নিপ্পনের দেশে —–( দ্বিতীয় অংশ) লেখিকা —- #শ্বেতা ব্যানার্জী

নিপ্পনের দেশে —–( দ্বিতীয় অংশ)

লেখিকা —- #শ্বেতা ব্যানার্জী

কেউ এখানে হাঁটেনা, সবাই যেন দৌড়াচ্ছে, সময় কে এরা দাঁড় করিয়ে শাসন করে। আমরা পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালী, জন্মলগ্ন থেকেই দাবার বোড়ের মতন এক পা চলন, এখানে এসে প্রথমে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল, এদের ছন্দে পা মেলাতে না পেরে তালকাট ছিল, তারপর বাঙালী তো ম্যানেজ মাস্টার একদম চমকে সমুজ্জ্বল…

আমার ছেলে যেহেতু টোকিও শহরে থাকে তাই আমাদের ঘোরাঘুরিটা টোকিও শহর কেন্দ্রিক বেশি হয়েছে।
টোকিও একটা বিরাট শহর। একসময়ে পৃথিবীর একনম্বর শহর ছিল জনসংখ্যার নিরিখে, এখন মেক্সিকো সিটি। কিন্ত ব্যয়বহুল হিসাবে মনে হয় এখনও প্রথম। টোকিও শহরে দ্রষ্টব্য স্থান প্রচুর,
শুধু ঘুরে দেখার অপেক্ষা।

জাপানিদের সততা, ভদ্রতা, আর মানুষকে শ্রদ্ধা করার প্রবণতা প্রশংসনীয়, ওখানে একটাই সমস্যা কমিউনিকেশন স্কিল।খুবই কম সংখ্যক জাপানি ইংরেজিতে কথা বলেন।
তবে ছেলে ও বৌমা সাথে থাকায় আমাদের সেই অসুবিধায় পড়তে হয়নি।আমরা শুধু বাধ্য ছাত্রের মতন ঘাড় নেড়েছি–
অচেনা, অদেখার প্রতি মানুষের একটা সহজাত টান থাকেই…আমারাও এর বাইরে নই।
জীবনে প্রথমবার বিদেশ ভ্রমণ, তার আগে অবশ্য নেপাল ও ভুটানে গেছি, কিন্তু বিদেশ তো নয়, মনে হয়েছে অন্যকোনো শহরে মাসী বা পিসির বাড়ি বেড়াতে এসেছি..
যদিও সে অর্থে ভুটানে খুব বেশি ঘুরতে পারিনি ,কিন্ত নেপাল বেশ ভালোই ঘুরছি,তবে ফিলিংস ওই এক।

আজ ১১,১,২০
আজ আমরা চলেছি “ওডাইবা”
ওডাইবা টোকিওর অন্যতম টুরিস্ট স্পট।

ওডাইবা মেট্রো স্টেশনে নেমে Minami Sunanachi
বাস স্ট্যাণ্ড। মানব সভ্যতার অঙ্গ হিসাবে যানবাহনের তাগিদ মানুষ অনুভব করে আর আবিষ্কার হয় নিত্যনতুন যানবাহন যার মধ্যে বাস একটা।
ছোট থেকে বাসে চড়েছি বহুবার তবে এখানকার অভিজ্ঞতা একটু অন্যরকম, যেমন আমারা লাইন দিয়ে বাস উঠলাম স্মার্ট কার্ড পাঞ্চ করে,যে কার্ড আমাদের প্রথম দিনই করে নিতে হয়েছিল নারিতা রেল স্টেশনে, যেমন ঘুরবে সেই অনুযায়ী তত ইয়েন দিয়ে এই কার্ড করিয়ে নিতে হয়। অবশ্য ঘোরাঘুরি বেশি করলে আবারও পরে নতুন করে নেওয়া যায়। । সিটে বসে দেখলাম সিটের পাশেই bottom আছে প্রয়োজন বোধে পুশ করলে বাস থেমে যাবে, মোবাইল চার্জ করার জন্য U S B পোর্টযুক্ত করা প্রত্যেকটি সিটের পাশেই, আসলে জাপানিরা কাজপাগল মানুষ এবং সময়ের দামও এদের কাছে খুব বেশি, তাই এই ব্যবস্থা।
২০১৯ সালে শুরুতেই জাপানের রাস্তায় স্বচালিত বাস চালু হয়ে গেছে এই বাসে চোদ্দো জন যাত্রী চড়তে পারেন, এই বাসে চালকের আসন বা স্টেয়ারিং কিছুই নেই, যদিও আমি এই বাসে চড়িনি,তবে দেখেছি।
আমরা এসে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে –Pallete town(ODA IBA)
টোকিও বে-র কৃত্রিম বীচে অবস্থিত ওডাইবা বিনোদন কেন্দ্র পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। বীচের সিসাইড থেকে মাউন্ট ফুজির চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে,তবে যদি সূর্যদেব সহায় হন,আমাদের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার মতন।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় জায়গাগুলো হ’লো —
Medieval Eurooean Themed Structure, Deeks sea side mall,
টোকিও উপসাগরে অবস্থিত একটি বিস্তৃত স্থলভূমি,
উনিশ শতকের মার্কিন সামরিক জাহাজ জাপানে
এসে টোকিও রক্ষার জন্য একটি দূর্গ তৈরির উদ্যেশ্য এই স্থলভূমি তৈরি হয়।
আমরা চলেছি মন্ত্রমুগ্ধের মতন.. চারদিকের উজ্জ্বল আলো আর রমনীয় সন্ধ্যার আবেশে আকৃষ্ট হয়ে
হুশ নেই এই তালকানার, ছেলের হুশিয়ারি তে হুশ ফিরলো,আরে দ্যাখো সামনের দিকে —
কী যে করো তুমি! আসলে এই তালকানা মা’ কে নিয়ে ছেলের সর্বদা চিন্তা।
সন্তান যখন অভিভাবক হয় তার প্রাপ্তি অপরিসীম..
আজ ওডাইবা এসে জাপানিদের উন্নত রুচিবোধ,
প্রকৃতিবন্দনা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
জাপানের সাথে আমাদের সময়ের ব্যবধান সাড়ে তিনঘন্টার কিন্তু সার্বিকক্ষেত্রে মনে হ’লো আমরা
কয়েক আলোকবর্ষ দূরে দাঁড়িয়ে আছি।
তাইতো হ্যাঁ করে চোখ,মুখ, প্রাণ, মায় সমস্ত সত্তা দিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলাম।
“আ্যকোয়া সিটি ওডাইবা” একটি বিশাল শপিং
মল,তার সামনেই স্ট্যাচু অফ লিবার্টির আদলে একটি স্ট্যাচু আছে। আছে টোকিও উপসাগরের বুকে একটা পোর্ট।
সমস্ত মলটা পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণের সাথে নিজেদের রুচি মিশিয়ে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য। প্রচুর মানুষ ঘোরাঘুরি করছেন কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে কথাবার্তার আওয়াজের কোন তীব্রতা নেই, শুধুই উৎসাহ, সে এক শেখার জিনিস।
আমরা বাঙালীরা অতি উৎসাহী যা চলনে-বলনে ধরা পড়ে, ওদের চলন আছে কিন্তু বলন, কে যেন মেপে দিয়েছে —–
উহু ঠোঁট ওইটুকুই ফাঁক তার বেশি নয়।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আধুনিকতার অহংকে সঙ্গে নিয়ে আমরা পা বাড়ালাম (towards Shimbashi)
Odaiba station monorali লেনে, এও এক অবাক বিস্ময় এই মনোরেল, চালক বিহীন ট্রেন, শুনেছি এই ট্রেন রেললাইনের কিছুটা উপর দিয়ে চলে magnetic power এ, আমরা Shimbashi Station
থেকে হেঁটে Ginza এলাম এটা একদম টোকিও শহরের ফুসফুস, এখানে আমরা Khan Kabab Biryani তে dinner সারলাম।
এত ভালো আতিথিয়েতা এই হোটেলের চিন্তা করাই যায়না, বেশীরভাগ সবাই পূর্ববঙ্গের। আমরা বাঙালী জেনে মালিক নিজে এলেন, আমাদের সঙ্গে আলাপ
করলেন, এবং আবার আসার জন্য আগাম আমন্ত্রণ করে রাখলেন। ফেরার পথে কিছু বাঙালি আনা সারলাম কেনাকাটা। তবে এখানে টিপস দেওয়া ও নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ যে কোনো জায়গায়।
এখানে সবকিছু চলে ঘড়ির কাঁটা মেনে, অগত্যা আমরা বাড়ির পথ ধরলাম, যদিও আমার আরও কিছুক্ষণ হাঁটার ইচ্ছে ছিল,কিন্ত না–
“চল সমান পথে চল নিয়ম মতে”

ক্রমশঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *