একার জেগে থাকা ✒️ মৌসুমী মিত্র

একার জেগে থাকা
মৌসুমী মিত্র

সবাই জানে দিন শেষে তুমি একা ।
জনারণ্যে কোলাহল ,তবু কী ভীষন নিস্তব্ধতা ।
ঝিঁ ঝিঁ পোকার মত গুঞ্জন,—” দুবেলা মরার আগে মরবো না ভাই মরবো না।”
হেরে গিয়েও হারতে না চাওয়ার আমরণ সংগ্রাম।
অরণ্যটা ভীষন একা !
কটকটে পোকাগুলো বিদ্রোহী, চিৎকার করে বলে,”লড়াই লড়াই লড়াই চাই ,লড়াই করে বাঁচতে চাই।”
খান খান হয়ে যায় নিস্তব্ধতা।
একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষের হাহাকার,—- একটা মানুষ চাই , একটা মনের মত মানুষ ;

একটা মনের মানুষ।

ক্লান্ত পদক্ষেপে একটা মরুদ্যান —– শুধু একটা মানুষ।।

সাজাবো যতনে ✒️✒️✒️ রত্না রায়

সাজাবো যতনে

রত্না রায়

পালক খসে, পালক খসে
গোলাপ ফুলের পালক খসে
পলাশ শিমুল আলতা পায়ে
কৃষ্ণচূড়ায় ডাকলো এসে।

সীমন্তে ওই সূর্যসকাল
লাজবন্তীর রাঙা কপাল
নাকছাবিতে ঘামের আলাপ
জামদানীটা হচ্ছে নাকাল।

হালখাতারই খাঁজে খাঁজে
মিঠে বাতাস সবার মাঝে।
মঙ্গল ঘট আমের পাতায়
নতুন বছর আলোর সাজে।।।

# শিরোনাম-প্রাপ্তে তু ষোড়শ বর্ষে। # কলমে- ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

# ছোট গল্প।
# শিরোনাম-প্রাপ্তে তু ষোড়শ বর্ষে।
# কলমে- ছন্দা চট্টোপাধ্যায়।

–” অংশু,বল্ কী হয়েছে? আমি তোর বাবা। মনে রাখিস, ষোল বছর বয়সে বাবাই ছেলের সবচেয়ে বড় বন্ধু হয়। প্রাপ্তে তু ষোড়শ বর্ষে পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ। বল্ রেজাল্ট খারাপ হয়েছে? -” না,বাবা, কেমন করে বলি!”– দ্বিধাগ্রস্ত কচি মুখটা মলয় দু’হাতের অঞ্জলিতে তুলে ধরে। সদ‍্য গজানো হাল্কা দাড়িগোঁফে ঢাকা অপূর্ব নিষ্পাপ এক তরুণ আনন। মাথা নিচু করে কিছু বলছে বাবাকে। পিতা সস্নেহে পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে, নিচু স্বরে বোঝাচ্ছে কিছু । বেশ কিছুক্ষণ পরে ছেলের প্রফুল্ল কন্ঠস্বর -“ওক্কে বাবা।”– মনে রাখিস, সব শেয়ার করবি তোর এই বেস্ট ফ্রেন্ডকে।”–

পাশের ঘরে বসে সব শুনছিলো ইন্দিরা। অংশু মায়ের থেকেও বাবাকেই বেশী ভালোবাসে। সন্তানকে কী ভাবে আগলাতে হয় তা মলয় জানে। ইন্দিরা ভাবে– আচ্ছা, প্রাপ্তে তু ষোড়শ বর্ষে পিতা তো পুত্রের মিত্র হয়, কিন্তু কন‍্যা দ্বাদশ বর্ষেই মায়ের সখী হয়ে যায়, যখন প্রথম রজোদর্শন হয়। মা-ই বুঝিয়ে দেয় এ সময় কী করণীয়। ইন্দিরার মাও প্রতি মাসে নিজের হাতে তার রক্ষাকবচ বেঁধে দিতো। মা বড়ো বিশ্বাস করতো তাকে। মা বুঝতোইনা, তার মেয়ে বড়ো হচ্ছে। এখনো যেন শিশু। ইন্দিরা যে তখন সদ‍্য ষোড়শী! মলয়ের ভালোবাসার জোয়ারে সে যে তখন ভেসে যাচ্ছে! মাকে বলতেও পারছে না, অথচ ইন্দিরার বিবেক বলেছিলো যে, অন্তত মাকে বলা উচিৎ। বলা হয়নি। পাড়ার লোকেদের মারফৎ যেদিন বাড়িতে জানাজানি হলো এই কথা, বাবা দুহাতে মুখ ঢেকে বিছানায় বসে পড়লেন। দাদা গলা টিপে ধরে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলো এক অজ্ঞাত শব্দ–“কুলটা”–। আচ্ছা,কুলটা মানে কী? মা কেমন অদ্ভূত চোখে তাকিয়েছিলো তার দিকে। মা ঘামছিলো। ইন্দিরা ঠকঠক করে কাঁপছিল! এমন সময়ে মলয় এলোপাথাড়ি ঝড়ের মতো ছুটে এলো। আপনারা দয়া করে ওকে মারবেননা। আমি কথা দিচ্ছি ওকে বিয়ে করবো। মা শুধু ইন্দিরার দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করলো -“তোকে সবচেয়ে বিশ্বাস করেছিলাম ইন্দু,আমার সবচেয়ে আদরের মেয়ে তুই-ই। তুই আমায় বলিসনি?! বিশ্বাস হচ্ছে না,এমন করে আমাকে তুই ঠকালি ইন্দু!”- মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ঘরে ঢুকে খিল দিয়েছিল।

পয়লা বৈশাখ মলয়কে বিয়ে করে বাপের বাড়ি ছাড়লো ইন্দিরা। নাঃ, বিয়েটা বাপের বাড়ি থেকে দেয়নি যেমন, তেমনই আটকাবার চেষ্টাও কেউ করেনি। মলয়কে নিয়ে রেজেস্ট্রি অফিস থেকে শেষবারের মতো মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। মা শুধু মলয়কে দেখছিল অবাক চোখে। ইন্দু মাকে প্রণাম করলে মা এক বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। আর দেখা হয়নি মায়ের সঙ্গে। চোখের জলের কনকাঞ্জলি দিয়ে ঘর ছাড়লো ইন্দু। মাও সেই অভিমানেই হয়তো বছরখানেকের মধ‍্যেই মারা যায়। খবর হাওয়ায় ভাসে। গঙ্গার ঘাটে চোখের জলে মায়ের নামে চতুর্থীর তর্পণ করেছিলো ইন্দিরা।

ষোল বছর বয়সে যে দূরত্ব তৈরী হয়েছিলো তা চিরস্থায়ী হয়ে গেলো। বুকের মধ‍্যে চিরস্থায়ী হয়ে গেল মায়ের রুদ্ধবাক করুণ মুখ। আজ সেই পয়লা বৈশাখ! আজ ইন্দিরার বিয়ের তারিখ! আজ মায়ের সঙ্গে চির বিচ্ছেদের তারিখও! আজ মাতৃস্নেহ হারিয়ে তার বিনিময়ে নতুন সংসার গড়ে তোলার দিন। -“আজ যদি সেই ষোল বছরে ফিরে যেতে পারতাম, মাগো ক্ষমা চাইতামনা, তোমার কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতাম।”–

ইন্দিরার দুচোখ জলে ভরে গেলো।
**********************************************

#লজ্জাহীনা #কলমে : সাহানা

#লজ্জাহীনা
#কলমে : সাহানা

বাইরের বারান্দাটা প্রশস্ত। দরজা খুলেই সারি দিয়ে ফুলের টব আর একটি টিঁয়াপাখি। করবীদেবী সকাল বিকেল এই ঘর আর বারান্দা নিয়ে অনেকটা সময় ব্যস্ত থাকেন। পরিচর্যায়। বাকি সময়টা কাটে লেখালেখি নিয়ে। হ্যাঁ,  করবীদেবী একজন লেখিকা। সাপ্তাহিক এবং বাৎসরিক অনেগুলো পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত ছাপা হয়। প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত হয়েছেন অজস্রবার।
লেখার টেবিলে কলমটা নামিয়ে ল্যাপটপের ঢাকাটা বন্ধ করলেন তিনি। আজ খুব অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন, বারংবার। অনেক স্মৃতি তাঁর মনের দুয়ারে বারবার আঘাত হানছে, তাঁকে মনঃসংযোগ করতেই দিচ্ছে না!
-মা, একটু চা খাবে? বানিয়ে দিই?
পার্বতী দরজা ঠেলে তাকিয়ে উৎসুক চোখে।
-নাহ্!
-খাও না। ভালো লাগবে। দুপুরে তো কিছুই খেলে না…
-আচ্ছা,  আন্।
খুশি মনে মাথা নেড়ে চলে যায় সে। যাবার আগে দরজাটা
ভেজিয়ে দিয়ে যায়।
এ বাড়ির সবাই জানে তিনি নির্জনতা পছন্দ করেন।
করবীদেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসেন। পার্বতীকে চেনেন ছোটো থেকেই। উচ্ছ্বল প্রাণশক্তিতে ভরপুর। সম্প্রতি একটি অন্য জাতের ছেলেকে ভালো লেগেছে তার। কিন্তু তাদের গোত্রে ভিনদেশীর আসা নিষেধ। অগত্যা কেঁদে পড়েছে তাঁর পায়ে। পার্বতীর মা-বাবা অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকে তাঁর দিকেই।
-লোকলজ্জা বলেও তো একটা কথা আছে, দিদিমণি।
পার্বতীর বাবা তাঁর ড্রাইভার। মা’ও রান্নার কাজে আছে দীর্ঘ দিন।
-এখন তো এসব কেউ মানে না, দয়াল। আর, ছেলেটি তো বেশ ভালো। আমি কথা বলেছি। অমত কোরো না।
তারপর থেকেই পার্বতী তাঁর সুবিধে অসুবিধের খেয়াল রাখে।
একটু বেশিই রাখে।
নিজের মনেই হেসে ফ্যালেন, চশমাটা তুলে নিয়ে …
সম্প্রতি একটি উপন্যাস লেখায় হাত দিয়েছেন। সামাজিক। কিছুটা জীবনীও বটে। নিজের জীবনের প্রতিফলন!
মুখ্য চরিত্র একান্নবর্তি পরিবারে দায়বদ্ধ, নিজের বিলিতি ডিগ্রী, ছবি আঁকা, গান ইত্যাদি প্যাশনগুলোর ক্রমশ গলা টিপে ধরছে সংসারের জাঁতাকল…দুই ছেলে, মেয়ে,  স্বামী, শাশুড়ি….
এত দায়িত্ব সামলেও রোজ লেখার খাতাটা টেনে বসেন। ডাইরি লেখেন। সবকিছুই সম্ভব হয়েছে স্বামী এবং শাশুড়ির প্রেরণায়।
ফিসফাস যেগুলো কানে আসে, ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ার সাহস পান এঁদের জন্য।
-মা, কি লিখছো?
কিশোর পুত্রের জিজ্ঞাসা।
-একটা গল্প রে।
-চরিত্রে আমাকে রেখো। পুত্রদ্বয় ছোট থেকেই বই-এর পোকা।
-হ্যাঁ রে, বাবা। সস্নেহে হাত বুলিয়ে দেন।
সবটাই ঠিকঠাক চলছিল। একটি সতেজ, সুঠাম পারিবারিক ছবি। নিটেল ভালোবাসার পরিবেশ।
বাধ সাধলো কন্যাটি।
ছোটবেলা থেকেই একরোখা, বড্ড জেদী। বাবার অত্যধিক স্নেহে বিপথগামী।
কতবার বলেছেন…
-শোনো, বিপাশাকে অত আদর দিও না, একটু শাসন করো, প্লিজ। মা, আপনিও একটু শাসন করুন। নাহলে ও আয়ত্ত্বের বাইরে চলে যাবে যে!
-আহা, তুমি ভুল ভাবছো। ও হচ্ছে আধুনিকা। ওরকম একটু আধটু করবেই।
তখন চুপ করে গেলেও ভেতরে অন্তর্দাহ টের পান। তিনি যে মা!
বছর দশেকের মধ্যেই সংসারের চিত্রটা পাল্টায়।
ছেলেরা বিদেশে উচ্চ ডিগ্রীর আশায়। স্বামী গত হলেন হার্ট অ্যাটাকে। শাশুড়ি তার আগেই।
অতএব সংসারের রাশ তাঁর হাতেই।
কিন্তু বিপাশা?
কলেজের গন্ডী পেরোনোর আগেই নানা কুসঙ্গে পড়ে সে। একদিন…
-মা, আজ আমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে আসবো। আলাপ করিয়ে দেবো।
-বয়ফ্রেন্ড?
হোঁচট খান…কি করে অবলীলায় বলছে মেয়ে!
বিপাশা নির্বিকার।
বাবা তার জন্য রেখে গিয়েছেন আয়ের একটি বিরাট অংশ।
সুতরাং, হাল ফ্যাশনের গাড়ি, পোশাক এবং উদ্দাম জীবনযাত্রা তার নিত্যসঙ্গী।
সমাজ, লোকলজ্জা? এত কিছু ভাববার সময় কোথায়?
জীবন গতিশীল, এগিয়ে চলতেই হবে। মা-এর মত কলম পেশা বা ভাইদের মত ডিগ্রী অর্জনের পরিশ্রম, কোনোটাই পছন্দ নয়।
৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹
দীর্ঘশ্বাস ফেলে করবীদেবী আবার লেখায় মনোযোগ দেন। এ সমাজে স্বেচ্ছাচার এখন নিত্য অঙ্গ। যুবসমাজ স্বাধীন, উদ্দাম, জীবনমুখী। অসামাজিক যেকোন কার্যকলাপের জন্য লোকলজ্জা …..আজ কোথায়? অথচ, দুই ভিন্ন গোত্রের সজীব প্রাণকে আলাদা করতে চায় বিনা দোষে, শুধুমাত্র লোকলজ্জার ভয়ে! এ কিরকম বিচার!
অগত্যা সমাজের দায়বদ্ধতা নিতে হবে কলমকে, লেখককে এবং পাঠকসমাজকে। এই বিশ্বাসেই নাহয় এগিয়ে চলবেন তিনি।

… নববর্ষ.. “তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ “.

…………. নববর্ষ…………

“তোমায় নতুন করে পাব বলে
হারাই ক্ষণে ক্ষণ “…..

এ নতুনকে আমরা ধরে নিতেই পারি এক নতুন দিনের সূচনা রূপে। জীর্ণ-পুরাতনকে পিছনে ফেলে নতুন কোনো আশা বা স্বপ্নের দিকে দৃষ্টি ফেরাই। কিন্তু যা কিছু পুরোনো, সবকিছুকে সত্যিই মুছে ফেলা যায়? তার কিছু অংশ সযত্নে সঙ্গোপনে সঙ্গে নিয়েই চলতে হয়। হয় তো বা তার কিছুটা ক্ষণে ক্ষণে হারিয়ে ফেলি…কখনো জেনে কখনো বা অজান্তেই, তবু নতুনকে পেতে হলে পুরোনোর রেশটা থেকেই যায়। যাক না– ক্ষতি কি?….
কালবোশেখীর মাতন নিয়ে
আসুক নতুন বরষ।
দুলিয়ে দেবে,  হেলিয়ে দেবে,
পুরানো সব আখর।
নতুন আশায় চলব আবার
নতুন  অঙ্গীকারে,
প্রাচীন ‘কিছু’ হাতটি ধরে
চলবে সরে সরে।
সকল নিয়ে বাঁধব বাসা…
বিশ্ব নিয়ে সাথে!
মুছব শুধু দুঃখগুলিই ?
চলব নতুন পথে।

এমনি করেই আর একটা বছর আসবে… আবার জমবে সুখ-দুঃখের গাথা, জীবনের সঙ্গে মিশে যাবে ওতপ্রোতভাবে, চলার পথে ভুলভ্রান্তিতে রাস্তা যাবে ঢেকে …তবুও আবার  আনন্দে মাতব আমরা…আবারও আসবে আর একটি নতুন বছর…….

নতুন বছর শুভ হোক সকলের জন‍্য।
শুভ নববর্ষ।।
******************* গীতালি।

মুক্তগদ্য “বৈশাখ হে মৌনী তাপস” -বিজয়া দেব।

মুক্তগদ্য

“বৈশাখ হে মৌনী তাপস”

-বিজয়া দেব।

“জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক…” এভাবেই নতুনের আহ্বান করি আমরা। পেছনে ফেলে আসি মূল্য অমূল্য। যা ফেলে আসি তার নির্যাসটুকু সম্বল করে নিয়ে নতুনের পথ চলি। আবার অনন্ত কালস্রোতে দাঁড়িয়ে দেখি আমাদের ফেলে আসা খন্ডমুহূর্ত ও গ্রহণ করা নতুন মুহূর্তের সমবায়ে আমাদের যাপন আধো আলো আধো ছায়ার রহস্যালোকে আবৃত। নিজেকেই তখন বড্ড অচেনা বলে বোধ হয়। তখন ভাবি জীবন কি সত্যিই অর্থবহ না কি নিরর্থক না কি পুরাতন নতুনের সমবায়ে এক প্রশ্নময় অস্তিত্ব।
৩৬৫ দিন ঘুরে গেলে নতুন বছর আসে আমাদের যাপনে দু’বার। একবার নতুন ইংরাজি বছরে আরেকবার বাংলা নববর্ষে। পাশ্চাত্য শৈলীতে ৩১ শে ডিসেম্বর ও ১লা জানুয়ারি উদযাপিত হয় আর ৩০ শে চৈত্র ও পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয় বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির হাত ধরে।
শৈশবে পঞ্জিকা হাতে নিয়ে দেখতাম নববর্ষে হালখাতার ছবি। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে আমন্ত্রণপত্র আসত। চিঠির উপরে হালখাতার উৎসবে এক ধুতিপাঞ্জাবি পরা বাঙালি আসনপিঁড়ি হয়ে বসে আছেন আর সামনে বেশ বড় খাতা হাতে কলম ধরা। একটা হিসেবনিকেশের ব্যাপারকে দিব্যি ফুটিয়ে তোলা হতো।
এই হালখাতা ব্যাপারটি ঠিক কি? স্বাভাবিক ভাবেই মনে প্রশ্ন জাগত। পরে জানতে পারি হালখাতার বেশ কিছু ব্যাপকার্থ রয়েছে। “হাল” শব্দটির অর্থ আমরা জানি “এখন” কিংবা “নতুন” । সে হিসেবে “নতুন খাতা” মানে নতুন বছরে নতুন হিসেব নিকেশের নতুন খাতা। পুরাতন হিসেব নিকেশ শেষ হতো শেষ চৈত্রে।
আবার অন্য আরেকটি ইতিহাসও আছে।  “হাল” শব্দটি “হল” থেকে এসেছে বলেও জানা যায়। “হল” মানে “লাঙল”। লাঙল আবিষ্কারের পর মানুষ সমাজবদ্ধ হয় ও আশ্রয়স্থল তৈরি করে বসবাস শুরু করে। লাঙল আবিষ্কারের পর কৃষিজাত দ্রব্য উৎপন্ন হওয়া সহজতর হয় এবং কালক্রমে তা কৃষিপণ্যে পরিণত হয়। এই কৃষিপণ্য বিনিময়ের হিসেব যে খাতাতে লেখা হতো সেই খাতাকে বলা হতো হালখাতা। সেই থেকে পুরনো হিসেব মিটিয়ে নতুন খাতাতে নতুন বছরে নতুন হিসেব লেখার খাতাকে বলা হল হালখাতা। হালখাতার মলাট লাল কাপড়ে মোড়া উপরে স্বস্তিকাচিহ্ন। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এই হালখাতার পুজো হয় এবং মাঙ্গলিক পথ চলার সংকেতবাহী হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
এছাড়াও, রাজা রাজড়া সম্রাট বাদশারা সারা বছরের রাজস্ব আদায়ের হিসেবনিকেশের শেষে একটি উৎসবও পয়লা বৈশাখে করতেন বলে জানা যায়। সম্রাট আকবর এই রাজস্ব আদায়ের বার্ষিক হিসেবনিকেশ শেষে পয়লা বৈশাখে পুণ্যাহ উৎসব চালু করেন। পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদের শাসক মুর্শিদ কুলি খাঁ-ও পুণ্যাহ উৎসব করতেন।
লোকায়ত জীবনযাপনেও শেষ চৈত্র ও পয়লা বৈশাখের বিশেষত্ব রয়েছে। চড়কপুজো নীলষষ্ঠী শিবের গাজন ইত্যাদি আমাদের যাপনে কখনও প্রত্যক্ষ কখনও পরোক্ষে জড়িয়ে আছে। আমাদের আসাম অঞ্চলে পুরো চৈত্রমাস জুড়ে চড়কপুজোর জন্যে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল সবজি ডাল টাকা পয়সা নেওয়ার প্রথা চালু আছে লোকায়ত জীবনে। সারা চৈত্রমাস জুড়ে হরগৌরীর নাচ, কালী সেজে এসে নাচ দেখানো এসব রীতি শৈশব স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে উদাসী চৈত্রের সন্ন্যাসীরূপের সঙ্গে চড়কপুজোর হরগৌরীর দুপুর রোদে ঘুরে ঘুরে নাচ দেখানো, শিবের সারাদেহে ভস্মের রূপকল্পে সস্তার রূপোলি রঙ মাখানো দেহে চৈত্রে খরতাপের ঝলসিত রূপ, মাথার উদাসী জটাজুট,  গৌরীর কাঁচাহলুদ মাখা মুখের সাথে চৈত্রের সন্ন্যাসীরূপের অদ্ভুত সাযুজ্য দেখেই উপলব্ধ হয় প্রকৃতির সাথে লোকায়ত জীবন কী অপরূপভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। যাঁরা চড়কপুজো করেন এঁরা শিবের উপাসক। চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক গাছকে ঘিরে নিজেদের নানাধরণের কষ্ট দিয়ে এঁরা মহাদেবকে সন্তুষ্ট করতে চান বর্ষশেষে, নতুন বছর শুরু করতে চান মহাদেবের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে।
এদিকে বস্ত্রবিপণিতে তখন চলে চৈত্রসেল। জীর্ণ পুরাতনকে সরিয়ে দিয়ে নতুনের সম্ভার দিয়ে বিপণিকে সাজানোর প্রক্রিয়া।
বৈশাখের প্রথম দিনে বাঙালি মেতে ওঠে বর্ষবরণে। গানে কবিতায় নৃত্যে পত্র পত্রিকা প্রকাশে নতুন বছরকে বরণ করার এই নান্দনিক প্রকাশ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ণাঢ্য হয়ে ওঠে। আর এদিকে খরবৈশাখের মৌনী তাপস মূর্তি তা প্রত্যক্ষ করে তার বিলগ্ন বৈশিষ্ট্যে।
………………………………………….

 

গীতশ্রী সিনহা… সম্পাদকীয় কলমে।

সম্পাদকীয়

গত গত পর্বে সম্পর্ক – ভালোবাসা – নির্ভরতা এসব নিয়ে বলে গেছি বিভিন্নভাবে, বলেছিলাম সাহিত্য – লিটিলম্যাগাজিন – পুস্তক – বইমেলা – উৎসব আরও অনেককিছু নিয়ে।
এবার ফিরে এলাম ” সময় ” কে সাথে নিয়ে।
“আগের নষ্ট করা সময়ের জন্য আফসোস করলে… এখনকার সময়ও নষ্ট হয় ” ছোট্টবেলা থেকে শিখেছি, জেনেছি। সময়ের মুল্য দিতে না পারলে সফলতা আসে না। সময় এবং সফলতা হাত-ধরাধরি করে এগিয়ে চলে। সফলতার সবচেয়ে বড় শর্ত সময়ের সার্থকতা মেনে চলা।
যে মানুষ নিঃস্ব, কিছু নেই হাতে… তার হাতেও সময় আছে, সবচেয়ে বড় সম্পদ।
অতীত চলে গেছে, তাই সেটা নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই,ভবিষ্যৎ নিয়ে জেনেও লাভ নেই, বর্তমান যেভাবে কাটাবে ভবিষ্যৎ সেই ভাবেই প্রশস্ত হবে।
সময়ের প্রতি যত্নশীল হলে সময় আমাদের জীবনের যত্ন নেবে।
আজকের কাজ আজ করো, কালকে আবার নতুন কাজ করবে, জমে থাকা কাজ তোমার জীবনের দখল নেবে।
আমরা সারাদিনে যা যা খরচ করি তারমধ্যে সব চেয়ে দামী হচ্ছে সময়।
সময় নিয়ে অজুহাত দেখিও না, তুমিই পিছিয়ে পড়বে, অবহেলিত সময় তোমাকে কিছুই দেবে না।
বড় বড় দার্শনিক রা বলেন “আমার সময় নেই, আর আমি কাজটা করতে পারবো না… এই দুই এ-র মানে একই, অলসতা … অবহেলা…
ভবিষ্যতে যাওয়ার গতি হলো প্রতি ঘন্টায় ৬০ মিনিট। সময়ের গতি যে যেভাবে ব্যবহার করবে, তার ভবিষ্যৎ তেমনিভাবেই মজবুত বা দুর্বল হবে।
সময় স্রোতের মতো ভেসে যায়, ভেসে যাওয়া সময়কে গচ্ছিত রেখে সফলতা নিয়ে নাও।
সময় মানে জীবন, জীবন মানে প্রতিষ্ঠা, জীবনের অলিতে-গলিতে সময় মেপে চললে উচ্চ শিখরে তুমিই অবস্থান করবে।
সময়কে সাধারণ ভাবে কাটালে, সময় তোমাকে সাধারণ জীবন উপহার দেবে। তখন আমরা বলে থাকি হাতাশা করে, ” জীবনে কিছুই পেলাম না… ( সাথে লম্বাচওড়া দীর্ঘশ্বাস )।
যে সময় হারিয়েছি তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য আগামী সময়কে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করলে কিছুটা ফিরে পাওয়া যায়।
সময়ের অভাব কিন্তু সমস্যাই নয়, সকলের হাতেই ২৪ ঘন্টা,আসল সমস্যা সদিচ্ছার অভাব।
ফেলে আসা সময়ের কথা না ভেবে বর্তমান সময়কে সুসজ্জিত করে তোলো, ফলাফল সুসজ্জিত হবে।
সময়কে তোমার বৈঠকখানার মতো সাজিয়ে তোলো, সময়ের সাথে সখ্যতা করো, গুরুত্ব বুঝে সময়ের সাথে আপোষ করে চলো।
একলা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যয় করো না সময়, বরং দেওয়ালে দরজা বানিয়ে ওপারে যাওয়ার ভাবনায় থাকো।
পিঁপড়ের মতো ব্যস্ত থাকার কথা হচ্ছে না, কাজের পিছনে ব্যস্ত থাকার কথা বলছি।

স্তব্ধতার পর্দায় চোখ রেখেছি আমরা বাধ্যতামূলক ভাবে, তাই বুঝি আজ সময়ের কথা বলে গেলাম অগোছালো জটপাকানো আবোলতাবোল ভাবে। আসলে সবই বলি মনের তাগিদে।
এসো সবাই সময়ের পিছনে দৌড়াই… সময়ের ইমারত তৈরি করি। সফলতা দুয়ারে অপেক্ষায়।

গীতশ্রী সিনহা… সম্পাদকীয় কলমে।

‘ শকুন ‘ গল্প পাঠে প্রতিক্রিয়া। ✒️✒️ গীতশ্রী সিনহা

এক পাহাড় প্রমাণ ধ্বংস আর মৃতের স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষের বেঁচে থাকার দীর্ঘকালীন বাস্তবকে তুলে ধরেছেন হাসান আজিজুল হক।বাস্তবিকই আমাদের স্বাধীনতা – উত্তরকালে এমন প্রখর কন্ঠস্বর খুব কম শুনেছি আমরা। চারিদিকে বিভ্রান্তি ও দোলাচলে ভরা পরিস্থিতি তাঁর চেতনা স্থিত ও আপোষহীন থাকার অঙ্গিকার আমাদের বিস্মিত করেছে বার বার।
‘ শকুন ‘ গল্প পাঠে প্রতিক্রিয়া।

গীতশ্রী সিনহা

হাসান আজিজুল হকের প্রথম গল্প ‘ শকুন ‘, প্রকাশ হয়েছিল ১৯৬০ সালে। গল্পটি আমার প্রিয় গল্পের মধ্যে অন্যতম। বাস্তবকে সামনে রেখেই বাস্তবকে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নির্মাণ তাঁর গল্পে। কাহিনীর বাইরে নিরন্তর কাজ করে চলেছে তাঁর স্মৃতি, তাঁর সত্তা, তাঁর মানবিক বোধ আর সমষ্টি জীবনের আশৈশব অভিজ্ঞতায় যারা তিল তিল করে গড়ে ওঠে। ঠিক যেন কল্পনা তাঁর সত্তারই সম্প্রসারণ। এই সত্তার মূলে আছে সমাজ বাস্তবতা। আর আছে চারিপাশের দৃশ্যমান প্রকৃতি, আর তাঁর স্বচ্ছ, সজাগ চোখে দেখা গ্রামীণ জীবনে হাভাতে মানুষ, পরিবেশ, তাদের অন্তর্নিহিত বাস্তবতা, তাঁর স্মৃতিবাহিত হয়ে যারা উঠে এসেছে এই গল্পে।
‘ শকুন ‘ গল্পের শুরুটা আমাদের এক গ্রামীণ সন্ধ্যার পরিবেশে নিয়ে যায়ঃ ‘ কয়েকটি ছেলে বসেছিল সন্ধ্যার পর, তেঁতুলগাছটার দিকে পিছন ফিরে। খালি গায়ে ময়লা হাফসার্টকে আসন করে। গোল হয়ে পা ছড়িয়ে গল্প করছিল। একটা আর্তনাদের মতো শব্দে সবাই ফিরে তাকাল। তেঁতুল গাছের একটা শুকনো ডাল নাড়িয়ে, পাতা ঝরিয়ে, সোঁ সোঁ শব্দে একটা কিছু উড়ে এলো ওদের মাথার ওপর। ফিকে অন্ধকারের মধ্যে গভীর নিকষ একতাল সজীব অন্ধকারের মতো প্রায় ওদের মাথা ছুঁয়ে সামনের পোড়া ভিটেটায় নামল জিনিসটা। ‘
তারপর হৈ চৈ করে ছেলেরা ছুটলো জিনিসটার কাছে। অনেক গবেষণা, পর্যবেক্ষণ করে ছেলেদের দল বুঝলো ওটা ‘ শকুন ‘। তবু কারও কারও মনে ভয়, ‘ ক্যা জানে, সঞ্জব্যালায় ক্যার মনে কি আচে ?… বুকে থু থু দিল। ‘ তারপর ওটা ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। আর দেখলো ——
‘ এক জায়গায় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত সুন্দর জিনিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মতো সেই কুৎসিত জীবটা।
তারা হিংস্র কৌতুহলে প্রাণান্ত খেলায় মেতে ওঠে শকুনটাকে নিয়ে। এবং রফিক নামক ছেলেটি ‘ শকুনিটাকে ধরবুই ‘ বলে জেদ ধরে। শেষ পর্যন্ত সবাই ধরে ফেলল ওকে, আঁকড়ে জাপটে দুমড়ে… তারা বুক দিয়ে অনুভব করলো হাঁপরের মতো ফ্যাসফ্যাসে শব্দ উঠছে শকুনিটার যন্ত্রের ভিত্তিতে থেকে। দীর্ঘশ্বাসের মতো – ফাঁপা, শূন্য, ধরা পড়ার ক্লান্তির ক্ষোভের। আর তখনই লেখকের জিজ্ঞাসা… ‘ ছেলেগুলোর কৌতুহল, নিজেদের তুষ্টি, তৃপ্ত ক্লান্তিকর সম্ভাব্য পীড়ন দেওয়ার উত্তেজনাকর বক্ষস্পন্দন পাখিটা অনুভব করতে পারল কি ? ‘ শেষে ‘ দুই ডানা অসহায়ভাবে, নিরুপায় ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করলো শকুনটা। ‘
এবার ছেলেদের ‘ দ্বিতীয় দফা দৌড়। প্রত্যাশার পিছু পিছু নয়। প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে। অকারণ নিষ্ঠুরতার সঙ্গে। আত্মতৃপ্তির নিষ্ঠুরতা ‘।
‘ শকুন ‘ প্রতীকে প্রাপ্তি। প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে উদ্দাম আর প্রাণান্তকর পরিশ্রম তাদের। গল্পটি জুড়েই ছেলেদের ‘ শকুন ‘ ধরার প্রাণান্তকর চেষ্টার ছবি। তার বর্ণনা লেখক নিপুণভাবে করেছেন। ‘ শকুন ‘ ধরার পর ওরা ভয়ানক হুল্লোড় করে ওরা দৌড়াচ্ছে এই টানার পিছু পিছু, চেঁচাতে চেঁচাতে। অদ্ভুত রকমের মজার খেলা খেলে কি লাভ ?
‘ লাভ? তোকে দেখে লোব — তু তো শকুনি, তোর গায়ে গন্ধ, তু ভাগাড়ে মরা গরু খাস, কুকুরের সাথে ছেঁড়াছেঁড়ি করিস —- তোকে দেখে রাগ লাগে ক্যানে ?
ছেলেদের কথায় শকুনিটাকে দেখে তাদের রাগ লাগে — মনে হয় তাদের খাদ্য যেন শকুনির খাদ্য —- তাদের পোশাক যেন ওর গায়ের বিকৃত গন্ধভরা নোংরা পালকের মতো —- সুদখোর মহাজনের কথা মনে হয় ওদের দেখলেই।নইলে মহাজনকে লোকে শকুনি বলে কেন ‘।
তারপর ‘ ওরে শালা, পালাইতে চাও, শালা শকুনি, শালা সুদখোর অঘোর বোষ্ঠম।
অঘোর বোষ্ঠমের চেহারার কথা মনে করে হা হা করে হেসে উঠলো সবাই। ‘
এসবই হাসান দেখেছেন গ্রামীণ বাস্তবতায় মার খাওয়া হাড় হাভাতে হতচ্ছাড়া একদল ছেলের চোখ দিয়ে। এইখানে হাসান অসহনীয় সমাজ বাস্তবতার কদর্য দিকগুলো তল থেকে তুলে আনেন। শকুনটা হঠাৎ কখনও হয়ে ওঠে সুদখোর মহাজন, অঘোর বোষ্ঠম, কখনোবা নীচতায় ভরা নিরন্ন জীবনের আসন্ন কদাকার মৃত্যু।
শেষে শকুনিটার ঘাড় মুচকে, ঠোঁট ফাঁক করে অতি সাবধানে ছেলেরা তাকে খড়ের টুকরো খাওয়াচ্ছে।
‘ খা, শালা, মর শালা। ‘
তারপর সবাই শকুনের পালক ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিলো।
তারপর তারা বাড়ির দিকে ফিরতে চাইলেই, —
জামু বলল, ‘ উদিকে যাস না —- চ’ ঘুরে যাই।
তোর বাড়ি তো উদিকেই —- চ ‘ দেখি না উ দুটো কি !
বাড়ি কাচে বলেই জানি উ শালা —– শালী ক্যা?
ক্যা – র‍্যা?
দরকার কি তোর শুনে ?
বল ক্যানে !
উ হবে জমিরদ্দি আর কাজু শ্যাখের রাঁড় বুন।
কি করচে উখানে ?
আমড়ার আঁটি? চ ‘ বাড়ি যাই। ‘
লেখক অতি অল্প কথায় অল্প ইঙ্গিতেই ছেলেদের কথায় একটি অবৈধ সম্পর্কের প্রত্যক্ষচিত্র তুলে ধরেছেন, যার ফলশ্রুতি ধরা পড়লো যখন সূর্য উঠলো, রোদ উঠলো, গাছপাতা ঝকমক করে উঠলো, তখন —— । হাসানের ভাষায়ঃ
‘ ন্যাড়া বেলতলা থেকে একটু দূরে প্রায় সকলের চোখের সামনেই গতরাতের শকুনিটা মরে পড়ে আছে। মরার আগে সে কিছু গলা মাংস বমি করেছে। কত শূন্য কতো ফাঁপা —- ঠোঁটের পাশ দিয়ে খড়ের টুকরো বেরিয়ে আছে। ডানা কামড়ে, চিৎ হয়ে, পা দুটো ওপরের দিকে গুটিয়ে সে পড়ে আছে৷ দলে দলে আরও শকুনি নামছে তার পাশেই।কিন্তু শকুনি শকুনির মাংস খায় না। মরা শকুনিটার পাশে পড়ে রয়েছে একটি মানুষের শিশু। তারই লোভে আসছে শকুনির দল,চিৎকার করতে করতে। কিন্তু শিশুটির পেটে প্রথম দুর্বল ঠোঁটের আঘাত বোধহয় মরা শকুনিটারই। ভীড় জমে গেল আস্তে আস্তে, এলো না শুধু শেখের বিধবা বোন। সে অসুস্থ। দিনের চড়া আলোয় তাকে অদ্ভুত ফ্যাকাশে দেখায় মরা শকুনিটার মতোই। ‘
হাসান এইভাবেই বাংলাদেশের মানুষের ক্রম মৃত্যুর এক ধারাবাহিক বিবরণী দেন তার গল্পে। তার গল্পের শেষ বড় মার্মান্তিক, বড় করুণ হয়ে ওঠে। অফুরান জীবনের রস অফুরানভাবে পরিবেশন করতে গিয়ে তিনি কেবলই নীলবিষ উগরে দেন।

অমৃতাত ———— মধুমিতা ঘোষ

অমৃতাত

————

মধুমিতা ঘোষ

মৃত্যু – তুমি কি সত্যি ই নিষ্ঠুর

বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে, ভয়ঙ্কর লুকোচুরি খেলো জান্তব উল্লাসে

তোমার বুকে কি জীবনের মানচিত্র আঁকা আছে

যুগ যুগান্ত ধরে তুমি বীজের শরীরে অন্য এক বীজ

তোমার চরিত্র বিশ্লেষিত হয় দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে

মৃত্যু – তুমি কি মৃত্যুর মধ্যেই নির্লিপ্ত থাকো

নিরবয়ব শূন্যতাই আসল মুখ?

ওহে কবি –

আমি জীবন জগতে ছড়িয়ে থাকা নিপুণ শিল্প, শান্তির এপিটাফ

মনের চলাচলে নিশ্চিতভাবে জন্মাই ভ্রুণের সারাংশে

অলীক বাস্তবতায় যৌবনের খেলাতেই অন্তর্জলী

তিন সত্যিতে আমায় চিনতে গেলে আতুরঘরের ত্রিমাসিক চিত্রে,একাকী অক্ষরে …

জন্মের রহস্য বুঝতে হবে অশরীরী গন্ধে ।।

“তুমি” ✒️✒️শান্তময় গোস্বামী

“তুমি”

শান্তময় গোস্বামী

আজও দেখি রেল ব্রীজের নিচে, রাস্তার ধারে, নলিকাটা পুকুরের পাড়ে, বস্তির আগুনে, সঙ্গমের চিৎকারে যাবতীয় বেজন্মার আসরে তোমার ছিন্নভিন্ন স্বর ছটফট করে। মৃত্যুর ঠোঁটে এখনো বাঁশি বাজে। শরীরে বয়ে যাওয়া অসংখ্য নদীর আয়ুপথ কোথায় শেষ হবে, কি ব্যাখ্যা দেবে আমাদের রেশমিক ব্যর্থতা, তোমার গলা জড়িয়ে কে বলবে তুমি আমার দেশ নও, তুমিই আসলে নাবিক হাওয়া, বেঁচে থাকার প্রাচীন হরফ।

কখনো দেখি মাঝ দুপুরে শহর চেরা রাস্তায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ‘তুমি’। দুপাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে নানা রঙের গাড়ি ও ক্ষয়ের বর্বরতা। ট্রাফিকের আত্মার ব্যর্থ সিগনাল আর তীব্র হর্ন ছিটকে পড়ছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত।’ তুমি’কে ঘিরে পাক খাচ্ছে কোঁচকানো জগৎ।মেলানিন শুকিয়ে গুঁড়ো গুঁড়ো,ঝরে পড়ছে পিঠের ওপর। বদলে যাচ্ছে মানুষ দেখা ও মারার কৌশল, কি সাবলিল ভঙ্গিতে খেলুড়ে বালকের মতো মেতে উঠছে অহংবাদী চৈতন্য । কেউ চিৎ করে শোয়াতে পারছে না তুমি’কে । হাজার হাজার শেকড় চারিয়ে গেছে পৃথিবীর কেন্দ্রে। আর আমি বাতাসের ভেজা জিভের ওপর দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছি,হয়তো অনন্তকাল।জানি না, ‘তুমি’ গর্ভের আগুন কোন গুহায় কার জন্য তপস্যায় অনন্ত পাথর হয়ে যায়। যখন মাটি তার রূপ হারায় তখন আকাশ নেমে আসে। ‘তুমি’ এসে ঠোঁটের দরজা খুলে দেয়। সম্ভ্রম আর বিভ্রমের মধ্যিখানে প্রেমের অর্থহীনতা মনখারাপের চোরাবালিতে ঢুকে পড়ে। ইতিহাসের পর ইতিহাস জামা বদলে যায়। মানুষের বেঁচে থাকার ভয়ানক অপেরা ছটফট করে। তোমার দুই স্তনের ইলেকট্রন বিপরীত ঘুর্ণনে আমার যাবতীয় অক্ষর কেবল অনুকম্পা ভিক্ষে চায়। এও এক বিভীষিকা। গাছের বোঝা নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকে তুমি, অচেনা মরণ কখন যে করাত আর তুরপুনে উল্কি এঁকে দেয় ঘাড়ে টের পাই না।

হ্যাঁ, তুমি, তোমাকে বলছি, যে ভঙ্গিতে পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তুমি আজ স্ট্যাচু অফ প্রপার্টি , তার চারপাশে দ্যাখো কেমন আদুল গায়ে পাহারা দিচ্ছে রোদ্দুর বাহিনী, তোমার ময়ুর মুদ্রা দেখে ছুঁকছুঁক বৃষ্টিরা ঠোঁট টিপে হেসেই চলেছে। ঈর্ষার ধোঁয়া উড়ছা দূর থেকে দেখছি আয়নার ভেতর ছুটছে বিজ্ঞাপনের আলো ফ্লাডলাইটের ক্যারিশমায় ধুন্ধুমার শরীর। চকচকে লতানো গান আঁকড়ে ধরছে গ্রাম শহর মাঠ তারপর আয় সখী, তোর দেহেতে আমি আলোহাতে বাজনা বাজাই, ওঃ সে কি মার মার জেল্লা। তোমাকে দেখলেই নজরবিহীন নৌকো খুঁজে নিচ্ছে অনন্তর নদীমুখ। তুলসি তলা ঘুমিয়ে পড়ে কান্নায়, তুমিই বলো রঙিন মাছেরা কতদিন বাঁচে কতদিন?

কথা ✒️✒️ মৌসুমী মিত্র

কথা
মৌসুমী মিত্র
…………………….

তোমাকে নিয়েই কাটবে জীবন।
দেখেছি তোমার অনির্বচনীয় রূপ
তুমি-ই কি তবে সেই সৃষ্টির বিশ্বরূপ?

কথার পাহাড় সব ছাপিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায়,
মন বারান্দায় কথার ফানুস,
মেঘের গায়ে লিখছে কথা মেঘের পালক।
রঙ মিশিয়ে শব্দ পাহাড় গলছে রসের ধারা
ভাবের আভাস তুলছে ঢেউ কথার খেয়া পাগলপারা ।
যেদিকে চাই কথার মেলা বিকায় হাটে বাজারে —-
দেখছি বসে মুগ্ধ চোখে আমার প্রিয়ারে
——তার নিরলঙ্কার বিশ্বরূপ।।

মিছরির ছুরি ✒️✒️ সোমা কোলে

মিছরির ছুরি
কলমে সোমা কোলে

মুখে বুলি, আমি জনগণের দাস
ভিতরে তীক্ষ্ণ ফলার ধার
এরাই নাকি যুধিষ্ঠিরের দল
কথার খেলাপ এদের কারবার!!

মুখোশ মুখের রং বদলায়
রক্তে খেলে হোলি
ওজন দাঁড়ির পাল্লায় মনুষ্যত্ব
তুমি আমি বলি।

সকাল এখন আরও অন্ধকার
যাচ্ছি কোথায় নেমে
‘লজ্জা’ও এখন মুখ ঢাকছে
আড়াল খোঁজে শরমে।

গনতন্ত্র নেমেছে নতুন খেলায়
মানুষ মারার কল
মান আর হুঁশ সব হারালো
প্রাণটাই এখন সম্বল।

জুজুর ভয়ে সবাই গর্তে
সবাই আড়াল সন্ধান
শেষে নাকি সবার ভালোই হবে!!
জয় জনতা জনার্দন!!!

বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে
কেউ হবো না রাজি
গনতন্ত্র দিয়ে পরি গলায় ফাঁস
রাখি জীবনের বাজি।।

মাটির পুতুল ✒️✒️ উত্তম কুমার দাস

মাটির পুতুল
উত্তম কুমার দাস

গড়েছে আজ কুমোর প্রতিমা
মাটির মন্ড দোলে
পুজিবে যে জন মন্দিরে আজ
মন্ত্র প্রদীপ জ্বেলে।

মাটির দেবতা মানুষের গড়া
চরণে নোয়াই মাথা
বিধাতার আজ এমন মহিমা
অবুঝ মনেতে গাঁথা।

দেবতা গড়েছে রক্ত মাংসে
মানুষ পুতুল যত
হিংসার ঘোরে কাটছে মাথা
হিসেব রাখবে কত।

তাই আমি আজ বিষাদ চিত্তে
মানুষের গান গাই
কুমোর গড়ুক মাটির প্রতিমা
মনের ভেতরে ঠাঁই।

ঈশ্বরে গড়া মানুষ পুতুলে
ভাই ভাই লড়ে মরে
মানুষে গড়া মাটির পুতুলে
পুজো হয় ঘরে ঘরে।

তন্ত্রে মন্ত্রে দেবতার পুজো
মাটির পুতুল খানি
ভক্তির রসে শ্রদ্ধা মিনতি
কতটা সফল মানি।

শক্তির পুজো শক্ত মাটিতে
সর্ব শক্তিমান
শক্তির গান দুর্বলও করে
‌নয় তা অসন্মান।

সংসারে যত ধাতব শিল্পী
চারুকলা ভাস্কর
তাদের সৃষ্টি কথা বলে ওঠে
দেখে হাসে ঈশ্বর।

#একটি ব্যর্থতার গল্প #কলমে : সাহানা

#একটি ব্যর্থতার গল্প
#কলমে : সাহানা

সাফল্য, কে না ভালোবাসে! সব মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য সফল হওয়া, জীবনের উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছনো। ব্যর্থতা সেই অর্থে থাকে পেছনে, আড়ালে অন্তরালে। অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, কিছু কিছু ব্যর্থতা আমাদের ভাবতে শেখায়, নতুন একটি দিক উন্মোচিত করে। আমরা ভাবি, সত্যিই তো, এমন করে তো ভাবিনি কখনও!!
৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹
রাস্তার ধারে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলোকে রোজ খেলতে দেখি। আমার লেখালেখির টেবিলটি পশ্চিমের জানলা ঘেঁষে, বাইরেটা বেশ দেখা যায়। এই বাচ্ছারা সব পাশের বস্তিতে থাকে। ওদের বাবা-মা সবাই কাজকর্ম করে। কেউ ঠিকে ঝি, কেউ রান্নার দিদি আবার কেউ ছোটোখাটো দোকানে কাজ করে। ছেলেরা বেশিরভাগই মজুর শ্রেণীর।
এদের সংসারে নিত্যদিনের অভাব লেগেই থাকে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করানো তো দূরের ব্যাপার, প্রতিদিনের খাওয়াটুকুও ঠিকভাবে জোটে না।
নানা চিন্তায় ডুবে ছিলাম। হঠাৎ ..
জানলার ওপাশে একটা ছোট্ট মাথা…চোখগুলো চকচকে, এদিকেই তাকিয়ে আছে!!
পাশেই একটা বিস্কুটের খোলা প্যাকেট ছিল। কি মনে করে, সেটা বাড়িয়ে দিলাম খোলা জানলা দিয়ে। চট্ করে হাত বাড়িয়ে দিল।
-এই! কোথায় থাকিস তুই?
ঘাড় ঘুরিয়ে আঙুল তুলে দেখালো। দেখিয়েই ছুট্।
-এই! দাঁড়া, দাঁড়া বলছি!
কে, কার কথা শোনে!
এইভাবে বেশ কদিন চলল। প্রতিদিন একটা নয়, দুটো চারটে কচি মাথা সংখ্যায় বাড়তে থাকল।
আমার কাজের মহিলাটি সব দেখেশুনে মাথা নাড়ল!
-দিদি, কি করছো? অ্যাই! যা সব এখান থেকে।
-আহা! ওদের তাড়িও না। ভাবছি, ওদের লেখাপড়া শেখাব।
-সেকি গো, দিদি।
হেসেই আকুল সে। এত হাসার কি আছে! বিরক্ত হই।
-পারবে না গো দিদি। এদের পড়ানো এত সহজ নয়।
-দেখা যাক্।
সংক্ষেপে বলি।
কদিন ধরে আমার অক্লান্ত প্রচেষ্টা চলে। বিস্কুট, মিষ্টি ইত্যাদির লোভ দেখিয়ে কয়েকটি অবাধ্য মনকে একত্রিত করি।
সমস্বরে অ-আ-ই-এর রব ওঠে।
সবটাই চলছিল নিজস্ব ভঙ্গিমায়।
তারপর একদিন বেশ ভোরে ঘুম ভেঙে উঠেই শুনি অনেকগুলো গলার চিৎকার…একসঙ্গে অনেকে শোরগোল করলে যেমন হয়!
কি ব্যাপার?
নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় আসি। বারান্দার সিঁড়ি পেরিয়ে একফালি জমি, তারপর গেট। সেই গেটের একটু ওপাশে রাস্তা। বেশ কজন মানুষ এই সাতসকালে জমা হয়েছে।
আমাকে দেখে ওরই মধ্যে একজন এগিয়ে আসে। চিনতে পারি, এ হলো কার্তিক, প্লাম্বার। কাজ করেছে এ বাড়িতে।
-দিদি, আমার ছেলে আপনার বাড়িতে পড়তে আসত।
-হ্যাঁ। কিন্তু কি হয়েছে? কিছু হয়েছে কি?
-আজ সকালে উঠে ওকে পাচ্ছি না।
-পাচ্ছ না মানে?
-জানি না, দিদি। এক কামরার ঘরে তো থাকি। এপাশে ওপাশে কত খুঁজলাম! আপনার কাছে এসেছে কিনা, দেখতে এলাম।
-এত সকালে!
-তাই তো!
কথার মাঝেই এগিয়ে আসে আরও কজন। সবাই মুখচেনা। প্রত্যেকের এক কথা। এক অভিযোগ!
-তাজ্জব ব্যাপার!
ছেলেমেয়েগুলো রোজ এখানেই আসত। আজ কি হলো ওদের?
এরপর ঘটনাগুলো ঘটল খুব দ্রুত।
বিস্তর থানা পুলিস, ছোটাছুটি এবং তদন্তে জানা গেল একটি মিষ্টি চেহারার দিদিমণি নাকি খাবার, চকোলেট ইত্যাদি প্রায়ই বিতরণ করতো বস্তিতে গিয়ে। ঘটনার দিনে তাকেই নাকি দেখা গিয়েছে অনেক ছোট বাচ্ছাদের সঙ্গে! তারপর, আর কিছুই জানা নেই।
সব শুনেও মনে খটকা থেকেই গেল! ছোটো ছোটো অভাবী পরিবারের বাচ্ছা, খাবারের লোভে তারা সবার কাছে হাত পাততো। পড়াশোনা ও তো খাবারের লোভেই। কিন্তু অত ভোরে তাদের জটলা বাঁধতে দেখেও….হয়তো বস্তির মানুষ ভেবেছিল, আমারই মতো কোনো দিদিমণি ওদের ভালো কিছু শেখাবে! তাই সন্দেহ হয়নি।
ধিক্কার জাগল।
সমাজ সংস্কার করতে চাইছি, অথচ নিষ্পাপ শিশুদের জন্য কি বিপদ অপেক্ষায় আছে, জানি না। বাস্তবের রাস্তায় আমি হাঁটিনি। যদি হাঁটতাম, আমার চেহারা পরিচিত হতো, কেউ ভুল করতো না!
কি ভুলই যে করেছি! এ আমার চরম ব্যর্থতা!

তোমাকে চাই ✒️✒️ গীতশ্রী সিনহা

তোমাকে চাই

গীতশ্রী সিনহা

অলৌকিক জ্যোৎস্না নেমেছে
চোখের পাতায়…
তুমিই প্রতীক বুঝি চাঁদের ইশারায়…
তোমাকে চাই আমি, চাই আমি আর্ত বৈশাখীর দিন
সমস্তক্ষণ নিজস্ব আগুনে পুড়তে পুড়তে
শুধু তোকেই চাই।
বর্ষণের মতো নেমে এসো তুমি
আমার মুখের দাহ৷, আতপ্ত স্নায়ুগুলির ওপর
ঝরে পড়ুক সান্দ্র জলধারা ।
আমি তোমাকে এভাবে পেতে চাই । শুধু তোমাকেই।
অস্থির অবগাহনে তুমি আমার কবিতা ।

গত রাত ছিল অন্য নিমগ্নতা। অন্বেষণ।
সাক্ষী থাকে ঘড়ির টিক টিক শব্দ,
রাতচরা পাখির উড়ান ,

পূর্বজানালায়, মায়াবী টেবিলে , ভোরে ঝরে পড়ে
কবিতার জন্য সাদা পাতার খোলা নীলরং কলম ।
কবিতার জন্য আমি জীবনকে গুছিয়ে নিতে পারি
রাত্রিময় আকাশে মিলনান্ত নীলে …

ফোন তুলতেই তুই বললি, ” কবিতা আজকাল কেউ
পড়ে না, কেউ শোনে না “!!!
তোকে বলে রাখি, “শুধু কবিতার জন্য অমরত্ব তাচ্ছিল্য
করতে পারি “…

পূর্ণতা ✒️✒️ কুমকুম চৌধুরী

পূর্ণতা
কুমকুম চৌধুরী

তাপ আছে আগুনে সৌন্দর্য ফুল বাগানে
নুন আছে সমুদ্রে বহমানতা নদীতে
হাড়ি কড়াই এ কানায় কানায় পূর্ণ ভাত, ডাল, দুধ।
সেখানে পূর্ণতা, এখানে একলা হাইওয়ে..
আমি তোমায় গ্রহণ করেছি বার বার বর্জনের মতো।
যেটুকু তোমার ভেতরের সামাজিক বর্জ্য
স্তুপাকার ছাইয়ের ভেতর যেটুকু তোমার ডাল ভাতের বমন..
তাকেই অলংকার করে ঝুলিয়েছি দেহে পরম স্নেহে।

ভেবে দেখো..
পূর্ণতায় পূর্ণতা নাকি শূন্যতায় পূর্ণতা!
না থাকায় অনেকখানি থাকা নাকি সবখানেই জুড়ে থাকায় একটুও না থাকা!

** গল্পের শেষ ** কাবেরী বোস ঘোরাই

** গল্পের শেষ **
কাবেরী বোস ঘোরাই

এটাই আমার শেষ লেখা , আর তোমরা আমার কোনো লেখা পড়তে পারবেনা কারণ !!! লেখা থামিয়ে টেবিলের ওপর রাখা স্লিপিং পিল গুলো গলঃকরণ করে নিলো লোকটি,আর সে লিখতে পারছেনা সত্যি কারণ আর সে বাঁচতেই চাইছেনা!!এই কথাগুলো বিখ্যাত লেখক বারীন বাড়ুজ্জ্যের লেখা, খুব সাধারণ দেখতে রোগা ছিপছিপে গাল তোবড়ানো একটা লোক , ধুতি পাঞ্জাবিতেই চিরকাল স্বচ্ছন্দ ছিলেন কিন্তু কালের টানে এখন পায়জামা পড়েন তাও ঢোলকা মতোন , চোখে মুখের চেয়ে বড় একটা আদ্যিকালের মোটা কালো ফ্রেমের চশমা , জীবনে শখ আহ্লাদ বলতে ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাক এর চচ্চড়ি , কচি পাঁঠার ঝোল , আর দামি ব্র্যান্ডের কিছু সিগারেট খাওয়া তবে এই তিনটেই প্রায় বন্ধের দিকেই কারণ কিছুটা শারীরিক বেশীরভাগটাই আর্থিক এবং বাকি পুরোটাই মানসিক! পৈতৃক সূত্রে উত্তর কলকাতায় একটা পুরোনো দুকামরার বাড়ি আছে তার ,তবে সেটাও দেখাশোনার অভাবে ভগ্নস্তূপে পরিণত হচ্ছে ধীরে ধীরে , একটা ঘরেই বারীন থাকে এবং ওই ঘরেই তার সবকিছু , পাশের ঘরটা এখন রান্না খাওয়া করে , সে একা মানুষ কি এমন খায় কিন্তু তবু অন্য কিছু করতে মন চায়না কারণ সুরমা মানে তার বৌ ওই ঘরটাই রান্নাঘর প্লাস খাওয়ার ঘর হিসেবে তৈরী করেছিলো কারণ রান্নার জায়গাটা বড় ছোট তাদের এক ফালি জায়গা মাত্র , ওখানে এখন বারীন চেয়ার রেখে রোদ পোহায় বই পড়ে এসব আর কি!! সুরমা যতদিন ছিলো তবু একটু শান্তি ছিলো ,তার আগোছালো মনখারাপিগুলো বহু যত্নে রোদ্দুর পেতো সুরমার কোলে মাথা রেখে বারীন তার শুখনো জীবনে তা দিতো , আর আশ্চর্যজনক ভাবে সুরমা কিভাবে যেনো তার ছেঁড়াফাটা সংসারটাকে ঠিক সেলাই করে রিফু করে চালিয়ে নিয়ে যেতো! কারণ বারীন লেখা ছাড়া আর কোনো কাজই সেভাবে পারতোনা , প্রথম দিকে বেশ নাম ডাক হবার পর আস্তে আস্তে লেখাও কমিয়ে দিয়েছিলো বারীন কিজানি কেন আর মন বসতোনা , লেখা আসতোনা অথচ পাঠক চাহিদা তুঙ্গেই ছিলো !তবু বারীন লিখতে পারতোনা ওই কোনোক্রমে দু তিনটে !! রয়ালিটির টাকাতেই চলতো সংসার তবে ওই যে বললাম সুরমা ঠিক চালিয়ে নিয়ে যেতো!! তারপর একদিন মার অসুখের খবর পেয়ে বারীন দেশের বাড়ি গিয়েছিলো সাতদিন বাদে এসে দেখে সুরমা চলে গেছে তাকে ছেড়ে! একটা চিঠি রেখে গিয়েছিলো তাতে লেখা ছিলো ,খুঁজতে হলে নিজেকে খুঁজো আমায় নয় কারণ আমায় তুমি হারিয়ে ফেলেছো যদি কোনোদিনো নিজেকে খুঁজে পাও তাহলে আমাকেও ফিরে পাবে!! বারীন হতভম্ব হয়ে তবু খুঁজেছিলো তন্ন তন্ন করে অনেক থানা পুলিশ অনেক হয়েছিলো কিন্তু ওই চিঠি দেখে আর কেউ বিশেষ খোঁজেনি সুরমাকে!! শুধু বারীনের মনখারাপিগুলো ভিজে গিয়েছিলো তার বুকের কষ্টের আড়ালে!! আর কেউ তাকে গরম রুটি করে ডাকেনি বলেনি খেতে এসো নইলে এবার ঠান্ডা হয়ে যাবে খাবার , কেউ তার ঘর্মাক্ত গেঞ্জি জামা পরমযত্নে কেচে দেয়নি , কেউ তার এলোমেলো চুলে ঠান্ডা হাত দিয়ে হাত বুলিয়ে দেয়নি ! কেউ তার তোবড়ানো গালে চুমু খেয়ে বলেনি এই তুমিই আমার সেই প্রেমিক যাকে আমি স্বপ্নে জেগে সবসময় চেয়েছি!! একসময় সব খোঁজা শেষ হয়েছিলো আস্তে আস্তে অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো সুরমাবিহীন এই জীবন ! এরপর শুধু কিছু শুকনো জীবনের মতো শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা বারীনের !! লেখা প্রায় নেই বললেই চলে তবু খুব অনুরোধে লেখে একটাই কোনোক্রমে! যখন প্রতিনিয়ত লিখতো সবাই তাকে মাথায় তুলে নাচতো আজ সে প্রায় অবলুপ্তির পথে তাও ওই নামের জোড়েই চলছে কোনোরকমে , কিন্তু বারীন আজ এই লেখাটি তার মোবাইলে লিখেছে post প্রায় করেইনা সে তবু একটা একাউন্ট খুলে এইটুকুই জানান দেওয়া বেঁচে আছি ব্যাস এইটুকুই যেনো, সঙ্গে সঙ্গে বহু কমেন্ট আসা শুরু কি হলো ! কেন হলো !! কি হয়েছে ইত্যাদি সেসবের উত্তর দেওয়া নিষ্প্রয়োজন বারীনের কাছে , আস্তে আস্তে উঠে সে পাশের ঘরে গেলো সেখানে আলমারিটা বহু কষ্টে সরালো কারণ তার লিকলিকে শরীরে অতো জোর কোথায়! বোঁটকা একটা গন্ধ নাকে এলো!! কিছু কেরাসিন ছিটোলো বারীন সেখানে তারপর আগুন জ্বালালো খুব সন্তর্পণে , আগুন জ্বলে উঠলো দাউদাউ করে !! বেশ কিছুখন পর বারীন সেখানে জল ঢেলে নিভিয়ে বাইরে চলে এলো!! সবাই জানে বারীন বাড়ুজ্জ্যের মাথাটা সুরমা চলে যাবার পর থেকেই ওরম হয়ে গেছে প্রায়ই সে নানা জিনিষ ঘরে বাইরে পোড়ায়!! কখনো পুরোনো ছেঁড়া কাগজপত্র কখনো জামাকাপড় বা কখনো সুরমার হাড় গোর!!! বারীন জেনে ফেলেছিলো সুরমা তাকে ছেড়ে যাওয়ার প্ল্যান করছে !! তার পুরোনো প্রেমিকের সাথে!! তারপর আর কি নিজের হাতে সুরমাকে মেরে এই আলমারির পেছনে ইটের প্রাচির দিয়ে গেঁথে দিয়েছিলো তারপর মার অসুখ বলে চলে যাওয়া আর এসে তন্ন তন্ন করে সুরমাকে খোঁজা আর চিঠিটা ওটা সুরমারই লেখা বারিনের বহু গল্পের আটকে যাওয়া জায়গা ফিল আপ করার জন্য সুরমারই লেখা , সেটাই ব্যাবহার করা সুরমার আত্মহত্যার চিঠি বলে!! সুরমাকে মারতে তার খুব কষ্টই হয়েছিলো,আসলে বারীন বাড়ুজ্জ্যের স্বভাব হলো তার গল্পের শেষটা মিলিয়ে দেওয়া তাই সে তার ভাবনাকে চিরকাল কোনো কাছের বিশেষ মানুষের মধ্যে তৈরী করেছে এবং সেইভাবেই বাস্তবে রূপায়িত করেছে সে যেভাবে গল্পের শেষটা মেলাতে চেয়েছে এইজন্য যতদুর যেতে হয় সে গেছে তাই আজ বহু বন্ধু বান্ধব আত্মীয়স্বজনহীন সে!! সেটা বাস্তবে আনার জন্য চরম পরিণতি সে গেছে বহুবার!! তবে এ অসুখ তার বাড়ছে দিন দিন তাই সে গল্প লেখা থামিয়ে দিয়েছে তবু সব গল্পের শেষে একটা মৃত্যু চাই এটাই তার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো তাই সুরমাকে দিয়েই হাতেখড়ি হয়েছে তার কারণ গল্পের নামটাই ছিলো যে পরকীয়া!!! আর আজ যে শেষ গল্প লিখেছে তাতে শেষে লেখক আত্মহত্যা করছে!! গল্পের শেষ মিলিয়ে দিতে হবে যে তবেই তো সে জাত লেখক হবে নাকি কলম আঁচরে হাজার শব্দ নামিয়ে মাইকে চিল্লিয়ে আধডজন পুরস্কার জিতে প্রমান করতে হবে সে লেখক!!! নাঃ!! সে যে জাত লেখক চোখ বুজে আসছে দেখা হবে সুরমার সাথে আবার!!!!

#নীলবৃষ্টি
স্বত্ব সংরক্ষিত

“ভালো থেকো” ** মন্দিরা মুখার্জী (ব্যানার্জী)

“ভালো থেকো”
***************
মন্দিরা মুখার্জী (ব্যানার্জী)

সবটুকু গেছে চলে
জীবনের অভিশাপ-
চলছে যে কতদিন
জেগে থাকা বহু রাত,
প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙি গড়ি,
তবু ভেঙে পড়ি না!
মুঠো মুঠো আলো আকাশের বুকে,
সেখান থেকে একমুঠো আলো আনতে চাই!
কিন্তু আলো যে ঢেকে দেয় ,
একখণ্ড কালো মেঘ এসে,
সুখ হারিয়ে যায় অন্ধকারের মাঝে!
আঁধারের বিষাদ রাত ছিঁড়ে ফেলে রক্তাভ ক্রোধ,
হলুদ খামে আসে আলোর চিঠি ,
পৃথিবীর ডাকঘরে!
পাহাড়ের চূড়ায় আছে আকাশের বাতিঘর ,
তুমি তো কৃপণ নও।
কোনোদিন কিছুই চাইনি আমি,
তবুও চলবো আলোর খোঁজে!
তুমি একটু আলো ছড়াও আমার যাত্রা পথে,
হয়তো আলোর সন্ধানে
একটু ভালো থাকার প্রতীক্ষা !
********•••••••********

কানামাছি ভোঁ ভোঁ ✒️✒️ রত্না রায়

কানামাছি ভোঁ ভোঁ

রত্না রায়

একটা পেরেক, একটা হ্যামার।
ছিঁড়ে যায় পাশবালিশ ওয়াড়
শশ্মানকালির নিত্য বাওয়াল।
খসে পড়ে চুনসুরকি দেওয়াল

একটা শিকার একটা হাঙর
ঝরে পড়ে ডাস্টবিনের খবর
উড়নতুবড়ির দাহ্য খেয়াল
চষে যায় আঙুরক্ষেতে শেয়াল।।

একটা মুখোশ একটা মানুষ
উড়ে যায় আলকাতরা ফানুস
ব্যাঙেরছাতায় মিথ্যে ভাওয়াল।
ধসে পড়ে জপমালায় সওয়াল।

একটা আলোর একটা ঝালর
সরে পড়ে গিরগিটির চাদর
তাজমহলের সত্যি চোয়াল
টেঁসে যায় যত রাঘববোয়াল।।
।।।।।।।।।।