জার্মানি: জাটিঙ্গার ফিনিক্স হয়ে ওড়া🇩🇪 © সায়ন্তন ধর

জার্মানি: জাটিঙ্গার ফিনিক্স হয়ে ওড়া🇩🇪

©✍🏼 সায়ন্তন ধর

(দ্বিতীয় পর্ব)

…সবে উন্নতি করা শুরু করেছিল জার্মানি এর মধ্যেই অর্থনৈতিকভাবেই বিপর্যস্ত হয়ে যায় তারা। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে অর্থনৈতিক অরাজকতা দেখা যায়। এই সময় কালে বিশ্বজুড়ে কৃষি ও শিল্পে চূড়ান্ত অসাম্য আসে জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও ইতালিতে ফ্যাসিজম প্রাধান্য পায়। ১৯৩৩ সালে এই পরিস্থিতিতে জার্মানির চ্যান্সেলর হন হিটলার। হিটলারের দলের নাম ছিল ন্যাশনাল সোশালিস্ট সংক্ষেপে নাৎসি। সোশালিস্ট কথাটি থাকলেও তিনি ছিলেন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের উগ্র সমর্থক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির শক্তিশালী হওয়া সত্বেও হারের অন্যতম কারণ হিসেবে ইহুদীদের সাথে সোভিয়েত বলশেভিকদের আঁতাতের কথা তুলে ধরা হয় এবং দেশকে ইহুদি মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। হিটলারের মধ্যে ডারউইনবাদের বিকৃত প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় অর্থাৎ বাঁচার অধিকার শুধু ক্ষমতাবানের রয়েছে। নাৎসী বাহিনীর রাষ্ট্রীয় প্রতীক ছিল স্বস্তিকা চিহ্ন। এর ব্যুৎপত্তি করলে দাঁড়ায় সু+অস্তি, অর্থাৎ রোমান সাম্রাজ্য ও প্রাশিয়া সাম্রাজ্যের পর এই তৃতীয় সাম্রাজ্যে ভালো ছড়িয়ে রয়েছে। জার্মান ভাষা ও সংস্কৃত ভাষায় যেমন মিল রয়েছে তেমনি প্রতীক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আর্যদের চিহ্ন হিসেবে স্বস্তিকাকে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। হিটলারের আমলে জার্মানি অনেকটাই উন্নতি করে। ইস্পাত, ইঞ্জিনিয়ারিং, মাইনিং ও অটোমোবাইল শিল্পে মিত্রশক্তির থেকে অনেক বেশি এগিয়ে ছিল জার্মানি। অস্ত্র শিল্পে প্রভূত উন্নতি হয়, আবিষ্কার হয় নিত্যনতুন যুদ্ধাস্ত্র। হিটলারের শাসনকালে ধর্মীয় বিরোধ কমে যায়, অর্থনৈতিক সাফল্য আসে, বেকারত্ব হ্রাস পায়। নারী, যুব সম্প্রদায়, শিল্পপতি ও কৃষক সমাজের সমর্থনের পাশাপাশি শিক্ষার মূলে নাৎসিবাদের কুপ্রভাব, গণমাধ্যম, প্রশাসন, আইনসভার একচ্ছত্র নায়ক হওয়ার ফলস্বরূপ হিটলার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয় ১৯৩৬ সালে বিশ্বের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য হিটলার বার্লিন অলিম্পিক এর আয়োজন করেন। সেই অলিম্পিকে পরাধীন ভারত ধ্যানচাঁদের হকিস্টিকের জাদুতে ফাইনালে আট গোলের মালা পরিয়েছিল জার্মানিকে, আর জিতে নিয়েছিল স্বর্ণপদক। এর মধ্যেই দেশ থেকে ইহুদি বিতাড়নের জঘন্য ক্রিয়া-কলাপ চলছিল। তবে হিটলারের এই বাড়াবাড়িতে বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশগুলির ও প্রচ্ছন্ন মদত ছিল তা জানা যায় ১৩ বছরের ইহুদি কন্যা আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি থেকে, “শুধু বড় বড় লোক, রাষ্ট্রনায়ক আর পুঁজিপতিরাই যে এর জন্য দায়ী আমি তা মনে করিনা। যে কেউকেটা সেও সমান দায়ী। নইলে দুনিয়ার মানুষ অনেকদিন আগেই বিদ্রোহে ফেটে পড়ত।” এত কম বয়সে এতটা সঠিক উপলব্ধি সত্যিই বিস্ময়কর! রবীন্দ্রনাথের “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে” -উদ্ধৃতিটি সত্যি বলে মেনে নিলে আমার মনেও প্রশ্ন জাগে, যদি হিটলার ভুলই করছিল, তখন তথাকথিত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন দেশ ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, আমেরিকা, লীগ অব নেশনস কি করছিল? মজা দেখছিল? তারাও কি প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও মদত দিচ্ছিল না হিটলারকে? যাইহোক পরিস্থিতি যখন হাতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল তখন ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয়বারের জন্য মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রাচ্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জাপান অক্ষশক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়। বিশ্বযুদ্ধের আবহে মনে আসে –

🇩🇪অনেক দূরের পথ সে যে স্প্রী নদীর পাড়
সেইখানেতে ব্রান্ডেনবার্গে জলছবির শহর
স্প্রীওয়াল্ডে নৌকো নিয়ে কত খেলা ছিলো
বড় হতে বার্লিন শহর ডাক যে দিলো
ছেলেবেলার সেই দিনগুলি হায় মনে পড়ে যায়
পুরোণো সেই দিনের কথায় এই মন করে আনচান

ছবির মত শহরখানি কত যে আপন
সংস্কৃতি আর বিজ্ঞানেরই চলছে জয়গান
স্প্রী নদী এখানেও বইছে অবিরাম
মনে পড়ে ছেলেবেলায় মায়ের গাওয়া গান
কৈশোরের সেই দিনগুলি হায় সোনার সময়
পুরোণো সেই দিনের কথায় এই মন করে আনচান

চলছিলো সব ঠিকভাবেই হঠাৎ কি যে হল
ভাঙা কাচের একটি রাত্রি সব বদলে দিলো
স্বচ্ছ আলোয় রূপোলি কাচ ছিল চারদিকেতে
ফ্রন্টে যাবার ডাক এলে যাই তড়িৎগতিতে
স্বদেশপ্রেমের সেই দিনগুলি হায় মনে পড়ে যায়
পুরোণো সেই দিনের কথায় এই মন করে আনচান

যুদ্ধ জয়ের আনন্দেতে কাটছিলো যে দিন
রক্তবিন্দু দিয়ে শুধছি পিতৃভূমির ঋণ
হারমোনিকায় গান ধরেছি লিলি মার্লিন
স্বদেশভূমি অদর্শণে মুখ হল মলিন
ট্রেঞ্চের এই দিনগুলি হায় বিভীষিকাময়
পুরোণো সেই দিনের কথায় এই মন হলো আনচান

সাতটি বছর ধরে যুদ্ধ অবিরাম
মেশিনগান আর হ্যান্ড গ্রেনেডের ধ্বংসলীলার তান
শীতের প্রকোপ বাড়ছে শুধু খাদ্যেরই সংকট
যুদ্ধ ক্রমে রূপ বদলায় খুলছে নানান ফ্রন্ট
বর্তমানের এই দিনগুলি হায় প্রতিকূলতায়
ওকের বনে ফেরার তরে এই মন করে আনচান।🇩🇪

জার্মানির হার যখন সময়ের অপেক্ষা সমৃদ্ধ বার্লিনের অবস্থার কথা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ‘নাৎসি জার্মানির জন্ম ও মৃত্যু’ গ্রন্থে উল্লিখিত কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করে বোঝানোর চেষ্টা করছি – “শহরের মধ্যভাগে চিড়িয়াখানা বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত, এদিক-ওদিক পশুদের মৃতদেহ পড়ে আছে। পেলিকান, সমুদ্রসারস আকাশে উড়ে পালাতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে। একটি বাদামি ভালুক আহত ও রক্তাক্ত হয়ে আর্তনাদ করে চলেছে। অনেক রাত্রে বার্লিনের আকাশে মেঘ মুক্ত চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে ভূতের নগরীকে। গুহা মানবেরা নিঃশব্দে যেন ভয়ে এদিক-ওদিক চলেছে। পুরানো রাজপ্রাসাদ, লাইব্রেরী, কয়েকটি বড় প্রাসাদ, যেগুলি এখনো দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে তার মাঝখান দিয়ে আগুনের শিখা উঠছে আকাশে। ফায়ার ব্রিগেড বাহিনীর জলের পাইপ ফেটে চৌচির, রাস্তাগুলো ভেনিসের মতো জলে ভাসছে, বোমায় ভেঙে পড়া বাড়িঘরের স্তুপ, তার নিচে ইট বালি চাপা পড়েও একটা দুটো টেলিফোন বেজে উঠছে।” বার্লিনের মানুষের অবস্থা সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি লাইনে সহজেই বোঝানো যায়- “আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়।” দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে পুনরায় যুদ্ধ অপরাধী চিহ্নিত করে জার্মানিকে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত করা হয়, ১৩৯৩ কিমি দীর্ঘ ইনার জার্মান বর্ডার তৈরী হয়, দুই দেশে যাতায়াতে পাসপোর্ট, ভিসার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পূর্ব প্রাশিয়া ও জার্মানির বেশ কিছু অংশ পোল্যান্ডের অধীনস্থ হয়। জার্মানির রাজধানী বার্লিনকে চারটি সেক্টরে ভাঙ্গা হয়। পশ্চিম বার্লিনের তিনটি সেক্টর যথাক্রমে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার দখলে থাকে, পূর্বের সেক্টরটি থাকে সোভিয়েত রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিম জার্মানির রাজধানী হয় বন। পূর্ব জার্মানির রাজধানী হয় পূর্ব বার্লিন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তুলনামূলকভাবে পূর্ব জার্মানি অপেক্ষা পশ্চিম জার্মানি বেশি উন্নতি করছিল ফলস্বরূপ অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মান ছিল অনেক বেশি উন্নত। এই কারণে ১৯৫৮-১৯৬১ সালের মধ্যে দেখা গেল পূর্ব বার্লিন থেকে অনেক মানুষ পশ্চিম জার্মানিতে চলে যাচ্ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রেঞ্চ, ব্রিটিশ ও আমেরিকান সেক্টর এর সঙ্গে রাশিয়ান সেক্টরের মতবিরোধ ঘটে। ফলস্বরূপ পশ্চিম বার্লিনকে ঘিরে ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বার্লিন প্রাচীর তোলা হয়। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দুই জার্মানি নিজেদের মতো করে উন্নতি করছিল। শিল্প ও অর্থনীতিতে ১৯৭৬ সালের মধ্যেই তারা প্রথম সারির দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল। এই সময়কালের মধ্যেই ১৯৫৪ ও ১৯৭৪ ফিফা বিশ্বকাপ জেতে পশ্চিম জার্মানি। ১৯৭৬ সালে অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জেতে পূর্ব জার্মানি, এছাড়াও অলিম্পিকে তাদের সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। এরপর ২২শে ডিসেম্বর ১৯৮৯ সাল বার্লিন প্রাচীরের মধ্যে থাকা ব্রান্ডেনবার্গ গেট (প্রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক উইলিয়ামের নির্দেশে ১৮০০ শতকে তৈরী) জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। দুই জার্মানির মিলিত হওয়ার লক্ষ্যে ১৩ ই জুন ১৯৯০ তে বার্লিন প্রাচীর ভাঙার কাজ শুরু হয়, যা শেষ হয় ১৯৯৪ এ। আনুষ্ঠানিকভাবে দুই জার্মানি একত্রিত হয় ৩রা অক্টোবর, ১৯৯০ তে। ভৌগোলিক ভাবে জার্মানির অবস্থান হয় পশ্চিমে ৫.৫° পূর্ব দ্রাঘিমা থেকে পূর্বে ১৫.৫° পূর্ব দ্রাঘিমা ও উত্তরে ৫৫.১° উত্তর অক্ষরেখা থেকে দক্ষিণে ৪৭.২° উত্তর অক্ষরেখার মধ্যে। জার্মানির পূর্বে পোল্যান্ড, দক্ষিণ-পূর্বে চেক প্রজাতন্ত্র ও অষ্ট্রিয়া, দক্ষিণে সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ-পশ্চিমে ফ্রান্স, পশ্চিমে লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ড, উত্তরে ডেনমার্ক, উত্তর সাগর ও বাল্টিক সাগর। নতুন জার্মানির রাজধানী হয় বার্লিন। জার্মানি ও বার্লিনের আয়তন যথাক্রমে ৩৫৭০২২ বর্গকিলোমিটার ও ৮৯১.৭ বর্গকিলোমিটার। দুটি বিশ্বযুদ্ধে এভাবে জড়িয়ে পড়াটা যেন জাতীয়তাবাদের আগুনে জাটিঙ্গার মত ঝাপিয়ে পড়া। সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে ঠিক যেন ফিনিক্সের মত উত্থান আজকের জার্মানির। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি তার। ২০০৫ সাল থেকে এদেশের কান্ডারী তথা চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা ডোরোথিয়া মের্কেল। আবেগে ভাসা জার্মানদের ধাতে নেই, অথচ ব্যতিক্রম ঘটলো। ২০২১ এর জানুয়ারিতে গোটা দেশ এক হয়ে বাড়ির ব্যালকনি, ছাদ, জানালায় এসে দাঁড়িয়ে স্বেচ্ছায় একটানা ছয় মিনিট হাততালি দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ ও বিদায় অভ্যর্থনা জনালো তাদের নেত্রীকে। তিনি দীর্ঘ ১৬ বছরের চ্যান্সেলর পদ থেকে অবসর নেবেন এবছর। হিটলারের জার্মানি ইহুদিদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করলেও অ্যাঞ্জেলা মেরকেল সিরিয়ান ও তুর্কি উদ্বাস্তুদের আশ্রয়দানের সাথে সাথে কর্মসংস্থানেও জোর দিয়েছিলেন। বর্তমানে আফগানিস্তানের মানুষের পাশেও রয়েছেন তিনি। জাপানের ফুকুশিমা দাইচি ও দাইনি পরমাণু বিস্ফোরণের পর জার্মানির পরমাণু কেন্দ্রগুলি বন্ধ করার সাহসী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেশ তথা ইউরোপের অবিসংবাদী নেত্রী হয়েও তাঁর বাড়িতে কাজের লোক মাত্র দু’জন তিনি ও তাঁর স্বামী। সেদিনের ছোট্ট মেয়ে “ম্যাডচেন” থেকে তিনি এখন জার্মানির “মুট্টি” অর্থাৎ মাতৃ প্রতিমা। ১০৮ টি নোবেল পুরষ্কার সহ জার্মানীও সবদিক থেকে নিজেকে একটি সাফল্যমণ্ডিত দেশে পরিণত করেছে।

(ক্রমশঃ)

©✍🏼 সায়ন্তন ধর
২৪/০৮/২০২১🇩🇪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *