বালুরঘাট বিমানবন্দর চালুর দাবী দক্ষিণ দিনাজপুর বাসীর, প্রশ্ন উঠছে সুকান্ত – অশোক লাহিড়ীর ভূমিকায়

বালুরঘাট, ২০শে অক্টোবরঃ ৪০ মিনিটে কলকাতা কিম্বা দুই ঘন্টায় দিল্লি কিম্বা তিন ঘন্টায় বেঙ্গালুরু, বালুরঘাট থেকে এই অল্প সময়ে এই যাত্রার কথা ভাবতেই অবিশ্বাস লাগে। কিন্তু বাস্তবে এই ভ্রমন সম্বব যদি বালুরঘাট বিমানবন্দর চালু করতে উদ্যোগ গ্রহন করে সরকার। অথচ দক্ষিণ দিনাজপুর মালদা ও উত্তর দিনাজপুর জেলার একাংশের মানুষকে এই সফর করতে যেতে হয় বাগডোগরা বিমানবন্দরে বিমান ধরতে। বালুরঘাট থেকে যার দুরত্ব ৩০০ কিলোমিটার। অথচ প্রবল সম্ভাবনাময় বালুরঘাট বিমানবন্দর চালুর বিষয় নিয়ে কোন হেলদোল নেই কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের। প্রায় ১২ কোটি টাকা রাজ্য সরকার খরচ করে বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে অন্যান্য পরিকাঠামো গড়ে তুলেও বিমান পরিষেবা চালু নিয়ে নিশ্চুপ কেন্দ্রীয় সরকার। বর্তমানে বালুরঘাট বিমানবন্দরের রানওয়ে প্রায় ১৫০০ মিটার হলেও ১৯০০ থেকে ২০০০ মিটার করবার জন্য প্রয়োজনিয় জমি রয়েছে বিমানবন্দরের হাতে। যদিও বর্তমানে এই বিমানবন্দর থেকে ATR 72 জাতীয় ৬০ থেকে ৭০ আসনের বিমান খুব সহজেই ওঠা নামা করতে পারবে বালুরঘাট বিমানবন্দর থেকে।

বালুরঘাট বিমানবন্দর চালু হলে এই জেলার যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতি ঘটবে শুধু তাই নয়, এই জেলার স্বাস্থ্য শিক্ষা সহ অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়নে অভুতপূর্ব ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বিমান পরিষেবা ভালো হলে হিলি হয়ে বাংলাদেশ থেকে আসা যাত্রী সেবা উন্নতি ঘটবে বাড়বে যাত্রী সংখ্যাও। শুধু মাত্র বালুরঘাট থেকে বিমান কিম্বা ট্রেন পরিষেবা ভালো না হবার কারনে ক্রমেই কমছে যাত্রী সংখ্যা। ফলে অধিকাংশ যাত্রী শিলিগুড়ি কিম্বা কলকাতা হয়ে যেতে আগ্রহী হচ্ছে। এছাড়াও রাধিকাপুর যাত্রী সেবা খুলে গেলে হিলি শুধু মাত্র পরিকাঠামোর অভাবে পড়তে চলেছে বড়সরো চ্যালেঞ্জ এর মুখে।

তাই আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগেই এই জেলার বিমানবন্দর চালুর দাবী করছে এই জেলার মানুষরা। তবে বিমানবন্দর চালু আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বড় ইসু বলেই মনে করছে এলাকার মানুষরা। তাই সব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিজেপির কাছে বিমানবন্দর চালু একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বর্তমানে বিজেপির দক্ষলেই রয়েছে বালুরঘাট লোকসভা ও বিধানসভার সিট। তাই বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ সুকান্ত মজুমদার থেকে বিধায়ক অশোক লাহিড়ী সবার কাছেই চ্যালেঞ্জ বিমানবন্দর চালু।

সোমবার হাওড়া এনজেপি বন্দে ভারতের টিকিট কেটে চড়তে হবে অন্য ট্রেনে? আপডেট দিল রেল

কলকাতা: বন্দে ভারতের টিকিট কেটেও সোমে চড়তে হবে অন্য ট্রেনে! বড় আপডেট দিয়ে এমনই কথা জানিয়ে দিল ইস্টার্ন রেল কর্তৃপক্ষ। পূর্বরেলের তরফে জানানো হয়েছে ১৬ অক্টোবর ২০২৩ এর হাওড়া-নিউ জলপাইগুড়ি বন্দেভারত একপ্রেস ট্রেনটি বিকল্প যুবা রেক দিয়ে পরিচালনা করা হবে।

যান্ত্রিক সমস্যাজনিত কারণেই আগামিকাল অর্থাৎ ১৬.১০.২০২৩ তারিখ অর্থাৎ সোমবার ২২৩০১/২২৩০২ হাওড়া-নিউ জলপাইগুড়ি-হাওড়া বন্দেভারত এক্সপ্রেস রেকটি বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই রেলের এই সিদ্ধান্ত বলে জানানো হয়েছে পূর্বরেল সূত্রে।

যাত্রীদের সুবিধার্থে এবং পরিষেবা বজায় রাখতে রেল কর্তৃপক্ষের তরফে আপ এবং ডাউন উভয়পথে বিকল্প ট্রেনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে । বিকল্প রেকটিতে দুটি প্যান্ট্রি কারও যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিকল্প ট্রেনটি বোলপুর এবং মালদহ টাউন স্টেশনে উভয়দিকেই যাত্রাকালে ১০ মিনিটের জন্য থামবে।

কিন্তু ট্রেন বাতিল হলে পাওয়া যাবে তো রিফান্ড? ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা মিলবে তো? এই প্রশ্ন উঠছে যাত্রীদের মধ্যে। এই বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ আগাম জানিয়েছে টিকিটের ফেরতযোগ্য অতিরিক্ত মূল্য নিয়মমাফিক ফেরত দেওয়া হবে। আর মিলবে খাবারও।

সিঙ্গাবাদ, রাধিকাপুর ও হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে যাত্রীসেবা শুরুর উদ্দ্যোগ রেলের, করা হলো টেন্ডার

কাটিহার, ১৯শে অক্টোবরঃ সিঙ্গাবাদ, রাধিকাপুর ও হলদিবাড়ি ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে যাত্রীসেবা শুরুর উদ্দ্যোগ নিলো উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেল। সেবা শুরু করতে যাত্রী সুবিধা ও সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য রাস্তা, আলোর ব্যাবস্থা ও র‍্যাম্প নির্মানের জন্য টেন্ডার করলো উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলের কাটিহার ডিভিশন। এতো দিন পযর্ন্ত শুধু মাত্র এই তিন রুট দিয়ে রেলের মাধ্যমে পণ্য রপ্তানিতেই ব্যাবহৃত হতো, যা দিয়ে এখন যাত্রী পরিষেবা চালুর ব্যাপারে ভাবনা চিন্তা শুরু করতে শুরু করলো ভারতীয় রেল।

এতোদিন উত্তরবঙ্গে মহদিপুর, হিলি, ফুলবাড়ি ও চেংরাবান্ধা দিয়ে যাত্রী পরিষেবা চালু ছিলো, চলতি বছরের শুরুতে হলদিবাড়ি হয়ে এনজেপি ঢাকা ট্রেন পরিষেবা চালু হলেও সিঙ্গাবাদ, রাধিকাপুর ও হলদিবাড়ি দিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোন যাত্রী সেবা ছিলো না। এবার এই রুট দিয়ে যাত্রী সেবা চালুর খবরে খুসির হাওয়া দুই দেশের মানুষের মধ্যে।

কাটিহার ডিভিশনের ডিআরএম সুরেন্দ্র কুমার জানান এই রুট দিয়ে যাত্রী সেবা চালুর করবার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো উন্নয়ন করবার জন্য টেন্ডার করা হয়েছে।

ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে নশিপুর রেল ব্রিজের কাজ, দ্রুত যোগাযোগ উত্তর দক্ষিণে

মুর্শিদাবাদঃ এই বছরের শেষে ডিসেম্বর মাসে শেষ হতে পারে নশিপুর রেল ওভারব্রিজের কাজ। চালু হতে পারে ট্রেন চলাচল। আশা প্রকাশ করে দাবি করলেন পুর্ব রেলের জিএম অমরপ্রকাশ দ্বিবেদী।  এই প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে চলছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করে রেল চালু হবে বলেই আশাবাদী তিনি।

এই নশিপুর রেলব্রিজের কাজ সম্পন্ন হলেই আর উত্তরবঙ্গ যেতে বেশি সময় লাগবে না। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাবে উত্তরবঙ্গ। সেই কারণেই ২০০৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ওই রেল সেতুর শিলান্যাস করেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদব। পরে ২০০৬ সালে সেতু নির্মাণের কাজও শুরু হয় । ২০১০ সালে এপ্রিল মাসে সেতুর উদ্বোধন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি।ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে আজিমগঞ্জের দিকে দুটি মৌজা চর মহিমাপুর ও মাহিনগর দিয়ারে মোট সাড়ে সাত একর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

সেই কারণেই আটকে ছিল নশিপুর রেলব্রিজের কাজ। অবশেষে এই বছর জানুয়ারি মাসে জমি জট কাটিয়ে শুরু হয় নশিপুর রেল ওভারব্রিজের কাজ। অবশেষে সেই কাজ এখন শেষের দিকে। আগামী দিনে উত্তরবঙ্গ হোক বা দিল্লি খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গন্তব্য নবাবের জেলা থেকে।

বালুরঘাটে বর্ষায় বিলম্বিত এফসিআই ও ভারতীয় রেলের ৫০ হাজার মেট্রিকটনের খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষন প্রকল্পের কাজ

বালুরঘাটঃ গত দুই মাসের প্রবল বর্ষণে ব্যাপক ভাবে ব্যাহত দক্ষিন দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া ও ভারতীয় রেলের যৌথ উদ্যোগে নির্মীত ৫০ হাজার মেট্রিকটনের খাদ্যবস্তু সংরক্ষন প্রকল্পের কাজ। জমি অধিগ্রহনের পরে বালুরঘাট রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এই নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে, যা আগামী ২০২৪ সালের মে মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সম্পূর্ণ করবার লক্ষ্য মাত্রা ধার্য করা হলেও, এবারের বর্ষায় কাজ সেই ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি নির্মাণকারী সংস্থার দ্বারা। সারা ভারতের একাধিক এলাকায় ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া ও ভারতীয় রেলের যৌথ উদ্যোগে এই ধরনের খাদ্যবস্তু সংরক্ষন ব্যাবস্থা গড়ে তুলছে ভারত সরকার, যার মধ্যে রয়েছে বালুরঘাটের এই ৫০ হাজার মেট্রিকটনের খাদ্যবস্তু সংরক্ষন প্রকল্পের নাম। কৃষি ভিত্তিক এই জেলার কৃ্ষি উন্নয়নের জন্য এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে ভারত সরকার। যেখানে অত্যাধুনিক উন্নত সংরক্ষন ব্যাবস্থার মাধ্যমে ধান গম সংরক্ষন করা হবে। যার ফলে কৃ্ষকরা উৎপাদিত ফসল সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রয় করতে পারবে। যা সংরক্ষন করে রেল ও সরক পথে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বা বিদেশের রপ্তানি করবে সরকার। এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজের বরাদ পেয়েছে লিপ এগ্রি লজিস্টিক বালুরঘাট প্রাইভেট লিমিটেড। যেখানে ৫০ হাজার মেট্রিক টনের অত্যাধুনিক আন্ডার গ্রাউন্ড সংরক্ষন ব্যাবস্থা সহ রাস্তা ও রেলপথের মাধ্যমে সংযুক্ত হবে। পাশাপাশি ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার প্রশাসনিক ভবন ও নির্মাণ করা হবে। এই সংস্থার প্রকল্প আধিকারিক সুভদিপ দাস জানিয়েছেন এই প্রকল্পের কাজ খুব দ্রুত সম্পূর্ণ করবার জন্য জোড় কদমে কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের শেষ থেকে কিন্তু বর্ষার কারনে খনন কাজ ও নির্মাণ কাজে ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হয়। দ্রুত কাজ শেষ করবার জন্য রাত দিন চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হলেও বৃষ্টির কারনে সেই কাজ নির্দিষ্ট সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেভাবে কাজ চলছে তাতে নির্দিষ্ট সময়ের কিছু বেশি সময়ে তা সম্পূর্ণ করতে পারা যাবে।

গীতশ্রী সিনহা —— সম্পাদক, বিনোদন বিভাগ

সম্পাদকীয়

Dinajpur Daily বিনোদন বিভাগের নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটল, অভিনব এক পথচলা। এক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে, জন্ম নেবার জমি প্রস্তুতের দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়ে যেন সংকীর্ণ পথচলা। যেন শূন্য থেকে শুরু। শিকড়ে শিকড়ে বুঝি বা থাকে কিছু মাটির গভীরে। কলা গাছ উপড়ে ফেলার পর আবার একসময় যেরকম মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে নতুন চারা। অদম্য তার টান। জীবনের সঙ্গে তার প্রেম সমস্ত বোঝাপড়ার অতীত। দায়বদ্ধতা এখানেই। এতো গেল নিজের সাথে নিজের দায়বদ্ধতা। দায়বদ্ধতা থাকে পাঠকের কাছে, ইতিহাসেরও কাছে।
একটা অলৌকিক কিছু ঘটে যাবে সেটা তো নয় ! আবার সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ তা – ও – না। নতুন নতুন নাম যোগ হচ্ছে আমাদের এই বিভাগীয় প্রতিটি সংখ্যায়। এ-ভাবে বিভাগের একটি নিজস্ব চরিত্র গড়ে উঠছে হয়তো-বা, যা খুবই কাম্য।
এই – দেশ জুড়ে ভাঙনের সময়, এ যেন রাস্তার পাশে গাছের ফল, যে যেমন খুশি গায়ের দাপটে পেড়ে খেতে চায়। ব্যপারটি হয়তো বা সরলিকরণ হল। পরিবর্তন ঘটুক মানুষের চেতনায়, সামাজিকতায়। বাজার দর্শন ভাবতে শেখাচ্ছে সবকিছুই পণ্য হিসেবে। শেখাচ্ছে, আলু – পটলের মতো ভালোবাসাও কেনাবেচার যোগ্য পণ্য। বাড়ছে মহিলাদের উপর অত্যাচার। ধর্ষণ খুন প্রাত্যহিকতায় আচ্ছন্ন। পচা এক সময়ের শিকার সামাজিক মানুষ। এ সমস্তর প্রতিফলন ঘটুক সাহিত্যের কলমে। সময় ইতিহাস জীবন চেতনায় ঋদ্ধ বস্তুমুখিন চিন্তার প্রকাশ চাই সাহিত্যের আঁচড়ে।
সাহিত্য সংস্কৃতি যে কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের প্রধান স্মারকচিহ্ন। জাতির নিজস্বতা বিরাজ করে দ্বিধাহীন, ভয়হীন সৃষ্টিতে মাতোয়ারা, সামাজিক প্রেক্ষাপট আছড়ে নিংড়ে তুলে আনবে সব অবিস্মরনীয় কবি -লেখক। যেগুলি হবে কালের প্রতিভূ ও কালাতিক্রম সম্পদ।
আসুন, সমবেত কন্ঠে বলে চলি, ” একটা নতুন স্তবকের জন্য এগিয়ে চলি, পড়ে থাক অতিরিক্ত দৃশ্যাবলী “…
শিশুর হাসির মতো সূর্যোদয় আসুক, আসুক কোকিলের কলতান… মুছে যাক কলরব।
শুভেচ্ছা শুভকামনা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী সংখ্যায় নতুন কিছু চমকপ্রদ লেখা নিয়ে।

গীতশ্রী সিনহা —— সম্পাদক, বিনোদন বিভাগ।

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ ~ শান্তনু ঘোষ

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ
~ শান্তনু ঘোষ
পর্ব-১০

আগে যা ঘটেছে:

নাটোরের রাজবাড়ি দেখে রাজশাহী যাবার পথে একটু উঁকি দিলাম পুঠীয়ার রাজবাড়িতে। সুন্দর এক রাজবাড়ি। তবে যত্নের প্রয়োজন। এ ধরনের সৌধগুলীর এক ঘটনাবহুল অতীত থাকে। তার কিছুটা জানা, অনেকটাই অজানা। এই জানা-অজানার আলো-আঁধার জানতে যতটা অধ্যবসায় ও সময় দিতে হবে, তা এই মুহূর্তে আমাদের দ্বারা হচ্ছে না। তাই চটপট দেখে ঝটপট গাড়িতে চড়ে রাজশাহী রওনা দিয়েছি।

তারপর…

বেলা অনেকটা হয়ে গেছে। ১টা বাজতে চলল। পুঠীয়ার রাজবাড়ি দেখে এগিয়ে চলেছি । আমাদের প্রায় ঝটিকা সফর চলছে। আজই রাজশাহী দেখে আবার রাতে পাবনায় ফিরতে হবে। তাই তাড়া আছে। কিন্তু তাড়াহুড়ো নেই। হাল্কা মেজাজে চলছি। যতটুক দেখা সম্ভব তাতেই খুশি। খুব ইচ্ছে হলে, না হয় আবার আসব।

আমি দেখেছি জীবনে প্রয়োজনের তুলনায় বেশী লম্ফ-ঝম্ফ করে বিশেষ কোন লাভ হয় না। কোন এক জায়গায় আমাদের সময়ের হিসেব আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে।

এই বিষয়ে আমার নিজস্ব এক খ্যাংরা ব্যাখ্যা আছে। অনেকেই বেশ অপছন্দ করে। তাতে আমার বিশেষ সমস্যা হয় না। আমার মোটা মাথার মতে, জীবনের সব থেকে টেনশন হল “ভবিষ্যৎ”। কারণ ওটাই আমাদের অজানা । কিন্তু তা বলে “আমাদের অজানা” ভবিষ্যতটা তৈরি হয়ে নেই, এমনটা নয়। ওটাও রেডি করা আছে। শুধু সামনে আসা বাকি। অনেকটা সিনেমা হলে সিনেমা দেখার মত। পরের সিন কিন্তু প্রস্তুত। শুধুমাত্র সামনের পর্দায় উপরে পড়ার অপেক্ষা। জীবনের ভবিষ্যতের ঘটনাগুলিও তেমনি ভাবেই তৈরি করা আছে। শুধুমাত্র বর্তমানের পর্দায় আবির্ভূত হওয়ার অপেক্ষা মাত্র।
এখন তাত্ত্বিকগণ প্রশ্ন করবেন, সবই যদি ঠিক হয়েই আছে, তাহলে আর এত কর্মকান্ড কেন বাপু ! হাত গুটিয়ে ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বসে থাকলেই হয়। এ তর্কের বিষয় নয়, গভীর অনুধাবনের বিষয়।

হাজার হাজার বছর আগেই, মাথায় ময়ূরের পালক পরা এক ভদ্রলোক, তার বন্ধু অর্জুনকে এ ব্যাপারে পরিষ্কার বলে গেছেন । অত বড় বীর অর্জুনবাবু তো যুদ্ধের আগেই ভবিষ্যতের আগডুম বাগডুম কথা ভেবে হাত থেকে অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ধপাস বসে পড়লেন। তাঁর নাকি গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। তখন তার সখা এক লম্বা লেকচার দিয়ে বললেন। এসব নিয়ে বেশী ভাবতে হবে না তোমাকে। আমি আগে থেকেই সব সেট করে রেখেছি। তুমি শুধু আক্টো করে যাও। যদিও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ তার জানা ছিল, তাও তিনি একবারও অর্জুনকে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে বলেননি।
কথাগুলো নেহাত মিথ্যে নয়। তেমন হলে এত কাল পরেও তা সমুজ্জ্বল থাকত না। কিন্তু আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতে চট করে বুঝে উঠতে পারিনা। একটু ভাবতে হয়। তবেই অন্তর্নিহিত অর্থ পরিষ্কার হয়।

সে যাই হোক। সেই লেকচার নিয়ে পরে একটা বই লেখা হয়ে গেল। ১৮ টা চ্যাপ্টার আর ৭০০ টা শ্লোকের ওই বইটা কিন্তু দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন বা ম্যানেজমেন্ট কিতাব। কপিরাইট নেই বলে, আমাদের দেশে তো বটেই পশ্চিম দুনিয়ারও ধর্ম প্রচারক, লেখক, ম্যানেজমেন্ট গুরুরা ওই বই থেকে স্রেফ টুকে নিজেদের নামে নির্লজ্জের মত চালিয়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। কিছুদিন আগেও অ্যালকেমিস্ট বইটা পড়ার পরে অনেক খুঁজে দেখলাম যে পাওলো বাবু কোথাও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছেন কিনা।

এবার কোথাও না থেমে সোজা ঢুকে পড়েছি রাজশাহী শহরে। আর পাঁচটা শহরের মতই লাগছে। রাস্তায় গাড়ি-লোক-ভীড়। তবে অবিন্যস্ত ট্রাফিক। নিয়ন্ত্রণ আছে, আবার কোথাও নেইও।

প্রায় দুটো বাজে। আমারা প্রথমেই যাব এক বন্ধুর বাড়ি। সে আমাদের রাজশাহী ঘুরিয়ে দেখাবে বলেছে। তার আগে তার বাড়িতে দুপুরের আহার গ্রহন করা।

এবার মুশকিল হল সেই বন্ধুর হদিশ পাওয়া। তাকে তো সামনা-সামনি কোনদিন দেখিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচয়। স্বাভাবিক ভাবেই তার বাড়ি চিনি না। এখন একমাত্র উপায় মোবাইল ফোনে যোগাযোগ। আমার ফোনটা তো ইন্টারন্যাশনাল রোমিংএ আছে। ফোন করছি। কুঁ কুঁ আওয়াজ করে। কোন উত্তর পাচ্ছি না। মহা জ্বালাতন। বলেছিল, রাজশাহী রেল স্টেশনের সামনে এক জায়গায় সে দাঁড়াবে। আমারা গাড়ি নিয়ে সেদিকে এক পাক ঘুরে এলাম। তাকে দেখতে পাইলাম না। অবশেষে কৌস্তভের লোকাল ফোন থেকে বার কয়েক ফোন করে তাকে পাওয়া গেল।

এবার তাকে খুঁজে পেয়ে চলেছি তার বাড়ি। শহরের মধ্যেই বেশ সুন্দর তিনতলা বাড়ি। পাড়াটি বেশ শান্ত। অনেকটা যাদবপুর এলাকার ঘরোয়া পাড়াগুলোর মত।

আমাদের দেখে সে তো আনন্দে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। খুব উত্তেজিত। আতিথেয়তার ত্রুটি নেই।

কেবলই বলছে, এত দেরী কেন করলে, আমি তখন থেকে অপেক্ষা করছি। হাতে তো আর বেশী সময় নেই। রাজশাহী ভালো করে দেখতে হলে আরও সময় প্রয়োজন।

সময় যে প্রয়োজন তা তো আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু কি আর করা।

তাই কথা না বাড়িয়ে খেতে বসে গেছি। সুস্বাদু রান্না হয়েছে বলেই বোধ হচ্ছে। দেখতে পাচ্ছি কৌস্তভ চিকেনটা পুরো সাফ করছে। আমি অবশ্য নিরামিষ।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই যাচ্ছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেই হিসেবে এই ভূখন্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিরাট বড় ক্যাম্পাস। ভিতরে সুন্দর পিচের রাস্তা। দুই ধারে প্রচুর গাছ। সবুজ। সুন্দর। চারদিকে নানা রংয়ে, নানা রঙ্গে, যৌবন-তারুণ্য থোকা থোকা ঘুরছে, বসে আছে, আড্ডা দিচ্ছে। আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট, তবে যাদবপুর বা সেন্ট জেভিয়ার্স-এর মত ট্যাঁশ ব্যাপারটা নেই। আছে জিন্স, আছে শাড়ি, আছে হিজাব, আছে বোরখা।

বন্ধু এই বিশ্ব বিদ্যালয়েই লেখাপড়া করেছে। তার কাছেই জানলাম যে, পনের-বিশ বছর আগেও শাড়ির চলই প্রধান ছিল এখানে। এখন ধীরে ধীরে দেখতে পাওয়া যায় হিজাব-বোরখার আধিক্য । বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা কি সত্যি তাহলে উত্তরণের পথে !

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি পবিত্র স্মৃতি সৌধের সামনে। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে যাঁরা মৃত্যু বরণ করেছেন, তাঁদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি উৎসর্গীকৃত এই সৌধ। নীচে জুতো খুলে আমরা বেদীর উপরে উঠলাম। কৌস্তভ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করল। ফুলের গুচ্ছটি অবশ্য আমার বন্ধু আগেই আমাদের হাতে দিয়ে দিয়েছিল।

এই সৌধের সামনে খোলা মাঠ। অনেক মানুষ আড্ডা দিচ্ছে। বেশীরভাগই মনে হচ্ছে ছাত্রছাত্রী। সৌধের পেছনে একটু দূরে দেখতে পাচ্ছি ইউনিভার্সিটি কাফেটেরিয়া। সৌধের মাঠের এক পাশে বেদীর উপরে রাখা আছে একটি পুরানো জীপ গাড়ির ধ্বংসাবশেষ। ঠিক তার পেছনেই আছে শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা।

এই জীপ গাড়ির একটা ইতিহাস আছে।
বাংলাদেশ হবার আগে তখন অত্যাচারী পাকিস্তানীদের শাসন চলছিল। সেই সময় সেনারা এই গাড়িটি করেই রাজশাহীর বহু মুক্তিযোদ্ধা, দেশ প্রেমিক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মম হত্যা করত। তারপর স্বাধীন বাংলাদেশ হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুন্দর পরিবেশ ফিরেছে। সেই জীপের ধ্বংসাবশেষ এখন এখানে রাখা হয়েছে সেই বীভৎসতার সাক্ষী হিসেবে।
কিন্তু সেই কালো দিনগুলো।
শুনলাম এখন কেমন করে ধীরে ধীরে আবার মৌলবাদীদের প্রভাব বাড়ছে। তাঁর আঁচ অনেকেই পাচ্ছে। কিন্তু ভয়ে মুখ বন্ধ। এবার কিন্তু আর পাকিস্তানী নয়। এরা বাংলাদেশী বিভেদকামী।

সৌধের সামনেই অনেকটা জায়গা জুড়ে বিশাল ও সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মসজিদ। হাল্কা নীল রঙের। বাংলাদেশে হয়ত সব সরকারী প্রতিষ্ঠানেই মসজিদ আছে। নিয়ম অনুযায়ী নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে। ইসলাম ধর্মের এই নিয়ম করে নামাজ পড়া ও এই ধর্মের অনুসারিদের তা পালন করা, এই নিয়মানুবর্তিতাকে আমি প্রশংসা করি। নিজেকে এক সুন্দর নিয়মে বেঁধে ফেলা সহজ কাজ নয়। তবে হ্যাঁ, নামাজ পড়ার পরেই কোন লোক অসৎ আচরণ করলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয় নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এদিক ওদিক গাড়িতে করেই ঘুরলাম। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট বাইরে থেকেই দেখছি। সুন্দর সাজানো বিল্ডিং। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের বাস সার্ভিস আছে।

১৯৪৭ মাত্র চারটি ডিভিশন বা বিভাগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্থান (বা সেই সময়ের না-হওয়া-বাংলাদেশ) তৈরি হয়। ভাবা যায় কত ছোট্ট দেশ ! তার মধ্যে রাজশাহী ডিভিশন ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ । বাকি তিনটি ডিভিশন ছিল ঢাকা, খুলনা, আর চট্টগ্রাম। তখন মাত্র ১৯ টি জেলা ছিল পুরো দেশে। আর এখন আটটি ডিভিশন আর ৬৪ টি জেলা। দেশের আয়তন বাড়েনি। কিন্তু প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য অনেকগুলো ভাগ করা হয়েছে।

পাকিস্তানী সেনারা রাজাকারদের সাহায্যে এই রাজশাহীতেই সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের একসাথে হত্যা করেছিল। ২৫শে নভেম্বর ১৯৭১। সে এক করুণ কাহিনী। গা শিউরে ওঠে। ছাত্র সেজে মাস্টারমশাইকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গেছে রাজাকারের লোকেরা । তুলে দিয়েছে পাকিস্তানী সেনাদের হাতে। এমন ভাবে মুক্তিকামী ডাক্তার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, ও সমস্ত বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে নানা অছিলায় ডেকে নিয়ে গিয়ে রাজশাহীর বিভিন্ন জায়গায় একসাথে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানীরা। রাজশাহীর পদ্মায় সেদিন রক্তপ্লাবন হয়েছিল।

পাকিস্তানীরা বাংলাদেশে অনেক হত্যালীলা করেছে। ১৯৭১ এ ২৩শে মার্চ পল্টন ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। আর ২৬শে মার্চ পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ঠিক এর আগেরদিন, ২৫ শে মার্চ, রাতের অন্ধকারে যে ভয়ঙ্কর ক্ষণ অপেক্ষা করছিল তা সাধারণ মানুষ ভাবতেও পারেনি। ওইদিন কুচক্রী পাকিস্তানীরা মরিয়া হয়ে দেশ জুড়ে নির্বিচারে বর্বরোচিত নৃশংস গণহত্যালীলা চালিয়েছিল। যাকে বাংলাদেশ এখন “কালরাত্রি” বলে।

এই ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ২৪শে মার্চ, ঢাকায় আওয়ামীলীগ ও পাকিস্তান সরকারের বৈঠক ব্যর্থ হয়। তখন থেকেই পাকিস্তানীরা পরের দিনের ষড়যন্ত্রের ব্যবস্থা পাকা করতে থাকে। ভাবতে অবাক লাগে যে, এমনই এক ২৪শে মার্চ তারিখেই, ১৯৪০ সালে, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব মুসলিম লীগের সভায় গৃহিত হয়েছিল এই পাকিস্থানীদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে। সেদিনের প্রেমিক পরে হয়ে গেল ঘাতক। নিয়তির কি পরিহাস! কাকে বিশ্বাস করবে মানুষ! তাহলে কি সেদিনের বাঙ্গালী মুসলিম নেতারা তাঁদের স্বজন চিনতে ভুল করেছিলেন?

অথবা এমনও হতে পারে। শয়তানী বুদ্ধির পাকিস্তানী নেতারা মিষ্টি কথা, সুন্দর ভবিষ্যত, আর মুসলমান সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে সহজ বিশ্বাসী বাংলার মুসলিম নেতাদের ব্যবহার করেছিল দেশ ভাগ করতে। কারন এদিককার মুসলিম ভোট না পেলে দেশ ভাগ সম্ভব নয় সেটা তারা ভালোই বুঝেছিল। যেমন করে যোগেন্দ্র নাথ মন্ডলকে বোকা বানিয়েছিল পাকিস্তানীরা। শেষে ওই লোকটার কি করুণ পরিণতি হয়েছিল তা যারা খোঁজ খবর রাখেন তারা জানেন।

আজ তো ভাবনা আসতেই পারে। যদি তারা সেদিন উন্মত্ত হয়ে বাংলা ভাগ না করতেন। যদি তারা পাকিস্তানের সাথে হাত না মেলাতেন। যদি তারা হিন্দু-মুসলমান ভেদ না করতেন। তাহলে তো এতগুলো বাঙ্গালীর নিধন-যজ্ঞ সংঘটিত হত না। এত হত্যা, এত রক্ত, এত স্বজনহারা, এত অশ্রু ঝরত না।

আমি নিশ্চিত যে, তাহলে আজ বিশ্বের দরবারে বাঙ্গালী (হিন্দু-মুসলমান নয়) এক অসম্ভব শক্তিশালী মানব গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত। তাই বলতে বাধা নেই, নেতারা সব সময় ঠিক নয়। তাঁদের নেতৃত্বে ভুল থাকে। মারাত্মক ভুল। যা একটা জাতিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অন্ধকারে ঠেলে দেয়।

আজকের বাংলাদেশের নব প্রজন্ম স্বাভাবিক ভাবেই এই পাকিস্তানী বর্বরতা চোখে দেখেনি। জানিনা তারা তাদের আগের প্রজন্মের ভয়ঙ্কর রক্তঝরা বেদনা, যন্ত্রণা কতটা অনুভব করে । বাংলাদেশ আজ অনেক এগিয়ে এসেছে। তবে আজকের বাংলাদেশে পাকিস্তানী প্রেমীদের প্রছন্ন বাড়বাড়ন্ত যা আমার চোখে পড়েছে, তা আবার অন্য কোন অশনি সঙ্কেত নয় তো?

বেলা শেষ হয়ে আসছে। তাই আর কোথাও দাঁড়াচ্ছি না। ঠিক হল, এখান থেকে সোজা পদ্মার পাড়ে যাব। সেখান থেকে সূর্যাস্ত নাকি অপরূপ। গাড়ি নিয়ে চলে এসেছি পদ্মাপাড়ে।

পদ্মার জল তীর থেকে বেশ কিছুটা দূরে। অনেক জায়গায় চরা পড়েছে। তবে জায়গাটি বেশ ভালই লাগছে। অনেক লোক তাদের বন্ধু, সঙ্গী, পরিবার নিয়ে বেরাতে এসেছে।

নদীর তীরে বালির উপরে সারি সারি আরাম কেদারা পাতা রয়েছে । অনেকেই হেলান দিয়ে বসে সামনে বিস্তীর্ণ পদ্মার জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করছে। সামনে আদিগন্ত জলরাশি দেখলে এমনিই মানুষের মন কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। যেমনটা হয় সমুদ্র তীরে।
সূর্যাস্তের সোনালী রং পদ্মার জলকে মায়াবী করে তুলেছে। মনে হয় অনেকক্ষণ চেয়ে থাকি। জলে দেখছি অনেকগুলি মোটর-বোট । বেড়াতে আসা লোকজন নিয়ে আরো কিছুটা দূর থেকে ঘুরিয়ে আনছে। বেশ আনন্দদায়ক বোট-রাইড।

নদীর পাড়ে বাদাম ভাজা, বিস্কুট, চা বিক্রি হচ্ছে। আমরা চা নিয়ে সামনে পড়ে থাকা খালি আরাম কেদারার উপর বসতেই, কোথা থেকে একটা ছেলে এসে বলে, ভাইয়া, এখানে বসলে ঘন্টায় কুড়ি টাকা । আমরা বেশ অবাক হলাম। এতক্ষণ তো আশেপাশে কেউ ছিল না! এ কোথা থেকে চলে এল! যাই হোক ২০ টাকা দিয়ে আমরা বসে বসে পদ্মার কোলে ধীরে ধীরে পড়ন্ত সূর্য-শিহরণ দেখছি। বেশ খানিকক্ষণ এই দৃশ্য দেখে এবার ফেরার পথ ধরি।

সন্ধ্যা হয়ে গেল। এখন যাবো রাজশাহীর বিখ্যাত সিল্ক ফ্যাক্টরি দেখতে।

ক্রমশঃ

আমার বিসর্জন ***** মৌ

🙏🙏আমার বিসর্জন🙏🙏
🙏 মৌ 🙏

আমি কন্যা এটাই আমার প্রথম দোষ
আর দোষের দায় আমার মাএর
সেও মেয়ে তাই দোষ তো তারও
সে জন্ম দিয়েছে কন্যা সন্তানের
সেদিন হলো জন্ম আমার কন্যা রূপে
জন্ম না মৃত্যু জানি না আমি
শঙ্খ ধ্বনি নেই কারোর মুখে হাসি নেই
আমি যে কন্যা আমার জন্মে আনন্দ নেই
জন্ম দিয়ে মা হারালাম আমি অপয়া কন্যা
মাতৃ হারা মেয়ের জন্য দুঃখ হলো
বাবা বিয়ে করলেন কন্যা পালনের জন্য
এক বছরে মধ্যে অপয়া হলাম আবার
ঠাঁই হলো মাতুলালয়ে মামা মামীর আশ্রয়ে
কন্যা না কাজের লোক বুঝিনি আমিও
নয় বছরে কন্যার কুমারী পুজোতে মত্ত
আমিও নয় আমার কুমারী হলো হরণ
মদিরার নেশায় অসহ্য যন্ত্রণা কন্যা পুজো
এরপর হলো প্রায় রাতের কুমারিত্ব হরণ
বিনা দোষে দোষের ভাগী হলাম প্রতি দিন
পনের বছরে হলাম বাড়ি ত্যাগ কন্যা
ঠাঁই হলো নতুন বাসায় পাখির বাসা বাঁধা
মাএর নাকি পাতানো মাসীর ঘরে
সেখানে হলো দুর্গা পুজোর কুমারী পুজো
নানা লোকের পুজোর অঞ্জলী দানে
অঞ্জলী আমিও দিয়েছিলাম যৌবনের
জানিনা কি নাম পরিচয় ছিলো তাদের
রক্ষক নামে ভক্ষণ করেছিলো সেদিন থেকে
মাদার মেরির মতো আমিও হলাম মা
কুমারী মা নাম হলো নষ্টা চরিত্রের মা
রাতের অন্ধকারে সদ্য জন্মানো মেয়ের
স্থান হলো নর্দমায় কিটের মতো
আমারও হলো বিয়ে নতুন সস্তা বেনারসি
হাতে শাখা পলা পায়ে আলতা
বিদায় হলাম দুর্গা আগমনীর দিন
নতুন স্বপ্ন সাজলাম সংসার সাজাবো
আমি মা হবো আগামী ভবিষ্যতের জন্ম হবে
রাত হতেই হারিয়ে গেলো স্বপ্ন গুলো
ছার খার হয়ে গেলো সংসারের গল্প
বিক্রি হয়ে গেলাম কয়েকটা টাকার বিনিময়ে
প্রতিদিন বধূ সাজি বাসরের জন্য
এক হাত দু হাত প্রতি রাতে হাত বদল
প্রতি বছর আসে দুর্গা পুজো
তাকে গড়তে আসে শিল্পী আমার দ্বারে
আমি এই দিন নাকি পয়মন্ত হয়ে উঠি
আমার হাতের ছোঁয়ায় নাকি রূপ নেবে
মাতৃ রূপ গড়বে আমার তুলে দেওয়া মাটি
রাতের অন্ধকারে যারা আসে লুট করতে
তাদের আঙিনায় মাতবে দুর্গা উৎসবে
ঠোঁটের কোণে হাসি দিয়ে দুর্গা মাকে বলি
এই টুকুই শুধু দাম আমাদের আছে
মনে মনে বলি মা গো এই একদিন আমার
এই দিন আমরা দেখি তোমার রূপের তেজ
রাতের আঁধার আসে লালসা মেটাতে
সেই পুরুষের আঙিনা সাজবে এই মাটিতে
এসেছে সে পুরুষ মাটি নিতে দিনের আলোয়
তোমাকে গড়বে আমার ছোঁয়া মাটি দিয়ে
আর যে পারিনা সহ্য করতে মা
আমিও বাঁচতে চাই তোমার রূপ নিয়ে
দশ হাতে সংসার সাজাতে চাই আমিও
কন্যা মা বৌমা আমিও হতে চেয়েছিলাম
কন্যা হয়েছি মাও হয়েছি বউ হয়েছি
শুধু হয়নি আমি সংসারী নারী
আমার গালে লালিমেখে পিঠে আঁচড় কেটে
সমাজ আমায় নাম দিলো পতিতা
আজও বাজছে শঙ্খ ধ্বনি চারদিকে
ঢাক ঢোল কাসর বাজছে মণ্ডপে মণ্ডপে
দেবী বরণে সেজেছে প্রতিটি ঘর
সিঁদুর খেলার মেতেছে প্রতিটি নারী
আমিও মেতেছি মা লাল বেনারসি পরে
লাল আগুনের শিখার আমার সাজে
দশমী বিসর্জনের বাদ্যি বাজে
আমার বিসর্জনে বাজনা শোনা যায়
দুর্গা বিসর্জনে সমারোহে ভিড় জমেছে
আমারও বিসর্জন তার পিছে পিছে।
🙏🙏🙏মৌ🙏🙏🙏

// লীলাবতী **** পূর্বা মাইতি

// লীলাবতী

পূর্বা মাইতি

এই গল্পটা কোন হাড়-হিম করা ভূতের গল্প নয়, বা কোন সাসপেন্স থ্রিলার, এটা নিতান্ত মামুলি ঘরের এক রমণীর কথা ,যার কথা শুনতে শুনতে , দু-চোখ খালি রাখা দায় হয়ে ওঠে,যাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলো ….ভিজে শ্রাবণের বেলা ….
ছোটবেলায় দেখতাম লীলাবতী পিসি তাঁর নাতিকে নিয়ে ,মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ি আসতেন | এক-পক্ষ কাল, দুই পক্ষকাল থাকতেন | বাড়ির সবার পছন্দের পাত্রী ছিলেন |মা-ঠাকুমার কাজের ভাগীদার হতেন | তিনি নানান গুণের গুণী ছিলেন ,তাই সম্পর্কটাকে নিজ গুণে অনেক দূর থেকে কাছে আনতে পেরেছিলেন |হয়ে উঠেছিলেন আমাদের আপন পিসি |তিনি যখন চাটাই বুনতেন বা দড়ি তাকাতেন ,বা শুয়ে শুয়ে পান চিবোতেন–তখন আমরা ভাইবোনেরা পড়াশুনো কাট মেরে ,পিসির কাছে গল্প শুনতে চাইতাম | লীলাবতী নাছোড়বান্দাদের গল্প শোনাতেন ….আপনমনে ….
লীলাবতীর এক কাকা ছিলেন –আজন্ম পরোপকারী,অকৃতদার এবং খুব বুদ্ধিমান |তাঁরই বুদ্ধির নমুনা,পিসি আমাদের মাঝে মাঝে শোনাতেন | আমরা সেই কাকার কথা শুনতে শুনতে, মানসপটে একটা অবয়ব তৈরি করে নিয়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম, আমরা প্রত্যেকেই ঐ কাকার মতো হবো |কাকার আমল ছিলো –ইংরেজ শাসনাধীন | প্রতি পদে চলতে গিয়ে বাধা | স্বাধীনচেতা মানুষ, কোনমতেই মেনে নিতেননা কোন হুকুমজারি | তিনি প্রায়ই কাউকে কিছু না বলে, হঠাৎ গায়েব হয়ে যেতেন | আবার হঠাৎই বাড়ি ফিরে আসতেন | এরকম একবার গায়েব হবার পর , বাড়ি ফিরলেন এক বাউলকে সংগে নিয়ে | বাউল ,কাকার বাড়ি এসে সন্ধ্যায় আখড়া জমিয়ে –সবার নজর কেড়েছিলেন | কিছুদিন পর হঠাৎ বাউল-সমেত কাকা উধাও | পরে ,পুলিশ বাড়িতে এলে জানা যায়, বাউলটি এক বড় বিপ্লবী ছিলেন |গা ঢাকা দিয়ে , কাকাই তাঁকে এ-বাড়িতে থাকতে সাহায্য করেছিলেন |এরকম অনেক ঘটনার জন্য , কাকা তৎকালীন পুলিশের নজরে পড়েন |
লীলাপিসির ছোটবেলায় পানীয়জল বাড়ির কাছাকাছি পাওয়া যেতোনা |দূর-দূরান্ত থেকে কলসি ভরে জল আনতে হোত | কোন এক বিকেলে পিসি যখন অন্যান্যদের সংগে জল আনতে যাচ্ছে , তখন পিসির কাকাও ওদের সংগে জল আনতে গেল | জল নিয়ে বাড়ি ফেরার পর ,মহিলারা লক্ষ্য করলেন যে ,একটি কলসি তাঁদের বাড়ির নয় | মাটির কলসি ওই জল ভরার কাছে পাল্টে গেছে | ছেলে-মেয়েরা গালগল্পে ব্যস্ত থাকার জন্য কেউ খেয়াল করেনি |কিন্তু আসল গল্প অন্যখানে –কাকা কোন বিপ্লবীর দরকারি জিনিস কলসিতে ভরে পাচার করে দিয়েছিলেন | এমনি খণ্ড খণ্ড কাকার কত গল্প –যেগুলো আমাদের সন্ধ্যার মনোরঞ্জন হয়ে উঠতো, অথচ পরাধীন ভারতবর্ষে যার মূল্য অসীম ,ইতিহাসের পাতায় নাম না থাকা, দশের কাছে- দেশের কাছে–যিনি কোন কিছু প্রত্যাশা না করে,দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে দেন ,সেই মহান দেশপ্রেমিককে যদি বিপ্লবী বলে ডাকি …
ইতিহাস কি মুখ ফিরিয়ে নেবে ….
এ-হেন কাকার ভাইঝি হলেন লীলাবতী পিসি | ঠিক কত বছর বয়সে পিসির বিয়ে হয়, সে খবর আমার জানা নেই | আগেকার দিনের বাচ্চাদের,এখনকার বাচ্চাদের মতো এতো প্রশ্ন ছিলোনা |মুখে মুখে কথার পিঠে কথা বসানোকে– বড়রা তর্কবাজ বলে একটু বাঁকা চোখে দেখতেন | যে মুখ বন্ধ করে,দোর বন্ধ করে, জীবনে দম বন্ধ করে বাঁচতে জানে — তারাই লক্ষ্মীশ্রী এ্য।ওয়ার্ড় পেতো !
শুনেছি, লীলাবতীর বিয়ে হয়েছিলো– কোন এক দোজবরের সঙ্গে |তাঁর একটি সদ্যমাতৃহারা দুধের শিশুও ছিলো | শিশুটির অকালে মাতৃবিয়োগের ফলে, বিকল্প মায়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে –এক্ষেত্রে লীলাবতী মনোনীত হন | নববধূর ওপর শ্বশুরালয়ে অন্যান্য কাজের সঙ্গে সঙ্গে , মাতৃহারা শিশুটির মাতৃবৎ দেখভালের দায়িত্বও বর্তায় | নানান কাজের ভিড়েও, নতুন মায়ের ভালোবাসায় –খোকা মা ডাকতে শিখে গেলো |এরপর, লীলাবতীও স্বপুত্রের জননী হয়ে উঠলো | দুই সন্তানকে নিয়ে এগিয়ে চললো — লীলাবতীর বারোমাস্যা |
ঋতুচক্রে ঘুরতে ঘুরতে এলো সেই ডাকাত শ্রাবণ,সঙ্গে নিয়ে এলো বুক ভরা ঝড়-জল ! এরকম এক ঝড়-জলের সন্ধ্যায় ,অন্যান্য জায়েদের মতো , পিসিও বাচ্চাদের নিয়ে হিমসিম খেতে লাগলো |শ্রাবণের জল আকাশ ভেঙে ঝরতে ঝরতে ,প্রবল আকার ধারণ করলো …
ধেয়ে এলো বন্যা |বাড়ির কর্তা প্রমাদ গুণলেন |
মাটির বাড়ি | দেওয়াল চাপা পড়ে , মরার শঙ্কা থাকে |সুতরাং বাড়ির বাইরে থাকাটাই শ্রেয় |যা কপালে আছে ঘটুক | ভবিতব্য কে খণ্ডায় !
প্রত্যেক জায়েরা কোলের শিশুটিকে কোলে নিলো আর বাড়ির পুরুষেরা বড় ছেলেপুলেদের আগলে , ঘরের বাইরে বেরলো |
বাদ সাধলো খোকা |লীলাবতী যেই নিজের ছেলেকে কোলে নিতে যাবে , অমনি খোকা মাকে জড়িয়ে ধরে,প্রবল স্বরে মা-মা বলে কাঁদতে লাগলো | ও ততদিনে একটু বড় হয়েছে |কিন্তু ও কিছুতেই মায়ের কাছ ছাড়া হতে চাইলোনা | বন্যার জল পাগলপারা | হু হু করে ঘরে ঢুকতে লাগলো ….| তাড়াহুড়োর মধ্যে লীলাবতী খোকাকে কোলে নিয়ে , নিজের সন্তানকে স্বামীর কোলে ঠেলে দিলো !
প্রবল বন্যায়, সে অন্ধকার রাতে — কে যে কোথায় ভেসে গেলো, তার হিসেব দু’দিন পর পাওয়া গেলো | কোন এক গাছের গুঁড়িতে , খোকাকে জড়িয়ে লীলাবতী আটকে ছিলো | মা-ছেলের যখন হুঁশ ফিরলো , ধীরে ধীরে পরিবারের সকলকে পেলো …. পেলোনা শুধু নিজের স্বামী আর সন্তানকে !
যে নাতিটিকে নিয়ে লীলাবতী আমাদের বাড়ি আসতেন, সে তাঁর সতিন-পুত্র খোকারই সন্তান | মা’র মুখে শুনেছি ,জীবনে খোকার বিরূদ্ধে পিসির কোনো অভিযোগ ছিলোনা | হয়তো তিনি মনে করতেন …. তাঁর মাতৃত্বেরতো অপচয় হয়নি ….

একটা ভানময় মানচিত্র রেশম লতা

একটা ভানময় মানচিত্র
রেশম লতা

ও ন্যাভাই, একটা গান ধইরা মানচিত্র বানাইতে পারবা?
আমগো গর্ভবতী মানচিত্র কেমন জারজ জারজ লাগে
বিনিময়ে তুমি কি চাও ন্যাভাই?
আর যদি টাকা হয় তবে একটা সাগরের জল কিনে নিব; ছুটি দিব বিশ্বচোখের সব জল__
জীবনকে আর টুটি চাইপা ধরব না
যদি মরে সময় ধড়ফড়িয়ে তবে মরুগ্গে
জম্পেশ স্যাম্পেইন হউক বেয়াই বাড়ির বস্তিত
তামাম পৃথিবীর তাবৎ বিদ্যুৎ ওখান থেকেই উৎপন্ন হউক। লতাবু, ধরাইয়া দেও আলো ওই চটের মাচা থেইকে।

শুনলাম, কেনুদাগো চালে আর কাক আহে না
ওরা এখন জ্যাতা মাইনষের বেওয়ারিশ চোউক, কান, নাক, আর কালা ঠোঁট খায়।
রামুনেতা আইল ধইরা যখন হাঁটে
তখন গনেশরা হাঁটু জলে নাইমা ঢোক গিলে___
এক ঢোক…. দুই ঢোক…. তিন ঢোক….
ওদের কলাছুঁলা রাজনীতি আর ভালো লাগে না।

বিভাগ-গল্প। #শিরোনাম-এখানে শিউলি ঝরেনা। # কলমে-ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

বিভাগ-গল্প।
#শিরোনাম-এখানে শিউলি ঝরেনা।
# কলমে-ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

-“এখানে আশ্বিনের সোনা রোদের গান শুরু হয় বিউগল আর প্যারেড দিয়ে।এবার দুর্গাপুজোয় বাড়ি যেতে পারবোনা। সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরার কাজে সদা সতর্ক থাকতে হয় আমাদের।ভারতমাতার পুজারি আমরা।আমাদের পরনের এই জলপাই রঙের জংলা ছাপের পোষাক‌ই মাতৃ আরাধনার পুরোহিতের পট্টবস্ত্র।পশু বলিদানে আমরা বিশ্বাসী ন‌ই।কিন্তু বিপন্ন দেশমাতৃকার রক্ষা কল্পে প্রতিটি সেনার আত্মোৎসর্গ তো করাই থাকে। আর হানাদারদের রক্তে সীমান্ত ধুয়ে দিতে আমরা পিছুপা হ‌ইনা গৌরি।তোমরা সবাই পুজোয় খুব আনন্দ করো।”- টপাটপ টাইপ করে শৌনক পোষ্ট করে দেয় গৌরিকে। তারপর অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে মোবাইল দিকে। স্ক্রিনে ফুটে উঠছে”গৌরি ইজ্ টাইপিং “।এখন কোন সৈন্যের স্ত্রীকে প্রতীক্ষায় বসেথাকতে হয় না স্বামীর চিঠির জন্য, মাকে পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না ডাকপিওনের অপেক্ষায়। গৌরির মেসেজ ঢোকে-” আমরা ঠিক‌ই আছি। বর্ডারে তো প্রচন্ড ঠাণ্ডা।মা খুব চিন্তা করেন তোমার জন্য। বাবা তো কর্ণেল ছিলেন। বললেন-“বৌমা,আমরা নিয়মিত শরীরচর্চা, শৃঙ্খলা অনুশীলন করেছি।তোমার শাশুড়িমাকে বোঝাও ঐ সব সস্তা সেন্টিমেন্ট একটা মিলিটারি ফ্যামিলিকে মানায় না।”- -“শৌনক,মিলিটারি মানে কী অনুভূতিহীন?এবার পুজোয় তুমি আসবেনা;আমি কতো প্ল্যান করেছিলাম,পাড়ার ক্লাব থেকে শুরু করে সব ঠাকুর দেখতে যাব।বাবা বলেছেন আমার মা-বাবাকেও ডেকে নেবেন।সবাই মিলে আনন্দ করবো।সব ভেস্তে গেলো।”-

গৌরির ফোন বেজে ওঠে, -“গৌরি,এতো টাইপ করতে পারছিনা।শোনো আমার প্ল্যান।সারাদিন ব্যাস্ত থেকো। দুস্থ বাচ্চাদের জন্য পোষাক ও খাবার বিতরণ কোরো।”- গৌরি বলে -“সব প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। শুধু তুমি থাকবেনা, সে শূন্যতা কে ভরাবে?”- -“কিচ্ছু শূন্য হয়না গৌরি।বাবার মতো আমিও বলছি,নেভার বি সেন্টিমেন্টাল। বাস্তব চরম কঠিন। আমার একমাত্র সেন্টিমেন্ট আমার দেশ। সম্মান আমার মা-বাবা।আর ভালোবাসা? আমি মিলিটারি ম্যান।সততার সঙ্গে বলছি, ভালোবাসি একমাত্র আমার গৌরিকে। মিস করবো তোমাকে মেমসাহেব।”- গৌরির ভিজে গলা শোনে শৌনক -“কবে আবার কথা হবে?”- -“ফোনে কথা হবে।প্রতি রাত বারোটা থেকে সকাল ছটা।এটাই আমাদের প্ল্যানিং। যদিও এইভাবে কথা বলার জন্য স্পেশাল পারমিশন নিতে হয়। আমি চেষ্টা করছি, কেমন?”- ছোট্ট একটা মিষ্টি চুমুর শব্দ ভেসে আসে। গৌরিও একটা চুমু দিয়ে চোখের জল মুছে মোবাইলটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

পত্রসাহিত্য / কলমে – গীতশ্রী সিনহা

পত্রসাহিত্য / কলমে – গীতশ্রী সিনহা

অতিক্ষা
সময় ঘেঁটে দেখতে গিয়ে দেখি বেশ কিছু অতীত গরুর গাড়ির চাকার মতো গড়িয়ে গ্যাছে… ছিঁড়ে -চুষে তছনছ… মিহি কাচে জ্যোৎস্না ফুঁড়ে শুকনো পাতার শব্দে নি:সঙ্গতা রঙ্গতামাশায় ব্যস্ত ! বসন্ত মাখানো পলাশ ছুঁইনি কতোদিন, তুই – আমি ! বিশ্বের সকল ঋতু-ই ছিল আমাদের বসন্ত! ২৩ – এর বসন্তে তোকে আবার মনে করছি রে অতিক্ষা। হঠাৎ ওঠা ঘূর্ণি ধুলোর ঝড়ের কাছে তোর নামে কিছু লিখে পাঠিয়েছিলাম সে-ই পাঁচ সালের… বসন্তে-ই হয়তোবা ! দূরবর্তী নৌকার পালে আটকে থাকা চিঠি আজও আঙুলে ছোঁয়ানো থুতনির মতো বিভ্রান্ত!
বয়সের তুলনায় আমি একটু বেশি পাকা ছিলাম, পাড়ার স্কুলে তুই -আমি হাত ধরে ভর্তি হতে যাই, ক্লাশ থ্রি -তে নিজেরাই। স্বভাব অনুযায়ী তোর নাম রাখলাম অতিক্ষা, আমি অক্ষরা ! ট্যাপট্যাপ করে আশ্চর্যবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে ছিলি বড়দিদিমণির অফিস ঘরে। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই ! আমাদের নামের মানে জিজ্ঞেস করলেন বড়দি, আমি তো প্রস্তুতি নিয়েই গেছিলাম !
বললাম, ” বড়দি, ওর তো পড়াশোনা করার খুব ইচ্ছে তাই ওর নাম অতিক্ষা ! ” হাই পাওয়ারের চশমা কপালে তুলে গোল্লা গোল্লা চোখে তাকিয়ে থাকেন নির্বাক দৃষ্টিতে ! সে-ই অবসরে এবার আমাকে নিয়ে পড়লাম, বললাম — ” বড়দি পড়তে খুব ভালোবাসি… তা-ই তো দেবী সরস্বতীর নাম আমার নাম ! ”
ব্যাস, হয়ে গেলাম ভর্তি, শুধু অভিভাবক এর সই। তাও হয়ে গেল !
মনে আছে রে অতিক্ষা, বইয়ের ভাঁজে আমরা ক্লাশ চলাকালীন চিঠি চালাচালি করতাম —– মনের কথা বানান ভুলে লেখা ! কাটাকুটিতে বেশির ভাগ লেখাই উদ্ধার করতে পারতাম না ! সেটাও ছিল ভারী মজার ! টিফিন পিরিয়ডে খিলখিলিয়ে হাসি—- বেশিরভাগ টিফিনের রুটি-গুড় মাটিতে তখন গড়াগড়ি।
সারসের মতো গলা বাড়িয়ে দিন এগিয়ে চলছিল বেশ। মৌমাছির খুপরিতে ঠিল পড়ে তুই – আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম ! উড়ে যাওয়ার স্বাধীনতা পাইনি, মধু তো অনেক পরের কথা! লুট হয়ে গেল গোছানো সময়। বড় হওয়ার উদগ্র খিদে সময়কে আমূল-পরিবর্তন করে দিলো।
প্রতিষ্ঠিত হয়েছি, কলমকে এখন বন্ধুকের হাতছানি মনে করি।
অতিক্ষা, আজ অনলাইন ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ — সব যেন মায়ার চাদর ! চিনি না, জানি না — অথচ বন্ধু ! দেখাও হয়তো হবে না কোনো দিন ! তাও তারা কেমন যেন মায়ায় লেপ্টে থাকা আপনজন ! ৫ সালেও যদি ওয়েবসাইট থাকতো, আমি তোকে হারাতাম না রে! ওয়েব পেজের কোথাওবা ধোঁয়ার মতো তুই ভেসে থাকতি ! তা-ই আগের লেখার চিঠিটা একটু এক্সটেনশন করে ছেড়ে দিলাম ” পত্রসাহিত্য ” হিসেবে। এটাই হয়তো আমাদের ডেসটিনেশন ! ফিরে পেতে চাই soul mate – কে। জমে থাকা ধ্বনি -তাল-লয় প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে অগোছালো বেখেয়ালি সময়ের ধাক্কায়… আর একটা নতুন জীবন চাই শুধু তোর জন্য।
আশায় অপেক্ষায় থাকলাম রে অতিক্ষা।

তোর ছোট্টবেলার সাথী
অক্ষরা।
—————————-

কবিতা : *মিলাবে মিলিবে* 🖊 নীহার কান্তি মন্ডল

কবিতা : *মিলাবে মিলিবে*
🖊 নীহার কান্তি মন্ডল

“দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে”
বিশ্বকবির এ চিরন্তন বাণী
কখন কিভাবে — না জানি
তারই উত্তরসূরির
এ যুগের হাজার কবির
অভীষ্ট লক্ষ্য হয়ে দেখা দেবে
হয়তো কবি নিজেও দেখেন নি ভেবে।

একটা সময়ে
কবিরা ছিলেন সাধারণের চেয়ে
একটু হলেও আলাদা।
তখন পাঠক ছিল অগন্য
তুলনায় কবির সংখ্যা ছিল নগন্য।

আর এখন –?
আজকের গণমাধ্যমের এই
অপরিমেয় উন্নতির যুগে
কবিও পাঠকের সংখ্যা
সমান সমান প্রায়
হয়তো বা পাঠকই সংখ্যালঘু
কবি-সংখ্যার তুলনায়।
কবি ও কবিতা আজ
ফেসবুকের অপার সহযোগিতায়
অনায়াসে মুঠোফোনের পাতায়।

কবিরাই অন্য কবির কবিতা বেশি পড়েন
কেউ বা না পড়েই বুড়ো আঙ্গুলে
টিপ-ছাপ ইমোজির দস্তখতে
আপন উপস্থিতির চিহ্ন আঁকেন।

কবিতার আঁতুরঘর ছিল এক কালে
স্কুল কলেজের কোনো নির্দিষ্ট দেয়ালে
অলঙ্কৃত দেওয়াল-পত্রিকা
ছিল কবিতার বাঁধানো খাতা
অথবা বার্ষিক ম্যাগাজিন,
আজ পাল্টে গেছে দিন
ফেসবুকে সাহিত্য-চর্চার ফলে
সকলেরই নিজস্ব “ওয়ালে”।
বোর্ডের ‘পরে তুলি কলমের
বালাই নেই অলঙ্করণের
আছে মোবাইলের কী-বোর্ড
যেখানে যথেষ্ট আঙুলের ছোঁয়াই।

হাজার কয়েক সাহিত্য-গ্রুপের
কয়েক শত কবি-সম্মেলন
ঘুরে ফিরে সহস্রাধিক কবির মেলা।
(আমিও তাদেরই একজন)
শুধু পারমুটেশন-কম্বিনেশনের খেলা।
স্বঘোষিত সাহিত্যিকও নয় তো বিরল।
সবই সাহিত্যে উদারীকরণের সুফল।

কবিতা লেখাটাও আজ সোজা
নেই সেই হরেক নিয়মের বোঝা
সহজ হয়েছে দু’চারটে কবিতা লিখে
কবি হিসেবে স্বীকৃতিও পাওয়া
‘কাব্যতীর্থ’ ‘কাব্য-ভারতী’
কিংবা ‘কাব্যশ্রী’ শিরোপা
না লিখেও বিশেষ কোনো কাব্য
সাহিত্য গ্রুপের বদান্যতায়
আজ হয়েছে সহজলভ্য।

“সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে”
আজকের সাহিত্য-বাসরে
— কবির এই অমোঘ বাণী
সাফল্যেরই অন্যতম চাবিকাঠি
সকলে নিয়েছি আমরা মানি’।

#এসে_মেশা_সাগরে:—- #সুজাতা_দাস:—-

#এসে_মেশা_সাগরে:—-
#সুজাতা_দাস:—-

ছুটে চলা পথে নির্নিমেষ অবকাশ,
পাহাড়ের বুক চিরে খরস্রোতা নদী,
যার দিক সে নিজেই ঠিক করে-
আপন খেয়ালে রাস্তা বাছে নিজের মতো সাগরে মেশার তাগিদে।

দিগন্ত বিস্তৃত নীল নীলিমায়,
অসংখ্য তারার ভিড়ে এক উজ্বল তারকা জ্বলতে থাকে সাঁঝ আকাশে-
বহু দূরের নক্ষত্র, ছোঁয়ার অবকাশ নেই শুধুই চেয়ে দেখা!
ইচ্ছেরা উড়তে চায় উপরে আরও উপরে,
যেখানে শুধুই ভালোলাগার ভিড়ে সহস্র নীহারিকার সংসার–
আছে সময়ের নিয়ম মেনে উদিত হওয়া আর অস্ত যাওয়া!
আছে অনন্ত শূন্যতায় নিজেদের মেলে ধরা।

নদীর মতো মনেরও হদিস পাওয়া মুশকিল, ভাসে স্রোতের দিকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে!
মিলতে চায় দুরন্ত সাগরের বুকে—
এই কারণেই ছুটে চলা অনন্তকাল, দিক পাল্টানোর আগে পর্যন্ত—
মনও ছুটে চলে অসীমের দিকে, মেলার অপেক্ষায় দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে—-
কখনও ছুটে চলা বিফলে যায়, কখনও মেশে অনন্ত সাগরের মাঝে যা চেয়েছিল নিজে।

কিছু স্রোত হারিয়ে শীর্ণকায়া হয়ে বাঁচে,
শুধু মাত্র নামটুকু নিয়ে—-
তবুও ভাবে হয়তো আবার আসবে জোয়ার,
তন্বী তরুণীর মতো ছুটে চলবে সে!
মিশবে দুরন্ত সাগরের অনন্ত বুকে, হারাতে অবহেলে!

#নতুন কিছু করি #কলমে : সাহানা

#নতুন কিছু করি
#কলমে : সাহানা

কাচের ঘোরানো দরজাটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে পলি। হাতে টুকিটাকি সামগ্রীর কয়েকটা কাপড়ের ব্যাগ। পুজোর মাত্র কটা দিন বাকি। এর মধ্যেই সবকিছু সেরে ফেলতে হবে। কাজ কি কম!
পরিবারের সব সদস্যদের মনের মত জিনিসপত্র কেনা, ফর্দ মিলিয়ে উপহার দিয়ে আসা, এক মহা ঝক্কি!!
তারপর তো শুরু হবে…
-বুঝলি পলি, এই শাড়িটা ভালো, কিন্তু জমিটা তেমন পোক্ত নয়…কত নিল রে?
-পলিমাসি, আমার জামাটা কিন্তু একেবারে ওল্ড ফ্যাশনড্। চলবে না, বলেই দিচ্ছি। না পড়লে, দোষ দিও না!
-আরে পলি, শুধু সেলের মার্কেট থেকে বাজার করলেই চলবে? একটু স্ট্যান্ডার্ড জায়গায় কেনাকাটা করো বাপু!!

বড়ো জা আবার নির্বিরোধী।
-আহা! ওকে কেন সবাই মিলে…

হাজারটা মতামত! কথা বলে বা প্রতিবাদ করে কোনো লাভ নেই।
সংসারের একটিই নিয়ম। ভালো থাকতে চাইলে মুখটি বন্ধ রাখো। নাহলে, পরিস্থিতি যাবে আয়ত্ত্বের বাইরে!!

একমাত্র বাবা এবং মা যতদিন জীবিত ছিলেন আগলেছেন প্রাণ দিয়ে। তারপর…
পলি চুপ করেই থাকে আজকাল।
প্রথম প্রথম মৃদু প্রতিবাদ করত। কখনও গ্রাহ্য হতো কখনও নয়। ধীরে ধীরে জীবনের চলার বাঁকগুলো আরও ভাঙাচোরা আরও তীব্র হতে থাকে…একসময় মনে হয়, পলি পড়েছে জীবন নদীখাতে…
কি দরকার! অহেতুক প্রতিবাদে? সেই তো জীবন বইবে নিজস্ব গতিতেই।
অতএব চুপ থাকাই ভালো!!
একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে আঁচলে টান পড়ে!

-কে রে?
ফিরে তাকিয়েই অবাক!
দুটো ছোট্ট ছোট্ট মুখ, শীর্ণ দেহ, গায়ে প্রায় কিচ্ছু নেই, পরণে শুধু ঢিলে রঙচটা একটা বস্তু, প্যান্ট ছিল কোনো কালে হয়তো!
-এই, তোরা কে রে? কি চাই?
অকারণেই গলাটা গম্ভীর করে তোলে।
ফিকফিক করে হাসছে! দাঁতে ময়লা ছোপ।
-খেতে দাও। দুদিন খাইনি।

এ আবার কি!
বিরক্তি বোধ করে। কিন্তু জোর করে কিছু বলতে পারে না। কেমন যেন মায়ায় মাখানো চোখগুলো। খুদে অথচ জ্বলজ্বলে।
অস্বীকার করা যায় না!
-এই তোরা কে? কোথায় থাকিস?
নিজের প্রশ্নে নিজেই অবাক হয়। কি দরকার ছিল জানবার?
-খেতে দাও।
সেই একই সুর!
পার্স খুলে দুটো দশ টাকার নোট এগিয়ে ধরে।
-এই নে। কিনে নিবি কিছু।

