পিকনিক ***** তনুজা চক্রবর্তী

পিকনিক
তনুজা চক্রবর্তী
 
আবারও একটা নতুন বছর আসতে চলেছে। পুরানো ক্যালেন্ডারের জায়গায় নতুন ক্যালেন্ডার টাঙানো হবে দেওয়ালে, রাখা হবে টেবিলের ওপর। প্রতিবারের মত এবারেও মাহিরা একত্রিশে  ডিসেম্বর রাত বারোটার সময় বারান্দায় প্রদীপ জ্বালিয়ে  তার  ঠাম্মির  গাওয়া রবিঠাকুরের গান শুনিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে।  গানের সঙ্গে সে নাচবে । তার বাবা আর মা কবিতা পাঠ করবে। আর পরদিন পয়লা জানুয়ারির ভোর থেকেই শুরু হয়ে যাবে পিকনিকে যাওয়ার প্রস্তুতি।
মাহি তার বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাগে তার খেলার সরঞ্জাম নিচ্ছে দেখে তার মা বেশ অবাক হল। অতবড় ব্যাগটায় ভরে কী এত নেবে সে? জানতে চাইল তার কাছে। তেমন কিছুই নয়,কেবল ব্যাগটা তার খুব পছন্দের, তাই সঙ্গে নিচ্ছে।
 পাড়ার ছোট-বড় প্রায় প্রতিটা মানুষই যাচ্ছে । এবার তারা যেখানে যাচ্ছে, সেখানে পৌঁছতে গাড়িতে ঘন্টাখানেক সময় লাগবে। গ্রামটার নাম বড়গাছিয়া।  মাঠের পর মাঠ টপকে খেঁজুর গাছে ঘেরা একটা জায়গা আছে সেই গ্রামে। সেই জায়গাটার  পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা খাল, সেখানেই এবার পিকনিক করবে তারা। সেই খালের জল সারবছর চাষের কাজে ব্যবহার করে চাষিরা। তাল গাছের গোড়া কেটে বানানো কয়েকটা ডোঙাও আছে সেই খাল পারাপার করার জন্য। বিধু কাকু আগেই সেখানে গিয়ে সবটা দেখে এসে জানিয়েছে।
আশেপাশের সুন্দর গ্রাম্য পরিবেশের মাঝে কাঠের জ্বালে সকালের জলখাবার থেকে বিকেলের চা অবধি রান্না করবে পাড়ার কাকু-জেঠুরা। রান্না থেকে ছুটি দেওয়া হবে মা-কাকি-জেঠিমাদের । তারা এদিক-ওদিক ঘুরবে আর নিজেদের মধ্যে গল্প করে সারাটা দিন কাটিয়ে দেবে। মাহিও তার বয়সি বন্ধুদের সঙ্গে খুব মজা করে কাটাবে। কেবল ডোঙায় চড়া হবেনা বলে মনটা খুঁত খুঁত করছে তার। আসলে ডোঙা চালানো আর চড়া দুটোই বেশ কঠিন, তারজন্য ব্যালেন্স লাগে।
দুটো বাসে চেপে সকাল সকাল সেখানে পৌঁছে গেল তারা। সকালের খাবারের পর্বে ছিল লুচি-তরকারি আর মোয়া। তারপর একটা করে কমলালেবু। মাহি এবার তার জন্মদিনে পাওয়া ব্যাডমিন্টনের সেটটা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। তার ব্যাট নিয়ে দাদা-দিদি,কাকুরাও খেলেছে তাদের সঙ্গে।
এবার প্রথম থেকেই সবটা একটু অন্যরকম ছিল । আসার সময় মা-বাবা, কাকু-কাকিমা,জেঠু জেঠিরা চড়েছিল একটা বাসে,  সব ছোটোদের নিয়ে পাড়ার দাদা-দিদিরা আর রতন জেঠু অন্যটায়। গোটা রাস্তা হইচই, বেসুরে গান গাইতে গাইতে একসময় তারা পৌঁছে গেছিল পিকনিকের জায়গায়। সবার প্রথমে মাহি বাসে উঠেই তার ব্যাগটাকে একদম পেছনের সিটের তলায় রেখে এসেছিল, পাছে কেউ তার মায়ের মত প্রশ্ন না করে।
দুপুরের রান্না প্রায় শেষ, বেগুনি ভাজা শুরু হয়েছে। প্রথমে ছোটোরা খাবে, তারপর মা-কাকি-জেঠিরা, আর সবশেষে খাবে বাবা-জেঠু-কাকুরা।
মাহি নিজের আসনে বসে তার দু-পাশে দুই হাত দিয়ে দুটো জায়গা রেখে দিল। সেখানে সে কাউকে বসতে দিচ্ছে না। সকলে মিলে বারবার জিজ্ঞেস করার পরেও সে চুপ করে বসে আছে। সেখানে সে কাকে বসাতে চায়, সেটাও বলছেনা! মায়ের কাছে বকুনি খাওয়ার পরেও কাউকে বসতে দিল না। পাতে ভাত, ডাল আর বেগুনি দেওয়া হয়েছে। সবাই খেতে শুরু করেছে, কেবল মাহি হাত গুটিয়ে বসে আছে।
 রতন জেঠু,  পাড়ার সবচেয়ে  বয়জ্যেষ্ঠ মানুষ, সব বাচ্চার খুব কাছের বন্ধু।  যাঁর প্রশ্রয় পেয়ে মাহি তার নতুন দুই  বন্ধুকে পিকনিকে নিয়ে আসতে পেরেছে। তাঁর  চোখের ইশারায় যে বাসটাতে চড়ে সে এসেছিল, হঠাৎই এক দৌড়ে সেই বাসের কাছে পৌঁছে ঢুকে গেল তার ভেতরে। সবাই খাওয়া ভুলে তাকিয়ে আছে সেদিকে। এরপর ঠিক কী ঘটতে চলেছে, কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না।  মাহি বাসের ভেতর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তার কোলে লাটাই আর লাট্টু, পাড়ার কুকুরের দুটো বাচ্চা। দুদিন আগেই রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে তাদের মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *