভালবাসা আমাকে অমরত্বের সন্ধান দেয়
আমার কবিতারা অমৃতের সন্তান।

#ভালোবাসার_মরশুম (২) সৌমেন দত্ত

#ভালোবাসার_মরশুম (২)

সৌমেন দত্ত

প্রিয় মানুষটিকে জড়িয়ে
তার শিরায় শিরায় মিশিয়ে ছিলে নিঃশ্বাসের উত্তাপ,
তবুও বুঝতেই পারো নি মানুষ কি চায়…!
মনখারাপের রাতে জড়িয়ে কখনও জানতে চেয়েছো,” কি গো,মুখটা অমন লাগছে কেন..? ”
কিম্বা ঘুম ভাঙা চোখে হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরে বলেছো..” কি ভীষণ ঠান্ডা গো “।

হাজারো কাজের ফাঁকেও একটা ফোন দিয়ে বলুক,
” কি করছো,খেলে কিছু “,
একটু গা গরম হলেই কপাল ছুঁয়ে বলুক, ” একি!জ্বর তো, বলোনি কেন আমায়..?

সবাই চায় তার একটা প্রিয় মানুষ থাকুক, খুব কাছের,শুধুই নিজের,একমাত্র নিজের।
যে দূরে থাকলেও তার স্বর,ছোঁয়া যেন তাকে বারবার কাছে আগলে রাখে সযতনে।

ভুলে যায় জন্মদিনের রাতের সারপ্রাইজ,
ভুলে যায় প্রথম আলাপের ক্ষণ, ছোট বাপুজী কেক আর দেশলাই কাঠি হাতে,” কি রে এতো রাতে ভিডিও কল,হলো টা কি.?হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ ”
ওপারে থাকা প্রিয় মানুষটা আবেগে বানভাসি, ভালোবাসার সমুদ্রে উথাল-পাথাল ঠোঁটের কোণ।
ভুলে যায় প্রিয় রঙের অভিবাদন,
অর্থের ভীড়ে নিজ সারমর্ম ভুলে যায়।

প্রতিটি মানুষ চায় আগলে রাখার মতো বুক,আর দুটি হাত,
প্রতিটি মানুষ চায় তাকে কেউ প্রিয় চারা গাছটির মতো আগলে রাখুক চারপাশটা।

মন বড় অভিমানী, অল্পতেই সিন্ধু পাড় করে ফেলে,আবার অধিকেও বিন্দু খুঁজে পায় না।

সে চায় রাত জাগা চোখ দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে কেউ বলুক,” ঘুমোও নি কেন..!,কিসের টেনসন..? আমি আছি তো,সব ঠিক হয়ে যাবে “।
একলা ছাদে দাঁড়িয়ে আনমনা হয়ে থাকলে কাঁধে হাত রেখে তাকে বলবে ,” কি ব্যাপার কি ভাবছো একা একা..?”

শুধুই মনে মনে ভাবি আমরা,সামনে নির্বাক নিরুত্তর, ভাবি সিনেমায় হয় এসব,পুষে রাখি রাগ অভিমান গোপনে,
দুরত্ব বাড়তে বাড়তে মুঠোর বাইরে কখন চলে যায়,নাগাল পেতেই আলোকবর্ষ পেড়িয়ে যায়।

সত্যিই মানুষ বড্ড আবেগী,
ভিতরের জমা সব রাগ অভিমান আবেগের আদরের চাদরে হারিয়ে যেতে চায়।বাঁচার হাজারটা কারণ খুজে পায়।

মনের ভিতর হাজার অঙ্কের হিসেব অব্যক্তই রেখে দেয়,
পুষে রেখে দেয়,
খাঁচার বাইরে থেকেও বিচ্ছিন্নতা আঁকড়ে বাঁচে।

 

সৌমেন দত্ত

#স্মৃতি_রোমন্থন #বিষয়_সরস্বতী_পূজা

#স্মৃতি_রোমন্থন
#বিষয়_সরস্বতী_পূজা

সরস্বতী পূজা বলতে পুরোটাই স্মৃতি, অর্থাৎ সাড়ে তিন দশক আগের কথা। প্রথমেই যা চোখে ভাসে,তা হলো বাগান ভরা গাঁদা ফুল। কত রকম গড়নের,কত রঙের, কত বিচিত্র আয়তনের। তার মধ্যে যেটা বাসন্তী রঙের, সেটা রেখে দেওয়া হতো শুধু সরস্বতী পূজার জন্য। রাতারাতি চুরি তো হয়ে যাবেই, তাই আগের বিকেলে সাজি ভরে, ঝুড়ি ভরে ফুল তুলে নেওয়া হতো। অমনি সূচ সুতো নিয়ে বসে যেতাম মালা গাঁথতে। সমান আয়তনের ফুলগুলি বেছে নিয়ে কখনো একরঙা, কখনো দুই বা তিন রঙে সেজে উঠতো মালা। মনের উৎসাহ উচ্ছ্বাসও তাতে গাঁথা পড়তো নিঃসন্দেহে।
হারমোনিয়ামের বাক্সো নতুন চাদরে ঢেকে পেছনে একটা বড়ো নতুন বেডকভার ঝোলানো হতো। তার ওপর কাগজ কেটে নানা নকসা ফুটিয়ে সাজানো হতো। নতুন কাগজ সবসময় জুটতো না, পুরোনো ক্যালেন্ডারের উল্টো পিঠের সাদা দিকটা ব্যবহার করা হতো।
এদিকে আশেপাশের শরবন থেকে খাগ সংগ্রহ করে বাবা নিপুণ হাতে কলম বানিয়ে ফেলেছেন। ছোট ছোট দলে ছেলেমেয়েরা বাড়ির সামনে দিয়ে যেত নানান সামগ্রী নিয়ে, তাদের কাছ থেকে বেলপাতা,পলাশের কুঁড়ি, আমের মঞ্জরী জোগাড় হতো।
এর পরের আনন্দ ছিল দাদার সঙ্গে ঠাকুর কিনতে যাওয়া। স্টেশন সংলগ্ন বাজার থেকে ছোট বা মাঝারি মূর্তি ক্ষীণ আলোতে বেছে টেছে নিয়ে আসতাম, সঙ্গে ঘট, চাঁদমালা ইত্যাদি দশকর্মার বাজার। বাড়িতে এনে সেই মূর্তির যা অসম্পূর্ণতা আছে, যেমন বীণার তার, হাঁসের চোখ ইত্যাদি রং তুলির ছোঁয়ায় পূর্ণ করা হতো। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে দেখে দেখে আর আশ মিটতো না। অনেক রাত অব্দি বারবার করে দেখতাম আমার নিজের হাতের ‘মণ্ডপসজ্জা’।
নিমপাতা, কাঁচা হলুদ, সর্ষে,আর সব কি কি বেটে যেন একটা মণ্ড তৈরি করতেন মা। তাতে সরষের তেল দিয়ে মাখা। সেটাকে মা বলতেন শ্রী। শ্রীপঞ্চমীতে ওটা মেখে স্নানের বিধি। চর্মরোগের প্রতিষেধক সন্দেহ নেই, কিন্তু ঐ শীতের ভোরে ঠাণ্ডা কনকনে ‘শ্রী’ মাথাটা বড্ডো আতঙ্কের ছিল। যাই হোক, কোনো রকমে শ্রীযুক্তা হয়ে স্নান সেরে মায়ের হাতে হাতে পুজোর জোগাড়। দোয়াতে দুধ ভরে ওপরে টোপা কুল দিয়ে খাগের কলমের সাথে রেকাবিতে সাজিয়ে রাখা, পুষ্পপত্রে নানারকম ফুল, বেলপাতা,চন্দন, দূর্বা এই সব নানা উপকরণ সাজিয়ে রাখা, ঘট, সশীর্ষ ডাবে সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক আঁকা এই সব।
এরপর পুজোর শেষে অঞ্জলি দেওয়া। সত্যি বলছি, ভীষণ ভক্তিভরে অঞ্জলি দিতাম। সারা বছর ফাঁকিবাজি ঐ ভক্তি দিয়েই পূরণ করার চেষ্টা আর কি! তারপর শাড়ি পরে স্কুলের পথে ছোটা। বাড়ি থেকে স্কুল ছিল দূরে, বাসে করে যেতে হতো। সঙ্গীসাথীর অভাবে প্রতি বছর যাওয়া হতো না। শাড়ি পরে নিজেকে সেদিন বেশ বড় বলে মনে হতো, কেউ অবশ্য পাত্তা দিত না। স্কুলেও পুজোর আগের দিন রঙিন কাগজের শিকলি বানানো, ঘট আঁকা, আলপনা দেওয়া, এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতাম। স্কুলের ঠাকুরকে প্রণাম করে প্রসাদ নিতাম। নানা রকম ফলের সঙ্গে ছোট ছোট দুটো নারকেল নাড়ু পেলে জীবন ধন্য হয়ে যেত। ক্লাস টেনের আগে স্কুলের খিচুড়ি খাওয়া হয়নি আমার। বাড়িতে এসে খিচুড়ি, বাড়ির গাছের বেগুন ভাজা, বাঁধাকপির ঘণ্ট, আলুর দম, কুল দেওয়া টমেটোর চাটনি, পাঁপড় দিয়ে সারা হতো মধ্যাহ্নভোজ। আহা! কী তার স্বাদ!
সারাদিন অনেকে আসতেন অঞ্জলি দিতে, প্রসাদ নিতে। কিন্তু সন্ধ্যার পর ভীষণ নির্জন হয়ে যেত বাড়ি। শঙ্খধ্বনিতে, ধূপধূনা, পঞ্চপ্রদীপে সন্ধ্যারতির শেষে একটু গান কবিতা আবৃত্তির দর্শকশূন্য ঘরোয়া আসর বসাতেন বাবা। দাদারা তখন চলে গেছে যে যার বন্ধুমহলে। বাবার আদেশে আমি গান গাইছি, আমার অনুরোধে বাবা আবৃত্তি করছেন। শ্রোতা আমার গর্ভধারিনী জননী আর স্বয়ং বাগদেবী। সমস্ত দোষ ত্রুটি ক্ষমা করে দু’জনের মুখেই স্মিত হাসি।
পরদিন ভোরে বেলপাতায় খাগের কলম দিয়ে লিখিত ভাবে মাকে প্রণাম জানানো হলে দধিকর্মা এবং দাদাদের সঙ্গে গিয়ে ঘট বিসর্জন। মূর্তি বিসর্জন দেওয়া হতো না, তিনি সারা বছর পূজিতা হতেন সম্বৎসরের ফাঁকিবাজি মেরামত করার দায় নিয়ে।
আমার এই প্রেমহীন, সঙ্গী বিহীন স্মৃতিচারণ কারোর ভালো লাগবে কিনা জানিনা, তবে মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত হয়ে আছে সব।
পরিশেষে একটি ছোট্ট ঘটনা বলি। তখন আমি কলকাতার বাসিন্দা, পাড়ার তিনটে কুঁচো বাচ্চা সরস্বতী পূজার চাঁদা নিতে এসেছে, নিয়মমাফিক সরস্বতী বানান জিজ্ঞেস করায় ঠিক উত্তরও দিয়েছে। টাকা বার করতে করতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর পূজা বানান কি?” দুচার বার ঢোক গিলে বলে, ‘প-এ হস্সু… উনতু য-এ আকার। টাকাটা দিয়ে দাও না!” হায় রে! শেষ রক্ষা হলো না। ওটা যে সিলেবাসের বাইরের প্রশ্ন!

কলমে -সুনৃতা রায় চৌধুরী ©

প্রতিচ্ছবির ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য ✍️ মহুয়া গাঙ্গুলী

প্রতিচ্ছবির ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য।
———————–✍️ মহুয়া গাঙ্গুলী।

শুরুতেই বলে রাখি, যেটুকু ভাবনা সেটুকুই উপলব্ধি জীবনের গল্পে।
কারন একটাই, জীবন আর মৃত্যু একইসঙ্গে দু’পিঠ বরাবরে এগিয়ে চলে।
তাই আমাদের কাছে “স্মৃতি” বলে যেটাকে তকমা দিই… সেটা আসলে গল্প। কারন প্রমান ছাড়া সবটাই বানানো মনে হয়। তাই সেক্ষেত্র ধরেই টেনে আনছি আজকের প্রসঙ্গ “ফেসবুকে অ্যালবাম বা ছবি বনাম সাহিত্য ।
“বদলাচ্ছে সব বদলায় না স্মৃতি, ছবিগুলোর যেন ভাসানোই রীতি ” এটা একদম আমারই মনের কথা।
আসলে লিখি মানেই পড়াশোনা সবসময় নয়
লিখি মানে শব্দের মায়াজালে অনুভূতির ছবি আঁকি।
তাই নিজেকেই যখন আয়নার সামনে দাঁড় করাই… সেখানেও কোথায়ও যেন নিজের ভিতরকেও আরো একবার আবিষ্কার করে ফেলি।
হ্যাঁ সেরকমই চাই প্রভাবিত করতে একজন পাঠকের উপলব্ধিকে..আসলে কথাতেই আছে “নিজেকে একবার আয়নার সামনে দাঁড় করাও… তারপর অন্যের বিচার করো।”
তবে তখনই মাথায় আসে সেই লাইন…” তুমি কি কেবলই পটে আঁকা ছবি..?” তারমানেই ঐ লাইনেই পরিস্কার..
ছবি থেকেই কল্পনা জন্মাচ্ছে। আলোর প্রতিবিম্ব আর প্রতিসরণ এগুলোর তো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অবশ্যই… কিন্তু আমাদের জীবনমুখী ভাবধারা, অনুভূতি, ..মগজ তথা পিটুইটারির ক্ষরণ দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। আমরা আসলে যাকে সাহিত্য বলি, সেটি আদতে নিজের অনুভূতি অথবা চাক্ষুষ যা কিছু সব‌ ব্যক্ত করি ভাষায়। ব্যাকরণ একটি ছক… যার মাধ্যমে সাহিত্য ধারার বিভিন্ন নামকরণ হয়েছে।
তবে সবকিছুর যেমন ভালোমন্দ দিক আছে , এক্ষেত্রেও এটিও ব্যাতিক্রম নয়…
যেমন, প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখাটা খুব জরুরী।
এমন অহেতুক ছবি সাহিত্যের উঠোনে জুড়বোনা..যেটি সাহিত্যকে ঢেকে দেবে…
প্রাসঙ্গিকতা কে তরান্বিত করতে ছবি একটা সম্পর্ক তৈরী করে। কারন যারা আঁকেন,তারাও একইভাবে একটি গল্প বা ভাব ফুটিয়ে তুলতেই মরিয়া হন।
আবার উপলব্ধি বিভিন্ন ভাবধারায় প্রভাবিত।
দেখা যায় একটা লেখা থেকে হাজার লেখা বেরিয়ে এলো বিভিন্ন ভাবধারায়।
ফেসবুক কথার অর্থ মুখ পুস্তিকা।
সাহিত্য যখন মলাটবন্দী পুস্তক.. তখন যেটি আমরা কল্পনায় আনতে চাই… মুখপুস্তিকা ( ফেসবুক) সেটিকে অনায়াসে প্রকাশ্যে আনতে পারে।
সবশেষে একটা কথাই বলি..
আমরা যখন যে লেখাই কলমে ধরি,
সার্বিক যতোই বলি, অস্বীকার করার জায়গা নেই, বেশীরভাগ পাঠক যেন লেখক/ লেখিকাকেই চরিত্র আকারে ভাবতে ভালোবাসেন। তাই ব্যক্তিগত প্রশ্নের সম্মুখীনও কিছু ক্ষেত্রে হতে হয়।
একটা লেখক/ লেখিকার সেখানেই মনেকরি সার্থকতা।©️✍️ মহুয়া গাঙ্গুলী।

গান্ধীর অ-হিংসবাদ এবং বিপরীতে সুভাষচন্দ্র বসু ******* দুলাল কাটারী

গান্ধীর অ-হিংসবাদ এবং বিপরীতে সুভাষচন্দ্র বসু

দুলাল কাটারী

ভারতীয় উপমহাদেশের দুই মহানায়কের একজন জাতিরজনক মহাত্মা গান্ধি আর অন্য জন রিয়েল হিরো নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু। এই দুইজনের রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা পর্যালোচনার এই পর্বের প্রথমেই বলে রাখি এই দুই মহান নেতার গন্তব্য ছিলো একই ;তা হলো ভারতমাতার স্বাধীনতা কিন্তু পথটা ছিলো অনেকটাই আলাদা।দুজনের মধ্যেই ছিলো অগাধ দেশপ্রেম। দুজনেই ছিলেন ভারতবাসীর রক্ষা কর্তা তাই দুজনেই ভারতীয়দের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন চিরস্থায়ী ভাবে। তবুও আজকের দিনে যদি আমরা রাজনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের আসরে গান্ধিজি ও নেতাজির রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কথা একসঙ্গে উপস্থিত করি তাহলে তর্কবিতর্কের মাত্রা অতিক্রম করে হাতাহাতি একটা খন্ড যুদ্ধও হয়তো হয়ে যাবে বিশ্লেষকদের মধ্যে,কারণ ভারতমাতার স্বাধীনতার এই বৃহৎ পর্বটিতে গান্ধিজি এবং নেতাজি দুজনেই সর্ববৃহৎ সময় উপস্থিত ছিলেন এবং সেই সময়কালে দুজনের মধ্যে নানা মতপার্থক্য চরমতম পর্যায়ে পৌঁছাতে দেখা যায়, যার ফল ছিলো সুদূরপ্রসারী।
* ১.নেতাজির কংগ্রেসে ইস্তফা দেওয়া। ২. ভগৎ সিং,শুকদেব, রাজগুরুর ফাঁসি। ৩.গান্ধিজির এক-একটা আন্দোলনের অমীমাংসিত পর্যায়েই তার প্রত্যাহার ধ্বনি তোলা
৩. গান্ধিজির একের পর এক অনশন ৪.এবং শেষ জীবনে মৌনতার জীবন যাপন ৫.প্রতিটি আন্দোলনে সরকারের পক্ষ থেকে রক্তমাখা হিংস্রতা উপহার হিসেবে পাওয়া।
৬.যে সরকার কথার চেয়ে গুলি চালায় বেশি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে অহিংস সত্যাগ্রহ কতটা দরকারী বা হিংসার পথ অবলম্বনেই বা কতটা লাভ হবে জাতির। ৭. আর কেনইবা বলা হচ্ছে যে গান্ধিবাদ হলো পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ানক হাতিয়ার।
– এই সব দিক বিচার করতে গেলে আগে যে দিক গুলিতে আমাদের আলোকপাত করতে হবে তা হলো **সমকালীন উপমহাদেশীয় সমাজচেতনা,রাজনৈতিক চেতনা এবং গান্ধিজি ও নেতাজির রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা এবং ওনাদের দুজনের চিন্তা চেতনার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্ম নৈতিক,জাতি গত এবং অর্থনৈতিক প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা।
ব্রিটিশোত্তর ভারতের ছবিটা আমরা যদি একটু অনুসরণ করি তাহলে দেখতে পাবো যে সাড়া ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে বেশ কিছু স্বতন্ত্র রাজ্যের অস্তিত্ব ছিলো এবং সেই রাজ্য গুলির রাজা, সামন্ত, বা রাজকর্মচারীরা জনগণকে এক গভীর অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখে নির্মম শাসনতন্ত্র কায়েম করে রেখে ছিলো। তাই একথা সকলেই জানে যে জনগণ দেশীয় শাসনেও খুব একটা ভালো ছিলো না বরং বেশ কিছু ক্ষেত্রে মধ্যযুগিয়ো বর্বরতা প্রকট রূপ ধারণ করে। মানুষ না পেতো বিচার, না পেতো বাকস্বাধীনতা, রাজার ইচ্ছাই শেষ ইচ্ছা ছিলো।বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভূমি পর্যায়ের সমস্যা গুলোতে স্থানীয় শাসনকর্তারাই নিজের মতো বিচার পরিচালনা করতো সুতরাং এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে প্রভাবশালীদের অত্যাচারের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত ছিলো। তথাকথিত স্বাধীনতা বলতে যেটা বুঝি তার নূন্যতমও ছিলো না।
***তাই যাদের জীবন মাত্র কয়েকজন রাজা বা সামন্ত চালিয়ে এসেছে এতো দিন তারা আজ একটা দেশ চালানোর দায়িত্ব কিভাবে নেবে? আবার যদি ভারতীয় উপমহাদেশে রাজতন্ত্র ফিরে আসে তার ভবিষ্যৎ কিইবা হবে?এতো বড়ো একটা দেশ কে চালাবে? কে কার তত্বাবধানে থাকবে? কবি গুরুর সেই মহান আদর্শ ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে ‘ সেটা প্রতিষ্ঠা পাবে তো? নতুন শাসকের ‘That government is the best which governs the least’ এই কথাটা হৃদয়স্থ হবে তো?
প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাকে এক বৃহৎ বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করলে দেশবাসী হলো তার ভূমি ভিত্তি স্বরূপ।এই ভূমি যদি মজবুত না হয় তাহলে সেখানে স্বাধীনতার ফসল ফলা সম্ভব নয়।এটা স্বামীজি, গান্ধিজি, নেতাজি সকলেই মনে প্রানে উপলব্ধি করে ছিলেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধিজির সম্পূর্ণ পদার্পণের আগে পর্যন্ত অধিকার প্রতিষ্ঠার দুটি উপায় ছিলো জনগণের হাতে তা হলো—
১. সাংবিধানিক প্রদ্ধতি অর্থাৎ শাসনতন্ত্রে অংশ গ্রহন করে কোনো বিলে সম্মতি বা অসম্মতি দেওয়ার মাধ্যমে নিজ অধিকার সুদৃঢ় করা। কিন্তু এক্ষেত্রে অসুবিধা হলো ব্রিটিশ শক্তি সাংবিধানিক পদ গুলো অধিকার করে আগে থেকেই বসে আছে তাই সংখ্যা গরিষ্ঠের বিচারে তাদের মতামতই প্রাধান্য পাচ্ছে।
২.দ্বিতীয়টি হলো আন্দোলন বা বিদ্রোহ অর্থাৎ মিছিল, মিটিং, ঢিল ছোড়া, পাথর ছোড়া,তীর ধনুক বা কিছু ক্ষেত্রে গোলাগুলিও চলত ইত্যাদি ইত্যাদি।
**#গান্ধিবাদ পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ানক হাতিয়ার।
গান্ধিজির সত্যাগ্রহ হলো এক চরম মানসিক এক্সারসাইজের প্রতিফলন। যায় প্রভাবে গান্ধি পেয়েছিলেন ফুলের মতো কোমল এবং পাথরের মতো কঠিন এক হৃদয়। এই সত্যাগ্রহের মাধ্যমে গান্ধিজি মানুষকে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারা যায় এটা বোঝাতে চেয়েছিলেন। তিনি মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে চরম সত্য কি, সেটা কেউই (সে সরকারই হোক আর জনগণই হোক) জানে না বা জানা সম্ভব নয়।কোনো সরকার;সে দেশীয় সরকার বা বিদেশি সরকার যে-ই হোক না কেন, সেই সরকার যখন তার দেশের মানুষের উপর কোনো আইন প্রনয়ন করে তখন সেই আইনের চরম তাৎপর্য, চরম প্রয়োজনীয়তা,চরম সত্যতা সেটা সরকারের পক্ষেও জানা সম্ভব নয় আর জনসাধারণেরও সেই চরম সত্যতা জানা সম্ভব নয় অর্থাৎ যে উদ্দেশ্য আইনটি প্রনয়ন করা হচ্ছে একমাত্র সেই উদ্দেশ্যটিই যে সঠিক বা সত্য উদ্দেশ্য সেটা বলা যায় না। আবার অন্যদিকে যদি এই আইনের কিছু বিরূপভাবকে সামনে রেখে জনসাধারণ আন্দোলনের পথে চলে তাহলে তাদের ( জনসাধারণের) উদ্দেশ্যটিও যে একমাত্র সঠিক বা সত্য সেটাও বলা যায় না। সুতরাং সহজ সরল ভাষায় বলতে গেলে বলা যায় সবকিছুই আপেক্ষিক। এবং এই আপেক্ষিকতার ভিত্তিতেই সরকার কোনো একটা আইন প্রনয়ন করে থাকে সাধারণত নিজের সুবিধার কথা ভেবেই অথবা জনসাধারণের একাংশের সুবিধার কথা ভেবে। ‘জনসাধারণের একাংশের সুবিধার কথা ভেবে’ এই কথাটা বললাম তার কারণ, এখানে একটা কথা স্পষ্ট করতে চাই যে, কোনো একটা আইনের প্রয়োজনীয়তা তখনই দেখা দেয় যখন কিছু জনসাধারণকে একটি নির্দিষ্ট দিকে তথাকথিত শৃঙ্খলা পরায়ণ করার প্রয়োজন মনে করে সরকার। ‘তথাকথিত শৃঙ্খলা পরায়ণ’ কথাটি বললাম তার কারণ সরকার যেটাকে ভাবছে আইনের আওতায় এনে সমাজে আইনের শাসন চালু করতে বা জনগণকে শৃঙ্খলা পরায়ণ করতে সেই আইনটির চরম প্রাসঙ্গিকতা, চরম সত্যতা, চরম প্রয়োজনীয়তা কোনটাই সরকারের পক্ষে বা জনগণের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।সহজ সরল কথায় বলতে গেলে যেটাকে সরকার ভাবছে আইনের শাসন সেটা হয়তো জনসাধারণের চোখে নির্মম জুলুমের প্রয়োগ।
প্রাসঙ্গিক ভাবেই একথা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, যে মানুষ গুলি কে শৃঙ্খলা পরায়ণ করতে চাওয়া হলো তাদের মধ্যে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে না এটা কেউ বলতে পারবে না। সুতরাং সহজ করে বলতে গেলে একথা বলতে হয় যে আইনের প্রয়োজনীয়তা এবং তার প্রয়োগ আলোচনা করতে গেলে দেখা যায় কারো একটা বিরুদ্ধ আচরণ করা হচ্ছে সরকারের দিক থেকে। কিন্তু আমি একটু আগেই বললাম যে চরম সত্যি বলে কিছু যদি থাকে তবে সেটা চিরকাল অধরাই থাকবে।আমাদের চিরকালই চেষ্টা থাকবে সত্যের কাছাকাছি পৌছানোর।এযেন এক আধ্যাত্ম চেতনার সঙ্গে রাজনৈতিক চেতনার সমাপতিত অবস্থা। প্রকৃতপক্ষে গান্ধিজির আধ্যাত্মিক সাধনার দিকটি বিচার করলে সেটাই স্পষ্ট হয়।
সুতরাং আইন প্রনয়নের দিকটা বিচার করলে এটা ধরে নিতেই হচ্ছে যে সরকার হয়তো বাহু বলে একটা অংশ কে দমন করলো।তখন ঐ দমন করা অংশ যে আন্দোলনের পথে চলবে সে আন্দোলনের চরম প্রয়োজনীয়তা বা চরম উদ্দেশ্য, এককথায় চরম সত্যতা কতটা, সেটা আন্দোলকারীদের পক্ষেও জানা সম্ভব নয়।
##তাই এক কথায় বলা যায় আমরা যে ইচ্ছে প্রকাশ করে আন্দোলনে নেমেছি সেটাই যে চরম সত্য এটা নাও হতে পারে। তাই আমাদেরকে নিরস্ত্র ভাবে, অহিংসার পথে আন্দোলন করতে হবে। যদি আইনটিতে কোনো অসহিষ্ণুতা আছে বলে জনসাধারণের মনে হয় তাহলে জনসাধারণ শুধু সরকারকে এই বিষয়ে অবগত করে অবিচলতার সঙ্গে জানাতে থাকবে যে সরকারের প্রনয়ণ করা আইনটি তাদের জন্য দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই গান্ধি মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন যে শাসক যে পথে চলে আর শাসিত যে পথে চলে সেই দুটো পথেরই চরম সত্যতা কিছু নেই। তাই যেখানে চরম সত্যতা কিছু নেই তাহলে তাকে প্রতিষ্ঠার জন্য শাসন বা শাসিতের উভয়পক্ষেরই চরম সহনশীলতা পালনে ব্রতী হতে হবে। আর এই ভাবনা থেকেই শাসক এবং শাসিত উভয়েই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। আর এখানেই গান্ধির রাজনৈতিক আধ্যাত্মবাদের প্রাসঙ্গিকতা অনেকটা বেশি।

গান্ধি হলো জাতির জনক এবং গান্ধির জন্ম হয় ভারতীয় সমাজ চেতনার উপর ভিত্তি করে এবং গান্ধি মহাত্মাতে পরিনত হন শুধু মাত্র ভারতীয় জাতির ধ্যান ধারণার উপর ভিত্তি করে তাই নয় পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের প্রবল প্রতিরোধের এক অপরাজেয় অস্ত্র তৈরির মধ্য দিয়ে। জাতি কিভাবে শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে আয়ত্ত করবে বা জাতির নতুন শাসক কতটা নমনীয় ও সহনশীল হবে এই নিয়ে গান্ধি বিচলিত ছিলেন।এই প্রসঙ্গে একথা উল্লেখ করতে বাধ্য হচ্ছি যে আজকের দিনেও আমার এই রাজনৈতিক দূর্বলতার স্বীকার হচ্ছি। আমার খুল্লাম খুল্লা ভাবে রাজনৈতিক আলোচনা করতে পারিনা। কোনো রাজনৈতিক নেতার দূর্নীতি বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি না।গনতন্ত্রের একটা বড়ো ভূমিকা পালনকারী হিসেবে আমরা যে বিরোধী দলের কথা ভাবি সেও কিন্তু শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলে না বা বলবার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে না মিডিয়ার সামনে ইসু খোঁজার রাজনীতি করে বা লোক দেখানো রাজনীতি করে ভোট চাওয়ার রাজনীতি করে।অথচ আজ শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পৃথিবীর বৃহত্তম সংবিধান আছে বিরোধীদের হাতে। এটাতে কোনো দিন স্পষ্ট হয় না জনগণের কি করনীয়। এতে লোক আরো বিভ্রান্তিতে পরে। সেখানে গান্ধি একটা আইকন।বিদেশি শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার ক্ষমতা ছিলো তাঁর।

***এখন যদি এই দিকটা একটুখানি বিচার করে দেখি যে, ভারতীয় রাজন্য বর্গ যে যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষায় পারদর্শী ছিলো না সেটা বলাও ভুল হবে কারণ ততকালীন ভারতীয় রাজার হরহামেশাই নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন।এবং মুঘলরা তো খুব দক্ষতার সঙ্গেই যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়েই ভারতে শাসনতন্ত্র কায়েম করেছিলো। তবুও শুধুমাত্র ভারত নয় সারাবিশ্বেই( এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকার) ইউরোপ মহাদেশর কয়েকটি দেশ তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার কেন করতে পেরেছিলো সেটা কমবেশি সকলকেই জানা। সুতরাং ভারত যে পরাধীনতার স্বীকার হয়েছিলো সেটা কোনো অযৌক্তিক বিষয় নয়। বরং এটা বলা যায় যে পরাধীনতার সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবে ভারত থেকে ততকালীন রাজতন্ত্র উৎখাত হয়।
যাইহোক আমরা যেখানে ছিলাম সেটা হলো ভারতবাসী নিজেরা কতটা স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত সেই আলোচনায়।এই রকম একটা শত বিভক্ত জাতি কে একই মানসিকতার আওতায় এনে, একই আইনের পোষাক পরানো খুব জটিল কাজ বলার থেকে অসম্ভব কাজ বলা’ই বরং শ্রেয় হবে; এবং শেষ পর্যন্ত সেটা অসম্ভবই হলো। দেশ ভাগ এবং সামপ্রদায়িক দাঙ্গা এটাই প্রমান করে যে ভারতীয়দের একসূত্রের বন্ধনে বাঁধা সম্ভব নয়। কারণ এই ভারতীয় উপমহাদেশ কুসংস্কার আচ্ছন্ন, শত জাতির শত মতের এক আধার।এখানে সকল গোষ্ঠীর মত এক হওয়া সম্ভব নয় কিছুতেই।তবুও গান্ধির মতো নেতা বা স্বামীজির মতো সাধক এটা অনুভব করেন যে ভারতীয় দের আগে মানুষ হতে হবে। আর এখানেই গান্ধির প্রাসঙ্গিকতা অনেক বেশি। তিনি অনুভব করেন যে শিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের মধ্যে রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিৎ হবে না। তিনি ভারতের গ্রামীণ রাজনীতিতে জোর দেন। তিনি সেই সমস্ত মানুষকে রাজনৈতিক ভাবে চলতে বা ভাবতে শেখানো শুরু করেন যারা নিজের রাজনৈতিক মেরুদণ্ড আছে কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান ছিলো ইতিপূর্বে। তিনি সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্ম নৈতিক, চিন্তা ভাবনা গত এবং জাতি গত শত বিভক্ত এই মানুষ গুলিকে একটি জাতিতে পরিনত করতে চেয়েছিলেন তা হলো ভারতীয়।জাতি হিসেবে আমরা সকলেই ভারতীয় এই হলো আমাদের পরিচয় আর এই জাতির জনক বা পিতা হলেন গান্ধি স্বয়ং। গান্ধি যেন তার সন্তানসন্ততির জন্য এমন একটা সমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে স্বাধীনতার পর তার সন্তানসন্ততিরা নির্দ্বিধায় হেসে খেলে, নেচে, গেয়ে, সুখে, শান্তিতে বাঁচতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বলা যায় গান্ধি যখন এক চির অন্ধকারে ডুবে থাকা জাতি কে শাসকের বিরুদ্ধে ‘না’ বলতে শেখাচ্ছেন তখনই সুভাষের মতো নবীন রক্ত সেই চির অন্ধকারে ডুবে থাকা জাতির থেকে শাসকের বিরুদ্ধে ‘না’ শোনার জন্য ব্যকুল হয়ে উঠেছিলেন।

মানুষ যেকোনো শাসনতন্ত্রের আন্ডারেই মানুষ থাকুক না কেন সে নিজেকে স্বাধীন মনে করবে।নিজে নিজের দায়িত্ব নিতে দ্বিধাবোধ করবে না। তাছাড়া ভারতীয় সংস্কৃতি অহিংসা বা সহনশীলতার কথা বলে এসেছে দীর্ঘদিন।
মানুষ শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভাবেই যে স্বাধীন হবে তা নয় বরং ধর্ম, জাতি,অর্থনৈতিক সবকিছুতেই নিজেকে স্বাধীন হতে হবে। আর এসবের জন্য প্রথমে ভয়মুক্ত মন ও হৃদয় গড়ে তুলতে হবে এবং সেটা নীতির উপর ভিত্তি করেই করতে হবে। ধাতু যতই কঠিন হোক সেটা একটা নির্দিষ্ট উষ্ণতায় গলতে বাধ্য। তাই শাসক যতই নিষ্ঠুর হোক আন্দোলনের লক্ষ্যটা স্থির রেখে অহিংস পথেই তার সুফল অর্জন করা সম্ভব এটা উপলব্ধি করতে হবে।

অন্যান্য নেতৃত্বমন্ডলী চাইতেন দেশবাসীকে স্বাধীনতা দিতে হবে। কিন্তু গান্ধির ভাবনায় দেশবাসীকে স্বাধীনতা দেবার ক্ষেত্রে আমি বা আমরা (নেতারা)কে? আমরা যেটা করতে চাইছি সেটা হলো ক্ষমতার হস্তান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিন্তু দেশবাসী যদি আগে নিজের চেতনার স্বাধীনতা ঘটাতে পারে। যখন সে নিজের চেতনার স্বাধীনতা ঘটাতে পারবে তখন তাকে গোলাম করবে এমন শক্তি কারো আছে নাকি?
রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন হওয়ার আগে নিজেকে নৈতিক বা চেতনাগত ভাবে স্বাধীন হতে হবে। ব্রিটিশ শক্তিকে একের পর এক প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে ব্রিটিশের মুখে বারবার জুতো মেরে মেরে এটাই প্রমান করেন যে ‘তুমি’ কে আমার উপরে আইন প্রনয়ন করার ‘তুমি’ থাকো কিন্তু তোমাকে আমার কোনো দরকার নেই।
তোমার অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের দরকার মার্কেট। কিন্তু আমি যদি মার্কেটই না দিই তাহলে তো তোমার থাকা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। উপনিবেশবাদ সাধারণত অর্থনৈতিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম না করা পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বেশ ভালো করে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না।সাম্রাজ্যবাদ যে শুধুমাত্র আমাদেরকে আর্থিকভাবে শোষণ করে তাই নয়,এই সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দৃষ্টিকোণ, চিন্তা ভাবনা, সংস্কৃতি সবকিছুকেই গ্রাস করে। ইংরেজরা ভারতীয়দেরকে নানা ছলেবলে কলেকৌশলে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে ইংরেজ শাসন তাদের জন্য মঙ্গলময়, ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত ভারতীয়দের মনে এই বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেন গান্ধিজি, নেতাজি, দাদাভাই নৌরজি সকলেই।আমরা যখন পশ্চিমী লিটারেচার স্টাডি করি এবং পশ্চিমী শক্তি গুলো হিংস্রতা দেখি তখন সবচেয়ে বেশি কনফিউশানে পড়ে যায়। সেখানকার সাহিত্য মানবতার কথা বলে, উদারতার কথা বলে, রুশ বিপ্লবের কথা বলে, ফরাসী বিপ্লবের কথা বলে কিন্তু সেই পশ্চিমী শক্তি গুলির হিংস্র সাম্রাজ্যবাদের কথা পড়লে চরম নির্লজ্জতা। ভারতীয় পরম্পরার খারাপ দিক গুলির শুদ্ধতাতেও গান্ধিজি মন দেন।আমজনতার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব মূলক ভাবনা আনতে চেষ্টা করেন।
শ্রীমতী অ্যানী বেসান্ত এবং তিলকের হোমরুল আন্দোলনেরও উদ্দেশ্য অনেকটা এই রকমই ছিলো।
প্রতিরক্ষা এবং বৈদেশিক নীতি ইংল্যান্ডের হাতে রেখে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হোমরুল স্বায়ত্তশাসিত অধিকার অর্জন করা এবং সেই উদ্দেশ্যে মানব এবং মানবতাকে সংগঠিত করা।
প্রকৃতপক্ষে গান্ধি হলো শান্তির উপাসনায় মগ্ন এক সূর্যের মতো শক্তির আধার।তাঁর এই শক্তির ( শান্তির) দুশো কোটি ভাগের এক ভাগও যদি ইংরেজ শাসকের হৃদয়স্থ হতো তাহলে ইংরেজ শাসনের জঘন্যতম নির্লজ্জতা ইতিহাসের পাতাকে এতোটা কলঙ্কিত করতো না।

****এ প্রসঙ্গে বলতেই হয় যে কিছু আন্দোলন হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়ে তিনি পর্যবেক্ষক দের একাংশের চোখে ঘৃণার পাত্রে পরিনত হয়েছেন।দেশবাসী এবং আন্দোলনকারীরা যেন দিশেহারা হয়ে গিয়ে হতাশা এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। কিন্তু এটা বলাবাহুল্য যে সেই মূহুর্তে আন্দোলন বন্ধ না করলে স্বৈরাচারী শাসক আরো হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতো। এক্ষেত্রে গান্ধি যেন একদিকে জাতির রক্ষা কর্তা অন্য দিকে জাতির প্রতিপালক এই দ্বৈত ভূমিকা পালনে নিজের চরিত্র কে আরো মজবুত করেছেন।
গান্ধির মতো বৃহৎ শান্তি বৃক্ষে ভগৎ এ-র মতো পক্ষীর বাসস্থানের জন্য জায়গা হয়নি বলাটা যেমন সহজ নয় তেমনই এরকম একটা শান্তি বৃক্ষ ভগতের পছন্দের ছিল কিনা সেটাও চুল চেরা বিশ্লেষণ করতে হয়।
কয়েকজন বীর বিপ্লবীকে হয়তো বাঁচাতে পারেন নি কিন্তু কত হাজার হাজার নিরীহ দেশবাসীকে যে স্বৈরাচারী ইংরেজ শাসকের হাত থেকে আন্দোলন চলাকালীন অহিংস সত্যাগ্রহের পথে থেকে বাঁচিয়েছেন সেটাও বিচার করতে হবে। সত্যাগ্রহকে দমন করার মতো কোনো অস্ত্র পশ্চিমী শক্তি গুলোর কাছে ছিলো না।
আচ্ছা বেশ, আমরা এতোক্ষণ দেখলাম গান্ধিজি অহিংসার পূজারী এবং আমরা অনেকই মনে প্রাণে তা মেনেও নিচ্ছি কারণ আমরা জানি গান্ধিজীর অহিংসার নীতি অবলম্বন করেই নেলসন মেন্ডেলা তাঁর দেশ এবং জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন এবং নোবেল শান্তি পুরষ্কারেও ভূষিত হয়েছেন।গান্ধি অহিংসার পূজারীই যদি হয়ে থাকেন তাহলে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্যদের কেন গান্ধির নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস যুদ্ধের মতো হিংসামূলক কাজে পাঠিয়ে ইংরেজ সরকারের হয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করিয়ে হিংসার ভার নিলেন সেটা অবশ্যই গান্ধি চরিত্রে একটা প্রশ্ন চিহ্ন বয়ে বেড়াবেই।
যদিও গান্ধির অহিংস সত্যাগ্রহ ছিলো Higher weapon for self protection.তবুও ইতিহাস চিরকাল প্রশ্ন করবেই তিনি কেন ভগৎ সিং,শুকদেব, রাজগুরুর ফাঁসি আটকানো জন্য বৃহত্তর আন্দোলনের পথে নামেন নি? প্রকৃতপক্ষে এ. ভি. হিউম যে সেফটি ভালব তত্ত্বের কথা বলেন তার পরিপূর্ণতা পেয়েছিলো গন্ধিজির হাত ধরেই। তাই সরকার যে গান্ধির সঙ্গে ভালো আচরণ করবে এটা বিশেষ কোনো অবাক হওয়ার কথা নয় বরং গান্ধির নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস ইংরেজ সরকারের ঢাল স্বরূপ কাজ করেছিলো একতা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাছাড়া গান্ধিজির মতো বিচক্ষণ নেতার এটা নিশ্চয় জানা ছিলো যে মৌর্য সাম্রাজ্যে অশোকের থেকে শুরু করে পরবর্তী শাসককে বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস নীতি গ্রাস করে ছিলো এবং তার ফলস্বরূপ মৌর্য শাসকরা রাজ ধর্ম পালনে ব্যর্থ হয়েছিলো এবং পতন অনিবার্য হয়েছিলো কি নির্মম ভাবে। শুধু আত্মপক্ষ শান্তি চাইলেই হবে না,প্রতিপক্ষ কতটা শান্তির উপাসক সেটাও বিচার্য বিষয়। তার তাৎক্ষণিক ফল হিসাব করলে দেখা যায় ১৯৬২ সালে ভারতকে চিনের সঙ্গে মোকাবিলায় অনেক ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়েছে। সুতরাং ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা প্রয়োগে গান্ধিকে ভালোবাসার যেমন অনেক কারণ আছে সেই রকম গান্ধি কে ঘৃণা করারও অনেক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেই কিন্তু গান্ধি কে উপেক্ষা করার মতো একটিও কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
***সুতরাং এই ভাবনা গুলি থেকেই নেতাজির প্রাসঙ্গিকতা অনেকটা বেড়ে যাচ্ছে। গান্ধিবাদের দীর্ঘকালীন অসাড়তা, ইংরেজ শাসকের দিন দিন নির্মমতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ব ইতিহাসে একাধিক সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন এই সকল প্রেক্ষাপটই ছিলো নেতাজির মহত্ত্বের প্রধান দিক।স্বামীজি বলেছিলেন ‘যদি বদলাতেই হয় তাহলে পথটা বদলাও লক্ষ্যটা নয়।’নেতাজি যেন তাঁর হৃদয়ের অভিযোজন ঘটিয়ে নিতে পেরেছিলেন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সঙ্গে।তবে পুরো কংগ্রেসকে যদি পাশে পেতেন তাহলে হয়তো রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটা বদলে যেতেই পারতো। শত্রুর দুর্বলতার সুযোগে স্বাধীনতার সুফল পাওয়ার যেতে পারে এই ভাবনা নিয়েই নেতাজির দেশত্যাগ করা এবং বিদেশি শক্তির সাহায্য প্রার্থনা করা।
নেতাজি প্রথম দিকে রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় এবং মতাদর্শে গান্ধিজীর এতোটাই স্নেহের পাত্রে পরিনত হন যে পরবর্তী কংগ্রেসের প্রধান কার্যভার সুভাসচন্দ্রের হাতেই দেওয়া যেতে পারে এরকম ভাবনা গান্ধিজির মনে উদিত হয়। তবুও রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য যখন প্রকট হয় তখন নেতাজিকে শুধুমাত্র স্বৈরাচারী ইংরেজ সরকারের সাথেই যে লড়াই করতে হয় তা নয় জাতীয় কংগ্রেস তথা গান্ধির সঙ্গেও চরম লড়াই করতে হয়। যাইহোক নেতাজিই প্রথম গান্ধিজী কে জাতির পিতা নামে ভূষিত করেন এবং বিদেশ থেকে প্রচার করতে থাকে গান্ধিজির আদর্শ এবং যে জাতির পিতা গান্ধির মতো এক বিচক্ষণ ব্যক্তি সেই জাতির এবার পরাধীন থাকার সময় শেষ হয়ে এসেছে এটাও জাতিকে বোঝাতে চেষ্টা করেন। এপ্রসঙ্গে বলে রাখি আমরা মনে হয় গান্ধির আদর্শকে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন ও মূল্যায়ন করতে পেরেছিলেন নেতাজি না হলে গান্ধিজি কে তিনি জাতির পিতা আখ্যায় ভূষিত করতেন না।তবে নেতাজি এটা বুঝতে পেরেছিলেন মর্মে মর্মে যে জাতির ঘুমানোর দিন এখই শেষ হওয়ার উচিৎ। এবং স্বাধীনতার জন্য মারিয়া হয়ে ওঠা উচিৎ।সেই উদ্দেশ্যেই তিনি প্রথম এতো বড়ো সেনাবাহিনী তৈরি করেন প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে বিদেশের হাতে বন্দি হওয়া ভারতীয় সেনাদেরকে নিয়ে। আন্দোলন মানেই স্রোতের বিপরীতে এগিয়ে চলা এটা আত্মস্থ করেছিলেন নেতাজি।
তবে একটা কথা বলে রাখি সাম্রাজ্যবাদের ক্ষুধা কোনো দিনও মেটে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের যে অর্থ ক্ষতি হয় তা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে রাজকোষ ঘাটতি মেটানোর উদ্দেশ্যে আরো বেশি করে কঠোর ও কঠিন শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানে মনোযোগ দেয় ইংল্যান্ড। যায় ফলস্বরূপ রাউলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই বৃহত্তর আন্দোলনের পথ ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। রাউলাট আইনের নির্মমতা বিচার করে গান্ধিজি নিজেও বলেন ‘এই আইন গুলি এবং এই ধরনের অন্যান্য আইন আমরা ভদ্র ভাবে মেনে নিতে রাজি নয়’
‘এই আইনে উকিল নেহি, দলিল নেহি, আপিল নেহি।’
ব্রিটিশ শাসনকে তিনি ‘শয়তাবাদ’ এর পরিচায়ক বলে মন্তব্য করেন।
জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনারেল ডায়ার পঞ্চাশটি রাইফেল থেকে গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুলি বর্ষনের নির্দেশ দিলো এবং ঐ দিন সন্ধ্যায় সান্ধ্যআইন জারি করে আহতদের মুখে জল দেওয়ার জন্যও কাউকে গৃহের বাইরে আসতে দেয় নি।এর ফলে সভ্যতা ও সাম্রাজ্যবাদের মুখোশধারী ইংরেজ শাসনের কদর্য ও ভয়াবহ রূপটি উদঘাটিত হলে গান্ধিজি বলেন ‘এই শয়তান সরকারের সংশোধন অসম্ভব, একে ধ্বংস করতেই হবে।’
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি নেতাজি এই ‘শয়তানবাদ’ এর ধ্বংসকর্তা রূপেই আবির্ভূত হন।স্বামীজির চেতনায় যুবসমাজকে ইস্পাত দৃঢ় পেশি শক্তি সম্পন্ন করে তুলতে আপ্রান চেষ্টা করেন নেতাজি। তিনি বারবার বুঝিয়ে দেন যে,পৃথিবীর একমাত্র সচেতন ও শক্তিশালী জাতিই স্বাধীনতা অর্জন এবং তা রক্ষা করতে পারে।
****আমাদের এই মহান ঈশ্বরের মৃত্যু আজও রহস্যময় এক সমুদ্র। এই জাতির ঈশ্বর যতদিন পৃথিবীর বুকে মানুষ থাকবে ততদিন পূজিত হবেন।নেতাজির নাম শুনলেই যেন জাতির মেরুদণ্ড সোজা হয়ে যায় স্বাধীনতার ক্ষুধা শিরায় শিরায় প্রবাহিত হতে থাকে। যিনি গান্ধিকে জাতির পিতা বলেন আজ ভারতীয় সমাজ যেন তাঁকেই জাতির পিতা মনে করেন। আজ ভারত মাতার বীর যোদ্ধাদের রক্তে যেন নেতাজির রক্তই প্রবাহিত হচ্ছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে আজ অব্দি বিনা রক্ত পাতে কেউ স্বাধীনতা পায় নি। সেখানে গন্ধির অহিংসার নীতি কতটা ফলপ্রসূ হবে সেটা নিয়ে অনেকই সন্দিহান ছিলো। বিশেষ করে ব্রিটিশের মতো একটা হিংস্র সাম্রাজ্যবাদী শাসক যেখানে প্রতিপক্ষ সেখানে এই রকম অহিংসা নীতি নিয়ে আন্দোলন কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা যুব সমাজের বক্ষ বিদির্ণ করা চিন্তার কারণ হয়ে প্রকট হতে থাকে আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের বা ফরাসি বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব এর ইতিহাস জানার পর। তবে এই রকম একটা সাম্রাজ্যবাদী সরকারের ক্ষুরধার অস্ত্রের সঙ্গে লড়াই করার জন্য ভারতের তেমন কোনো অস্ত্রও ছিলো না। একের পর এক দেশীয় রাজা তাদের সর্বশক্তি দিয়েও ইংরেজ সরকারের অস্ত্রের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছেন।তাই গান্ধিজি মানব এবং মানবতার উপরে নির্ভর করেই স্বাধীনতা অর্জনে বা জাতির মঙ্গলে ব্রতী হয়েছিলেন।
সুতরাং গান্ধিজি এবং নেতাজি দুজনেই আজ জাতির চোখে ভগবানের পরবর্তী স্থান পেয়েছেন একথা না বলে যদি বলি যে ভগবানের আগে স্থান পেয়েছেন তাতেও অত্যুক্তি হবে না। যেমন নেতাজির মতো বড়ো আইকন আজও মেলেনি, ভবিষ্যতেও মিলবে কি না তাও সন্দেহ আছে ।তেমনই গান্ধিজির মতো আদর্শও আজও পৃথিবীতে অমিল।
নেতাজির সঙ্গে হিটলার এবং মুসোলিনির সম্পর্ক দেখে ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং কূটনীতিবিদদের একাংশ বিচলিত হতে পারেন একথা ভেবে যে নেতাজির হাত ধরে হয়তো একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো। তবে এটা নিছকই কল্পনা মাত্র কারণ নেতাজি কোনো দিন হিটলার বা মুসোলিনির আদর্শ বা নীতিগত কথা ভুলেও উচ্চারণ করেন নি। তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিলো শত্রুর শত্রুকে আপন করে তাদের থেকে সাহায্য নিয়ে দেশ কে স্বাধীন করা। কথিত আছে প্লেন দূর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়।কিন্তু ভারতবাসী আজও এই রিয়েল হিরো,জাতির রক্ষাকর্তার মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি।তাই এই ভগবানের কোনো মৃত্যু দিবস নেই।

# সীমান্ত # পর্ব – ৪ কলমে – অরণ্যানী

# সীমান্ত # পর্ব – ৪
কলমে – অরণ্যানী

পাখিদের কলরবে ওদের ফিসফাস কথার আওয়াজ বিজয়ের কানে গেল না। সে ওভাবেই বসে দূরে ওপারের জঙ্গলের দিকে চেয়ে আছে। ঘাটের একদম কাছে এগিয়ে এলো ওরা। তবুও বিজয় দেখতে পেল না।
মিনু — বিজয়দা।
বিজয় চমকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল। ততক্ষণে ওরা ঘাটে এসে গেছে। বিজয় কবিতার হাতটা ধরে বসতে বললো। ভীষণ অস্বস্তিতে কবিতা মাটির দিকে চেয়ে রইল। মিনুও বুঝতে পারছে না ও কী করবে।
বিজয় – বসো।
মিনু — কে? আমি না কবিতা?
বিজয় একটু লাজুক হেসে বলল — দু’জনেই।
মিনু – তোমরা কথা বলো। আমি ঘাটে নেমে একটু চোখেমুখে জল দিই। যা তাড়াতাড়ি হেঁটে এসেছি – – – ঘেমে গেছি একদম।
মিনু ঘাটের সিঁড়ির কাছে গেল। দেখল, ঘাটের ভাঙাচোরা জলে ডোবা সিঁড়ির উপর থেকে একটা বড় মাছ ওকে দেখে দূরে সরে গেল। একটু দূরে গিয়ে জলের মধ্যে লাফও দিল। ছপাং করে একটা শব্দ হল। নদীর স্থির জল কেঁপে উঠল। মিনু জলে নেমে মুখ হাত ধুতে থাকল।

কবিতা ও বিজয় পাশাপাশি সবে বসেছে। কবিতার চোখ লজ্জায় মাটির দিকে। সূর্যাস্তের লাল রোদ মুখে এসে পড়েছে। বিজয় কবিতার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে। বিজয়ই প্রথম কিছু বলবে বলে ঠিক করছে।
মিনু — বিজয়দা, এই ঘাটে কত মাছ। তুমি এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিলে। যদি ছিপ নিয়ে আসতে তবে বড় মাছ উঠে যেত।
বিজয় মিনুর কথা শুনে ফিক্ করে হেসে ফেলল। কবিতারও ঠোঁটে মুচকি হাসি এলো। মিনু দেখল, নদীতে একটু দূরে দুটো বুনো হাঁস একসাথে সাঁতার দিচ্ছে। ও ঘুরে একবার কবিতাদের দিকে তাকাল।
বিজয় – কী, কিছু বলো।
কবিতা – কী বলবো?
বিজয় – আমি চিঠিতে যা জানালাম তার উত্তরে। লিখতে তো জানো। তবু চিঠির উত্তর তো দিলে না। তবে মুখেই কিছু বলো।
কবিতা মাটির দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুল মাটিতে ঘোষতে ঘোষতে খুব আস্তে করে বললো – আমি বলবো না। আমার লজ্জা করে।
মিনু নদীর জলে লাল মেঘের ছায়ার দিকে তাকাল। হাত দিয়ে লাল জলটাকে নাড়া দিল। একটু হাওয়া এসে ঘাটের ধারের গাছগুলিকে দুলিয়ে দিয়ে গেল। সেই হাওয়ায় ঝরে পড়ল কিছু শুকনো ও পাকা পাতা। ঘাটের ধারের বকুল গাছটা থেকে কিছু ফুল ঝরে পড়ল। মিনু চোখ বন্ধ করে হাওয়ার শীতলতাকে অনুভব করল। তারপর চোখ খুলে ঝরা ফুলগুলোর দিকে চাইল। আবার চোখ পড়ল কবিতাদের দিকে।
বিজয় – তবে হ্যাঁ বা না বলো।
কবিতা নিচু গলায় হ্যাঁ জানালো।
ওরা কথা বলছে দেখে মিনু চোখ সরিয়ে নিল। মিনু তাকাল বকুল গাছটার দিকে। যার উপর ঝাঁক ঝাঁক পাখি বসে কিচির মিচির করছে। হঠাৎই চোখ পড়ল একটি পাখির বাসায় দুটি পাখি ঢুকছে।
বিজয় একটু সরে এসে কবিতার একটা হাত ধরে নিল। কবিতার দেহ অসার হয়ে এলো।
বিজয় – তুমি লজ্জা কেন পাচ্ছ? তোমার হাত ঘামছে। ভয় করছে?
বিজয় দুটো হাত দিয়ে কবিতার ডান হাতটা ধরে রাখল। কবিতা কোনো কথাই বলতে পারল না। মুখচোখ অভিভূত হয়ে গেল। মনে মনে ইচ্ছে করল, বিজয় ওকে দু’হাতে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরুক।

ওপারের জঙ্গলে আঁধার নামল। শিয়ালের ডাক শোনা গেল। এপারের ঘাটে গোধূলি লগ্ন। শেষ সূর্যাস্তের হালকা লালচে আলোটুকু তখনও রয়েছে। মিনুর চোখ আবারও কবিতাদের দিকে গেল। মিনু দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। কেমন যেন বিহ্বল দৃষ্টিতে চারিদিকে তাকিয়ে রইল। একটু পরেই বিজয়ের খেয়াল হলো মিনুও আছে। বিজয় ধীরে ধীরে কবিতার হাতটাকে নিজের দু’হাত থেকে মুক্ত করে দিল।
কবিতা – সন্ধে হয়ে গেল। আবার পড়তে যাওয়া আছে।
বিজয় – ও, ঠিক আছে, এসো। কাল আসবে?
কবিতা – হ্যাঁ।
মিনুর দিকে চেয়ে বলল – চল্।
মিনুর ঘোর তখনও কাটেনি। মিনু চুপচাপ কবিতার দিকে এগিয়ে এলো। বিজয় তখনও ঘাটেই বসে।
কবিতা – তুমি বাড়ি যাবে না?
বিজয় – পরে যাব।
কবিতা – একটু পরেই তো সব মাতালরা এখানে আসবে।
বিজয় – তখন চলে যাব।
কবিতা ও মিনু দু’জনেই একটা ঘোরের মধ্যে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে চললো। অল্প আঁধার নেমে গেছে ততক্ষণে।

মাস্টারদার বাড়ি :- একটা ছোট উঠোন। উঠোন থেকে উঠে একটা বারান্দা। বারান্দা পার হয়ে বাইরের ঘর বেশ বড়। অন্তত তিনটে ঘরের সমান।সেই বাইরের ঘরেরই একধারে উনুন, বাসন কোসন, ইত্যাদি রান্না খাওয়ার সরঞ্জাম। আর এক কোণে রাখা আছে নানা ধরনের বন্দুক, পিস্তল, ছোঁড়া ইত্যাদি অস্ত্র। আর এক কোণে গুটোনো অবস্থায় বড় বড় হাতে বোনা তাল পাতার চ্যাটাই। আর কাঠের তাকে রাখা আছে নানা শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক, খাতা, পেন, ও কিছু গল্পের বই। বাইরের ঘর পার হয়ে ভেতরে একটি ছোট ঘর। চৌকিতে বিছানা পাতা। একটা ছোট আলনায় জামাকাপড়। দেওয়ালের তাকে নানান নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস।

মাস্টারদার বাড়িতে পড়তে এসেছে পতু, পদ্মা, জবা, শ্যামলী, কবিতা ও মিনু। তাল পাতার চ্যাটাই বিছিয়ে ওরা বই খাতা নিয়ে গোল হয়ে বসে পড়ে। মাঝখানে মাস্টারদা। ওরা কেউ স্কুলে পড়ে না। মাস্টারদার কাছেই লিখতে পড়তে শিখেছে। মাস্টারদাই ওদের প্রশ্নপত্র তৈরি করে, পরীক্ষা নেয়, নম্বর দেয়। এইভাবে পরীক্ষায় পাশ করে করে ওরা তৃতীয় শ্রেণীতে এখন পড়ে। পদ্মা আর শ্যামলীর বয়স বাকিদের থেকে একটু কম। ওদের মধ্যে জবা সবচেয়ে চটপটে, চটুল প্রকৃতির এবং সদা হাস্যময়ী। গায়ের রঙ একটু কালো। কিন্তু চোখে মুখে ও চেহারায় একটা চটক আছে। সেটা স্বাস্থ্যের দীপ্তির কারণেও বটে। দেখলেই বোঝা যায় সবল প্রকৃতির মেয়ে।

মাস্টারদার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। বেশ লম্বা, স্বাস্থ্যবান ও পুরুষালী ব্যক্তি। সঠিক সৈনিকের চেহারা। যুদ্ধের সময় সৈনিক হিসাবে সেনাদলে যোগ দেন। তাদের গ্রাম মাদুরা আক্রান্ত হলে গ্রামের মানুষদের নিয়ে গণসেনা গঠন করে গ্রাম বাঁচানোর সংগ্রামে সেনাপতিত্ব করেন। যোদ্ধা হিসাবে মাস্টারদার নাম আশপাশের অনেক মানুষের কাছেই পরিচিত। তিনি গ্রামের ছেলে মেয়েদের অস্ত্রশিক্ষা দেন, লেখাপড়াও শেখান যারা স্কুলে পড়ে না তাদের। গ্রামের এবং আশপাশের গ্রামের অনেকেই তাকে মানিগণ্যি করে। অবিবাহিত যুবক। একাই থাকেন। বাবা, মা বা কোনো আত্মীয়ও তার নেই। কোন এক যুদ্ধের সময় গ্রামে গণসেনা গঠনের জন্য তার উদয় হয়। তারপর থেকে তিনি বাড়ি করে এ গাঁয়েই থেকে গেছেন।
সন্ধ্যাবেলা মাস্টারদার বাড়িতে পড়াশোনা চলছে।
জবা – মাস্টারদা, আগে কী পড়ব? অঙ্ক করব?
মাস্টারদা – হ্যাঁ, তাই কর।
সকলের মধ্যে একটা ফিসফাস গুঞ্জন শুরু হলো।
পতু – আগেই অঙ্কটা বের করতে হলো? এখন সবে সন্ধে। কতগুলো অঙ্ক করতে হবে কে জানে। ওর আদিখ্যেতা।
কবিতা – মিনু, আমি যদি ভুলে যাই? আমাকে দেখাবি তো?
মিনু – ঠিক আছে। তুই তো পাশেই বসেছিস। পাশ থেকে দেখে নিবি।
পতু উঠে গিয়ে মিনুর আর এক পাশে বসতে গেল। ওই পাশে পদ্মা বসেছিল।
পতু – এই সর্। আমি ওর পাশে বসব।
পদ্মা – না, যে যেখানে আগে বসেছে, সেখানেই বসবে।
পতু – আমরা বন্ধু।
পদ্মা – আহা, বুঝি না যেন। অঙ্ক দেখবে বলে এখন বন্ধু।
পতু – হিংসা করছিস কেন?
মাস্টারদা – কী হলো? তোরা উঠে উঠে এদিক ওদিক করছিস কেন?
জবা – অঙ্ক দেখবে বলে।
পতু – চুপ কর। ভুল যেন তুই করিস না। কতই যেন পড়াশুনোয় ভালো।
জবা – আমি কি বলেছি আমি ভালো?
মাস্টারদা – প্রতিমা, নিজের জায়গায় গিয়ে বস। আর ঝগড়া করবি না। সবাই একটু ছেড়ে ছেড়ে বসতো। অনেক জায়গা আছে।
এভাবে মাস্টারদার শাসনে ওদের লেখাপড়া চলতে লাগল।
এক সময় মাস্টারদা কবিতাকে জিজ্ঞেস করলেন – হ্যারে কবিতা, তুই দু’দিন আসিসনি কেন? কোথায় গিয়েছিলি?
কবিতা – মামার বাড়ি।
মাস্টারদা – বলেছি না, এখন একদম কামাই করবি না। আর দু’দিন বাদে আমি পরীক্ষা নেব। দু’দিন অস্ত্রশিক্ষাও প্র্যাকটিস করিসনি। আমি এবার অস্ত্রশিক্ষারও পরীক্ষা নেব। অস্ত্রশিক্ষার সময় একদম কেউ কামাই করবি না। অস্ত্রশিক্ষা না নিয়ে এখন কেউ মামার বাড়ি, মাসির বাড়ি, দিদির বাড়ি কোথাও যাবি না। এরপরও যে কামাই করবে তাকে আমি কান ধরে এক ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখব, আর একশো বার ওঠবোস করাবো। মৃন্ময়ী, তুই তো বাড়িতেই ছিলি। অস্ত্রশিক্ষা নিতে আসিসনি কেন?
মিনু একবার মাস্টারদার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
মাস্টারদা — কিরে, কিছু বলছিস না যে? তুই তো এমনিতেই অর্ধেক দিন অস্ত্রশিক্ষা নিস না। জানি পড়াশুনোটা ভালো পারিস। কিন্তু যে কোনো দিন যুদ্ধ লাগতে পারে। তখন কী করবি? অন্তত নিজেকে বাঁচাতে তো শিখতে হবে।
মিনু চুপচাপ গম্ভীর মুখে বসে। চোখ ছলছল। চোখের সামনে ভেসে উঠল দু’হাতে তুলে নেওয়া আদরের লুল্লু, যাকে পড়তে আসার আগে দুধ বিস্কুট খাইয়ে এসেছে সেই ছবি।
মাস্টারদার কথা শুনে অন্যরাও নড়েচড়ে বসল।
পতু – আমার কী ভয় লাগছে। সত্যিকারে যুদ্ধ কি আমাদেরও করতে হবে? নাকি দাদারা করলেই হবে?
কবিতা – শেখাচ্ছে তো সবাইকেই। দাদারা সামনে থেকে করলে আমাদের তো পেছন থেকে হলেও করতে পারতে হবে।
জবা হাসতে হাসতে বলল – ওরা দেখো, যুদ্ধের কথা শুনে এখন থেকেই কী করছে। আচ্ছা মাস্টারদা, আমি কতটা যুদ্ধ করতে পারব মনে হয়?
মাস্টারদা – বেশ সময় দিয়ে ভালো করে শিখলে তো মনে হয় তোর হবে।
জবা সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল – কী হবে গো?
মাস্টারদা – ভালো করে শিখতে পারলে গণসেনায় যোগ দিবি?
জবা – মেয়েছেলেরা সেনা হয়?
মাস্টারদা – কেন হবে না? হয় তো অনেকে।
জবা – না, মানে আমাদের মতো মেয়েরা।
মাস্টারদা – হ্যাঁ। তারাও তো মেয়েই নাকি? সেছাড়া গণসেনায় তো থাকবে তোদেরই কারো বাবা, কাকা, দাদারা। তারা যখন প্রাণপণে গ্রাম বাঁচানোর লড়াই করবে তখন অস্ত্রশিক্ষায় ভালো হলে তাদের সঙ্গে থাকবি না?
জবা – হ্যাঁ, তুমি যদি নাও তাহলে থাকব।
ওদিকে পতু, পদ্মা, শ্যামলী, কবিতারা জবাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করল।
পদ্মা – ওই দেখ্, শুরু হয়ে গেল ঢলানো।
সকলে হাসল। তবে ওরা ফিসফাস করেই কথা বলছিল, আর নিঃশব্দেই হাসছিল।
পতু – ওর জামাটা দেখেছিস? ইচ্ছা করে সামনে ঝুঁকেছে, আর সব দেখা যাচ্ছে।
(ক্রমশ)

অবুঝ মন ****** তনুজা চক্রবর্তী

অবুঝ মন

তনুজা চক্রবর্তী

সবুজে ঘেরা গ্রামের ছবি
শব্দ দিয়ে আঁকেন কবি
ব্যাপার খানা মজার বেশ
কাব্য গড়া হবে না শেষ।
কচুর বন ছাতিম তলা
সাজিয়ে মেপে যায়না বলা
ছলনা ময় বাঁশের ঝাড়
বাতাস যেন কেবল তার!
গ্রামের মাথা পুরানো বট
ছাড়ায় একা নিয়ত জট।
পুকুর জুড়ে শাপলা ফুল
পদ্ম ভেবে চোখের ভুল
সুপারি তাল সীমানা ঘিরে
হারালে পথ আসবে ফিরে।
সবাই ওরা আপনজন
পড়ছে বাঁধা অবুঝ মন
পারলে যেও কবির বাড়ি
ঠিকানা লিখে দিলাম তারি।

আবছায়া ****** শেষ পর্ব

আবছায়া
শেষ পর্ব

এদিকে শৌণক নয়নের সঙ্গে সমানে কথা বলে চলেছে। কথা তো নয়, জেরাই করছে সে! শৌণক যখন জেরা করতে শুরু করে তখন ওর সঙ্গে  যুঝে ওঠা ভীষণ মুশকিল হয়ে ওঠে। ওর কথার জালে জড়িয়ে নয়ন স্বীকার করতে বাধ‍্য হয় যে সুধার প্রেগন‍্যান্সির কারণ ও নিজেই। নিজের সপক্ষে বলে যে এই ঘটনা সুধার সম্মতিতেই ঘটেছে। সুধা একটা বাচ্চার জন‍্য প্রায় পাগল হতে বসেছিল। তাই নয়ন ওকে সেই সুখ দিতে চেয়েছে। জেরার মুখে সে এটাও স্বীকার করে যে ও সুধাকে ভালোবাসে কিন্তু এটাও বলে যে এই জন‍্যে সুধার সংসার ভেঙে যায়, সেটা ও চায় না।
শৌণক বলতে থাকে…
—-  আপনি জানতেন, সুধা প্রেগন‍্যান্ট?
—-  হ‍্যাঁ জানতাম।
—- এই নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কোনো বিবাদ হয়েছিল?
—-  সেটা সুধা আমাকে বলে নি।
—-  এটা বিশ্বাসযোগ্য কথা, নয়নবাবু?
নয়ন এই প্রশ্ন শুনে একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। আমি তাকে লক্ষ‍্য করছিলাম। আমার মনে হল ও অনেক কথা লুকিয়ে যাচ্ছে। শৌণক আবার প্রশ্ন করে,….
—- আচ্ছা, খুনটা কে করল বলুন তো?
নয়ন কেমন আমতা আমতা করে বলল,
—- কেমন করে বলি বলুন তো? ব‍্যাপারটা ঋভু জানতে পেরেছিল কিনা তাও তো আমি  জানি না! সুধা আমাকে সেকথা বলেনি।
—- আপনিও তো খুনী হতে পারেন?
নয়ন যেন আকাশ থেকে পড়ল!..
—-  আমি? এর পিছনে আমার মোটিভ কি হতে পারে? নয়নের গলা রুদ্ধ হয়ে  আসে। চোখে স্পষ্টতই আতঙ্কের ছাপ ফুটে ওঠে। শৌণক একই গলায় বলতে থাকে,
—- আপনি তো ভাবতেই পারেন যে একথা জানাজানি হলে আপনার সব সুনাম নষ্ট হবে। চাকরি চলে যাবে। কারণ এক্ষেত্রে সুধার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর ঋভুবাবু জানতে পারলে আপনাকে কি ছেড়ে দিতেন? আপনিই বা পালিয়ে কোথায় যেতেন? শেষে তো ধরা দিতেই হত।
নয়নের চোখ তখন আতঙ্কে যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে।
শৌণক তাও বলে চলেছে,
—-  যদি ঋভুকে খুনী বলা হয়, তবে তো সে আপনাকে ছাড়বে না। যে স্ত্রীর জন‍্য ঋভু নিজে এত বড় স‍্যাক্রিফাইস করতেও পিছপা হয়নি, সে যদি বিশ্বাসঘাতকতার জন‍্য নিজের স্ত্রীকে খুন করেও, তবে সিড়িতে বসে কান্নাকাটি করার বদলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই  আপনাকে খুন করতে আসত? তাই নয় কি?
প্রবল জেরার মুখে এবার নয়ন তর্ক করার জোরটাও হারিয়ে ফেলেছে। কি বলবে, কিইবা বলার আছে, বুঝতেই পারছে না।

শৌণক পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ফোন করে ফোর্স চাইল।
অফিসার ইন চার্জ এলে নয়নকে তার হাতে তুলে দিয়ে বলল,
—- থানায় নিয়ে  যান। আর জেরা করে বের করুন যে খুনটা কখন কিভাবে করা হয়েছে। খুনীকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। আমার মনে হয় ঋভুবাবুকে জেরা করার আর দরকার নেই। ওনাকে ছেড়ে দিন।
অফিসার আর দেরি করলেন না। শৌণককে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে নয়নকে এরেস্ট করে নিয়ে চলে গেলেন।
শৌণক বলল,
—-  আপনারা যান। আমি  ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।

আমি সুনীতা রক্ষিত, দুঁদে ডিটেকটিভ শৌণক চ‍্যাটার্জির এসিস্ট‍্যান্ট…. শৌণকের সঙ্গে  একটার পর একটা কেস করতে করতে রহস‍্যভেদে বেশ সাবলীল হয়ে  উঠেছি! শৌণককে চিয়ার্স করে নিজেও এই রহস‍্য ভেদ করে মনে মনে খুব খুশি হয়ে  উঠলাম। কিছুটা কৃতিত্ব তো আমারও প্রাপ‍্য! অনেক ক্লু আমারই চোখে পড়েছিল। শৌণকের শ‍্যেন দৃষ্টির কিছু ভাগ তো আমিও লাভ করেছি। এমন কতই তো রহস‍্য ভেদ করেছি আগে। সে গল্পও কোনোদিন নিশ্চয়ই শোনাব। কিন্তু আজ মনটা খুব খারাপ হয়ে  গেছে মেয়েটির অমন নিষ্ঠুর মৃত্যু দেখে। সন্তানের জন‍্য প্রবল আকুতিতে জীবনটাই তার চলে গেল। আহা রে, ওর জন‍্য সত্যিই কষ্ট হচ্ছে।।
*************
৪টি পর্বে গল্পটা শেষ করলাম। পাঠকের মতামত জানতে পারলে উৎসাহিত অনুপ্রাণিত হবো।ধন্যবাদ।

আত্মজা *** সুদেষ্ণা সিনহা

আত্মজা
———-
ধারাবাহিক উপন্যাস
অধ্যায় -৪
সুদেষ্ণা সিনহা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে।জাপান একাধিক দেশের বিরুদ্ধে লড়ছে।কলকাতা শহরের ভিতরে তেমন করে কোন যুদ্ধের প্রভাব নেই।তবে মাঝে মাঝে আকাশপথে হামলা চালায় জাপানি যুদ্ধবিমান। কখনো কখনো কলকাতাতেও বোমা পড়ছে।

লোকেদের মুখে মুখে একটা গান বেশ শোনা যাচ্ছে :
সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি,
বোম ফেলেছে জাপানি।
বোমের ভিতর কেউটে সাপ,
সবাই বলে বাপ রে বাপ।
স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে কংগ্রেস,ফ্রন্ট মোর্চা,বা মুসলিম লিগ কেউ  থেমে নেই। হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ারে গা ভাসাচ্ছে একসাথে। মুসলিম লিগ বা কংগ্রেস মিটিংগুলোতে বসে নিজস্ব দাবি-দাওয়া নিয়ে সরব হতেও ছাড়ছে না।
শ্যামাকান্ত ইংরেজ সাহেবদের অধীনে চাকরি করেন। এই সব রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লে তার সমূহ বিপদ। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। পরাধীনতা মুক্ত হয়ে দেশ স্বাধীন হোক।তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের নামে ন্যক্কারজনক গুন্ডামি তিনি পছন্দ করেন না। নিজেকে এসব থেকে সাত হাত দূরেই রাখেন তিনি। অবসর সময়ে নিজের মতো সময় কাটান।
এসপ্ল্যানেডের অফিসের কাছাকাছি একটা ঘর ভাড়া নিয়েছেন শ্যামাকান্ত। কাস্টমস অফিস দশটা-পাঁচটার নিয়মে চলে না।সারাদিন ধরে তাদের কাজ।বাড়িতে রান্নার ব্যবস্থা নেই শ্যামাকান্তের।একা মানুষ। সে সব হাঙ্গামা তার ভালো লাগে না। এই অফিসগুলি পরিবারকে সঙ্গে থাকার অনুমতিও দেয় না। অফিসের গার্ড বিশ্বাসদা দুপুরে নিজের রান্নার সাথে দুটো মাছ-ভাত চাপিয়ে দেয় শ্যামাকান্তর জন্য। পাতার ছায়ায় দুপুর গড়িয়ে আসে। ঝিমধরা দুপুরে ঘন পাতার আড়ালে একটা দাঁড়কাক কর্কশভাবে ডেকে ওঠে।অজানা আশঙ্কায় মনটা উতলা হয় শ্যামাকান্তের। নীল বর্ডারের সাদা কলাইকরা থালায় ভাত সাজিয়ে বিশ্বাসদা খেতে ডাকে, সাহেব খেয়ে নেন ।
কত দিন মায়ের হাতে পদ্মার ইলিশ ভাপা খাননি শ্যামাকান্ত! লালগোলা থেকে তাদের ভট্টাচার্য্য পাড়ার বাজারে প্রায়ই ইলিশ উঠত।সাদা চকচকে রূপালি মাছ। মাছের গায়ে মশলা মাখিয়ে কলাপাতায় মুড়ে মা ভাতের হাঁড়িতে বসাতেন।সারা বাড়ি গন্ধে ম ম। সব মনে পড়ে তার।
আর একজনের কথা খুব মনে পড়ে!সরমা,তার বউ!বিয়ে করে লাজুক বধূটিকে রেখে আসতে হয়েছে বহরমপুরের বাড়িতেই। বহরমপুর ভট্টাচার্য্য পাড়া থেকে তার বউয়ের চিঠি আসে প্রায় প্রায়ই।কাঁচা হাতের লেখার হরফের পর হরফ সাজিয়ে ভালবাসার ইমারত গড়ে তোলে সে শুধু শ্যামাকান্তের জন্য।
—- কবে তুমি ফিরে আসবে গো? এসো তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমাকে ছাড়া যে আমার কিছুই ভাল লাগে না। বোঝ না তুমি?

তাদের কাস্টমস অফিসে ছুটিছাটা কম। এখানে রবিবারেও ছুটি নেই। কতদিন বাড়ি যাওয়া হয় না শ্যামাকান্তের!
শ্যামলী প্রতিমা,আয়তঘন চোখে কাতর আকুতি স্ত্রী সরমার। স্বামীর জন্য তার নীরব প্রতীক্ষা বড়ই বিস্মিত করে শ্যামাকান্তকে।এই ভবসংসারে যাওয়া আসার নিত্য  খেলার মাঝে এক মানবী তার ভালবাসার দ্বারটি খুলে রেখে অপেক্ষা করে আছে তারই জন্যে! তার হৃদয়পাটে এত মূল্য শ্যামাকান্তের!
শ্যামাকান্তের হাতে সময় কম। সকালে পাড়ার মোড়ে একটা গুমটি থেকে চা-বিস্কুট খেয়ে ডিউটিতে বেরিয়ে পড়েন শ্যামাকান্ত। এসপ্ল্যানেড থেকে খিদিরপুর ডক ইলেকট্রিক ট্রামে আধ ঘন্টা।সিটে বসে পড়েন শ্যামাকান্ত।টুংটাং শব্দ করে শহরের বুক চিরে এগিয়ে চলে ট্রাম।নির্জন রাস্তায় সাহেবের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে সাদা গাউন পরা মেম। গাছের নীচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে দু’একটি পথচারী।
শ্যামাকান্তের তাড়া থাকে। ইংল্যান্ড থেকে যে জাহাজগুলো আসে যতক্ষণ না সেগুলোর মালপত্তর সার্চ হচ্ছে ,ততক্ষণ সেগুলো জেটিতে ভিড়তে পারবে না।
ফুলশয্যার রাতে কাপড়ের পুঁটলি হয়ে বিছানার এককোণে জড়সড় হয়ে বসেছিল সরমা।মায়ের দেওয়া আংটি সরমার আঙুলে পরিয়ে তাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন শ্যামাকান্ত।
—কি পছন্দ হয়েছে আংটি?
মাথা হেলিয়ে দিয়েছিল সরমা।
—-আর আমাকে?
সরমা লজ্জায় লাল।
—এত লজ্জা !আমার কাছে!কি বললে না তো আমাকে তোমার পছন্দ হয়েছে কি না ?
সরমা তবুও চুপচাপ।
কপট রাগ দেখান শ্যামাকান্ত।
—-বেশ তবে কালই কলকাতা চলে যাব।
একটা নরম হাত তার ঠোঁট চেপে ধরে।
— না যাবে না।

বিয়ের পর অফিসের কাজে ফেরার দিন বিরহী হৃদয়ের ভারে ভারাক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।চোখের জলকে বুকের পাঁজরে লুকিয়ে স্বামীকে বিদায় দিয়েছিল সরমা চোখের জলে।ঘরের আয়নার প্রতিবিম্বে দেখা দিয়েছিল তার বেদনার ছবি। বারবার শ্যামাকান্তের  মন বলেছিল, ফিরে গিয়ে দুটো কথা বলি।
ট্রেনের তাড়ায় তা আর হয়ে ওঠে নি। বিদায় বেলায় পড়ন্ত রোদ্দুরে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে অস্ফুটে সে বলেছিল,কবে আসবে গো? তাড়াতাড়ি আসবে তো?তোমাকে ছেড়ে আমার খুব কষ্ট হবে!
ট্রেন ছেড়ে দিলে প্ল্যাটফর্মের সীমারেখায় হারিয়ে গেল সে। চলতে চলতে পৃথিবীময় তার বেদনার মুখের প্রতিচ্ছবি দেখেছিল শ্যামাকান্ত। এসপ্ল্যানেডের ভাড়া ঘরের শূণ্য বিছানায় শাঁখাপলা পরা নরমদুটি হাতকে খুঁজতেন তিনি রাতের অন্ধকারে। সঙ্গী হারানোর ব্যথায় ভরে যেত তার হৃদয়। শহর জুড়ে রাস্তার উপর লোহার বিমের গ্যাসবাতির পোস্ট।সকালে কর্পোরেশনের যে লোকটি গ্যাসের আলো নিভিয়ে দিতে আসে সে সুর করে গান গায় —
জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য,প্রভু নিত্যানন্দ।
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌর ভক্তবৃন্দ।।

তার গানের সুর ছড়িয়ে পড়ে নিস্তব্ধ রাস্তায়। শ্যামাকান্ত ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখতেন কলকাতার রাস্তা জল দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হচ্ছে।রাস্তার মোড়ে বড় বটগাছটার শাখা-প্রশাখা বেয়ে সকালের হলুদ রোদ নেমে গেছে নীচের রাস্তায়। আর একটা দিনের শুরু।
বহরমপুরে ভট্টাচার্য্য পাড়ার বাড়িতে সরমা হয়তো নুপূর বাজিয়ে এঘর ওঘর করছে!
শ্যামাকান্ত সারাদিন ধরে লুকিয়ে লুকিয়ে কাকে যেন খুঁজে বেরান।
মোড়ের চায়ের দোকান খোলে সকাল ছ’টায়। উনুনের গনগনে আগুনে চায়ের জল ফুটছে। কেটলির গা বেয়ে চা উপচে পড়ে। ভাঁড়ে শ্যামাকান্তের চায়ে ধোঁয়া ওঠে।  বিস্কুট দিয়ে চা’টুকু শেষ করে তিনি ভাড়াবাড়ির রাস্তা ধরেন। তার বুকপকেটে সরমার চিঠি। চিঠির ঘঁষা লাগে বুকের পাঁজরে।
কে যেন বলে, তুমি কি বোঝ না তোমাকে দেখতে না পেয়ে আমার কত কষ্ট হচ্ছে!
সারাদিন কাজের ভিড়ে শেষ হয়।দিনের আলোটুকু নিভে যাবার আগে ঘরের সামনের গ্যাস বাতিটা জ্বালিয়ে দিয়ে যায় কলকাতা কর্পোরেশনের একটি লোক।হাল্কা আবছা আলোয় শ্যামাকান্তের মনে হয় কলকাতা শহরের প্রাণ বুঝি নতুন করে জেগে উঠেছে।
স্কুলে পড়ার সময় থেকেই শ্যামাকান্তের নাটক খুব ভাল লাগত। পাড়ায় মাচা বেঁধে কত নাটক করেছে এক কালে। এখন কলকাতায় অনেকগুলো থিয়েটার হলে থিয়েটার চলে। কোন কোনদিন বাসে চেপে স্টার থিয়েটারে ছুটে যান তিনি।টিকিট কেটে থিয়েটার দেখেন। মন কিছুটা শান্ত হয়। কোনদিন বা মহাজাতি সদনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুনতে শুনতে বুঁদ হয়ে বসে থাকেন। সঙ্গীতের রেশ মনের মাঝে ঝর্ণাধারার মতো ঝরে পড়ে।
ভোরবেলায় কলকাতা পথে পথে সোনাঝরা রোদ্দুর।গাছ-গাছালির মাথায় মাথায় সোনালি রোদের ঝিকিমিকি।
শ্যামাকান্তের বুক পকেটে ঘোরে সরমার চিঠি।
চিঠির স্পর্শে কে যেন বলে ওঠে, তুমি কি বোঝ না,তোমাকে দেখতে না  পেয়ে কান্নায় ভেসে যায় আমার সমস্ত হৃদয়। ”
মনে মনে শ্যামাকান্ত বলে ওঠেন, এতো মুল্য আমার তোমার কাছে, সরমা । তুমি আমায় এতো ভালবাস!

ঘোড়ার গাড়ি চেপে এক সাহেব যাচ্ছে। কোচোয়ান ‘হেই হেই’ শব্দে ঘোড়া হাঁকাচ্ছে। সূর্য কেঁদে উঠল বুঝি কোনো এক নীল পাহাড় চূড়ায়।ঝর্ণার জল খিল খিল করে হেসেই থেমে গেল হঠাৎই। পাহাড়চূড়ায় উপর দিয়ে সাদা বক ট্যা ট্যা ডাক দিয়ে উড়ে গেল আরেক দিকে।মাথার উপর দিয়ে খন্ড খন্ড কয়েকটা মেঘ উড়ে গেল অচিরেই।গায়ে মৃদু বাতাসে কাঁপন ধরিয়েছে বেশ।
সেদিন আর পথে চলতে পারলেন না শ্যামাকান্ত। শরীরটা অবসন্ন হয়ে ওঠে।মাথাটা ভার ভার।গা’টা বেশ গরম। জ্বর জ্বর লাগছে। কুলুঙ্গির পুঁটলি থেকে একটা ট্যাবলেট জল দিয়ে গিলে নেন শ্যামাকান্ত। আজ আর কাজে যেতে পারবেন না তিনি। এই রকম শরীর খারাপ করলে সরমার কথা খুব মনে পড়ে। সে থাকলে বেশ হতো। অসহ্য যন্ত্রনায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে শ্যামাকান্তের। বাটির জলে কাপড় ডুবিয়ে কপালে মেলে ধরলে বেশ আরাম লাগত। সারা রাত ধরে ছটফট করতে করতে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়লেন তিনি।
স্বপ্ন দেখলেন সরমা কলকাতায় এসেছে। ভোরে কলকাতার রাস্তা ধুয়ে দেওয়া হয়েছে।সেই রাস্তায় আলতা রাঙা পা ফেলে হেঁটে আসছে সরমা।এলোচুল ভিজে কোমরের নিচে ঝুলে পড়েছে।
শ্যামাকান্ত ডাকলেন,এস।তোমার জন্য সারা রাত ধরে জেগে আছি।
তখনও শ্যামাকান্তের হাতের স্পর্শে সরমার চিঠি।
সরমার হাত ধরে ঘরে ফিরে আসেন তিনি।আলো ঝলমল সকালে মনটা খুশী খুশী।
—–কতদিন পর দেখা হল বল?আমি মনে মনে তোমার কথায় ভাবছিলাম।
—-আমাকে মনে পড়ে তোমার?
—— পড়বে না বউ আমার!
ঘুম ভেঙে যায়।শ্যামাকান্ত বোঝেন ভোররাতে আবোল তাবোল ভেবেছেন।তাই স্বপ্ন দেখছেন। বাড়ির জন্য খুব মন খারাপ করছে তার। সরমারও হয়তো খুব মন খারাপ।বেচারা!কাকেই বা সে মনের কথা বলবে!

তার কাঁচা হাতের লেখা চিঠিটাকে তিনি মেলে ধরেছেন চোখের সামনে।
——– তুমি কবে ফিরে আসবে গো ? এসো। ফিরে এসো তাড়াতাড়ি। তোমাকে ছাড়া আমার যে ভাল লাগে না। বোঝ না তুমি!

বিপ্লব কলমে — উওম কুমার দাস

বিপ্লব
কলমে — উওম কুমার দাস

ওরা ব্যাকরণ মানেনি
তাই স্থির জলে আরো একবার ঢেউ উঠলো পুরনো স্মৃতিকে ঘিরে।
অভিমান যত বাড়ে বিপ্লবের উন্মাদনা ততই তীব্র হয়।

ওরা ব্যাকরণ মানেনি
মনের দরজা বন্ধ করে শরীরে ওম খুঁজেছিল।
দুমুঠো শান্তি পেয়েছিল ভাতের বদলে
তাই আবার একবার ধরা পড়ল।

ওরা ব্যাকরণ মানেনি
তাই সবটা দিয়ে আবার শুরু করলো… স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া কিছু বিস্তৃতি নিয়ে! ভয়ে ভয়ে

ভাঙা প্লেট যদি কারো চোখে পড়ে
ভাঙা কাপে যদি ঠোঁট রক্তাক্ত হয়!

তবু ওরা ব্যাকরণ মানেনি
তাই মৃত্যুর আগে আয়ু ফুরিয়ে গেল
বিপ্লবের যতটা উন্মাদনা ছিল সে ততটা বিপ্লবী হয়ে উঠতে পারেনি….

আজ দূর থেকে দাঁড়িয়ে স্মৃতি হাসছে আর বিপ্লব পরাজিত।

ওরা ব্যাকরণ মানেনি।

ধারাবাহিক গল্প ***** ইচ্ছে পূরণ

ধারাবাহিক গল্প
ইচ্ছে পূরণ
পর্ব–৩

অবনী যা অনুমান করেছিল সেটাই হল।দুপুরে খেতে খেতে বাবা বলল–টুবাই জুঁইকে তোর কেমন লাগে?অবনী বলল–জুঁই তো চমৎকার মেয়ে বাবা।নতুন করে বলার তো কিছু নেই।হিমাংশু বাবু বললেন–তাহলে তোর শচীন কাকুকে কাল একবার আসতে বলব?

অবনী বলল–সে তো তোমার বন্ধু মাঝে মাঝেই আসেন।হিমাংশু বলল–তুই তো জুঁইকে পছন্দ বললি।আমি জুঁইয়ের সংগে তোর বিয়েটা ঠিক করতে চাই।–বাবা আমার তো চাকরি একবছরও হয়নি।এর মধ্যে বিয়ের কথা ভাবছ কি করে?এই বাড়িটা শরিকি ঝুরঝুরে পুরনো বাড়ি।আমি অন্তত বছর চারেক চাকরি করে আমাদের বাড়ির অংশটা আগে রিপেয়ারিং করি।

হিমাংশু বাবু বললেন–বাড়ি নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।আমার রিটায়ার করতে আর ছমাস মাস আছে।এককালীন যে টাকা পাব সেটা দিয়েই বাড়ি রিপেয়ারিং করব।বিয়েটা না হয় বছর খানেক পর হবে।

অবনী বলল–বাবা আমি এখন থেকেই কোনো কমিটমেন্ট করতে পারব না।আমি কোনো সরকারি চাকরি করিনা।কোম্পানির চাকরি মানেই অনিশ্চিত চাকরি।আগে আমাকে একটু থিতু হতে দাও।–তাহলে শচীনকে কি বলব?–কি বলবে মানে?তুমি কি আমার মত না নিয়েই কথা দিয়েছো নাকি?–আসলে প্রস্তাবটা শচীন দিয়েছিল। আমি কোনো কথা দিইনি।আমি শুধু তোর ইচ্ছা আর মতামত জানতে চেয়েছি।

অবনী বলল–জুঁই তো এখন লেখাপড়া করছে।ও লেখাপড়াটা আগে কমপ্লিট করুক।এত দীর্ঘ সময়ে অনেক কিছুই ঘটতে পারে বাবা।হিমাংশু বাবু গম্ভীর মুখে খাওয়া শেষ করে উঠে গেলেন।সুলেখা বলল-বাবার মুখের ওপর তো খুব ট্যাঁক ট্যাঁক করে কথা শোনালি।তা কি ঘটতে পারে টুবাই? ঘটতে পারে না কিছু ঘটিয়েছিস?ঝেরে কাশ তো বাবা।–আমি আমার কথা বলিনি মা।জুঁই পরবর্তী সময়ে তার পছন্দের কাউকে তো জীবনসঙ্গী করতেই পারে।তোমরা পুরনো যুগের মতো কথা দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটা বন্ধ করো মা।শচীন কাকু বাবার বন্ধু।সেই সম্পর্কটাই আপাতত থাক না।

পরদিন দুপুরে খাওয়ার পর অবনীর একটু চোখ এঁটে এসেছিল।মাথার কাছে টুবাই দা ডাক শুনে ধড়মড় করে উঠে বসে বলল–তুই?দিলি তো কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে?জুঁই হেসে বলল–কটা বাজে খেয়াল আছে?বিকেলের চা খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।এই নাও তোমার চা।আচ্ছা টুবাই দা তুমি নাকি বিয়ে করবে না বলে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করেছো?–কে বলল তোকে?জুঁই বলল–কাকিমার কাছে শুনলাম।– তাতে তোর সমস্যাটা কি?তোর না সামনে পরীক্ষা?লেখাপড়া শিকেয় তুলে খেজুরে গল্প করতে এসেছিস?জুঁই বলল–আমার আবার কি সমস্যা।আমি তো বাবাকে বলছি এম এ পড়ব। তারপর চাকরির চেষ্টা করব।কিন্তু বিয়ে করতে তোমার সমস্যাটা কি?তুমি তো চাকরি করছ।

অবনী বলল–আমি যা স্যালারি পাই তাতে কলকাতার মতো জায়গায় বৌয়ের ভরণপোষণ চালানো কঠিন।জুঁই বলল–অনেকেরই চাহিদা খুব বেশি কিছু থাকে না।–তাই নাকি? এমন মেয়ে তোর সন্ধানে আছে বুঝি? –চোখ থাকলেই দেখতে পেতে।অবনী বলল–এই সেরেছে,তুই নোস তো?–আমি কেন হব?দায়িত্ব নিতে ভয় পাওয়া ছেলেকে আমি কখনও বিয়েই করব না।

অবনী বলল–একদম ঠিক বলেছিস।তোর জন্য রাজপুত্র বর এখন থেকেই সাধনা করছে। আচ্ছা তুই একা এসেছিস না কাকুও এসেছে?–আমি বুঝি একা আসতে পারি না?প্রত্যেক দিন একাই তো বাস ঠেঙিয়ে কলেজ যাই।— চল তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি।

ফিরে এসে অবনী বলল–মা বাবাকে দেখছি না?–তোর বাবা এইমাত্র তাস খেলতে বেরিয়ে গেল।যা বাবা মাত্র একটা দিনের জন্যে এলাম আর ফাদার বেরিয়ে গেল?ভাবলাম একহাত দাবা খেলব।–হ্যাঁ রে জুঁইয়ের বাড়ি পর্যন্ত যাসনি?–বাবার সংগে আড্ডা মারব দাবা খেলব বলেই তো গেলাম না। ওদের বাড়ি পৌঁছানোর অনেকটা আগেই জুঁই বলল চলে যেতে পারবে। পরের বার ঠিক যাব।–তোর বাবার মন খারাপ বুঝিস নি?

অবনী বলল–আচ্ছা মা আমি কি এমন বাবাকে বলেছি যে বাবার মন খারাপ হবে?আর আমার বয়সটা কি বিয়ে করার বয়স?একটু গুছিয়ে নেওয়ার সময় তো দেবে?–তোর জন্যে পায়েস করেছি।এখন খাবি না রাতে খাবি?–রাতে রুটির সঙ্গে খাব।সংগে হাঁসের ডিমের কারি আর বেগুন ভাজা কোরো।এখন চা আর তোমার স্পেশ্যাল বেগুনি ভেজে দেবে?মা প্লিজ তুমি অন্তত মুখ গোমড়া করে থেকো না।

ঘরে এসে ভাবল বীথিকে একবার ফোন করবে।মনটা কেমন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।জুঁই কি তার সঙ্গে বিয়ের কথা চলছিল জানে? মেয়েটা কি তার প্রতি দুর্বল ছিল?তার কারণে কেউ কষ্ট পাবে এটা ভেবে তার খুব খারাপ লাগছিল।সে তো কখনও জুঁইয়ের সঙ্গে সেভাবে মেলামেশাই করেনি। প্রতিশ্রুতির তো কোনো প্রশ্নই নেই।

একটু পরে মা বেগুনি আর চা নিয়ে ঢুকল।দুবার ডেকে ছেলের সাড়া না পেয়ে কাছে এসে গায়ে হাত দিয়ে বলল–এই টুবাই,কি
এত তন্ময় হয়ে ভাবছিস বল তো?ডেকে সাড়া পাচ্ছিনা।অবনী একটা বেগুনিতে কামড় দিয়ে মার মুখের কাছে ধরে বলল–টেরিফিক মুচমুচে হয়েছে।খেয়ে দ্যাখো।মা বলল–তোর মতলবটা কি বল তো?এতক্ষণ কার ধ্যান করছিলিস?অবনী বলল–তোমার আদর খাওয়াটাই আমার একমাত্র মতলব।কই হাঁ করো।এবার না হাসলে কিন্তু ছোটবেলার মতো কাতুকুতু দিয়ে হাসাব।

সুলেখা হেসে বলল–হয়েছে?এবার ছাড়,আমার কাজ আছে।আজ রাতটা থাকবি তো?–না মা ভোরের ট্রেন ধরে গেলে অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে।আমি রাতের ট্রেনে চলে যাব।

ট্রেনে গোটা রাতটা অবনী ভারক্রান্ত মনে থাকল। তার গল্পবাজ আড্ডাবাজ বাবা যন্ত্রের মতো তার সংগে আচরণ করল।বাবা মার সঙ্গে ছোটোবেলা থেকে তার স্ট্রং বন্ডিং।

প্রতিবার ফেরার সময় বাবা দু রকম মিষ্টি কিনে আনে,মা আচার,ঘি নারকেল নাড়ু এটা সেটা দিয়ে ব্যাগ ভর্তি করে দেয়।ব্যাগ গোছানোর সময় বাবা নিজে খুঁটিনাটি জিনিস দিতে ভুল হল কিনা দেখে নেয়।এবার বাবা মিষ্টি এনে দিয়ে ধারে কাছে থাকেনি।যাওয়ার আগে শুধু বলল সাবধানে যাস।

ক্রমশ–

ধারাবাহিক উপন্যাসিকা ****** কলমে ছন্দা চট্টোপাধ্যায় ****** কিছু কথা।

ধারাবাহিক উপন্যাসিকা
কলমে ছন্দা চট্টোপাধ্যায়
কিছু কথা।
পর্ব-৩।

খুকুর কথা।
আমি খুকু। ভালো নাম কেকা। একটু আগে দিদি ফোন করেছিলো। এ কী শুনলাম আমি? দীপ শেষ হয়ে যাচ্ছে? আমার মায়ের কোলপোঁছা সেই দীপ!দীপু, দীপাঞ্জন! আমি আর দিদি ছিলাম যার জননীর প্রতিনিধি, অতি ছোট ছোট দিদি।কী ভীষণ ভালোবাসতাম আমরা ছোট্ট পুতুলের মতো ভাইটাকে। দিদি ছিলো রাঙাদি, আমি মিষ্টিদি।আধো আধো স্বরে ডাকতো -‘নানাদি, মিত্তিদি’-।সারাদিন দিদির ট্যাঁকে ঘুরতো। আমি কিনা বড্ডো রোগা, কমজোরি, কোলে নিতাম বসে বসে। ভাইটা বেশ মোটাসোটা তো। একবার পড়ে গিয়ে মাথা ফাটালো।কী রক্ত!কী রক্ত!! আমি নিজের মাথা ঠুকে দেখছিলাম কতটা ব্যাথা পেয়েছে দীপ।সেই দীপ আজ মৃত্যুপথযাত্রী!আমাকে একটা খবরও দিলোনা কেউ! অবশ্য দেবেই বা কেন? আমি তো গলার কাঁটা ছিলাম বাবা মায়ের। না ছিলো রূপ, না ছিলাম লেখাপড়ায় ভালো। দিদি সুন্দরী,দিদি পড়াশোনায় ভালো। দিদি সভ্য। আমার মতো উড়নচণ্ডী,পাড়াবেড়ানি নয়। দিদিকে এক দেখায় অভিজাত পাত্রপক্ষ পছন্দ করে নিয়ে গেলো।জামাইবাবু কেন্দ্রিয় সরকারী চাকুরে, গেজেটেড অফিসার। দিদির বিয়েতে কতো নতুন শাড়ি গয়না। আমাকে মা দিলোনা। গাছে চড়তে গিয়ে ছিঁড়ে ফেলব কিনা, তাই। কোনমতে হায়ার সেকেণ্ডারী পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছি। বনগাঁ থেকে আসতো সুভাষ। চাষি পরিবারের চাষাড়ে সুভাষ আমার চোখে আলোর ঝলকানি দেখতে পেলো। ওর চোখে দেখলাম রামধনু। আমার অবহেলিত বর্ণহীন জীবন সাত রঙে রঙিন হয়ে গেলো।পারিবারিক সংস্কৃতিতে মেলেনি,জাতে মেলেনি। তবে আমি বুঝেছিলাম-প্রেম এসেছিলো নিঃশব্দ চরণে।আমাদের মোটা চালের ভাতডালের সংসারে তাই সচ্ছলতা না থাকলেও স্বাচ্ছন্দ্য ছিলো।এখনো আছে।দাদা তখন প্রফেসারি করে।কলেজের প্রিন্সিপালের মেয়েকে বিয়ে করে তারও হাই স্ট্যাটাস।মা বাবাও সেই উচ্চতার কাছে দীনহীন।শুধু দিদি জামাইবাবুই তার মর্যাদার যোগ্য।দাদার বিয়েতে আমি শুধু বৌভাতের নিমণ্ত্রণ পত্র পেয়েছিলাম।যাওয়া হয়নি। আমার চাষা শ্বশুর, চাষির ছেলে বর আমাকে একটা ভালো শাড়ি, একটা কানের দুল কেন,একটা নাকছাবিও দিতে পারেনি। অভিজাত বাড়ির মেয়ে বলে পরিচয় দেবার যোগ্যতা হারিয়েছি আমি। শুধু দীপু বৌবাজারের গোল্ডপ্লেটেড কিছু গয়না,একটা সত্যি সোনার ঝুমকো আর মুর্শিদাবাদ সিল্কের একটা শাড়ি নিয়ে যেদিন এসেছিলো, -‘মিষ্টিদি, আমার বিয়েতে যাবি তুই।এই গুলো পরে যাবি। আর এই সোনার কানপাশাটা রাখ।আমার বৌকে আশীর্বাদ করবি।’-
আমার সোনা ভাই। না করতে পারিনি। তবু না গেলেই ভালো করতাম।মা ছোট বৌমার মুখ দেখে দিলো খাঁটি সোনার আটগাছা চুড়ি, নিজের বিয়েয় দিদিমার থেকে পাওয়া।বৌদিকে দিয়েছিলো রতনচূড়,দিদির বিয়ে দিয়েছিলো ষোলো ভরি গয়নায় গা সাজিয়ে। বড়লোক বেয়াইবাড়ির মান রাখতে হবে তো!শুধু আমিই বরের বাড়ি গিয়েছিলাম ঝুটো মুক্তোর মালা,ইমিটেশন দুল, কাঁচের চুড়ি আর ছাপা পাটের চকচকে শাড়ি পড়ে। আমার বারোমেসে সোনার কানের রিংটা, আঙটিটাও খুলে মাকে ফেরত দিয়েছিলাম। যে অলঙ্কারে মায়ের আশীর্বাদ নেই তা আমার কাছে মূল্যহীন। বৌদি দীপুর বৌকে দিলো মান্তাসা,দিদি দিলো প্রায় তিন ভরির লকেটহার।আমি শ্রীলাকে কানপাশাটা দিতেই মা জিজ্ঞেস করলো-‘কোথায় পেলি?-‘ দীপু বলে উঠলো -‘মিষ্টিদির শাশুড়ি দিয়েছেন’-। এই হচ্ছে আমার ভাই। আমার দিদিটাও খুব ভালো। আর শ্রীলা?হেলাগোলা মেয়েটা আমাকে কী করে এতো ভালোবাসলো কে জানে!সে কী দীপুর শিক্ষায়!অথচ আমার নিজের মা আর বৌদি আমাকে নিয়ে কতো লজ্জিত। আমি পালিয়ে বিয়ে করেছি, আমার শ্বশুরবাড়ি অশিক্ষিত চাষা,আমার বর গাঁইয়া বলে কতো দুঃখ করে চোখের জল ফেলেছে শ্রীলার দাদা দিদিদের কাছে। তারা আমাকে কেন শ্রদ্ধা করবে? কেন করুণা ও ঘৃণার চোখে দেখবেনা? কেন নমস্কারিতে সস্তা রঙচঙে সিন্থেটিক শাড়ি দেবেনা?কেন আমার সঙ্গে আমার ভাইয়ের দূরত্ব তৈরী করবে না? তবু তো দীপু শ্রীলা মাঝেমধ্যে আমার মাটির দাওয়ায় বসে মোটা লাল চালের ভাত কলমি শাক, আর পুকুরের মাছের ঝোল খেতে যেতো। সেই ভাই আমার দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, আমি খবর পাচ্ছি শেষ সময়! হায় ঈশ্বর!

ক্রমশ:

লজ্জা / কলমে – হাসি দত্ত

লজ্জা / কলমে – হাসি দত্ত

সমগ্ৰ উপমহাদেশের এক লজ্জা , এখানে বসবাস করা প্রতিটি মানুষের লজ্জা , আমার মারাত্মক লজ্জার !!!
কেনো জানেন !!!
এখানে প্রকৃতির রোষানলে মানুষ পড়ে প্রায় সময়ই ঠিক কথা, তবে এখানে মানুষের কারণেই মারা যায় অনেক অনেক বেশি ….. আমার সেই লজ্জা !! …..
আমার বলতেও লজ্জা করে ,
লজ্জাতেও আজকাল আকাল পড়েছে …..
আকাল !!! আকাল !!!!
মৃণাল সেনের ‘ আকালের সন্ধানে’ ছবিটার কথা মনে পড়ে মাঝেমধ্যেই তবে কাল থেকে মনে পড়ছে বারবার, কারনটা শেষে বলছি……
ছবিটাতে হাতুই গ্ৰামের এক বৃদ্ধের তিরষ্কার যেন বারবার নাড়িয়ে দেয় ,
” বাবুরা এয়েছেন আকালের ছবি তুলতে!!
আকাল তো আমাদিগের সব্বাঙ্গে !! ”
সত্যিইই তো , বৃদ্ধ লোকটি তো কিছু ভুল বলেন নি।
এই 2024 সালে এসেও আমাদের কঙ্কালসার চিন্তাভাবনায় টিকে আছে আকাল এবং তা বহাল তবিয়তে টিকে আছে আমাদের জীবনে এবং মননে…..
পরিচালক মৃণাল সেন ১৯৪৩ সালের আকালকে ১৯৮১ সালের সমাজজীবনের সাথে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন এই ছবির মাধ্যমে …. পুরোপুরি সফলও হয়েছেন….
আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে ১৯৪৩, ১৯৬৯, ১৯৭১ এর আকালের মধ্যে নিঃশ্বাস নিই ঠিক কথা, তবে 2024 এর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে , আমার নিঃশ্বাসে আকালের গন্ধ ……
কারন আমি আকালের ভুক্তভোগী, আকাল সৃষ্টির একজন পরোক্ষ অংশীদার ……
এই ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিতে দেখতে পাই , আকালের সময় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে অনেকেই বেছে নেন তৎকালীন সমাজের চোখে নোংরা হিসেবে প্রতীয়মান হওয়া পথ…… কিন্তু সত্যিই কি তারা তথাকথিত নোংরা
পথ স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলো!!নাকি বাধ্য হয়েছিলো!!
এর উত্তর আমি পেয়েছি এই ছবির মধ্যেই…..
যখন এই ছবির এক চরিত্র ‘দুর্গা’ ঠিক করে, গ্ৰামে সিনেমার কাজ করতে আসা দলে সে অভিনয় করবে দুটো পয়সা পাবে, তখন দুর্গার স্বামী সমাজের দোহাই দিয়ে এই কাজে আসতে তাকে বাধা দেয়, সেই সময় দুর্গার সেই প্রতিবাদের ভাষা আজও আমাদের গালে এসে সপাটে চড় মারে , আমাদের আঁতে ঘা দেয়…… দুর্গা বলে ওঠে…….
” গাঁয়ের পাঁচজন তখনও ভাবেনি এখনও ভাবছে না। তবে আইজ কেন তারা নাক গলাতে আসে ?? ”
.মৃণাল সেন আকালের মাঝেও বলেন আরেক আকালের গল্প। আর আমরা আজ 2024 এও বহমান আকালের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই আকালের গল্প শুনি… বর্তমানেও টিকে আছে আকাল!! আর,আকাল!!….. পরিবারকে চালাতে কষ্ট তাই অসৎ পথে যেতে হচ্ছে। নিজের প্রতি ঘৃনা থেকে মারাত্মক ঘৃনার পথ বেছে নিতে হচ্ছে। কোনও একটা অন্যায়ের আশঙ্কায় আরেকটি অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে হচ্ছে……
মাঝেমধ্যে প্রচন্ড কান্না বেরিয়ে আসে, হেরে যাওয়ার কান্না, আকালকে তোষন করার কান্না…..
আমরাই আকাল সৃষ্টি করছি আবার আমরাই আকালকে সামাল দিচ্ছি , তাই মনের ভেতরে টিকে আছে প্রচণ্ড দুঃখবোধ, যা প্রায়ই বেরিয়ে আসতে চায়…….
এবার বলি….এতক্ষন ‘আকালের সন্ধানে’ ছবিটা নিয়ে এতগুলো কথা লেখার অন্যতম কারন , এই ছবির সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল যে অভিনেত্রীর অভিনয় দেখার আগ্ৰহে , তিনি হলেন ‘ওঁ শ্রীলা মজুমদার’..
গতকাল তিনি পরলোকগমন করেছেন…..
এই মহান অভিনেত্রীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি
লেখা কপিপেষ্ট করবেন না, শেয়ার করতেই পারেন