ল্যান্ডার বিক্রম নিয়ে ইসরোর ভুয়ো অ্যাকাউন্ট করে বিকৃত করা হচ্ছে তথ্য, সতর্ক করলো ইসরো

১২ই সেপ্টেম্বর, বেঙ্গালুরুঃ শনিবারের হতাশার পর রবিবার ল্যান্ডার বিক্রমকে নিয়ে ISRO চেয়ারম্যান কে সিভানের বক্তব্যে স্বস্তি ফিরেছিল । সংবাদ সংস্থা ANI-কে সিভান বলেছিলেন, “আমরা চাঁদের মাটিতে বিক্রমের অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছি । অর্বিটার বিক্রমের (থার্মাল ইমেজ) ছবি তুলেছে ।” এরপর গতকাল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ISRO-র এক বিজ্ঞানীকে উদ্ধৃত করে জানায়, চন্দ্রপৃষ্ঠে আছড়ে পড়লেও অক্ষত রয়েছে ল্যান্ডার বিক্রম । নির্ধারিত অবতরণস্থানের কাছেই আছড়ে পড়েছে বিক্রম । তবে তা ভাঙেনি । অবশ্য বিক্রম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নেই । এরপর কে সিভানের নামে বিভিন্ন টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকেও বিক্রম সংক্রান্ত বিভিন্ন খবর ছড়িয়ে পড়ে সোশাল মিডিয়াতে । এবার এই বিষয়ে টুইট করে অবস্থান স্পষ্ট করল ISRO ।

 

It is noticed that accounts in the name of Kailasavadivoo Sivan is operational on many Social media. This is to clarify that Dr. K Sivan, Chairman, ISRO does not have any personal accounts. For official accounts of ISRO, please see

গতকাল এক টুইটে ISRO জানায়, ISRO প্রধান কে সিভানের কোনও অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট নেই । ISRO টুইটে লেখে, “আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কে সিভানের নামে বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং তা থেকে বিভিন্ন বিষয়ে টুইট করা হচ্ছে । আমরা স্পষ্ট করতে চাই যে সোশাল মিডিয়ায় ISRO প্রধানের কোনও অ্যাকাউন্ট নেই ।”

এদিকে ISRO-র এক বিজ্ঞানী আজ বলেন, “বিক্রমের সব যন্ত্রাংশ যদি অক্ষত থাকে, তবেই যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে । যদি অবতরণ সফল হয়ে থাকে এবং বিক্রমের সব যন্ত্রাংশ সঠিক ভাবে কাজ করে তবেই আমরা সংযোগ স্থাপন করতে পারব । এই মুহূর্তে অবশ্য কোনও বিষয়ই স্পষ্ট নয় ।”

উল্লেখ্য, 7 সেপ্টেম্বর রাত 1টা 30 থেকে 2টোর মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের কথা ছিল বিক্রমের । সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল । কিন্তু, চন্দ্রপৃষ্ঠের 2.1 কিলোমিটার দূরে বিক্রমের সঙ্গে সংযোগ ছিন্ন হয়ে যায় ।

চাঁদের পিঠে ছবি মিলল নিখোঁজ বিক্রমের, যোগাযোগের চেষ্টা চলছে, জানাল ইসরো

৮ই সেপ্টেম্বর, কলকাতাঃ না, চাঁদের পিঠে নিখোঁজ হয়নি ল্যান্ডার বিক্রম। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর ঠিক কোন জায়গায় সে নেমেছে, কক্ষপথে থাকা অরবিটার তা জানতে পেরেছে। এমনকি ছবিও তুলে ফেলেছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পা ছোঁয়ানো ল্যান্ডার বিক্রমের।

সবগুলিই ‘থার্মাল ইমেজ’। সেই সব ছবিই অরবিটার বেঙ্গালুরুতে ইসরোর গ্রাউন্ড কন্ট্রোল রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে।রবিবার এই সুসংবাদ দিয়েছেন ইসরোর চেয়ারম্যান কে শিবন। তিনি এও জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত বিক্রমের কাছ থেকে কোনও রেডিয়ো সিগনাল অরবিটারের কাছে পৌঁছয়নি। কিন্তু সে কোথায় নেমেছে, তার খবর যখন পাওয়া গিয়েছে, তখন আশা, শীঘ্রই বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে।

এখন বুঝে নেওয়া দরকার, থার্মাল ইমেজিং বলতে কী বোঝায়? কোনও ক্যামেরার মাধ্যমে থার্মাল ইমেজিং তখনই সম্ভব হয় যদি কোনও বস্তু থেকে বেরিয়ে আসা ইনফ্রারেড আলোক তরঙ্গের বিকিরণের ভিত্তিতে কোনও ছবি তোলা হয়। এই ইনফ্রারেড আলোক তরঙ্গের বিকিরণ আমাদের শরীর থেকেও প্রতি মুহূর্তে বেরিয়ে আসছে। রাতে নাইট ভিশন ক্যামেরায আমাদের ছবি তোলা হলেও সেই থার্মাল ইমেজিং পদ্ধতিরই সাহায্য নেওয়া হয়।
কী ভাবে বিক্রমের গা থেকে বেরিয়ে আসছে ইনফ্রারেড আলোক তরঙ্গের বিকিরণ?
মোহনপুরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইসার-কলকাতা)-এর বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিব্যেন্দু নন্দী জানাচ্ছেন, সূর্যের পিঠ থেকে বেরিয়ে আসা আলো প্রতি মুহূর্তেই এসে আছড়ে পড়ছে চাঁদ, পৃথিবী-সহ এই সৌরমণ্ডলের সব গ্রহে উপগ্রহেই। যে গ্রহের বায়ুমণ্ডল রয়েছে সেখানে সেই সূর্যের আলোর কিছুটা অংশ শোষিত হয়। কিন্তু চাঁদের কোনও বায়ুমন্ডল নেই তাই সূর্যের আলো, সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা সব ধরনের বিকিরণ পুরোপুরিই এসে আছড়ে পরে চাঁদের পিঠে। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পা ছোঁয়ানো বিক্রমের গায়েও এসে পড়েছে সূর্যের আলো। তাতে বিক্রমের গা গরম হয়েছে। তার মানে তাপের সৃষ্টি হয়েছে। তাপ এক ধরনের শক্তি। শক্তির ধর্ম এক শক্তি থেকে অন্য শক্তিতে বদলে যাওয়া। তাই গা গরম হওয়া বিক্রমের সেই বাড়তি তাপশক্তি ইনফ্রারেড আলোকশক্তিতে বদলে গিয়েছে। তৈরি করেছে ইনফ্রারেড আলোক তরঙ্গ। সেই তরঙ্গের মাধ্যমেই চন্দ্রযান-২-এ থাকা অরবিটার থার্মাল ইমেজ নিয়েছে বিক্রমের।
থার্মাল ইমেজের মাধ্যমে বিক্রম অক্ষত শরীরে রয়েছে কি না, বোঝা সম্ভব হবে?
পুনের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (আয়ুকা)-এর অধ্যাপক, ইসরোর ‘অ্যাস্ট্রোস্যাট মিশনের’ সায়েন্স অপারেশন বিভাগের প্রধান দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘কতটা সম্ভব তা নিয়ে আমার খুব স্পষ্ট ধারণা নেই। কারণ বিক্রমের আকার এক মিটারের (৩ ফুট ৩ ইঞ্চি) বেশি নয়।অরবিটার এখন রয়েছে চাঁদের পিঠ থেকে ১০১ কিমি উঁচুতে। ওই উচ্চতা থেকে এক মিটার আকারের বিক্রমের ছবি ইনফ্রারেড আলোক তরঙ্গে কতটা নিখুঁত ও স্বচ্ছভাবে অরবিটার তুলতে পেরেছে তা জানতে ও বুঝতে আমাদের আরেকটু সময় লাগবে।’’

চন্দ্রযান-২ এর অরবিটারে থাকা টেরেন ম্যাপিং ক্যামেরা পারে ইনফ্রারেড আলোক তরঙ্গের বিকিরণের ছবি তুলতে যার রেজোলিউশান ১০০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে হতে পারে পাঁচ মিটার। দীপঙ্কর বলছেন, ‘‘ওই উচ্চতা থেকে ওই রেজোলিউশনের ক্যামেরা দিয়ে ল্যান্ডার বিক্রমের চেহারার একটি বস্তুর ছবি তোলা  যেতে পারে। কিন্তু তাঁর গঠনগত খুঁটিনাটির সব কিছু সেই ক্যামেরায় ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম।তাই বিক্রম অক্ষত শরীরে আছে কি না বা পুরোপুরি সচল আছে কি না থার্মাল ইমেজিং-এর মাধ্যমে তা বোঝা কিছুটা দুরূহ।’’

বিক্রমের আরও ভাল ছবি তোলার অন্য উপায় রয়েছে?

দীপঙ্কর জানাচ্ছেন, আছে। অরবিটারে দুই ধরনের ক্যামেরা আছে। একটি অপটিক্যাল ক্যামেরা, অন্যটি ইনফ্রারেড ক্যামেরা। দিনের আলোয় আমাদর ছবি তুললে যতটা ঝকঝকে লাগে রাতে নাইট ভিশন ক্যামেরায় ছবি তুললে সেই ছবি কি ততটা স্বচ্ছ হয়? ঠিক সেই ভাবেই আশা করা যায়, অরবিটারের ইনফারেড ক্যামেরা বিক্রমের যে ছবি তুলেছে থার্মাল ইমেজিং-এর মাধ্যমে‌, তার চেয়ে অনেক স্বচ্ছ ও বোধগম্য ছবি পাওয়া যাবে অপটিক্যাল ক্যামেরার মাধ্যমে। সেই কাজটা অরবিটার করে ওঠা পর্যন্ত আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রেও অপটিক্যাল ক্যামেরা কিন্তু বিক্রমের ছবি পাবে চাঁদের ১০০ কিলোমিটার ওপর থেকে। ফলে অপটিক্যাল ক্যামেরার রেজোলিউশানের অনেকটাই নির্ভর করছে চাঁদের মাটিতে পা ছোঁয়ানো বিক্রমের শরীর স্বাস্থ্যের খবর কতটা নিখুঁত ভাবে পাওয়া যাবে।

এই অপটিক্যাল ক্যামেরার রেজোলিউশন কিন্তু অনেকটাই ভাল (০.৩ মিটার)। দৃশ্যমান আলোক তরঙ্গে চাঁদের মাটিতে পা ছোঁয়ানো বিক্রম কতটা উজ্জ্বল দেখাবে তার ওপরেই অবশ্য নির্ভর করছে অপটিক্যাল ক্যামেরা কতটা স্বচ্ছ ভাবে তার ছবি পাবে।

তবে দীপঙ্কর জানাচ্ছেন এ ছাড়াও আরও একটি ছবি তোলার যন্ত্র রয়েছে অরবিটারে। তার নাম ‘ইনফ্রারেড ইমেজি‌ং স্পেক্ট্রোমিটার’। তবে তার রেজোলিউশান কিন্তু খুবই দুর্বল। মাত্র ৮০ মিটার।

কেউ বলতেই পারেন, অরবিটার তো আর বৃত্তাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে না চাঁদকে। ঘুরে চলেছে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে। যার মানে যখন সে চাঁদের খুব কাছে আসছে তখন সে থাকছে ৯৬ কিলোমিটার দূরে। খুব দূরে থাকলে তার দূরত্ব হচ্ছে ১০১ কিলোমিটার। কিন্তু এই দূরত্বের ব্যবধানটা সামান্যই। মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। তাই তার ফলে অপটিক্যাল ক্যামেরায় তোলা বিক্রমের ছবির স্বচ্ছতার যে বিশেষ তারতম্য হবে তেমন আশা করছেন না বিজ্ঞানীরা।

গত ৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সময় রাত ১টা ৫২ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামার কথা ছিল বিক্রমের। কিন্তু তার মিনিট কয়েক আগে থেকেই, বিক্রম যখন চাঁদের পিঠ থেকে ২.১ কিমি উঁচুতে, সেই সময়ই অরবিটারের সঙ্গে যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ল্যান্ডারের। তার পর থেকে বিক্রমের পাঠানো কোনও রেডিয়ো সিগনালই অরবিটারে পৌঁছয়নি।

৯৫% সফল মিশন চন্দ্রযান ২, আশার কথা শোনালেন বিজ্ঞানীরা

৭ই সেপ্টেম্বর, বেঙ্গালুরুঃ ইসরোর অন্দরমহলে এখন চূড়ান্ত হতাশা। এতদিনকার গবেষণা জলে গেল! এত চেষ্টার পরও চাঁদের পিঠে নামতে পারল না বিক্রম। চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে ২.১ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত ল্যান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পেরেছিল ইসরো। তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মুষড়ে পড়ে গোটা দেশ। কিন্তু চন্দ্রযান ২ অভিযানকে কি সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা যায়? একেবারেই না। এমনই মত বিশেষজ্ঞদের। বিক্রমের কী হল, তা এখনও জানা যাচ্ছে না, তা ঠিক। কিন্তু দু’দিন পর মিললেও মিলতে পারে সুখবর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একশো শতাংশের মধ্যে ৯৫ শতাংশই সফল অভিযান। কারণ, বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেলেও এখনও অরবিটারটি অক্ষতই রয়েছে। চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবেই প্রদক্ষিণ করছে সেটি। মুন মিশনের মেয়াদ একবছর। বিজ্ঞানীদের আশা, আগামী এই একটা বছর চন্দ্রযান ২ থেকে একগুচ্ছ ছবি আসবে ইসরোর গবেষণা কেন্দ্রে। মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখাবে সেগুলি। সেই ছবিতে ধরা পড়তে পারে ল্যান্ডার বিক্রমের শেষ পরিণতি। আদতেও কি সেটি ধ্বংস হয়েছে? নাকি সংযোগ বিছিন্ন অবস্থাতেও নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বিক্রম? জানা যাবে তাও। যদি ল্যান্ডার বিক্রম ও রোভার প্রজ্ঞান নষ্ট হয়ে গিয়েও থাকে, তাতে মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। অভিযানের বাকি ৯৫ শতাংশ সফল বলেই জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

চন্দ্রযান ২ নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই চড়ছিল উত্তেজনার পারদ। রাত ৯টা নাগাদই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পৌঁছে গিয়েছিলেন ইসরোর সদর দপ্তরে। রাত যত বাড়ছিল, তত বাড়ছিল টেনশন। শেষমেশ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মাত্র পনেরো মিনিট পরেই ইতিহাস গড়তে চলেছিল ভারত। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও যখন কোনও সংকেত এসে পৌঁছল না সকলের মুখেই ঘনাল ছায়া। ISRO টেলিমেট্রি, ট্র্যাকিং এবং কমান্ড নেটওয়ার্ক কেন্দ্রের পর্দায় দেখা যাচ্ছিল গোটা অভিযানটি। সেখানেই দেখা যায়, বিক্রম তার নির্ধারিত পথ থেকে কিছুটা বিচ্যুত হওয়ার পর যোগাযোগটি হারিয়ে যায়। অর্থাৎ অবতরণ সফল হয়েছে নাকি বিফল তার কোনওটাই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া যেতেও পারে সুখবর। আপাতত সেই আশায় সময় গুনছে গোটা ভারত।

চাঁদের ২.১ কিমি উপরে নীরব হয়ে গেল বিক্রম

৭ই সেপ্টেম্বর, বেঙ্গালুরুঃ নেমে আসছিল নিখুঁত ভাবেই। কিন্তু চাঁদের মাটি থেকে আকাশে ২.১ কিলোমিটার উপরে থাকার সময় ইসরো যোগাযোগ হারিয়ে ফেলল বিক্রমের সঙ্গে!

ঠিক ৪৭ দিনের যাত্রা। একেবারে দিনক্ষণ মেপে চাঁদে নামছিল বিক্রম। দক্ষিণ মেরুর কাছে। যেখানে আজ পর্যন্ত আর কোনও দেশের যান পা রাখেনি।  ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রযানের এই ল্যান্ডারের পেটে রয়েছে ছোট্ট  চাঁদের গাড়ি বা রোভার প্রজ্ঞান। কয়েক ঘণ্টা পরে দক্ষিণ মেরুর কাছে ভোর হওয়ার কথা। ঠিক ছিল তার আগেই খুলে যাবে বিক্রমের ডালা বা র‌্যাম্প। তার উপর দিয়ে গড়িয়ে নামবে প্রজ্ঞান। ভোর ৫টা ১৯ মিনিটে। ভোরের আলো ফুটলে সেই আলো সোলার প্যানেলে মেখে জেগে উঠবে চাঁদের গাড়ি। ভোর ৫টা ২৯ থেকে প্রতি মিনিটে ৬০ সেন্টিমিটার করে এগোবে। তার পরে বিক্রম প্রজ্ঞান শুরু করবে খোঁজ, কী কী আছে চাঁদের মাটিতে ও চাঁদের উপরে! অরবিটার তো আগে থেকেই ছবি তুলে চলেছে চাঁদের। যা দিয়ে তৈরি হবে পথিবীর একমাত্র উপগ্রহের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র।

কিন্তু কী হল বিক্রমের? জানে না ইসরোও। চলছে তথ্য বিশ্লেষণ।

শ্রীহরিকোটা থেকে চন্দ্রযান ২-এর যাত্রা থমকে গিয়েছিল শেষ মুহূর্তে। ত্রুটি সামলে এক সপ্তাহ পরেই গত ২২ জুলাই বাহুবলী রকেটের ঘাড়ে চেপে রওনা দিয়েছিল ভারতের দ্বিতীয় চন্দ্রযান। তখনই ঠিক হয়েছিল যাত্রা পিছিয়ে গেলেও আগের নির্ধারিত দিনেই গন্তব্যে পৌঁছৈ দেওয়া হবে চন্দ্রযান ২-কে। ৭ সেপ্টেম্বর ১০০ দিন পূর্ণ হবে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের। সাফল্যের তালিকায় চন্দ্রবিজয়কে জুড়ে নেওয়ার পক্ষে এমন ভাল দিন আর কী হতে পারত শাসক শিবিরের কাছে! কিন্তু হল না। নামার আগে হারিয়ে গেল বিক্রম।

২০১৯-এর ভোটের আগে এ-স্যাট ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মহাকাশের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল ইসরো। সে-বার ইসরো বা ডিআরডিও-র কোনও কর্তা নন, খোদ প্রধানমন্ত্রী মোদীই সেই সাফল্য প্রচার করে বিরোধীদের বিস্তর সমালোচনা কুড়িয়েছিলেন। কিন্তু ভোটের ফলাফলেই প্রমাণ, জাতীয়তাবাদের হাওয়া তুলতে সেটাও কাজে এসেছিল মোদীর। আগামিকাল, সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার দিনে এমন একটা সাফল্য আসতে চলেছে— প্রধানমন্ত্রী তা নিয়ে খুবই উৎসাহিত ছিলেন দিনভর। আজ সকাল থেকেই একের পর এক টুইট করে গিয়েছেন তিনি। কোনওটিতে দেশবাসীকে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে বলেছেন। কখনও জানিয়েছেন, তাঁর বেঙ্গালুরুতে আসার কথা। সারা দেশ থেকে কুইজের মাধ্যমে বেছে নেওয়া যে ৬০ পড়ুয়া বেঙ্গালুরুতে তাঁর সঙ্গে বসে অবতরণ দেখবে, টুইট করেছেন তাদের নিয়েও। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।

গভীর রাতে এমন একটা ঘটনা প্রত্যক্ষ করার জন্য গোটা দেশেই আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। দেশের শহরে-গঞ্জে ও গ্রামে শুক্রবারের রাতটা গোটা দেশ কার্যত জেগেই ছিল। কোথাও দল বেঁধে, কোথাও বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে—  নজর ছিল ইসরোর বা খবর ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাইটে।

যাত্রা পিছিয়ে গেলেও পৌঁছনোর দিন একই রাখায় প্রশ্ন উঠেছিল, তাতে কোনও বিপত্তি হবে না তো! ইসরো আশ্বাস দিয়েছিল, এর জন্য গতি কিছুটা বাড়াতে হবে। পৃথিবীকে পাঁচ পাক ও চাঁদের চার পাশ পাঁচ পাক খাবে চন্দ্রযান ২। তার মাপজোকেও কিছু বদল অবশ্যই ঘটাতে হবে। গোটা দেশ ভরসা রেখেছিলেন ইসরোর বিজ্ঞানীদের উপরে। আজ তাঁদের সাফল্যের মুকুটে যোগ হতে পারত নতুন পালক। রাশিয়া, আমেরিকা ও চিনের পরে ভারত হত চতুর্থ দেশ, যাঁরা বায়ুমণ্ডলহীন চাঁদে যান নামাতে পেরেছে পালকের মতো। মঙ্গলগ্রহে বায়ুমণ্ডল রয়েছে। সেখানে যানের আছড়ে পড়া থেকে ঠেকাতে বায়ুর বাধাকে কাজে লাগিয়েছিল আমেরিকা। নাসার বিজ্ঞানী অনিতা সেনগুপ্তের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল বিশেষ প্যারাশুট। কিন্তু চাঁদে বাতাস নেই। বিক্রমের নীচে লাগানো তরল ইঞ্জিনের চারটি রকেটকে নানা পর্যায়ে  চালু করে এর গতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। সে কাজ শুরু করেও মাঝপথে ছিটকে গেল ইসরো।

চাঁদে অবতরণ বিশ্বে নতুন নয়। ষাট বছর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম বার চাঁদে যন্ত্র-দূত বা ল্যান্ডার নামিয়েছিল রাশিয়া। ১৯৬৯ সালে আমেরিকা মানুষ পাঠিয়েছে চাঁদে। চিনও চাঁদে পৌঁছেছে। গত ১১ এপ্রিল চাঁদে নামতে গিয়ে ইজরায়েলের মহাকাশযান ভেঙে পড়েছিল। ফলে  ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের কাছে এ ছিল এক নতুন পরীক্ষা। এই সফ্‌ট ল্যান্ডিং  ভারত আগে কখনও করেনি। মানসিক ভাবে প্রচণ্ড চাপে ছিলেন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ইসরোর প্রত্যেক বিজ্ঞানী, কর্তা ও কর্মী। মায় নিরাপত্তারক্ষীারাও।

উত্তেজনার বহরটা বোঝা গিয়েছিল দুপুরেই। ইসরোর তরফে কোনও বার্তা আসছে না। মুখপাত্রেরাও নীরব। ইসরো অফিস চত্বরে এক মুখপাত্রকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলাম। ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রেই শেষমেশ মুখ খুললেন তিনি। বললেন, সব ঠিকই আছে। পরিকল্পনামাফিক সব কিছু এগোচ্ছে। তবে এটাও স্পষ্ট হল, উত্তেজনায় ভুগছেন শীর্ষ কর্তারাও। সন্ধের পর থেকে ঘড়ির কাঁটা যত ঘুরছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে উত্তেজনা। ইসরো জানাল, অবতরণ রাত ১টা ৫৫ মিনিটে।

রাত ১টা ২২, মিডিয়া সেন্টারের পর্দায় তখন দেখা যাচ্ছে, কম্পিউটারে শেষ মুহূর্তের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করছেন ইঞ্জিনিয়ারেরা। প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যান এ এস কিরণকুমারকে দেখা গেল, ঘুরে ঘুরে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলতে। বিরাট জায়ান্ট স্ক্রিনে এক বার ভেসে উঠল, প্রথম অবতরণস্থলের ছবি। তা দেখেই মিডিয়া সেন্টারের সাংবাদিকদের মধ্যেও চাঞ্চল্য তৈরি হল। ১টা ২৩-এ পর্দায় ভেসে উঠল ‘মিশন অপারেশন কমপ্লেক্স’-এ এসে পৌঁছলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।

প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানালেন ইসরো চেয়ারম্যান কে শিবন। কন্ট্রোল রুমে ঢোকার আগে আশপাশ দেখে নিলেন মোদী। কন্ট্রোল রুমে ঢুকে উপস্থিত ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান কস্তুরীরঙ্গন, কে রাধাকৃষ্ণন-সহ বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলাপ করেন তিনি।

রাত ১টা ৩৮-এ শুরু হল গায়ে কাটা দেওয়া শেষ কয়েকটা মিনিট। বিক্রম তার কৃত্রিম মেধা দিয়ে প্রাথমিক ব্রেক কষা শুরু করল। সে তখন চাঁদের ৩০ কিলোমিটার উপরে। বিক্রমের ঠিক মাথার উপরে থেকে ছবি তুলে পৃথিবীতে পাঠিয়ে চলেছে অরবিটার। সেই ছবি পর্দায় ভেসে উঠতেই কন্ট্রোল রুমে হাততালি বিজ্ঞানীদের। দর্শকের আসনে মোদীরও। ১০ মিনিট পরে ফের গতি কমানোর কাজ সারল আরও সূক্ষ্ম পর্যায়ে। সে তখন চাঁদের মাটি থেকে ৭ কিলোমিটার উপরে। প্রাথমিক ভাবে একটি অবতরণস্থল ও তার বিকল্প ঠিক করা থাকলেও ১টা ৫০ মিনিটে বিক্রম তার তোলা ছবির ভিত্তিতে ল্যান্ডিং সাইট বাছাই বা ‘লোকাল নেভিগেশন’ শুরু করল।

বিক্রম তখন ২.১ কিলোমিটার উপরে। থমকে গেল পর্দা। কন্ট্রোল রুমে পিন পড়ার শব্দও শোনা যাবে। ইঞ্জিনিয়ারেরা হঠাৎ গম্ভীর। কারও মাথায় হাত। কোনও ঘোষণা নেই। এক অদ্ভুত নীরবতা। রাত ১টা ৫৩, প্রধানমন্ত্রীর গালে হাত। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছেন শিবন, কিরণকুমার। কন্ট্রোল রুম নিশ্চুপ। কী হল, বোঝা যাচ্ছে না। মিশন কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করছেন বিজ্ঞানীরা। সিবনের সঙ্গে কথা মোদীর। সঙ্গে কিরণকুমার, কস্তুরীরঙ্গন। সকলের চোখেমুখে উদ্বেগ। ২টো ৬ নাগাদ ঘোষণা, ল্যান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করা গিয়েছে। তার গতিপথের তথ্য ফের আসতে শুরু করেছে। ছবিও আসছে। কিন্তু পর্দায় ভেসে উঠল পুরোনো গ্রাফিকের ছবি। শিবন ঘোষণা করলেন, বিক্রম ২.১ কিলোমিটার উপরে থাকা পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। তার পরে বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। ২টো ১৯ মিনিটে মোদী এগিয়ে গিয়ে সিবনের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘‘আপনারা যা করেছেন দেশ আপনাদের জন্য গর্বিত। হোপ ফর দ্য বেস্ট আশা করি আবার আপনারা দেশকে খুশির খবর দিতে পারবেন।’’ উপস্থিত ৬০ পড়ুয়াদের সঙ্গে কিছু ক্ষণ কথা বলেন মোদী। তাদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তরও দেন।

আশা করা হচ্ছিল কামাল দেখাবে কৃত্রিম মেধা! এর পরে চারটির মধ্যে দু’টি রকেটকে কাজে লাগিয়ে নীচে আসার পরে মাঝের একটি রকেট চালিয়ে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক যে ভাবে হেলিকপ্টার হেলিপ্যাডে নেমে আসে, ঠিক তেমন ভাবে চাঁদে তার চার পা রাখবে ভারতের বিক্রম। তার আগের মিনিটে নিদের তোলা চাঁদের ছবি পাঠিয়ে দেবে পৃথিবীতে।

৪৭ দিনের যাত্রাপথে মাঝের এক পর্বে ইসরো প্রধান কে শিবন বলেছিলেন, আমাদের তো প্রায় দম বন্ধ হয়ে ছিল কিছু ক্ষণের জন্য। জানিয়েছিলেন অবতরণের ‘দুর্ধর্ষ মুহূর্ত’-এর অপেক্ষায় রয়েছে তিনি। আজ কেমন ছিলেন শিবন? সারা দিনে এক বারই শুধু সংবাদ সংস্থার কাছে জানিয়েছেন, ‘‘আমরা আত্মবিশ্বাসী। সাফল্য আসবেই।’’ কিন্তু ফিরে এল সেই দম বন্ধ করা মুহূর্তগুলি।

‘শক্তি-শেল’ বিপজ্জনক হতে পারে মহাকাশে, দাবী নাসার

৩রা এপ্রিল, দিনাজপুর ডেইলি ডেস্কঃ মহাকাশে ‘শক্তি’ জাহির, নাকি দূষণ! ভারতের সাম্প্রতিক ‘মিশন শক্তি’-কে বিঁধতে গিয়ে এ ভাবে শুধু কটাক্ষ নয়, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানাল, তারা আতঙ্কিত। ভারতের এই কাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক! অথচ কোনও দেশের কপালে ভাঁজ পড়ে, গত বুধবার তেমন কিছুই করেনি ভারত। দেশেরই মাটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে শুধু নিজেদেরই একটা অকেজো কৃত্রিম উপগ্রহ ধ্বংস করেছিল। মিনিট তিনেকের ব্যাপার। কিন্তু নাসা বলছে, তাতেই যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে। সংস্থার প্রধান জিম ব্রাইডেনস্টাইন দাবি করেছেন, ধ্বংস হওয়া ওই উপগ্রহের অন্তত ৪০০টি ছোট-বড় টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে মহাকাশে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন দেশের মহাকাশচারীদের পক্ষে যে কোনও মুহূর্তে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এ সব ধ্বংসাবশেষ। মহাকাশে ওই আবর্জনা ছিলই। কিন্তু ভারত ‘ক্ষেপণাস্ত্র’ ছোড়ার পর থেকেই বিপদের আশঙ্কা অন্তত ৪৪ শতাংশ বেড়েছে বলে দাবি নাসার। পৃথিবীর কক্ষপথে পাক খাচ্ছে ১০ সেন্টিমিটার ব্যাসার্ধের এমন অন্তত ৬০টি টুকরোকে এখনও পর্যন্ত চিহ্নিত করেছে নাসা। যার মধ্যে অন্তত ২৪টি টুকরো বিপজ্জনক ভাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের আশপাশেই ঘোরাফেরা করছে বলে আজ দাবি করেন জিম। কিন্তু মোট সংখ্যাটা যে প্রায় ৪০০! যার বেশির ভাগই মাধ্যকর্ষণ শক্তির টান ছাড়িয়ে উঠে চলেছে আরও আরও উপরের স্তরে। দিল্লি কিন্তু প্রথম থেকেই দাবি করে আসছে, ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডিআরডিও এই পরীক্ষামূলক এ-স্যাট ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে মহাকাশের গভীরে নয়, নেহাতই ‘লো-অরবিট’-এ। যাতে কোনও ভাবেই ধ্বংশাবশেষ মহাকাশে ছড়িয়ে না-পড়ে। বাতিল ওই কৃত্রিম উপগ্রহের যা কিছু অবশিষ্ট তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুড়ে ছাই হয়ে পৃথিবীতেই ফিরে আসবে। এ দিনও ইসরোর এক কর্তা বলেন, ‘‘ছ’মাসের মধ্যেই সব ধ্বংসাবশেষ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। ভারতকে লজ্জায় ফেলার মতো কিছুই করবে না ইসরো।’’ ‘শক্তি-শেল’ পাঠিয়ে ৩০০ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে ইসরোর বাতিল উপগ্রহ ধ্বংস করেছে ভারত। আর নাসা জানিয়েছে, এর সামান্য উপরে, ৩৭০ কিলোমিটার উচ্চতায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র। তাই ভাসতে থাকা আবর্জনা সেখানে আঘাত করলে বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। উদ্বিগ্ন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রকও। আমেরিকা-রাশিয়া-চিনের পরে চতুর্থ দেশ হিসেবে মহাকাশ যুদ্ধেও মহাশক্তি হিসেবে ভারতের এই আত্মপ্রকাশকে গোড়া থেকেই ভাল চোখে দেখেনি ওয়াশিংটন। চিন সংযত থাকার আর্জি জানালেও খোঁচা দিতে ছাড়েনি পাকিস্তান। বিশেষত, এ নিয়ে নরেন্দ্র মোদী ঢাক পেটাতে শুরু করায় শোরগোল পড়ে বিশ্ব জুড়ে। ডিআরডিও-র বিজ্ঞানীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মোদী বলেছিলেন, ‘‘ভারতের অস্ত্রভাণ্ডারে আজ অ্যান্টি-স্যাটেলাইট মিসাইল যুক্ত হল।’’

সরকারি ভাবে মুখ না খুললেও, আমেরিকার চটার কারণ, ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক ‘আউটার স্পেস’ চুক্তিতে বলাই রয়েছে, মহাকাশে কোনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র নেওয়া বা পাঠানো যাবে না। মোদী পাল্টা বলেছিলেন, এ-স্যাটের ভূমিকা সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক। কিন্তু ধ্বংস হওয়া উপগ্রহের আবর্জনার কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিশেষ মাথা ঘামাতে দেখা যায়নি দিল্লিকে। তবে অন্দরে জল্পনা ছিলই। গত কাল শ্রীহরিকোটা থেকে শত্রুর রেডারের খোঁজে কক্ষপথে একটি গোয়েন্দা উপগ্রহ (এমিস্যাট)-সহ মোট ২৯টি উপগ্রহ পাঠিয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। এমিস্যাট রাখা হয়েছে মাটি থেকে ৭৪৮ কিলোমিটার উচ্চতার কক্ষপথে। বিজ্ঞানীদের চিন্তা ছিল, ইসরোর এই রকেটও মহাকাশে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের টুকরোয় ধাক্কা খেয়ে নষ্ট হতে পারে। তেমন কোনও অঘটন হয়নি। কিন্তু যে কোনও দিন তা হতে পারে— আজ সেই আশঙ্কার কথাই মনে করিয়ে দিল নাসা। তাদের আরও ভয়, ভারতের দেখাদেখি যদি অন্য দেশও শক্তি-জাহিরের নেশায় মেতে ওঠে, তা হলে সমূহ বিপদ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ পৃথিবীর পক্ষেও। কাছাকাছি থাকা উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ কিছু দিনের মধ্যেই ছাই হয়ে ফিরে আসে। কিন্ত গভীর মহাকাশে বর্জ্যের টুকরো ধারাবাহিক সংঘর্ষের জন্ম দিতে পারে। পৃথিবীর চার পাশে ছোট-বড় বর্জ্যের বলয় তৈরিরও আশঙ্কা থাকছে। কারণ, মহাকাশে বর্জ্য জমানো বন্ধে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তি বা বিধিই যে নেই!