রাস্তার ওপারে ক্লাব। প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে। পুজো আসতে আর মাত্র এক সপ্তাহ। সব কাজ শেষ করার জন্য প্রচুর ব্যস্ততা। বেশ ক’টা দোকানপাট ও খুলেছে ওদিকে।
পলি সেইদিকে আঙুল দিয়ে দেখায়।
-না গো মা, ওদের হাতে টাকা দিওনি। দোকানে গেলেই বলবে, চুরি করেছে।
একটা কর্কশ স্বর ভেসে আসে।
স্বরের অধিকারিণী মানুষটি একদম শীর্ণদেহী। ছেঁড়া খোঁড়া কাপড়চোপড়!
-তুমি কিনে দিও।
-না গো মা, আমাকে তো দেবেই না।
তুমি কিছু দিয়ে যাও গো।
প্যান্ডেলের পাশে এরকম বেশ ক’জন লাইন দিয়ে বসে। আসন্ন পুজো উপলক্ষে দুঃস্থ মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করেছে ক্লাব থেকে। ঘোষণা চলছে।
পলি এক মুহূর্ত ভাবে। দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।
তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে রাস্তা পেরিয়ে ক্লাবে হানা দেয়।
দুজন কর্তা স্থানীয় ব্যক্তি এগিয়ে আসে।
-কি ব্যাপার, ম্যাডাম?
-আপনারা কি দুঃস্থ মানুষের জন্য কোনো ব্যবস্থা করেছেন?
-হ্যাঁ। পুজোর দিন পনেরো আগে পরে এবং পুজোর ক’দিন পেটভরে খিচুড়ির আয়োজন করা হয়েছে ক্লাব থেকে।
গদগদ স্বরে এক সদস্যের জবাব। পাঞ্জাবীতে লাগানো দলীয় ব্যাজটির দিকে তাকিয়ে ভ্রু  কোঁচকায় পলি। তকমা!!
-আর জামাকাপড়?
এবার মাথা চুলকোনর পালা।
-না, মানে… ওটা ঠিক…

সময় নষ্ট না করে হাতের ব্যাগ থেকে বেছে দুটো ব্যাগ ধরিয়ে দেয় ওদের।
-এর মধ্যে কিছু শাড়ি আছে। পাড়ায় বিলি করুন। অনেক মহিলাই আব্রুহীন দিনযাপন করে।

সদ্য পিকো করানো তাঁতের শাড়ি আর উপহার দেওয়ার জন্য কেনা ক’টা প্যাকেট নামিয়ে রাখে।

তারপর ওদের হাঁ করা মুখগুলো পেছনে ফেলে গটগট করে বেরিয়ে আসে বাইরের রোদে।
আশ্বিনের শুকনো গুমোট হাওয়া। ঘুরে ঘুরে পাক খাচ্ছে রাস্তার জঞ্জাল।
পলি সানগ্লাস নামিয়ে এদিক ওদিক দেখে।
নাহ্! সেই কচি শুকনো মুখগুলো নেই তো!
একটু এগিয়ে সেই মহিলাকে পেয়ে যায়। চট্ করে পাশের দোকান থেকে কয়েকটা রুটি আর মিষ্টি  কিনে তার সামনে দাঁড়ায়।
– এই নাও।
– বেঁচে থাকো দিদিমণি। ভগবান ভালো করবেন গো।
এই পল্টু – মিনি এদিকে আয়, দ্যাখ্ দিদিমণি কত্ত খাবার দিয়েছে।
পলি আর দাঁড়ায় না।
ফিরতে হবে।
রাস্তা পেরিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠার সময় একপলক তাকায় চারপাশে। বেশ হালকা লাগে। উৎসব তো দোরগোড়ায়। প্রাচুর্যের মধ্যে বসবাস করা মানুষজন চারপাশে ভিড় করে! অথচ, আলোর জেল্লাটা সরালেই একদঙ্গল উলঙ্গের মিছিল!
যাক্! একবিন্দু হলেও কিছু তো করতে পেরেছে! অন্তত একবেলার জন্যও! সেই চিরাচরিত সমালোচনা ….আর নয়, এবার নতুন কিছু ভাববে সে।

শিরোনাম — অন্য পুজো। (গল্প) কলমে — দীপ্তি নন্দন।

শিরোনাম — অন্য পুজো। (গল্প)
কলমে — দীপ্তি নন্দন।

হৈমন্তী আজ সকাল থেকেই বারান্দায় বসে আছেন আনমনে। কয়েকদিন অঝোরে বৃষ্টিপাতের পরে আজ একটু রোদ দেখা গেছে। আকাশটাও কিছুটা পরিস্কার আজ। তাই রোদে এসে বসেছেন তিনি। সামনেই পুজো! এখন আর তাঁর কাছে ঐ দিন গুলোকে বিশেষ দিন বলে মনে হয়না । অথচ একটা দিন ছিল যখন ঠাকুর দেখা আর হৈ চৈ খাওয়া দাওয়া নিয়ে সারাক্ষণ আনন্দের জোয়ার বইত সারা বাড়িতে। আজ এই অশীতিপর বয়সে একেবারে নড়বড়ে আর একা হয়ে গেছেন তিনি । “ও বড়মা আর কতক্ষণ রোদে বসে থাকবে গো! এখন তো কড়া রোদ উঠেছে। এবার তো ঘরে চলো। দাঁড়াও আমি হাতটা ধরি আগে, তারপর তুমি উঠবে । ” রতনের জোরদার গলা শোনা যায়। সে পাশের বাড়িতেই থাকে।
হৈমন্তীর নাতির বন্ধু ছিল একসময়ে। তার একমাত্র নাতিটি মোটরবাইক এক্সিডেন্ট করে ,তার এই অসহায় ঠাকুমাকে একেবারে একা আর আরও অসহায় করে দিয়ে চলে গেল যখন, তখন থেকেই তার দেখাশোনার ভার নিয়েছে এই রতন।
একেবারে দুটো পাশাপাশি বাড়ি। মাঝে শুধু একটা পাঁচিলের তফাৎ। তাই খুব ছোট থেকেই রতনের এ বাড়িতে অবাধ গতিবিধি। শুধু সেই নয়, তার বাবা, মাও এ বাড়ির ছেলে আর বৌমার খুব ঘনিষ্ঠ ছিল। আর সেকারণে একসঙ্গে তারা বাইরে বেড়াতে যেতো প্রায়ই। আর সেভাবেই তারা একই সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শেষ হয়ে যায় কিছু বছর আগে। শুধু রতন আর হৈমন্তীর নাতি রজত দুজন সেবার সঙ্গে যায়নি ওদের পরীক্ষা থাকায়। তাই সেবার ওরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। আর তারপর তো রজত ও চলে গেলে, তিনি একেবারে একা হয়ে গেছেন। এখন এই অশক্ত শরীরে তাঁর একটাই আকাঙ্ক্ষা, তাড়াতাড়ি ওপরে যাবার। এখন আর তাই পুজোর উৎসবের দিনগুলো কোনো নতুন আনন্দ এনে দেয় না তাঁর মনে।
রতনের হাত ধরে ঘরে এসে বসে হাঁফাতে থাকেন তিনি। এতটুকু পরিশ্রমের ক্ষমতা নেই আর তাঁর। ” বলি বড়মা, আজ তুমি কি খাবে বলত! তৈরি করে ফেলি চটপট।” বলেই রতন হাসতে থাকে। আসলে সে জানে, একা থাকলেই এই ঠাকুমাটি শুধু পুরোনো কথা ভেবে কষ্ট পায়। তাই সে হাসি মজা দিয়ে আবহাওয়াটা একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। রতন তার এই ঠাকুমাটিকে সমস্ত শক্তি দিয়ে আগলে রাখতে চায়, ছোট থেকে সে এঁর কাছ থেকে অনেক স্নেহ পেয়ে আসছে । তার নিজের ঠাকুমাকে তো তার মনেই পড়ে না।” কি রে দাদাভাই চুপ করে কি ভাবছিস বলতো? এই যে কিসব ভালো মন্দ আমাকে রেঁধে খাওয়াবি বলছিলিস, তার কি হলো? ” বলেই জোর করে দুলে দুলে হাসতে থাকেন তিনি। আসলে এই দুটি অসমবয়সী দুখী মানুষ পরস্পরের কষ্টের কথা জানে ভালো করে। তাই তারা চেষ্টা করে একে অপরকে এই সব অবাস্তব কথা বলে একটু আনন্দ দিতে! তা নাহলে কেউই কোনো ভালো খাওয়ার কথা কিংবা কোনো আনন্দ করার কথা স্বপ্নেও ভাবে না ! পুজোর দিনগুলোও এই মানুষ দুটির মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। ৪১৬.

দুর্গা বাজুক ***** মধুমিতা ধর

দুর্গা বাজুক

✍️মধুমিতা ধর

ঘুরতে ঘুরতে মেঘ আকাশের পথ
কখন যেন বৃষ্টি হয়ে নামে
ঐ বনপথ ,পাহাড়,সমুদ্দুর
সব পেরিয়ে পায়ের কাছে থামে।

শরৎ বেলার,শিউলি ঝরা মনে
হঠাৎ উঁকি দিয়েছে কাশবন
জড়িয়ে ‘ধরে সম্পর্কের মত
রক্ত রঙে ভেসেছে রঙ্গন।

সব একা আজ মিলনে মশগুল
হুল্লোড় খুঁজে,দিগ দিগন্তে ছোটে
এমন দিনে যেন সবার কানে
ঢ্যাম কুড়াকুড় দুর্গা বেজে ওঠে।

 

এ কেমন তর স্বপ্ন! ***** উত্তম কুমার দাস

এ কেমন তর স্বপ্ন!

উত্তম কুমার দাস

জ্বর জ্বর …শরীর পুড়ে যাচ্ছে
মন… মন থেকে মস্তিষ্ক একটা গভীর ঘোর
পাক খাচ্ছে… চারিদিকে জ্বর শুধু জ্বর

হোসেনের পোলা ডা চাইয়্যা ছিল… তিন দিন উপবাসের পর,

রহিমাবেটির বিয়া হল গরিব বলে হোসেনেরে দাওয়াত দেয় নাই… দুর্গাপূজা আহে

আমি হারিয়ে যাচ্ছি
গভীর থেকে গভীরতায়
ঈশ্বর নিরাকার… হে আল্লাহ

তবু দেবী ঘুরে বেড়ায় রাস্তায় রাস্তায়, ফুটপাতে ,স্টেশন চত্বরে শোভাবাজার ,সুতানটিতে

আমি ঘোরের মধ্যেও সব দেখতে পাই
হে আল্লাহ … দুর্গা কোথায়
হে আল্লাহ… দুর্গা কে?

উত্তম কুমার দাস

# দিবস কেন যে এলো না # – ৭

# দিবস কেন যে এলো না # – ৭

আজকের দিনটা একটু নিজের মতো করে কাটাবে ভেবেছিল নীলম। সব সময় সব হয় না, যেমনটা চাওয়া যায়। চন্দনার চিন্তাটা মাথা থেকে যাচ্ছে না। তারসঙ্গে ভিড় করে আসছে আরও কত পুরনো স্মৃতিরা। তাকেও জীবনে লাঞ্ছনা গঞ্জনা কম শুনতে হয়নি বাড়িতে বা সমাজের কাছ থেকে। কত অগ্রাহ্য করেছে অহংকারের সঙ্গে। কিন্তু মনের গভীরে কি বিষন্নতা কাজ করত না? তবুও কাউকে বুঝতে দেওয়া মানে হেরে যাওয়া, এই ছিল ওদের দর্শন। দুঃখের মধ্যেও যে ভালো থাকতে হয়, তা শিখিয়ে ছিল ওদের বন্ধু শ্রেয়া, আর চঞ্চলদা। হ্যাঁ, চঞ্চলদাকে কখনই দুঃখ করতে দেখেনি। অথচ দুঃখের সংসারেই যার জন্ম! এতো আনন্দ, এতো উচ্ছ্বাস, কোথা থেকে আসত? এতো অপমান, এতো সামাজিক লাঞ্ছনার পরও?

এসব ভাবতে ভাবতে আনমনে কখন একটু চুলে চিরুনি বুলিয়ে, শাড়িটা ঠিক করে নিয়ে নীলম বাইরে একটু হাঁটতে বেরোল। কিন্তু চেনা পরিচিত মানুষের সামনে পড়লেই আবার সেই সমস্যার কথা শুনতে হবে। কার স্বামী মদ খেয়ে এসে রাতে বউকে পিটিয়েছে, কার ছেলেকে জাল পেতে ধরার জন্য কার মেয়ে সেজে গুজে ঘুরতে বেড়িয়েছে, কার বউ স্বামী না থাকা কালীন অন্য পুরুষ ঘরে ঢুকিয়েছে – – – উহ্ – – – এসবের সমাধান করতে আর যেন মন চায় না। তবুও করতে হয়। কিছু তো করতেই হয়। সব কি আর ভালো লাগা লাগির উপর নির্ভর করে? কিন্তু আজ নয়। তাই নদীর পাড়ের অপেক্ষাকৃত নির্জন পথ ধরেই নীলম হাঁটতে লাগল। শীত চলে যাচ্ছে।ঝোপঝাড় শুকিয়ে এখানে এখন পায়ে চলার পথ। নাহলে অন্য রাস্তা আছে। কিন্তু চিরকালীন অভ্যাস!

আগাছার মধ্যেও দু’একটা গাছ তো আছেই। শিমুলের ফুলগুলো ফুটে আছে। দু’দিন পর ফলগুলো ফেটে তুলো উড়বে বাতাসে। বিকেলের রোদ ঝলমল করছে। কোকিলের ডাক তো বেশ কয়েক দিন থেকেই শোনা যাচ্ছে। একটা কোকিল এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে জামরুল গাছটার উপর। বেশিক্ষণ একটানা হাঁটতে একটু ক্লান্তি বোধ হয় আজকাল। নীলম বসে পড়ল জামরুল গাছটার নীচে।
(৪)
একদিন সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি এলো। না, সেদিন যেমনটা মজা হওয়ার কথা নীলমরা ভাবত, কারুরই সেই মজা হলো না। কেউ বাড়ি থেকেই বেরিয়ে এলো না। চঞ্চলদা সিঁদুর পরিয়ে নিয়ে এসেছে ঝিলিকদিকে! সঙ্গে সাক্ষী কুসুমদি। চোখে সেদিন জল নয়, যেন আগুন ঝলকে উঠেছিল নীলমের! অবশ্যই নীলমেরই বেশি। তবে তার বান্ধবীদেরও কিছু কম নয়। যদিও ঘটনাটা ঘটবে সবাই জানত, তবুও মেনে নিতে পারল না অনেকেই।

আর ঝিলিকের দাদা বিদ্যুৎ ভট্টাচার্য্য তো রীতিমত আঘাত পেলেন। মাত্র আঠারো বছর বয়স। লেখাপড়ায় চঞ্চল এতো ভালো। নিজেই মায়ের অসম্মতিতে চঞ্চলকে গৃহে আশ্রয় দিয়েছিলেন একটু উঁচু শ্রেণীতে তুলে আনার জন্য। তার বোন ঝিলিকের প্রতি চঞ্চলের ভালোবাসাটা যে মোহ, তিনি জানতেন। তাই সে মোহ কেটে যাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন। আর যদি টিকে যায় তিনি কথা দিয়েছিলেন চঞ্চলকে, যে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সমাজে পাঁচ জনের সামনে তাদের বিয়ে দেবেন। কিন্তু চঞ্চল এ কী করল! এখনো চাকরি করে না। আর তার স্ত্রী কুসুমই বা কোন বুদ্ধিতে ওকে বিয়ে দিয়ে আনল? স্থির থাকতে না পেরে বিদ্যুৎ ভটচায সেদিন ভীষণ মূর্তি ধারণ করে চঞ্চলকে মারধর শুরু করলেন। জানলার ফাঁক দিয়ে দেখে নীলমের একটু খারাপ লাগছিল। তবে নানান অকাজের জন্য ওরকম মার খেয়ে চঞ্চলদা অভ্যস্ত।

কিন্তু আজ আর চঞ্চল বিদ্যুৎ ভটচাযের শাসন মেনে নিতে পারল না। গায়ের জোরে হাত ছাড়িয়ে দূরে সরে গেল। অন্যদিকে কুসুম তার স্বামীকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল। পাড়ার মহিলারা সকলেই উপভোগ করে সে দৃশ্য দেখতে লাগলো। এরপর সংঘাত বিদ্যুৎ ভট্টাচার্য্যের নিজের বাড়িতে। একদিকে কুসুম আর বিদ্যুতে, অন্যদিকে বিদ্যুতের মা কুসুম ও বিদ্যুৎ দু’জনকেই এরজন্য দায়ি করল। একটা কায়স্থ ঘরের ছেলেকে গৃহে আশ্রয় দিলে এমনই বিশ্বাস ঘাতকতা করে তারা। এখন তার মেয়ে ঝিলিকের কী হবে? সে যে কায়স্থ হয়ে গেল। বাড়িতে মহা শোরগোল, ঝগড়া, মারামারি, কান্নাকাটি চলতে থাকল বিদ্যুৎ ভটচাযের। চঞ্চল আর ঝিলিক বিয়ে করে ঝিলিকের বাড়িতেই উঠতে চেয়েছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ তাদের একটু বুঝতে দেওয়ার জন্য বাড়িতে ঢুকতে নিষেধ করলেন। ঝিলিকের হাত ধরে চঞ্চল নিজের বাড়িতেই উঠল। কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই। গয়নাগাটি ছাড়া এক কাপড়ে তার সোনার টুকরো ছেলেকে এভাবে মেয়ে গছানোর জন্য প্রচুর চেঁচামেচি, খিস্তি পর্যন্ত চলতে থাকল। এর মধ্যে দিয়েই ঝিলিক চঞ্চলের বিবাহিত জীবনের শুরু।

সে কিন্তু আজ থেকে দীর্ঘ বছর আগের ঘটনা। যে নীলম আজ সত্তর পেরোচ্ছে, তখন সে তেরো বছরের কিশোরী।

এইভাবে সিঁদুর মাথায় চঞ্চলের ঘরে উঠে ঝিলিকের সংসার জীবনের শুরু। চঞ্চলের দিদি ততদিনে লেখাপড়া ছেড়ে অর্থ ও সৌন্দর্যের অভাবে ঘরে বসে। সেযুগে যাকে থুবরি হয়ে বসে থাকা বলত সমাজ। বড়দা উজ্জ্বল আর বাবা শেখর অধিকাংশ সময় মদ খেয়ে বাড়িতে বসে অথবা বাইরের আড্ডায়। সংসার চালাতে ততদিনে চঞ্চলের দিদি প্রিয়া শরীর ব্যবসায়। স্বভাবটা তার অল্প বয়স থেকেই একটু খারাপ ছিল। কারণ অর্থনৈতিক দিক থেকে আর একটু উচ্চ সমাজের ছেলেরাই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। কিন্তু রূপ গুণ কোনো দিক থেকেই সে যোগ্যতা না থাকায় শেষ পর্যন্ত এই বৃত্তিই গ্রহণ করে স্বেচ্ছায়। বিয়ে একটা নিয়ম মাফিক কিছুদিনের জন্য হয়েছিল। কিন্তু সে স্বামীও যদি মদ্যপ হয়ে অন্য নারীদের দোরে দোরে ঘুরে বেড়ায়, তবে লাভ কী সে স্বামীর ঘর করে?

এরকম সম্পূর্ণ এক বিপরীত মেরুর সংসারে এসে যথারীতি ঝিলিকের সংসার জীবন সুখের হলো না। কলেজে ভর্তি না হয়ে চঞ্চল ট্রাক চালকের কাজ নিল। সৌন্দর্যের জন্য শ্বাশুরী ও ননদ ঝিলিককে দেহ ব্যবসায় নামানোর চেষ্টা করল। প্রচুর অশান্তির মধ্যে দিয়ে একটি ছোট্ট খুপরি ঘরে ঝিলিক চঞ্চলের নিজস্ব সংসার হলো। কিন্তু এই দারিদ্র বেশি দিন ঝিলিক সহ্য করতে পারবে কেন? অন্যদিকে সমস্ত পাড়া ততদিনে চঞ্চলকে বয়কট করেছে। তার সঙ্গে পাড়ার ভদ্রস্থ ঘরের ছেলে মেয়েরা আর মেশে না। চঞ্চলেরও আর ভদ্র সমাজে নিজের স্থান করার ইচ্ছা গেল চলে। তার সমাজ গেল দ্রুত বদলে। জন্মই যার এরকম পরিবেশে, স্বভাবতই তাই ছোটবেলা থেকেই তার উগ্রতা একটু বেশি। ফলে চঞ্চলও মদ্যপানে অভ্যস্থ হয়ে গেল খুব দ্রুত। মাঝে মধ্যেই মদ্যপ অবস্থায় পাড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ ভটচাযকে গালিগালাজ করতে থাকে। পাড়ার মানুষ মজা দেখে। তারই মধ্যে সমস্ত সমাজকে চ্যালেঞ্জ দেখিয়ে ঝিলিকের সঙ্গে মাঝে মাঝে হাত ধরাধরি করে পাড়ার মধ্যে ঘুরেও বেড়ায় চঞ্চল।

নাহ্, আর সহ্য হয় না নীলমের। ক্রমশ মনের মধ্যে একটা আক্রোশ জন্ম নিতে থাকে। কিন্তু কার উপর এই আক্রোশ! ছোটবেলার সেই মিষ্টি ঝিলিকদিই এখন যেন দুটো চোখে জ্বালা ধরায় নীলমের। যদিও নীলমের বান্ধবীদের ততদিনে চঞ্চলের প্রতি আকর্ষণ উবে গেছে। সচেতনে, অথবা নিজের অজান্তেই ঝিলিক আর চঞ্চলের সম্পর্কের ফাঁক খোঁজে নীলমের মন। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নীলম ভাবে – – – কে বেশি সুন্দরী? না ঝিলিকদির গায়ের ফর্সা দুধে আলতা রঙ, আর নিজের চাপা গায়ের রঙের তফাত যেন অনেক। সবে শরীর গড়ে উঠছে কিশোরীর। সহ্য হয় না এই তফাত। মনে বার বার প্রশ্ন জাগে, ওই সৌন্দর্য ছাড়া আর কী যোগ্যতা আছে ঝিলিকদির? পারছে কি ঠিক মতো সংসার করতে? এক জটিল বয়ঃসন্ধি কালীন সমস্যার মধ্যে তখন নীলম। কিন্তু কেই বা তার খোঁজ রাখে, সে যে কখন বড় হয়ে উঠেছে? ছোট খাটো রোগা পাতলা চেহারার মধ্যে একটু শারীরিক পরিবর্তনে একটা জৌলুস দেখা দিয়েছে সবে।
(৫)
এদিকে চন্দনার ফ্যাকাসে মুখের দিকে চোখ পড়ছে ক্রমশ সকলের। মুখের হাসি কোথায় হারিয়ে গেছে! বয়সের জৌলুস হারাচ্ছে শরীর। নীলমের বাড়িতে এসে নিয়মিত দেখিয়ে যায়। এখনো প্রতিবেশীরা কিছু টের পায়নি। তবে আর কিছু টের না পাক, তপনের সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়নি বলেই যে মেয়েটা ক্রমশ ভেঙে পড়ছে মনে মনে, তা সবাই বোঝে। ফলে চন্দনার মাকে সকলে পরামর্শ দেয় মেয়েকে পাত্রস্থ করার।
(ক্রমশ)