গল্প -: “খেলাঘর” কলমে:- সুলতা পাত্র শেষ পর্ব

গল্প -: “খেলাঘর”

কলমে:- সুলতা পাত্র

শেষ পর্ব

****************

বিশ্বাস-আস্থা এগুলো দিয়েই সম্পর্কের ভিত তৈরি হয়। খুব দৃঢ় এই শব্দগুলো মজবুত হয়ে ভরসার ভিত ধরে রাখে,কিন্তু একবার ভেঙ্গে গেলে হুড় মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নিমেষে। আর একবার ভেঙে পড়লে সে সম্পর্কের নাম যাই হোক,সম্পর্কিত মানুষটা হয়ে যায় শুধুই পরিচিত বা তা ও নয় অনেকটা অচেনা।
রাইমার জীবনে এসেছে নানা ন্যায্য প্রত্যাশার অপ্রাপ্তি। শাশুড়ির সাথে মনোমালিন্য এবং সেই সূত্র ধরে স্বামীর সাথে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার দরুন এই বাড়িতে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠে রাইমার। শাশুড়ি দিনের পর দিন অশান্তি করতে থাকেন। উনার বক্তব্য উনার ইচ্ছাকে কেন দাম দেওয়া হলো না।
একদিন সকলের অলক্ষে একটি চিঠি লিখে রেখে দিয়ে, খুব ভোরে নিজের গয়না গুলো নিয়ে এক কাপড়ে বাবার বাড়ি চলে আসে রাইমা।
চিঠিতে লেখা ছিলো, -‘আমার সন্তানকে যারা চায় না সেখানে আমি মনে করি, আমার ও স্থান নেই। ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিয়ে গেলাম। কোনদিন আর এই বাড়িতে ফিরে আসবো না’।
রাইমা ভেবেছিলো তার শ্বশুর বাড়ি থেকে সব ঠিকঠাক করে নেবেন। তার বাবাকে বিনয় ফোন করবেন, কিন্তু না কোন যোগাযোগ কেউ করেননি। এমনকি প্রদীপ ও না। ……………

ছেলে হয় রাইমার, এবং ছেলে যখন চার বছর বয়স তরুণের প্রেমে পড়ে সে। তরুণ ন্যাশনাল ইন্সুরেন্স কোম্পানির গ্রেড ওয়ান অফিসার।তার খুব ভালো লেগেছিল রাইমাকে, এবং সবকিছু জানা সত্ত্বেও একদিন প্রপোজ করেছিলো। প্রথমে রাজি না হলেও শেষে রাজি হয় রাইমা, এবং বাবা-মা,দাদা- বৌদিকে জানায়।
বাবার বাড়ির সকলে খুব চিন্তিত রাইমা ও তার ছেলেকে নিয়ে। প্রদীপের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে, এবং অদ্ভুত ব্যাপার সামান্য একটি কারণে, ডিভোর্সের সাথে এক বছর হয়ে গেল প্রদীপ বিয়েও করেছে।……….

আবারো দিনক্ষণ দেখে বিয়ে হয় রাইমার। সবাই কি সুখী হতে পারে! সুখের জন্য কতজন কত কিছু করে, সফলতা আসে মাত্র কিছুজনের জীবনে। সুখ সে বড় চঞ্চল,যেতে চায়না সকলের ঘরে। আবার গেলেও বেশি সময় থাকতে চায় না।
রাইমার ছেলের নাম রাজেন্দ্র। সে পরপর বড় হচ্ছে যখন সে দশ বছর, তরুণ একদিন রাইমা কে প্রস্তাব দেয় রাজেন্দ্রকে হোস্টেলে রাখার জন্য।সে বলতে চায়, -‘আমারও তো ইচ্ছে করে আমার একটি সন্তান হোক’।
রাইমা বলে, -‘ সেরকম তো কথা ছিল না তরুণ। তুমি রাজেন্দ্রকেই তোমার সন্তান হিসেবে মেনে নেবে এই কথা ও কিন্তু দিয়েছিলে’।
তরুণ উত্তর দেয়, -‘ হ্যাঁ কথা দিয়েছিলাম কিন্তু এখন মাঝে মাঝে মনে হয় নিজের সন্তানের মুখ দেখতে। এটা তো অন্যায় নয়। সবাই কি একটি সন্তান নেয়?তোমার দুটো সন্তান নিতে আপত্তি কোথায়’?
‘আপত্তি নয় তবে তোমায় আমি শর্ত দিয়েছিলাম।আমার পক্ষে সেই শর্ত ভাঙ্গা সম্ভব ও নয়’।
যখন ওরা কথা বলছিলো রাজেন্দ্র তার পড়ার ঘর থেকে এসে বলে, -‘মা আমার কাছে বসবে চলো, আমাকে পড়াবে না? চলো না মা চলো,বাপির সাথে পরে কথা বলবে’।
রাজেন্দ্রের কথা শুনে তরুণ অসন্তুষ্ট হয়ে বলে, -‘এই হয়েছে মায়ের এক ন্যাওটা। মা ছাড়া জগৎ অন্ধকার দেখে। পৃথিবীতে যেন আর কারো মা হয় না, যতসব আদিখ্যেতা’।
রাইমা বলে,-‘চুপ করো তরুণ। আমার ছেলেকে তুমি কিছু বলবে না। মনে রেখো ওর ভালো থাকার জন্য কিন্তু তোমাকে বিয়ে করেছিলাম। যেখানে ও সুরক্ষিত নয়, সেই স্থান ত্যাগ করতে আমার বেশি সময় লাগবে না’।
‘চুপ করো তুমিও এত ছেলে আর ছেলে করোনা, শুনতে খারাপ লাগে আমার’।……….

দিনের পর দিন আবার সন্তান নিতে হবে রাইমাকে এই নিয়ে অশান্তি বেড়েই চলে। তরুণ অফিস ফেরত ড্রিঙ্ক করে বাড়ি ফেরে। রাইমা অনেক চেষ্টা করে অশান্তিকে সামাল দিতে,কিন্তু পারেনা। অশান্তির জন্য অনেক সময় রাজেন্দ্রের সাথে ও খারাপ ব্যবহার অকারনে করে ফেলে রাইমা।

একদিন শান্তভাবে অরুণকে বলে রাইমা,-‘আমি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলাম আমাদের সেপারেশন নিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ এইভাবে আর যাই হোক এক ছাদের তলায় সংসার করা যায় না। তোমাকে মুক্তি দিলাম। তুমি আবার বিয়ে করে শান্তিতে সংসার করো’।
‘কেন আবার কাউকে বিয়ে করে ছেলেকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাইছো? দেখো তোমার ছেলেকে কেউ মেনে নেবে না। আমি বলে মেনে নিয়েছিলাম, তবুও তুমি আমার কথাটা রাখলে না’।
‘না তরুণ আর খেলাঘর বাঁধবো না। এবার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনে আমার ছেলেকে নিয়ে একাই থাকবো। তবুও ওর অমর্যাদা দেখতে বা ওকে ছোট হতে কারো কাছে দেব না, ও তো আমার পাপের ফসল নয়। রাজেন্দ্র আমার পরিচয়ে চিরকাল মাথা উঁচু করে বাঁচবে। ওর জন্য আমি সবাইকে ছাড়তে পারি। এই আমার শেষ কথা। আমরা এখনই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি, ভালো থেকো’।

***********************

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *