জার্মানি: জাটিঙ্গার ফিনিক্স হয়ে ওড়া ——- সায়ন্তন ধর

জার্মানি: জাটিঙ্গার ফিনিক্স হয়ে ওড়া

সায়ন্তন ধর
(তৃতীয় পর্ব)

… আজ যা মাথা উঁচু করে জাজ্বল্যমান
কাল তা মুখ থুবড়ে পড়তেই পারে।
তাই, ভয় নয়, ধরো হাল, হবে জয়।
যুদ্ধ, প্রেম, খেলা, হারজিত সবেতেই।
উন্মত্ত সমুদ্র ভারী বিপদসঙ্কুল
হে প্রিয় বন্ধু, তুমিতো সাক্ষী সেসবের।
বিক্ষুব্দ সময়ে ধৈর্য্য ধরো, শান্ত হও।
সর্বংসহা, দেখো তোমার জয় নিশ্চিত।

নৌকো চালিয়ে দাও উন্মত্ত আট্লান্টিকে-
টেনে ধরো পাল, বৈঠায় লাগাও জোর
ধ্রুবতারার দিশায় ছোটাও তরনী-
কয়েকশো নটিক্যাল মাইল দূরত্বে
উত্তর সাগরসৈকতে ভিড়াও তরী
যেখানে জাটিঙ্গারা ফিনিক্স হয়ে ওড়ে।

কবিতার কথা মত মন যেতে চায় আমার প্রিয় এই দেশটিতে, সন্ধান করতে চায় তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের খনি। তাই লুফ্তহানসা বিমানে চেপে পৌঁছে গেলাম সে দেশের বৃহত্তম বিমানবন্দর ফ্রাঙ্কফুর্টে। লুফ্তহানসা নামটায় যেন ছড়িয়ে রয়েছে কোন মায়া। এখান থেকে জার্মানির উত্তর পূর্বে অবস্থিত রস্টক শহরে যাব। তাই চেপে বসলাম লাগজারিয়াস একটি বাসে। বাস ছুটে চলল ফেডারেল মোটরওয়ে A7 দিয়ে। লম্বা ৩৬ সিটের বাসটিতে ২×২ ভাবে সিটগুলি সজ্জিত। পরিষ্কার ঝকঝকে বাসের ভিতরটা। জানালার কাচগুলোও তেমনি ঝকঝকে। গাড়িতে স্ট্যান্ডিং যাত্রীও চোখে পড়ল না। সিটগুলি সব ভর্তি হলে নির্দিষ্ট সময়ে বাস ছাড়লো। ফ্রাঙ্কফুর্টের নগরজীবন কে ধীরে ধীরে পিছনে ফেলে মসৃণ রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললো আমাদের বাস। প্রতিটি রাস্তায় সুন্দরভাবে দিক নির্দেশ এবং বিভিন্ন ট্রাফিক নির্দেশ দেওয়া। সুন্দর সুন্দর বিদেশি গ্রামের ছবিগুলি দেখতে দেখতে পথ চলছি। এয়ারপোর্ট থেকে জার্মানিকে জানার কিছু বই নিয়েছিলাম। সেগুলোতেও চোখ রাখছি মাঝে মাঝে। জার্মানি নামটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ জার্মানিয়া থেকে। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার রাইন নদীর পূর্ব তীরের মানুষদের এই নাম প্রথম দিয়েছিলেন। জার্মানি নামে এই দেশটিকে সারাবিশ্ব চিনলেও জার্মান ভাষায় এর আরেকটি নাম রয়েছে, Deutschland, যা জার্মান শব্দ Deutsch / Diutisc থেকে এসেছে যার অর্থ হলো Of the people, অর্থাৎ জার্মান জাতির দেশ জার্মানি। মুখ তুলে আবার একটু বাইরের দিকে চাইতেই চোখে পড়ল একটি নদী নাম তার ওয়েসার। ফুলদা ও ওয়েরা নদীর মিলিত প্রবাহ ওয়েসার নাম নিয়ে জার্মানির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উত্তর সাগরে পতিত হয়েছে। ৭৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটির তীরেই বিখ্যাত বন্দর শহর ব্রেমেন অবস্থিত। আবার একটু তথ্য সংগ্রহে মন দিলাম। প্রাকৃতিক ভাবে জার্মানিকে পাঁচটি ইকোরিজিয়নে ভাগ করা যায়, যথা- অতলান্তিক মিশ্র বনভূমি, বাল্টিক মিশ্র বনভূমি, মধ্য ইউরোপীয় মিশ্র বনভূমি, পশ্চিম ইউরোপীয় চওড়াপাতার অরণ্য, আল্পীয় সরলবর্গীয় ও মিশ্র বনভূমি। জার্মানির ৩০ শতাংশ ভূমি অরণ্যাবৃত। সারা দেশে ১৬ টি জাতীয় উদ্যান ১৭ টি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ ১০৫ টি নেচার পার্ক, চারশোর বেশি চিড়িয়াখানা রয়েছে। জার্মানিতে কোন বায়োডাইভারসিটি হটস্পট নেই, এটা একটা বেশ ভালো খবর, কারণ, যে সমস্ত বনভূমির প্রায় ৭০% জীবকূল লুপ্তপ্রায়, তাদেরকেই বায়োডাইভারসিটি হটস্পট ঘোষণা করা হয়েছে। একটানা প্রায় তিন ঘন্টা চলার পর বাস একটু গতি কমালো। এতক্ষণ সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ১৩০ কিলোমিটার/ঘন্টা। সামনেই হ্যানোভার শহর। এখানে কিছুক্ষণের বিরতি। বাটার টোস্ট, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফ্রুট জুস দিয়ে প্রাতরাশ সেরে নিলাম এখানে। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি আমি ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছেছিলাম ভোররাতের দিকে। আবার যাত্রা হল শুরু। এতক্ষণ জার্মানির প্রাকৃতিক বিভাগগুলি বলছিলাম, এখন আসি জার্মানির রাজনৈতিক বিভাগে। এটি ১৬ টি কনস্টিটিউয়েন্ট রাজ্যে বিভক্ত। ৪০১ টি ক্রেইস বা জেলা রয়েছে। শহরগুলি আবার কয়েকটি বরোতে বিভক্ত। বর্তমানে জার্মানির কোট অব আর্মস হোলো সোনালী ব্যাকগ্রাউন্ডে লাল চঞ্চু, জিভ ও পা যুক্ত কালো ঈগল। যদিও এ দেশের জাতীয় পাখি সোনালী ঈগল, জাতীয় উদ্ভিদ ওক ( .) এবং জাতীয় ফল আপেল ( ). এদেশ পৃথিবীর বিজ্ঞানের ইতিহাসে রেখে গেছে অসংখ্য মণিমাণিক্য। বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন; উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ট্যাক্সোনমিস্ট এঙ্গলার ও প্রান্টল, ওট্টোকুন্টজে; ভূতত্ত্ববিদ জ্যোতির্বিজ্ঞানী কেপলার, গুটেনবার্গ, রিক্টর; জীববিজ্ঞানী সোয়ান ও স্লেইডেন; পদার্থবিদ রন্টজেন, ম্যাক্সপ্লাঙ্ক, হোমিওপ্যাথির জনক হানিম্যান প্রমূখ স্বনামধন্য বিজ্ঞানীদের জন্মভূমি এই জার্মানি। সেই জার্মানির জাতীয় সড়ক দিয়ে তীব্র গতিতে যেতে যেতে উপভোগ করছি এদেশের সৌন্দর্য কে। এরপর হামবুর্গে খুব অল্প সময়ের জন্য থেমে যাত্রা শুরু হল রস্টকের উদ্দেশ্যে। এদেশ শুধুমাত্র বিজ্ঞানেই নয় শিল্পকলা, সংস্কৃতি, সিনেমা এবং খেলাধুলাতেও ভীষণভাবে অগ্রণী। জার্মান একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী ভাষা, এ ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য সাহিত্য। পৃথিবীর বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলি জার্মানির কান চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে পেরে ধন্য হয়ে যায়। ফুটবল পাগল এই দেশটিতে ফ্রান্জ বেকেনবাওয়ার, গার্ড মুলার, লোথার ম্যাথিউজ, অলিভার কান, মাইকেল বালাক, মিরোস্লাভ ক্লোসে, ম্যানুয়েল নয়্যার, বাস্তিয়ান সোয়েনস্টাইগার এর মত খেলোয়াড়েরা জন্মেছেন এবং বিশ্ব ফুটবল কে শাসন করেছেন। জার্মানি একমাত্র দেশ, যে দেশ পুরুষ এবং মহিলা ফুটবল বিশ্বকাপ জেতে। ফুটবল ছাড়াও টেনিসে রয়েছে পৃথিবী বিখ্যাত স্টেফি গ্রাফ ও বরিস বেকার। ফর্মুলা ওয়ানের ট্র্যাক গুলি ধন্য হয়েছে মাইকেল শুমাখার ও সেবাস্তিয়ান ভেটেল এর গাড়ির চাকার ছোঁয়ায়। হয়তো আরো অজানা কিছু রয়ে গেল কিন্তু রস্টক চলে এসেছে। এবারে নামতে হবে। প্রায় ৬৯০ কিলোমিটার পথ ৮ ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম। এখন সবে দুপুর একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। বিকেল নাগাদ একটু শহরের আশপাশটা ঘুরে এলাম। রস্টক শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ওয়ারনো নদী। সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে, সূর্যাস্ত দেখে ফিরে এলাম অস্থায়ী ঠিকানায়। রাতে বাল্টিক সাগরের কড মাছের ঝোল আর ভাত খেয়ে মনে হল যেন নিজের দেশেই আছি। উত্তর জার্মানি সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় এখানে মাছের চল রয়েছে। তবে সবই সামুদ্রিক মাছ। সী ব্রীম, ট্রট, হ্যালিবাট, হেরিং, কড, স্যামন, সার্ডিন, টুনা কিছু নাম জানতাম, আর কিছু নাম জানলাম মেনুকার্ড পড়ে। ওয়েটারের কথা মত বিখ্যাত কড মাছ খাওয়াই স্থির করলাম। জেটল্যাগের পরপরই দীর্ঘ জার্নি করার জন্য ক্লান্তি, অসাধারণ খাওয়ার ও মনোরম আবহাওয়ায় ঘুম চলে এলো তাড়াতাড়ি। পরদিন সকাল সকাল প্রাতরাশ সারতে এসে তো চক্ষুচড়কগাছ। জ্যাম পাউরুটি, টুনা ফ্রাই ও তার সাথে বেরীর বাহার। স্ট্রবেরি, মালবেরি, ব্ল্যাকবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি আরও কি কি তাদের নামও জানা নেই। অপূর্ব স্বাদের অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রুগেন দ্বীপের উদ্দেশ্যে।

(ক্রমশঃ)

©✍ সায়ন্তন ধর
২৫/০৮/২০২১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *