আত্মজা -‐——– সুদেষ্ণা সিনহা

আত্মজা
-‐——–
ধারাবাহিক উপন্যাস
অধ্যায় – ৫
সুদেষ্ণা সিনহা

এম.এ পাশের পর সেন্ট্রাল এক্সচেঞ্জে নাম নথিভুক্ত করতে হয়।সেখান থেকেই বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক পদের জন্য ইন্টারভিউয়ের ডাক আসে। এসব জানত অলোক।তাই এম.এ পাশের পর পরই  বহরমপুর এক্সচেঞ্জে নাম লিখিয়েছিল সে।
চাকরির ইন্টারভিউয়ের ডাক পেল  সে পরের বছর।ত্রিমোহিনী হাই স্কুলে দর্শন শাস্ত্রের শিক্ষক পদ শূণ্য। এই পদের জন্য মোট পাঁচ জন পরীক্ষার্থী উপস্থিত হয়েছে ইন্টারভিউ দিতে। উপস্থিত পরীক্ষার্থীদের কারো বি.এড নেই।এম.এ পাশ করার পরের বছর অলোক বহরমপুর খ্রীষ্টান বি .এড কলেজ থেকে বি.এড পাশ করেছে।স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা থেকে পর পর সব পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর যোগ করলে অলোকেরই প্রাপ্ত নম্বর সবচেয়ে বেশী।
ত্রিমোহিনী হাই স্কুল রাস্তার উপরেই ।বেলডাঙ্গা ছাপাখানা মোড় থেকে বাসে গেলে বড় জোর চল্লিশ মিনিটের রাস্তা।স্কুলটা বেশ বড় । তিনতলা বিল্ডিং।বড় গেট পেরিয়ে বড় মাঠ।বিল্ডিংয়ের গায়ে গায়ে ফুলের বাগান।বিল্ডিংয়ের সামনে বিশাল মাঠ।
একজন ভদ্রলোক অলোকদের ঘরে এসে বলে গেলেন,আপনারা তৈরি থাকুন।এবার ক্লাস ডেমোনোস্ট্রেশন শুরু হবে পাশের ঘরে। নাম ডাকলেই আপনারা পর পর চলে যাবেন পাশের ঘরে।
নাম ডাকতেই সেই ক্লাসরুমে ঢুকল অলোক। ক্লাস ইলেভেনের ক্লাস।ঘরের সামনের দিকে কাঠের তক্তা উঁচু করে প্ল্যাটফর্ম বানানো হয়েছে।প্ল্যাটফর্মের উপর কাঠের টেবিল-চেয়ার।দেওয়ালে জুড়ে প্রকান্ড ব্ল্যাকবোর্ড।
ক্লাসের সামনের বেঞ্চগুলোতে ছাত্ররা বসে আছে।পেছন দিকে ইন্টারভিউ বোর্ডের লোকজন।সবাইকে চেনে না অলোক।তবে লম্বা রোগা টাক মাথা ভদ্রলোককে সে চিনতে পারল।তিনিই এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
পিছন থেকে ইন্টারভিউ বোর্ডের একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,নাউ লেট ইউ স্টার্ট ইওর ডেমোনোস্ট্রেশন।
অলোক একবার ভালো করে ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বলল,বয়েজ,নাও লেট আস স্টার্ট আওয়ার স্টাডিজ।
— সব আগে আমাদের জানতে হবে,দর্শন কি?সংস্কৃতে দৃশ ধাতুর সঙ্গে অনট প্রত্যয় যোগে দর্শন শব্দটি পাই আমরা।অর্থাৎ দর্শন হল সেই সত্য আমরা চোখের সামনে দেখছি  এবং আমাদের মনেও যার  সাক্ষাৎ উপস্থিতি আছে।দর্শন হল এমন একটি শাস্ত্র যা জীব জগৎ ও জড় জগৎ সম্বন্ধে সুসংগত ব্যাখ্যা দেয়। দর্শনের কোন সুস্পষ্ট সংজ্ঞা এক কথায় বলা সম্ভব নয়।তবে বিখ্যাত দার্শনিকদের মতবাদ বিশ্লেষণ করলে আমরা এটুকু বুঝতে পারি যে জীবের সঙ্গে জড়ের যে সম্পর্ক বা স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির যে সম্পর্ক সেটাই দর্শনে ব্যাখ্যা করা হয়। দর্শন সম্পর্কে প্লেটো যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা হল…..
যে ভদ্রলোক শুরু করতে বলেছিলেন তিনিই হাত তুলে ঘাড় নাড়িয়ে বললেন,ঠিক আছে।ঠিক আছে।
অলোক থেমে গেল।মন্ত্রমুগ্ধের মতো ছাত্ররা চেয়ে আছে তার দিকে।অলোক ডায়াস থেকে নেমে এল।
অনেকদিন পর বন্ধু প্রদীপের মুখটা মনে পড়ল।প্রদীপ বলত,শালা দুটো জিনিস ভগবান তোকে বেঁধে দিয়েছেন।
—- মানে?
—- মানে আর কি!ভুবন ভোলানো রূপ আর বাগ্মীতা।মেয়েগুলো তাই দেখেই তো তোর কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ে!

ইন্টারভিউয়ের কর্মকর্তারা বললেন,আপনি বাইরে একটু অপেক্ষা করুন।
স্কুলের করিডরের ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা।ইন্টারভিউ শেষ হতেই প্রার্থীরা চলে গেছে।করিডর জুড়ে প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা।সামনে কালো রঙের গ্রীলের দরজা,দেওয়াল ঠেঁসে টানা।বসে বসে বিরক্ত হচ্ছিল অলোক।গ্রামে হলেও বেশ সাজানো স্কুল।দেওয়াল জুড়ে মহাপুরুষদের ছবি টাঙানো।
পা দুটো সামনের দিকে বাড়িয়ে টান টান করল অলোক।দুই হাতের আঙুলে আঙুল ঢুকিয়ে মাথার উপর তুলে আড়িমুড়ি ছাড়ল বেশ অনেকক্ষণ ধরে।একটা কথা তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে ,কেন স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে অপেক্ষা করতে বলেছে।তবে কি তার চাকরিটা হচ্ছে!না চাকরির বিনিময়ে টাকাপয়সা চাইবে তার কাছে!অনেক সময় সেক্রেটারির মেয়ে বা ভাইঝিকে বিয়ের প্রস্তাবও করে চাকরির বিনিময়ে।
সেদিন সন্ধ্যেবেলায় ক্লাব থেকে ফেরার পথে পাড়ার দীপককাকুর সঙ্গে দেখা।দীপককাকু কৃষ্ণনগর ডি আই অফিসের ক্লার্ক ছিলেন।এখন রিটায়ার্ড করেছেন।
দীপককাকু বাড়ির খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। বাবা মারা যাবার পর মায়ের উইডো পেনশন চালু হয়েছে কিনা,টিঙ্কু আর মুন্নি কি করছে এখন,ওদের বিয়ের দেখাশোনা হচ্ছে কিনা।এসব জিঞ্জেস করতে করতেই দীপককাকু হঠাৎ বললেন,তোমার এখন বয়স কত,অলোক?
প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গিয়েছিল অলোক।তারপর বলেছিল,চৌত্রিশ চলছে।
—- জেনারেল কাস্ট তো?চাকরির বয়স পঁয়ত্রিশেই শেষ !
—— হ্যাঁ
—— যা চলে স্কুল কমিটিগুলোতে! টাকা খাওয়া খাওয়ি!ছিঃ! প্রকাশ্যে সেক্রেটারির আত্মীয়ার সাথে বিয়ের প্রস্তাব চাকরির বিনিময়ে!   কি যে যুগ চলছে!
—- তাই তো কাকু!
দীপককাকু ঠোঁট টিপে আপশোষের ভঙ্গীতে মাথা নাড়ান।তারপর হঠাৎ অলোকের ঘাড়ে হাত দিয়ে কানের কাছে মুখ এনে আস্তে আস্তে বলেন,তা বাবা এক্সচেঞ্জের কল পাচ্ছ তো? না সেখানেও টাকার নাড়াচাড়া।
সাত বছর হল অলোক এম.এ পাশ করেছে। তার বি.এড পাশও তিন বছর ঘুরতে চলল।দর্শন শাস্ত্র উচ্চ মাধ্যমিকের বিষয় বলে চাকরির পদও কম।
এর আগে তিনটে স্কুলের ইন্টারভিউয়ে কল পেয়েছিল সে।তিনটেটেই প্রার্থী ঠিক করা ছিল আগে থেকেই।তাদের ব্যাচের ছেলেদের মধ্যে কেবল পিনাকী কলেজে ঢুকেছে ।আর দু’একজন চাকরির আশা হারিয়ে ব্যবসাবাণিজ্যে মন দিয়েছে। প্রদীপ নিঃসন্তান মাসির সম্পত্তি পেয়ে কাটিহারে।মেসোমশাইয়ের সিমেন্টের দোকানে বসছে সে।
ব্যাচের মেয়েদের সাথে আর তার যোগাযোগ নেই এখন।জয়িতা দু’তিন বছর খুব পেছনে লেগে ছিল।মাসে মাসে চিঠি….তোমাকে কবে দেখতে পাবো গো?…খুব মন খারাপ করছে।…..বাড়ি থেকে খুব বিয়ের চাপ।তোমার চাকরির কি খবর?
পনের দিন অন্তর একই প্যানপ্যানানি!মেয়েটা প্রেমটাকে সিরিয়াসলি নিয়েছিল!বেচারা!কলেজ,ইউনিভার্সিটিতে ও সব চুমুটুমু কতই হয়!সব ধরে রাখতে হবে!
বাড়িতে বাবার হঠাৎ স্ট্রোকে মৃত্যু।অলোকের মাথার ঠিক ছিল না।বাবা দুই দিদির বিয়ে দিয়ে গেছেন ঠিকই,তবে বোনদুটোর তো কোনো ব্যবস্থা করে যাননি।টিঙ্কু তখন বাংলা অনার্সে লাস্ট ইয়ার।আর মুন্নি সবে এইচ এস পাশ করেছে।ছোট দুই বোনের দায়িত্ব তার কাঁধে।নিজের কি হবে তার ঠিক নেই,আরেক জনের দায়িত্ব নেওয়া কি সম্ভব! অলোক মনস্থির করে নেয় এবার জয়িতার প্রেমের ইতি টানতে হবে! জয়িতা একটা চাকরি পেলে ভাবা যেত তাও।অলোক চিঠি লেখে —- জয়িতা,আমি কবে চাকরি পাব জানি না। আদৌ আমার ভাগ্যে চাকরি জুটবে কিনা সেটাও নিশ্চিত নয়। আমার উপরে আর ভরসা রেখো না তুমি । তোমার বাবার পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে বিয়ে করে নাও। আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে তোমার জন্য।
ব্যস,কেটে গেল সুতোটা। জয়িতা আর চিঠি লেখেনি।অলোক জানে না,জয়িতা এখন কেমন আছে।ওর কি বিয়ে হয়ে গেছে!আরে হবে না বিয়ে!দেবদাস-পারোর প্রেমকাহিনি নাকি!
অন্ধকারের আস্তরণ স্কুল মাঠে ছায়া বিছিয়ে দিয়েছে।সারি সারি দেবদারু গাছের মাথায় নিভে যাওয়া আকাশটা বড় ম্রিয়মান।সংসার,পরিবার– সব আছে,তবুও নিজস্ব বৃত্তে বড় একা লাগছে অলোকের।
স্কুলের করিডোরে আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে দারোয়ান ডাকল অলোককে।
—– স্যার,আপনাকে হেড মাস্টারমশাইয়ের ঘরে যেতে বললেন।
দারোয়ানের পিছু পিছু হেডমাস্টারের ঘরে ঢুকল অলোক। সেক্রেটারি অপেক্ষা করছিলেন সেখানে।
—- আমাদের স্কুলের ইন্টারভিউ প্যানেলে আপনি ফার্স্ট হয়েছেন। কাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে যাবেন।আপনি জয়েন করছেন তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *