অশ্রু —- মালা মুখোপাধ্যায়

## ভূতের গল্প

গল্পের নাম : অশ্রু

মালা মুখোপাধ্যায়

–আঁয় আঁয় আমার নাতি আঁয়। কতদিন তোকে দেখি নি। আঁয় বাছা ,কাছে আঁয়, একটু আমার কাছে আঁয়।
হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ,ও নাতবৌমা এঁসো এঁসো আমার কাছে এঁসো, দেখো কে এঁসেছে? কী আনন্দ! কী আনন্দ! আমার নাতি এঁসেছে। দাওগো নাতিকে সীতাভোগ দাও, বর্ধমান থেকে এনে রেখেছি সীতাভোগ আর মিহিদানা, বড্ডো খেতে ভালোবাসে, পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত খাইয়েছি নাতবৌমা, আমার স্বামী নায়েবমশাই, একমাত্র নাতি তখন, কত আদর, গরুর দুধের বাঁট থেকে দুধ দুইয়ে কেঁড়ে সমেত দুধ খাইয়েছে গোয়ালা, এককেজি কাঁচা দুধ খেয়ে নাতি আমার সাদা মোচ দেখিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতো। ওগো কে কোথায় আছো ,এঁসো এঁসো, আমার গোপালকে আদর কঁরো।

আহারে চোখ মুখ বসে গেছে। কতদিন খেতে পায় নি। কেউ দেখে নি বাবা , আমার কত ভাগ্যের নাতি , একমাত্র মেয়ের ছেলে,তাও কত মানত করে হঁয়েছে, সেই নাতিকে রেখে আসতে কি মন চেঁয়েছে? আমি তো থাকতাম নাতির কাছে কাছেই। ঐ যে তোর বাড়ির উত্তর দিকের তেঁতুল গাছের গোঁড়ায়। আমি তো আবার তোদের ঘরের কোণেও থাকতাম। তোকে ছেড়ে যেতে মন চাই না। ওরে তোর যোগের ব্যাটা এসেছে নোড়া, কোলে তুলে নে। আর কোলে পিঠে করিস না। ঐদ্যাখ আর এক নাতি তো আগের বার এসেছে। বলে দিয়েছি,তোর সঙ্গে একদম যেন ঝগড়া না করে। আরো চারটে নাতি আছে ,তা থাক, এখন তো তোরা দুজনে এসেছিস, এই আমার চাঁদের হাট।
আর লজ্জা করতে হবে না,নাতবৌমা, তুমিও দুটো খাও,নাতির কাছ থেকে। কতদিন দুটিকে একসঙ্গে দেখি নি রে। আমার বিটি নোড়া একরকম থেকে গেল,পাড়াবেরুনী মেয়ে। কোথায় ছেলের কাছে থাকবে , তা নয় তো তাস খেলছে ভাতকটা খেয়ে।

গোপাল আমার,আমাকে তো গয়ায় দিয়ে এলি, আমি তো থাকতে পারলাম না, তোদের পিছু পিছু চলে এসেছি।
–তোমাদের কতদিন দেখিনি। কী যে ভালো লাগছে! তোমার তো কোনো রোগ নেই। বেশ সুস্থ আছো দেখছি।
–এটা যে রোগহীন জায়গা। তুই বড্ড ভালো থাকবি।
–কোথায় আমার দাদুভাই? আঁয় আঁয় গোপাল আমার বুকে আঁয়। কিছু খেতে পাস নি রে। ও গোপালের দিদিমা,গোপালকে যত্ন করে খেতে দিও।
–সীতাভোগ মিহিদানা খাচ্ছি দাদু।
–কতদিন খেতে পাস নি। কেউ একা একা থাকে? বয়স হলে নিজের ছেলে মেয়ের কাছে থাকলে বেশি ভালো হতো রে।
–আমি যে বড়ো দোটানায় ছিলাম দাদু। তোমার নাতবৌ তোমাদের কাছে থাকে। আমি এই একরকম ঘর ছাড়া বাউল মন নিয়ে দিন কাটাতাম ঘরে থাকলেও। এখানে খুব আনন্দ হচ্ছে গো দাদু। চোখের জল ধরে রাখতে পারছি না। আবার যাদের রেখে এলাম তাদের জন্য খুব মনখারাপ করছে গো।
–তাদের কাছে না থেকে পরের কাছে কেন থাকলি রে? তোকে না খেতে দিয়ে পয়সা কটা মেরেছে। এতো বোকা, নায়েবের নাতি?
–না দাদু, ওদের বোঝা হয়ে থাকতে মন চাইতো না যে। তাছাড়া একটা ব্যাপার ছিল , তোমাদের স্মৃতি ছিল যে গাঁয়ে, গাঁয়ের রাস্তায়, আমার ঘরে। সেই গুলো নিয়ে থাকা। তা এখানে এসে ভালোই লাগছে।
—তা তো লাগবেই। তা তো লাগবেই। এখানে তো তোর সবাই আছে। আছে নাতবৌমা।হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ ,তবে বাপু এখানে কিন্তু একদম নাতবৌমাকে বকা যাবে না। এখানে শান্তির জায়গা। আমাদের তো রোজ রোজ অতো অতো খেতে হয় না। এই বর্ধমান থেকে তোর জন্য মিহিদানা সীতাভোগ নিয়ে চলে এলাম। এই ভাবে সব খাবার নিয়ে আসি। কী মজা ! কী মজা! থাক বাছা । আমি এবার গড়গড়ায় টান দেবো।
–দাদু , তবুও আমার মনখারাপ করছে আমার ঘর , সংসারের জন্য। আমি তোমাদের দেখে গেলাম। এবার যাই।
—না না দাদুভাই, ওটি যে আর হবে না। আমি তোমার দিদিমা কতবার জন্মাবো ভেবেছিলাম, তোমার দাদু বলেছে,জন্মালে আবার মরতে হবে,কি দরকার বার বার কষ্ট করার ?
–আমি তো তেমন কষ্ট পাই নি দিদিমা। বলতে চাইছি মরার জন্য যে কষ্ট সে কষ্ট তো পাই নি। আমি আবার জন্মাতে চাই। বার বার জন্মাতে চাই।
–হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ দাদুভাই , এবার জন্মালে নাতবৌমাকে একসঙ্গে নিয়ে জন্মাবে।
–না না আমি জন্মাতে চাই না ,নাতবৌমা ঘোমটার ভিতর থেকে বলে। আমি এখানে থেকে থেকে মন বসিয়ে ফেলেছি। আর যাবো না। জন্মাতে গেলেও কষ্ট আছে তো। দু’ মুঠি তে করে নিয়ে যেতে হবে মায়া আর মোহ।
–তাহলে দিদিমা তোমাদের সঙ্গে দেখা হলো,এবার আসি। সীতাভোগ খেয়ে খুব ভালো লাগলো।
–হিঁ হিঁ হিঁ হিঁ দাদুভাই ,আর এই ভাবে তো যেতে পারবে না। এসেছো থাকো। দেখি ,কার পেটের মধ্যে তুমি যাবে, তোমার দাদু এখানেও তো নায়েবমশাই,তিনিই সব ঠিক করেন কিনা?
এই অবস্থায়, এই দাঁতভাঙা অবস্থায়, এই ৯০ বছর বয়সে আর ফিরতে পারবে না। তুমি , দাদুভাই না ফেরার দেশে এসে গেছো যে!

গোপালের চোখ দিয়ে খুব জল ঝরে পড়ে—তা সবাইকে দেখতে পেয়ে আনন্দাশ্রু না যাদেরকে ফেলে এসেছে তাদের জন্য মনখারাপের অশ্রু,তা গোপালই জানে !

মালা মুখোপাধ্যায়

১৫.১২.২০২০.
৬ পি.এম.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *