৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ ~ শান্তনু ঘোষ পর্ব-৫

৬০ টাকায় বাংলাদেশ – আমার অন্য পথ
~ শান্তনু ঘোষ
পর্ব-৫

আগে যা ঘটেছে:
ছোটখাটো ঘটনার দরজা পার হয়ে গেদে চেক পোষ্ট দিয়ে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশে ঢুকে পরেছি। এখন একটা ভ্যানে করে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে চলেছি দর্শনা হল্ট রেল ষ্টেশনের দিকে। ওখান থেকে ট্রেন ধরব। একটু তাড়া আছে।

তারপর…
ভ্যানে আমি একাই যাত্রী। আর কোন যাত্রী পাওয়া যায়নি। ইদানিং বেশী লোক এই পথে যাতায়াত করে না। তাছাড়া আমার একটু দেরী হয়ে যাওয়াতে যে কয়জন ছিল, তারাও আগে চলে গেছে। সেই কারনে আমাকে ভাড়া বেশী দিতে হবে। ভ্যান চালক বাবুল বলল, দাদা ৫০ টাকা দিবেন। কতটা রাস্তা ঠিক জানি না। তাই ভাবলাম যে নতুন লোক দেখে বেশী টাকা চাইছে। এসব গল্প আগে করেছি।

ভ্যান চলেছে পিচ রাস্তা ধরে। রাস্তা মোটামুটি ভালো। বেশ অন্য রকমের এক অনুভূতি হচ্ছে। হয়ত আবেগপ্রবণ হবার প্রভাব।

যেহেতু একক যাত্রী, তাই ভ্যানের উপর বাবুলের ঠিক পেছনেই বসে ওর সাথে গল্প করতে করতে চলেছি। রোদ বেশ চড়া। কিন্তু শীতকাল বলে তেমন কষ্ট হচ্ছে না। চলার পথে আমার দুদিকে গ্রাম। চাষের ক্ষেত আর মাঝে মাঝে দু একটা বাড়ি আর মসজিদ।

এক নতুন বিষয় লক্ষ্য করলাম। ভ্যান ভর্তি করে করে বাঁশ গাছের গুঁড়ি নিয়ে যাচ্ছে। আমি বাবুলকে জিজ্ঞেস করি, এত গুঁড়ি কোথায় লইয়া যায় ?

ও বলল, ইটভাটায়। শুধু গুঁড়ি না, কাঠ, খড়, বা সেইরম জ্বালানী সবই ইটভাটায় যায়। ইট পোড়ানোর কামে লাগে।

বাংলাদেশে কয়লার অভাব। কয়লাখনি তেমন নেই। তাই এই ব্যবস্থা । কারণ সবুজ দেশে গাছের অভাব নাই। যদিও প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস আছে।

ইটের দামও বেশী। পাঠকরা বাংলাদেশে পাকাবাড়ি বানাতে হলে ভারত থেকে ইট নিয়ে যাবেন।
আমাদের এদিকে দেখেছি ইটভাটায় মনের সুখে কয়লা জ্বালানো হয়। এমনটা বাংলাদেশ ভাবতেই পারেনা।

ভ্যান চলেছে বেশ গতিতে। এটা ব্যাটারি চালিত ভ্যান। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। বাবুলকে বলেছিলাম, আমার ট্রেন ধরিয়ে দিতে হবে।

যেতে যেতে ডান দিকে হাত তুলে ও বলল, ওই যে দূরে চাষ জমি, কলা বাগান, দেখতাছেন, অইগুলা হইল ইন্ডিয়ার চাষ জমি।

আমি তো অবাক ! এ কেমন করে সম্ভব? বাংলাদেশের মধ্যে ইন্ডিয়ার লোকের চাষজমি !

আমি জিজ্ঞেস করি, তা এখানে বর্ডার কই ? কি করে বোঝা যায় যে কোনটা ইন্ডিয়ার আর কোনটা বাংলাদেশের জমি ? সবই তো সবুজ ধানে ভরে আছে।

ও বলল, ওই যে কাঠির মাথায় সাদা প্লাস্টিক লাগানো, হেইটার ওই পারে ইন্ডিয়ার জমি।
আমার বিস্ময় কাটে না।

ভারত – বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত, কাঁটাতার, সীমান্ত প্রহরী, গুলিগোলা, কত আলোচনা । সেসব একদিকে সরিয়ে রেখে – কাঠির মাথায় সাদা প্লাসটিক – এত সহজ সীমানা সমাধান যে বিরাজ করে তা আমার অজানা। সেখানে নাকি, নিয়মিত, ভারতের বা ঠিক করে বললে, পশ্চিমবঙ্গের চাষিরা এসে চাষ করে !

যাই হোক, গল্প করতে করতে অনেকটা পথ চলে এলাম। দর্শনা বাসস্ট্যান্ড বাঁদিকে রেখে আমরা দর্শনা বাজার থেকে ডানদিকে মোড় নিয়েছি। খুব আনন্দের সাথে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছি । বেশ মজা লাগছে। সব থেকে ভালো লাগছে যে সর্বত্র বাংলায় লেখা। এটি আমার চোখের ও মনের জন্য এক সুখদায়ক অনুভূতি।

হঠাৎ একটা রেল গেটের সামনে এসে ভ্যান থেমে গেল। এই প্রথমবার থামল। আমি ভাবলাম ট্রেন আসবে তাই অপেক্ষা করছে। বসে আছি দেখে বাবুল বলল, নামেন, আইসা গেছে ।

আমি জিজ্ঞেস করি, সেকি, এসে গেল ? এটাই কি দর্শনা স্টেশন নাকি ?
সত্যি বলতে কি জায়গা টা আমার কল্পনার ধারে কাছে আসছে না ।
রানাঘাট, ব্যারাকপুর, বা বারাসতের রেলওয়ে সাইডিং যেমন অবহেলিত অবস্থায় থাকে তেমনই একটা জায়গা মনে হল। ভাবতেই পারছি না যে এই লাইন দিয়ে ঢাকা যাবার ট্রেন আসবে। আমি ভাবছি বাবুল নিশ্চয়ই আমাকে আসল স্টেশন থেকে দূরে কোন সাইডিং এ নামিয়ে দিচ্ছে। এবার আমাকে আরও হাঁটতে হবে।

আমি বিষয়টা বোঝার জন্য ভ্যান থেকে নেমে একটু এগিয়ে দেখতে এলাম, কোন ষ্টেশন চোখে পড়ে কিনা।
দেখি একটা লাইন বাঁদিকে চলে গেছে আর ডানদিকে একটু দূরে দর্শনা হল্ট ষ্টেশনের নাম লেখা আছে।

তাও নিশ্চিত হবার জন্য দু-একজনকে আবার জিজ্ঞেস করি, বেনাপোল এক্সপ্রেস এই ষ্টেশনেই আসবে কিনা।

বাবুলকে টাকা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে এসে উঠেছি।
খুবই ছোট ষ্টেশন। পুরোটাই প্রায় নেড়া। ষ্টেশন মাষ্টার অফিস আর টিকিট ঘরের সামনে একটু শেড দেওয়া আছে। কিন্তু বেশ ভিড় আছে। হয়ত আজ শুক্রবার বলেই।

বিভিন্ন বয়সের বেশিরভাগ পুরুষরা মাথায় ফেজ আর মহিলারা হিজাব বা বোরখা পরেছেন। পুরুষদের প্রায় সকলেরই দাঁড়ি আছে এবং অনেকের ক্ষেত্রে তা পরম্পরাগত ভাবে রং করা। কিন্তু ভালো লাগছে, যে সবাই বাংলা বলছেন। প্রাণ খুলে !

ভারতে এমন দৃশ্যে খুব স্বাভাবিক ভাবে আমি হিন্দি কথাই শুনতাম নিশ্চিত।

প্লাটফর্মের উপরে কিছু ছোট ছোট খাবারের দোকান। আমি একটু বিস্কুট কিনলাম। কিছু খাওয়া হয়নি অনেকক্ষণ।
বিস্কুট খেতে খেতে এগুচ্ছি ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ দেখি সেই দুইজন ভদ্রলোককে, যাদের গেদে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আটকে দিয়েছিল।

বেশ লাগল। একজনের সুচারুরূপে কাটা চাপ দাঁড়ি, অপরজনের কেবল গোঁফেই সীমাবদ্ধ।
যেচেই জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের ওখানে আটকেছিল কেন ?
চাপদাড়ি হাল্কা অর্থপূর্ণ হাসি দিলেন। যার অর্থ আমি ঠিক বুঝলাম না।
গোঁফ দাদা বললেন, আর বলবেন না। এমনিই একটু নেড়েচেড়ে দেখল। যদি কিছু পাওয়া যায়।
কি জানি এর কি মানে !
কথায় কথায় জানলাম যে ওনারা ঢাকা যাবেন, কিন্তু তার আগে পাবনায়। ভারতে বাড়ি হল বেলঘরিয়ায়।

এমন সময় লোকজন বেশ নড়াচড়া করতে শুরু করেছে। বেনাপোল এক্সপ্রেস ঢুকছে।
দেখলাম হর্ন দিতে দিতে সবুজ রঙের ট্রেন । ডিজেল ইঞ্জিন টানা ট্রেনটি প্রায় এসে পড়েছে। এ লাইনে মনে হয় ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিন চলে না। কামরার গায়ে সবুজের উপর সাদা রঙে সুন্দর করে লেখা আছে বাংলাদেশ রেলওয়ে “শোভন চেয়ার”

আমার টিকিট আগে থেকেই কৌস্তভ ব্যবস্থা করে রেখেছে। বগি নং ‘চ’। ভারতের মত B1, A1 এসব কিছু নয়।

হৈ হৈ করে ছুটে গিয়ে ‘চ’ কামরা খুঁজে ঊঠে পড়লাম। এটা চেয়ার কার। ভিতরে ভিড় জমে আছে। একদল বেরোতে আর একদল ঢুকতে চাইছে। জট পাকিয়েছে। যেমন হয় আর কি।
নিত্য দূর পাল্লার ট্রেনে অভিজ্ঞ যাত্রী আমি। এই জট ছাড়ানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ঝাঁপিয়ে পড়লাম উদ্ধারের কাজে।
এই যে দাদা আপনি একটু এদিকে আসুন, দিদি ওদিকে যান, বলে বেশ কাজ শুরু করে দিয়েছি।
হঠাৎ দেখি কয়েকজন আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছেন। আরে আমি তো ভুলেই গেছিলাম যে আমি বিদেশে এসে পড়েছি।
এখানে আমার শব্দ গুলো হয়ত একটু অন্যরকম ভাবে কানে লাগছে।

যাই হোক, জট ছাড়ল। আমি আমার সিট খুঁজে পেলাম। জানালার পাশেই। আহা কি আনন্দ। সব দেখতে দেখতে যাব।
কিন্তু দেখি সেখানে বসে এক হিজাব আর মাস্ক পরিহিতা আপাত অষ্টাদশী। তার শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে।

আমি বিনীত ভাবে তাকে অনুরোধ করি, সিট ছাড়ার জন্য।
ওমা, তিনি উল্টে খুব সপ্রতিভ ভাবেই আমায় বলেন, আপনি এই পাশের সিটে বসেন, আমি জানালার পাশে বসি। আমি তো হতবাক!

টু-সিটার । বিদেশ বিভূঁই। তায় মহিলা। বেশী তর্কের মধ্যে না গিয়ে তেনার ডানপাশের সিটে বসে পড়ি।।

ক্রমশঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *